সুড়ং খুড়ে স্বদেশ পানে

প্রকাশিত : ১৪ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকী:
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার সাথে সাথে পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানকারী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকুরীরত বাঙালি সদস্যদেরকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে গণ্য করা হয়। তাদেরকে কড়া প্রহরায় বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে রাখা হয়। অন্যান্য বাঙালি সৈনিকদের সাথে জুবায়ের সিদ্দিকীকেও খারিয়া ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করা হয়। এটি রাওয়াল পিন্ডি ও লাহোরের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পরবর্তীতে ব্যাচেলর ও পরিবার ছাড়া আটকে পড়া অফিসারদেরকে পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পেশোয়ারের বিখ্যাত খাইবার গিরিপথের প্রবেশস্থলে ব্রিটিশ শাসনের সময় নির্মিত ‘সাগাই’ দুর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। রুক্ষ কঠিন পাথরের উঁচু উঁচু পাহাড়ঘেরা স্থানে অবস্থিত সুউচ্চ দেয়াল ঘেরা দুর্গটির একটি মাত্র প্রবেশপথ ছিলো। সেই দুর্গ থেকে তাদের একটি দলকে নিয়ে আসা হয় উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের ওয়াজিরিস্থানের বানু জেলার আরেক দুর্ভেদ্য দুর্গ ‘খাজুরি’-তে। কড়া প্রহরার সেই দুর্গ থেকে তারা পালাবার জন্যে একটি একটি সুড়ং খুড়েছিলেন। সেই বিষয়টি ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকী তার ‘আমার জীবন আমার যুদ্ধ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। সেই বর্ণনায় স্বাধীন স্বদেশে ফেরার জন্যে বন্দী একদল সামরিক অফিসারের আকুতি ফুটে উঠেছে। তার জবানিতেÑ‘এর মধ্যে একদল সাহসী অফিসার আশু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কোনো আশা নেই দেখে মাটির নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ করে পালিয়ে যাবার পরিকল্পনা করলেন অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে। এই কাজের জন্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মাত্র কয়েক জনকে এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অন্যান্য কাউকেই এ বিষয়ে কোনো কিছুই জানতে দেওয়া হলো না। কারণ যদি কোনোভাবে এই পরিকল্পনার কথা ফাঁস হয়ে পড়ে তবে আর রক্ষা নেই। মেজর কাজী ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত এবং সন্দেহপ্রবণ লোক। তার তীক্ষè দৃষ্টি এড়িয়ে এতবড় ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ করা ছিল অত্যন্ত দুরূহ । কিন্তু স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আমাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কোন আশার আলো নেই তাই বাধ্য হয়েই সুড়ঙ্গ করে পালিয়ে যাওয়ার মত একটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার পরিকল্পনা করা ছাড়া উপায়ই-বা কী ছিল?
এই কাজের জন্য কোণার একটা ছোট্ট রুমকে নির্বাচিত করা হল অত্যন্ত গোপনে। কেবল ওই রুমের বাসিন্দাদের বিষয়টি চুপি চুপি জানানো হল। রুম নির্বাচনের পর সর্বপ্রথমে যে সমস্যাটি সমাধান করতে হল তা হল মাটি খনন করার জন্য যন্ত্রপাতি জোগাড় করা। স্বাভাবিক পদ্ধতিতে এই সব যন্ত্রপাতি জোগাড় করার কথাতো চিন্তাই করা যায় না। তারপর আরও প্রধান সমস্যা হচ্ছে খনন করা শুরু করলেই যে নতুন মাটি বেরোবে সেগুলো কীভাবে এবং কোথায় লুকিয়ে রাখা হবে বা ফেলা হবে? প্রতিদিনই তো মেজর কাজী আমাদের প্রত্যেকটা রুম তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখে যদি খোঁড়াখোঁড়ির বা নতুন মাটির সন্ধান পায় অথবা যদি নতুন মাটির গন্ধ পর্যন্ত পায় তবে আর আমাদের রক্ষে নেই। এ ছাড়াও অন্যান্য সমস্যা ছিল যেমন প্রতিদিনই মেজর কাজী আমাদের প্রত্যেকটি রুম সার্চ করেন এবং জিনিসপত্র সরিয়ে সরিয়ে মেঝ দেখেন যদি কোথাও সুড়ঙ্গ করার কোন চেষ্টা করা হয়েছে কি না তা দেখার জন্য ।
এত কড়াকড়ির মধ্যে কীভাবে সুড়ঙ্গ শুরু করা যায় তা-ই নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতে হল। তবে সমস্যা যেখানে আছে এর সমাধানও খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন তরুণ অফিসারদের কাছ থেকে কিছু কিছু চমৎকার আইডিয়া পাওয়া গেল। তবে আইডিয়া যতই ভালো হোক এই কাজের ঝুঁকিতো ছিলই এবং এই ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হবে। শুধু যথাসম্ভব গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।
আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করার জন্য ছোট একাট ক্যান্টিন ছিল। আমরা ক্যান্টিনের ছেলেদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে (কারণ দুর্গে এরাই ছিল একমাত্র বেসামরিক লোক) নানা রকমের প্রলোভন দেখিয়ে ছোটোখাটো কিছু যন্ত্রপাতি জোগাড় করার ব্যবস্থা করা হল। আপাত দৃষ্টিতে এগুলো মাটিকাটার যন্ত্র নয় কিন্তু প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে । সামনের মাঠে যে একটুখানি জায়গা ছিল সেখানে মাটি সমান করে একটা বাস্কেটবল খেলার কোর্ট তৈরি করার অনুমতি নিয়েছিলাম মেজর কাজীর কাছ থেকে। আর এই কোর্ট তৈরির কথা বলে কিছু কিছু মাটি কাটার সরঞ্জাম জোগাড় করা হল ক্যান্টিনের মাধ্যমে।
যে রুমটি সুড়ঙ্গ করার জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল সেটিও অন্যান্য রুমের মেঝের মত পাকা মেঝে ছিল। আর পাকা মেঝে ভাঙতে গেলেই প্রচন্ড শব্দ হবে, সেই শব্দটা কীভাবে গোপন করা যায়? এ নিয়ে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত হল যে আমাদের উপর তলায় যখন রান্নার জন্য কুড়াল দিয়ে কাঠ কাটা হয় তখন বেশ শব্দ হয় আমরা যদি ওই শব্দের সঙ্গে মিল রেখে পাকা মেঝ ভাঙার প্রাথমিক কাজটা করি তবে দুটি শব্দ এক হয়ে যাবে এবং এতে মেঝ ভাঙার শব্দটা আলাদাভাবে বোঝা যাবে না। এবং তা-ই করা হল, ঠিক দুপুরে এই কাঠ কাটার কাজটি হতো আমাদের লোকজনও ঠিক ওই সময় শাবল দিয়ে মেঝ ভাঙার কাজটি করল। প্রায় দুই ফুট বাই দুই ফুট একটি স্লেব ভেঙে উঠানো হল। এমনভাবে উঠানো হয়েছিল যাতে কাজ শেষে অল্প সময়ের ভেতর আবার সেটা যথাস্থানে বসিয়ে দেওয়া যায়। যাতে মেজর কাজী তার রুটিন পরিদর্শনের সময় এটা যেন ধরতে না পারেন। হালকা সিমেন্ট দিয়ে জোড়াটা বন্ধ করে ওখানে চা-এর পানি ফেলে দেওয়া হতো যাতে নতুন সিমেন্টের জোড়া দেখতে পুরোনো মনে হয় । যখনই ওই রুমের ভেতর সুড়ঙ্গের কাজ হতো তখন একজন অফিসার সব সময় রুমের বাইরে ‘লুক আউট ম্যান’ হিসেবে পাহারায় থাকতেন। মেজর কাজী বা অন্য কোনও প্রহরী এদিকে আসতে দেখেলেই পূর্ব নির্ধারিত সংকেত দিয়ে সুড়ঙ্গের কাজে ব্যস্ত অফিসারদের সতর্ক করে দেওয়া হতো। সঙ্গে সঙ্গে যারা মাটি কাটার কাজে সুড়ঙ্গের ভেতর থাকতো তারা বেরিয়ে আসতো এবং পাকা স্লেবটা যথাস্থানে স্থাপন করা হতো। তবে অনেক সময় যথেষ্ট সময় না-পাওয়া গেলে যারা মাটি কাটতে সুড়ঙ্গের ভেতরে গিয়েছিল তাদেরকে সুড়ঙ্গের ভেতরে রেখেই স্লেব বন্ধ করে দেওয়া হতো আর বিপদ কেটে গেলে তাদের বের করে আনা হতো । দীর্ঘক্ষণ সুড়ঙ্গের ভেতর এভাবে বন্ধ থাকলে জীবনের ঝুঁকি ছিল কিন্তু এ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। অবশ্য সৌভাগ্য বশত তেমন কোনো অঘটন ঘটেনি ।
যখন সুড়ঙ্গের কাজ করা হতো তখন ওই রুমেরই এক সদস্য ক্যাপটেন ইকবাল, যাকে সবাই ‘গনেশ’ বলে ডাকতো, তার হারমোনিয়াম নিয়ে গানের রেওয়াজ করতে বসে যেত। এতে মাটি খনন করার সময় একআধটু শব্দ হলেও তা গানের আওয়াজের সঙ্গে আর শোনা যেত না। নতুন মাটির একটা যে সেঁদো গন্ধ আছে সেটাকে লুকানোর জন্য ঘরে আগরবাতি জ্বালিয়ে রাখা হতো ।
খননকৃত মাটিকে নির্বিঘেœ সরানোটা ছিল একটা মহা সমস্যা । ঘরের বাইরে কোথাও ফেলা যাবে না কারণ নতুন মাটি কোথাও দেখলেই কর্তৃপক্ষ বুঝে যাবে কোথাও খনন করা হচ্ছে। দেয়ালের বাইরে তো আমাদের যাবার কোনো উপায় নেই। তা হলে কী করা যায়? চিন্তা করে এরও একটা সমাধান বের করা হল। আমাদের বাথরুম ছিল ‘কমন’ অর্থাৎ একই সঙ্গে লাইন করে বেশ কয়েকটা গোসলখানা । আমরা গোসলে যাওয়ার সময় ময়লা কাপড়চোপড় নিয়ে যেতাম ধোয়ার জন্য। বালতির নিচে খননকৃত নতুন মাটি আর উপরে ময়লা কাপড়চোপড় দিয়ে ঢেকে সোজা বাথরুমে গিয়ে মাটিকে পানির সঙ্গে মিশিয়ে ধীরে ধীরে ফেলে দেওয়া হতো। এতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম ছিল। অল্প মাটি হয়ত এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে ফেলা সম্ভব ছিল কিন্তু পরবর্তীকালে যখন সুড়ঙ্গের কাজ আরও দ্রুত গতিতে এগোতে লাগল তখন সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করল। এত মাটি কোথায় লুকানো যায়? কোনো উপায় না-দেখে অগত্যা আমাদের যে সকল ট্রাঙ্ক, স্যুটকেইস, বাক্সপেটরা ছিল সবগুলো থেকে কাপড়চোপড় বের করে ওই খালি বাক্স- ট্রাঙ্ক-স্যুটকেইস সবকিছুতে মাটি ভরে যথারীতি তালা লাগিয়ে লুকিয়ে রাখা হল।
সুড়ঙ্গের কাজ যতই এগিয়ে যেতে লাগল নিত্যনতুন সমস্যাও দেখা দিতে শুরু করল। যেমন সুড়ঙ্গের ভেতর অন্ধকার আর তাই আলোর ব্যবস্থা করতে হল। রুম থেকে লুকিয়ে একটি বৈদ্যুতিক তার নিয়ে ভেতরে একটা বাল্ব লাগানোর ব্যবস্থা করতে হল। সুড়ঙ্গ যত দীর্ঘ হতে লাগল ভেতরে ততই অক্সিজেনের পরিমাণ কমে আসতে লাগল। এ ছাড়াও যেহেতু বাতাস চলাচল করতে পারছিল না সে জন্য প্রচুর গরম লাগত কাজ করার সময়।
একটা কেরোসিনের খালি টিনকে কেটে দুই ভাগ করা হল, এক ভাগে পানি আর অন্য ভাগ খালি। খালি অংশে ছোট্ট ছিদ্র করে একটা লম্বা রাবারের নল লাগানো হল। এবার টিনের খালি অংশটাকে জোরে পানি ভর্তি অংশের উপর চাপ দেওয়া হতো । এতে খালি অংশে যে বাতাস ছিল তা যাবার আর কোনো পথ না-পেয়ে ওই ছোট্ট রাবারের নল দিয়ে সোজা সুড়ঙ্গের ভেতর প্রবেশ করতো । আর এতে করে যারা ভেতরে কাজ করতো তারা প্রয়োজনীয় অক্সিজেনটুকু পেয়ে যেত। মাটির নিচে প্রচন্ড গরম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বৈদ্যুতিক লাইন সুড়ঙ্গের ভেতর নিয়ে একটা টেবিল ফ্যানেরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল ।
এ ছাড়া আরও একটি সমস্যা দেখা দিল আর সেটা হল সুড়ঙ্গের ভেতরে এটা বোঝা যাচ্ছিলো না যে সুড়ঙ্গটা কি সমান গভীরতা দিয়েই যাচ্ছে নাকি ধীরে ধীরে উপরের দিকে চলে আসছে? এটা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ সেটা না-জানলে হঠাৎ করেই মাটির উপরে চলে আসতে পারে সুড়ঙ্গের মুখ তাহলে তো সবকিছুই ভেস্তে যাবে। এর জন্যও একটা ছোট যন্ত্র তৈরি করা হল। বোতলের মধ্যে পানি ভরে শুধু একটা বাতাসের বুদ্বুদ রাখা হল। এখন যদি ওই বোতলকে লম্বালম্বিভাবে মাটিতে শোয়ানো যায় আর যদি বাতাসের বুদ্বুদটা ঠিক মাঝখানে থাকে তবে বুঝতে হবে যে লেভেলে তারতম্য হচ্ছে না, আর যদি মাঝখানে না-থাকে তবে এমনভাবে মাটি কাটতে হবে যাতে বুদ্বুদটা ঠিক মাঝখানে থাকে তাহলে সুড়ঙ্গটা একই লেভেলে যাচ্ছে বলে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সুড়ঙ্গের কাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে চললো সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করে । মাসখানেক পর ধারণা করা হল ( কেবল ধারণাই করা সম্ভব কারণ দুর্গের বাইরে কী আছে না আছে তা দেখার কোনো সুযোগ আমাদের নেই) হয়ত সুড়ঙ্গটার মুখ এতদিনে দুর্গের প্রাচীর অতিক্রম করেছে। আর একবার যদি আমাদের সুড়ঙ্গটা দুর্গের বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় তবে আমরা হয়ত আবার মুক্ত আলো বাতাসে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিতে পারবো। হয়ত আফগানিস্তান হয়ে আমরা পালিয়ে যেতে পারবো বাংলাদেশে। আশার বুক বেঁধে সুড়ঙ্গের কাজ একটু দ্রুত গতিতে চলতে লাগল। এবার উপরের দিকে ওঠার পালা। আর এবারই মহাবিপত্তিটা ঘটলো।
সুড়ঙ্গের মুখটা প্রাচীরের বাইরে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু তা একেবারে বাইরে একজন প্রহরী যেখানে দাঁড়াতো সেখানেই সেই সেন্ট্রি পোস্টের মাঝখানেই বের হয়ে পড়ল। ‘পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে’। আর যায় কোথায়? সঙ্গে সঙ্গে প্রহরী সুড়ঙ্গের আবিষ্কারের সংবাদ পৌঁছে দিল মেজর কাজীর কাছে। পাগলা ঘণ্টা বেজে উঠল। মুহূর্তে মেজর কাজী তার দলবল নিয়ে খেপা কুকুরের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের উপর। আমাদের সবাইকে রুমের বাইরে খোলা মাঠে ‘ফলইন’ হওয়ার নির্দেশ দিল। আমরা সবাই বুঝতে পারছিলাম সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। অগত্যা চুপচাপ ফলইন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মেজর কাজী ও তার দলবল একটি একটি করে আমাদের রুমের জিনিসপত্র বাইরে ফেলতে লাগল আর রুমগুলো তন্নতন্ন করে চেক করতে লাগল। একেবারে হঠাৎ করে এই অঘটনটা ঘটে যাওয়ায় সুড়ঙ্গের মুখটাও আজ আর ভালো করে বন্ধ করার সুযোগ পাওয়া যায়নি। ফলে যা হবার তা-ই হল। মেজর কাজী খুঁজে পেল আমাদের দীর্ঘদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল সেই স্বপ্নের সুড়ঙ্গ।
একেবারে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে এসে ধরা পড়ে গেল। মেজর কাজী আমাদের পালানোর প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিতে পারায় উল্লাসিত হল ঠিকই কিন্তু একই সঙ্গে প্রচন্ডভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। মেজর কাজী আমাদের কাছে জানতে চাইলেন কারা এই প্রচেষ্টার সঙ্গে সরাসরি জড়িত তারা যেন নিজের থেকেই বেরিয়ে আসেন। যারা এর সঙ্গে সরাসরি ভাবে জড়িত ছিলেন তারা একে একে সবাই নিজে নিজেই বেরিয়ে এলেন।
মেজর কাজী তখন চরমভাবে উত্তেজিত। হঠাৎ করে আমাদের সবাইকে হতবাক করে দিয়ে তার থেকে অন্তত দুই ফুট লম্বা মেজর সালামের (মেজর জেনারেল হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত) গালে লাফিয়ে উঠে দিল এক চড় বসিয়ে! আমরা অবাক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে এই কান্ডজ্ঞানহীন বর্বর দৃশ্যটি দেখলাম। আমরা আমাদের নিজেদের চোখকে যেন বিশ^াস করতে পারছিলাম না। মেজর সালাম কিছু বলতেও পারলেন না। নীরবে এই অপমান সহ্য করলেন। যারা এতে সরাসরি জড়িত বলে নিজেরাই স্বীকার করেছিলেন তাদেরকে দুর্গের বন্দিখানার ভেতরেই আরও একটি কাঁটা তাদের বেষ্টনী দিয়ে আবার অন্য স্থানে বন্দি করা হল। আমরা তাদের দূর থেকে দেখতে পারতাম কিন্তু কাছে যেতে দেওয়া হতো না। ক’দিন পরে অবশ্য তাদের আবার আমাদের সঙ্গে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।
যদিও সুড়ঙ্গটি শেষ মুহূর্তে সফল হয়নি তবু পাকিস্তানের সেনা সদর দপ্তর থেকে একটি টিম পাঠানো হয় আমাদের এই সুড়ঙ্গটি দেখার জন্য। কারণ তারা দেখতে চেয়েছিল এত কড়া নিরাপত্তার মধ্যে থেকেও কেমন করে এত সুন্দর আর নিখুত সুড়ঙ্গ করতে পেরেছিল এই বাঙালি অফিসাররা। সুড়ঙ্গটি পরীক্ষা করার সময় তো একজন পাকিস্তানি জেসিও বলেই বসল, ‘কিউ নেহি হোগা? ইয়ে অফিসার লোগ তো পাকিস্তান ফৌজকা ট্রেনিং লিয়ে হ্যায়’। পাকিস্তানিরা যতই প্রশংসা করুক না কেন আমাদের পালিয়ে দেশে ফেরার যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আর বিজয়ের আনন্দে মেজর কাজী দ্বিগুণ উৎসাহে নতুন উদ্যমে আমাদের বন্দিজীবনকে কীভাবে আরও বেশি কষ্টদায়ক করা যায় সে জন্য নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতে লাগল, যাতে আমাদের বন্দিজীবনকে আরও বেশি দুর্বিষহ করা যায়। আর তাই হল আমাদের বন্দিজীবন আরও বেশি কষ্টদায়ক হয়ে গেল। এমনই করে দীর্ঘ দুটি বছর আমরা আমাদের তারুণ্যের সোনালি সময় নর্থ ওয়াজিরিস্তানের রুক্ষ পাহাড়ে ঘেরা খাজুরি দুর্গের সুউচ্চ কারা প্রাচীরের অভ্যন্তরে অন্তরীণ থেকে কাটাতে হল।’

আরও পড়ুন