সুরমা নদী-এক মৃত্যু পথযাত্রী

প্রকাশিত : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এম, আশরাফ আলী : সেদিন ৭ জানুয়ারি ২০১৯। আমার বন্ধু ফতেহ গাজি হঠাৎ ফোন করলেন জকিগঞ্জ যেতে হবে। তাঁর প্রস্তাব রাখবো কি রাখবো না-এমনই যখন চিন্তা করছি, তখন উনি নিজে থেকেই বললেন, ‘মজা হবে, খুব মজা হবে, আমরা চার-পাঁচ জন যাচ্ছি-নোয়াহ রেডি-একটা বিবাহের ওয়ালিমা খাবো আর সুরমা ও কুশিয়ারার উৎপত্তি স্থল দেখবো। এবার ভাবুন যাবেন কি না। আমি আর না করতে পারলাম না। কারণ আমার বহুদিনের ইচ্ছা সুরমা ও কুশিয়ারার উৎপত্তি স্থল দেখার। সেই ছোটবেলায় রচনা পড়েছি ‘সুরমা নদীর আত্মকথা’ শিরোনামে। রচনাটা অনেকটা মুখস্থও করেছিলাম। এখানে সামান্য উদ্ধৃতি দিচ্ছি-
‘আমার নাম সুরমা। তাই বলে আমি চোখে দিবার সুরমা নই। আমি একটি নদী। আমি আসামের লুসাই পাহাড় হতে উৎপন্ন হয়ে বরাক নাম ধারণ করি। এই বরাক নদী বাংলাদেশ সীমান্তে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। একটি ভাগের নাম সুরমা এবং অন্যটির নাম কুশিয়ারা।
সেই কিশোর বয়স থেকেই নদী দুটোর উৎপত্তিস্থল দেখার আগ্রহ ছিল। কিন্তু সময় ও সুযোগ হয়ে উঠেনি। আজ গাজি সাহেবের প্রস্তাবে সেই ঘুমন্ত ইচ্ছা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। শত ব্যস্ততা পিছনে ফেলে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলাম।
শহরতলির মেজরটিলায় আমরা ক’জন জড়ো হলাম। গাজি ভাই, শাহীন ভাই, চুনু ভাই, আমি আরও অপরিচিত দু’জন। যাত্রা শুরু হলো বেলা দুটোয়। টার্গেট জকিগঞ্জের বারো ঠাকুরি গ্রাম। ঐতিহ্যবাহী বারো ঠাকুরি গ্রামের জাহেদুল ইসাম ও ডাঃ হুরে জান্নাত সুবাইয়ার বিবাহ উত্তর ওয়ালিমা। নোয়াহ গাড়িটি গাজি ভাইয়ের ইশারায় যাত্রা শুরু করল।
সময় স্বল্পতার জন্য যত দ্রুত সম্ভব ছুটল আমাদের গাড়িটি। গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় এটিই হলো আলোচনার বিষয়বস্তু। কে ভোট দিতে পারল আর কে ভোট দিতে পারল না। কে কোথায় কিভাবে ভোট দিলেন, কিভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হলো-ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে সবাই পক্ষে বিপক্ষে আলাপ জমিয়ে তুললেন। প্রায় দেড় ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম বারো ঠাকুরি। আমাদের গাড়িটি বরের ‘নোয়া বাড়ি’ খ্যাত বাড়িতেই ঢুকল। তখন খানাপিনা প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমরা তড়িঘড়ি নামলাম। ইতোমধ্যে বর জাহেদুল ইসলাম আমাদের আন্তরিকভাবে রিসিভ করলেন। উপস্থিত হওয়ার জন্য ধন্যবাদও দিতে ভুললেন না।
ইতোমধ্যে পেটে দারুন ক্ষিধা। খাবার পরিবেশকরা খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমরা হাতমুখ ধুয়ে বসে গেলাম। ১০-১৫ মিনিটের ভিতর খাবার শেষ করেই গাজি ভাইকে বললাম চলুন আমলসীদ। ওরাও এ জন্য প্রস্তুত ছিলেন। জকিগঞ্জে পান সুপারির কোন অভাব নেই। পানদান ভর্তি পান সুপারি। লোকেরা ইচ্ছামত চিবোচ্ছে। জকিগঞ্জ সুপারি উৎপাদনে সিলেটে প্রথম, কথাটা বললেন গাজি ভাই।
বারো ঠাকুরি গ্রামের পূর্ব দিকে বের হতেই ভারত সীমান্ত। এর পর সুরমা নদী। নদীটি তখনও চোখে পড়ছে না। চোখে পড়ল ধান ক্ষেত। ভারতীয়রা এখানে ধান চাষ করে কেটে নিয়ে গেছে। নাড়া পড়ে আছে। জনৈক ভদ্র লোক বললেন (সেখানকার বাসিন্দা) জোট সংস্কারের আমলে আমরা এ জায়গাটুকু চাষ করতাম, এখন চাষ করে ভারতীয়রা। পাঁচ সাত মিনিট হেঁটে পৌঁছে গেলাম সুরমার তীরে। কিন্তু একী কোথায় নদী? নদীর তলদেশ ফেটে চৌচির। এ অংশের পুরো নদীটি ভারতীয়দের দখলে। নদীর ওপারে উঁচু কাটাতারের বেড়া। সেই বেড়া ঘেষে সার্চ লাইট। চোখে পড়ল সীমান্ত চৌকি। বারো ঠাকুরি গ্রামের বাসিন্দা জনৈক ভদ্রলোক আমাদের সতর্ক করে দিলেন। এটি ভারতীয় সীমান্ত। চৌকি থেকে আপনাদের দেখছে ওরা। যদি হুইসেল বাজায় তাহলে দাঁড়িয়ে যাবেন না হয় গুলি করবে। আমাদের মনে অজানা ভীতি কাজ করছে। তারপরও সুরমা-কুশিয়ারার মোহনা দেখার প্রবল আগ্রহ। নদীর পার দিয়ে হেটে চললাম। ১৫-২০ মিনিটের ভিতর পৌঁছে গেলাম আমলসীদ এলাকায়। এখানে আশপাশের গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে চিল্লাকান্দি, খাশি তলা, গণিপুর, উত্তরকুল ইত্যাদি গ্রাম। দেখলাম সুরমা ও কুশিয়ারার উৎপত্তি স্থল। বরাক যেদিক থেকে বাংলাদেশের দিকে এসেছে সেখান থেকে দু’ভাগ হয়ে একটি ডানদিকে অগ্রসর হয়েছে, এর নাম সুরমা। আর অন্যটি একটু বা দিকে বেঁকে কুশিয়ারা নাম ধারণ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দুটো নদীর মধ্যে কুশিয়ারার গভীরতা বেশি। ফলে কুশিয়ারা খর¯্রােতা। কিন্তু সুরমার একী হাল? সুরমার বুক ফেটে চৌচির। পানির কোন ছিটে ফোটা নেই। জুতা পায়ে নির্বিঘেœ ওপাড়ে যাওয়া যাবে। আমার বুকে কেমন যেন ছেৎ করে উঠল। বই পত্রে অনেক মরা নদীর কথা শুনেছি। অদূর ভবিষ্যতে কি সুরমা নদী নামে কোন নদী থাকবে না? এটি কি এক সময় ইতিহাস হয়ে যাবে?
বরাকের মাইল তিনেক উজানে টিপাই মুখ। ভারত ইতোমধ্যে টিপাই বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করার কারণে সুরমার এই অবস্থা। বাসিন্দাদের মত এটাই। সুরমায় পানি প্রবাহ না থাকায় স্থানে স্থানে সুরমা শুকিয়ে যাওয়ার খবর পত্র পত্রিকায় আসছে। যে সুরমা এই সিলেটকে দিয়েছে উর্বরতা। ফুলে ফুলে সমৃদ্ধ করেছে। এই সুরমাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে সিলেট শহর। কথিত আছে হযরত শাহজালাল (রঃ) জায়নামাজ বিছিয়ে সুরমা পার হয়ে সিলেট দখল করেছিলেন। এই সুরমা আজও সেই স্মৃতি বহন করে চলেছে। সুরমায় পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে এই সুরমার হয়ত মৃত্যু হবে! সুরমাকে ঘিরে যেখানে রয়েছে সীমান্ত- সেটা পার হয়ে এসে ভারতীয়রা বাংলাদেশ সীমান্তে নোম্যান্সল্যান্ডে ক্ষেত-কৃষি করছে। অপরদিকে নদী ভাঙ্গনে বাংলাদেশের ভূমি ভারতীয়দের আওতায় যেটি চলে গেছে সেখানে গিয়ে বাংলাদেশীরা ক্ষেত কৃষি করতে পারছে না। সীমান্তবাসী ভারতীয় সার্চ লাইটের আওতায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিন গুজরান করছেন। তাদের সীমানায় কাটা তারের বেড়া, সীমান্ত চৌকি ইত্যাদি প্রবলভাবে দৃশ্যমান হলেও বাংলাদেশ সীমান্ত যেন এক নিঝুমপুরী। এখানে সীমানা নির্ধারণী পিলারগুলোও চোখে পড়ে না। একটা স্বাধীন দেশের নিজস্ব সীমান্ত রক্ষণাবেক্ষণ অতি প্রয়োজন বলেই ধরা দিল আমার কাছে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

বুদ্ধিমান বলবো না; আনিসুজ্জামান জ্ঞান-চর্চা করেছেন!!

         মোহাম্মদ আব্দুল হক : সাংবাদিক...

লিডিং ইউনিভার্সিটিতে ইউএসএআইডি-এর আউটবক্সের আয়োজনে ‘ইউথ মিটিং’ অনুষ্ঠিত

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: লিডিং ইউনিভার্সিটিতে...

কমলগঞ্জে তিন দিনব্যাপী ফলদ বৃক্ষমেলার উদ্বোধন

         কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি ঃ “পরিকল্পিত...