“সুনসান নীরবতায় পেঁয়াজ ডাবল সেঞ্চুরির পথে”

প্রকাশিত : 03 November, 2019     আপডেট : ১ মাস আগে  
  

সালেহ আহমদ খসরু

১৯৬৪ সনে ঢাকার বাজারে আগুন ছড়িয়ে পড়লো! পেয়াজ ২.৫০ আর রসুন ৩.০০ টাকা! কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ এর অরন্যে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে কি তবে এই পেঁয়াজের ঝাঁজ স্বপ্নে দর্শন ছিল কি না তাই নিয়ে সেদিনকার কাগজের পাতা লেলিহান শিখার অনলে পুড়ে ছাই হওয়ার উপক্রম হয়েছিল! কপাল ভালো এক সংবাদেই ভিন্ন মেরুর সরকারের আমলা হতে কামলা মিলে বাজারে শান্তির পরশমণি এনে দিতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।
এই পিঁয়াজ যে আজও বাজারে অনল ছড়াচ্ছে সেই খবর স্বাধীন দেশের আমলা হতে রাজনৈতিক কামলা কাউকেই ছুয়ে না গেলেও সত্যিকারের কামলা বা মধ্যেবিত্ত সমাজের চোখের জল প্রকারান্তরে নাসিকাকর্তন করার জন্য যথেষ্ট বলেই প্রতিয়মান। সর্বোপরি প্রতিদিন যে ক’টি পচনশীল বস্তু মানব সমাজের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তার অন্যতম এই ঝাঁজালো পেঁয়াজ। ইহা অনেকটা লবনের মতো, সবকিছুতেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিগত দুই মাসেরও অধিক সময় বাজারে আগুনের লেলিহান শিখা জ্বালিয়ে দিলেও এর হতে পরিত্রাণের কোন ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা কর্তাগন নুন্যতম বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করেছেন বলে কেউ জানেন বলে সাধারণ মানুষ জানেনা। হতে পারে এটি কিছু অসাধারণ লোকের কারিগরি তাই এইরকম অযোগ্য(!!)সাধারণ মানুষ বোঝার চেষ্টা করাও ধৃষ্টতার নামান্তর। তবুও সৃষ্টিকর্তা আমাদের নাক কান গলা ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঐসকল অসাধারণ মানুষের মতো বলেই কিছু কথার অবকাশ থেকেই যায়! নাহলে কারিগরি আর জারিজুরি করে পেঁয়াজ নিয়ে পিয়াজুর সাথে মুড়ি দিয়ে ভর্তার মতো যতই পিষ্ট করুক তাতে কেই-বা জিজ্ঞেস করতো! শুধু আমরাও মানুষের মতো চোখ কান সহ বাকি সব অঙ্গের নাজুক উপস্থিতি বিদ্যমান তাই যন্ত্রণা অসহ্য হয়ে উঠে অতএব চিৎকার করিয়া কাঁদিতে মন আমাদেরও চায়! সেখানেও আরও বেশি নিপিড়ন- দেখি চোখ জ্বলে কিন্তু জল গড়ায়না! কি জানি কেউ যদি টুটি চেপে ধরে,তবুও একবিন্দু সাহস সঞ্চয় করে দুকলম চালিয়ে দিলাম-দেখি কোথাকার জল কোথায় গড়ায়!
এখন আসি এই পেঁয়াজের কিছু ইতি কথায়! পেয়াজ একটি দ্বিবার্ষিক চাষযোগ্য উদ্ভিদ, প্রায় সাত হাজার বছরের উপর ধরে মানবজাতির প্রাত্যহিক জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে আছে এই পিয়াজ! চীন,হল্যান্ড,জার্মানি সহ মায়ানমার, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারত এই লাল হলুদ সাদা তিন রঙের পেঁয়াজ ফলনশীল দেশ হিসেবে বিশ্বে আলোচিত! এর মধ্যে চীন সর্বোচ্চ উৎপাদন করে এবং হল্যান্ড সর্বাধিক রপ্তানিকারক দেশ।পিঁয়াজের স্বাস্থ্যগুন কোন অংশেই অন্যান্য ফলের চেয়ে কম নয় বরং এর একটি বিশেষ দিক হল ক্যান্সার জীবাণু হত্যা করতে এই ঝাঁজ বেশ পটু বলে চিকিৎসাবিজ্ঞান সায় দেয়! অতএব এই ভেজিটেবল কেবল মুসলমান বেশী ভক্ষণ করে বলে আর অপবাদ দিয়ে ছোট করার অবকাশ তিরোহিত হয়ে বরং মুসলমানদের সহিহ খাদ্যাভ্যাস যে ইতিবাচক তার ইঙ্গিত বহন করে। এই কথার মানে এই নয় যে,অন্যান্য ধর্মের বিপক্ষে বলছি বরং এটি স্বীকার করতে আপত্তি নেই সকল ধর্মের চারণভূমি ইউরোপীয় দেশ ও এশিয়ার শক্তিমান চীন সর্বোচ্চ উৎপাদন করে প্রমানিত সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় এই ভেষজ মানব জীবনে একটি জরুরি খাদ্যবস্তু যাতে করে এর সার্বজনীন ব্যবহার প্রণিধান যোগ্য।
এটির আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল মিশরীয় মানুষ তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে পিঁয়াজের ব্যবহার এবং কতকক্ষেত্রে আরতির মতো করে একে ভীষণ উপজীব্য বিষয়ে পরিণত করেছে তাদের বিশেষ কিছু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান গুলোর মধ্যে। তাই পিঁয়াজ যেন মনুষ্য সমাজে এক অতি-জনপ্রিয়তা সম্পন্ন বস্তুতে রূপান্তরিত হয়ে আছে।
দেশের মানুষ এরকম মনে করে বলে আমার মন সায় দেয় যে,আজ বাজারের যে অস্থিরতা তার দায় বানিজ্য মন্ত্রী সহ নীতিনির্ধারণী ফোরামের কর্তাদের, কারণ একমুখী আমদানি করতে গিয়ে ভারতের ইচ্ছা অনিচ্ছায় পর্যদুস্ত দেশের বাজার, যার কারণে তাদের সুবিধার ফল হয় আমাদের নাভিশ্বাস! এ থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে চীন ইন্দোনেশিয়া ফিলিপাইন এমনকি হল্যান্ড পর্যন্ত ছুটে যেতে হবে। মায়ানমার এর পেঁয়াজ তাদের সরকারের মতো পঁচা বলেই সদ্য আমদানি করা পেঁয়াজের নির্মম উত্তর। তদুপরি অনেক ব্যবসায়ীকে বলতে শুনেছি ইউরোপ হতে আমদানি করলে স্থানীয় বাজারে ১২/১৪ টাকা কেজি দরে বিক্রয় সম্ভব। যা প্রতিবেশী দেশের রপ্তানী কারকদের চ্যালেঞ্জের সামনে ফেলবে, এতে এতোদিন যে সুবিধায় আমাদের অসুবিধায় ফেলা হতো তা বুমেরাং হয়ে তাদের মুনাফাখোর না বানিয়ে প্রতিযোগিতামুলক ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। মানবতা বেচে থাকবে, তাদেরও সম্ভ্রমের সাথে মানুষ স্মরণ করবে।প্রতিবেশী শত্রু না হয়ে বন্ধু হবে সেইটি জাতি হিসেবে আমাদের অফুরান আকাঙ্খা। ভুলে গেলে চলবেনা বানিজ্যের সাথে জড়িয়ে আছে সম্পর্কের তারতম্য বা উষ্ণতা। যতোটা উষ্ণ বলে মুখে খই ফুটানো হোক কিন্তু তা যদি মানুষের মনকে আলোড়িত না করে তবে তা তিমিরেই থেকে যাবে বরং সেই অন্ধকার না আবার কোন ব্ল্যাকহোল তৈরি করে তার জন্য কাজ করতে হবে সকল রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকেরা ও সৎ আমলাতান্ত্রিক কর্তাদের আত্মমর্যাদার সাথে তবেই সুজন হবে এপার-ওপার। নাহলে পেয়াজের ঝাঁজের এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়বে গুলির ঝাঁজ, যা কখনো কাম্য নয়- আরাধ্যতো নয়ই।
এক কথায় দশ কথা আসে কারণ অতীত যেমন বেশি সুখকর নয় তেমনি বর্তমানও খুব স্বস্তির বলা যাবে কি!! সেইখানেই প্রশ্ন নিরন্তর -কেন গনতান্ত্রিক দেশগুলো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হয়ে উঠছে!? দখলদারিত্বের নেশায় তাদের চোখ মুখ অন্তর বুদ হয়ে আছে,সেইখানে এই পেঁয়াজ এর ঝাঁজ ঘষে দিলে মন্দ হতোনা, অথচ তাদের চোখের জলের পরিবর্তে সাধারণের আজ ত্রাহিত্রাহি অবস্থা।

পেঁয়াজ নিয়ে প্যাচাল ক্যাচালে রুপান্তরিত আজকের বাজার ব্যবস্থায়, এবং তা নগর হতে একদম প্রান্তিক অঞ্চলে। সাধারণত কোরবানির ঈদের সময় এবং রমাদ্বান মাসে পেয়াজের ঝাঁজ বেশ বুঝা যায়, কিন্তু এবার একদম ব্যতিক্রমী পন্থায় এই ঝাঁজে নাকের জল চোখের পানি একাকার।
শুরু হতেই বানিজ্য মন্ত্রী মায়ানমার চীন হতে আসছে পিয়াজ বলে কয়ে আশ্বস্ত করলেও এর ছিটেফোঁটা বাজারে প্রভাব পড়েনি।বরং দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এটি সকল সীমা অতিক্রম করে ১৫০ ছুঁতে যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে! এই অভুতপুর্ব পেঁয়াজের রুক্ষ ঝাঁজ যদি কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পেতেন তাহলে এখন আর অরন্যে নয় বরং তীব্র মরম বেদনায় সাগরে ঝাপ দিয়ে সলীল সমাধি মেনে নিতেন।
কিন্তু কি অবাক সুনসান নীরবতা, কেউ কিছু বলছেনা। বিরোধী দল নামক একটি বিশাল জনগোষ্ঠী থাকলেও তাদের না আছে কান্ড না আছে জ্ঞান, মানুষের নাড়ির কথা কতখানি বুঝে বা সম্যক উপলব্ধি আছে সেই প্রশ্নের জবাব কে দিবে সেই লোক স্পষ্ট নয় মানুষের দিব্যচক্ষুতে। অথচ দুর্মুখেরা বলে যথেষ্ট জনসমর্থন নিয়েও কোথায় যেন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, সে যাক সেটি তাদের বিষয় তাই এ পাঠ অন্য কারও দ্বারা পঠিত হবে এবং সে দায়ও তাদের। যদিও রাজনীতি মানুষের জন্য ও মানবিকতার তরে আর সেই অপরুপ রাজনৈতিক অনু-পরমাণু আজ বেশি অনুপস্থিত তাই মানুষ অপেক্ষায় থেকে থেকে তার কাঙ্ক্ষিত পথ সময়ে খুঁজে নিতে ভুল করবে বলে মনে হয়না। ❤
ঠিক এমন সময় দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাকু সম্মেলন শেষ করে এসে সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন তাতে আশার বানী যতোখানি আশ্বস্ত করেছে ততোধিক দুঃখবোধ হয়তো তাড়া করছে মানুষের মনে তাঁর একটি উপদেশে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর সংবাদ সম্মেলনে বললেন, তিনিও সবকিছুতে এটি(পেঁয়াজ) ব্যবহার করেননা বা কম ব্যবহার করতে উপদেশ দিলেন! অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লাগামহীন মুল্যের লাগাম টানতে না পারলে আর কে পারবেন! তাই যিনি পারঙ্গম সেই তিনিও পেঁয়াজ এর তীব্রতা প্রশমিত করতে এর ব্যবহার কমাতে বললেন,আফসোস এখানেই !
অতএব দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন এই উপদেশ দেন তখন এটি মেনে নেওয়া একধরনের অফিস ডেকোরাম মেইনটেইন করার মতো হয়ে যায়। তখন বানিজ্য মন্ত্রী জনাব টিপু মুন্সী কতোখানি মুন্সিয়ানায় অতীতে বলেছেন-এই পিঁয়াজ নিয়ে ভাবনার কিছু নেই বা পিয়াজ কম খেতে হবে অথবা সপ্তাহান্তে এই সমস্যা থাকবেনা, এইরকম নানান দিকভ্রান্ত কথা আর কেউ আমলে নেয়না। বরং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস ও উপদেশ আলোচিত হয় নগর থেকে গ্রামের হাটবাজারে। কেউ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে বিশ্বাস রাখেন এবং আমিও রাখতে চাই। কিন্তু সর্বোপরি সব কুল ছাপিয়ে পেঁয়াজ আজ বাজারে ১৪০ পেরিয়েছে, এই ভয়ংকর উর্ধগতিতে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত।
আবার এরমধ্যে কেউ আছেন যারা অস্থির পায়চারি করে গিন্নিকে বলেন – পেঁয়াজের উপর চাপাচাপি বন্ধ করে বিকল্প ভাবো, নাহলে যে নাভিশ্বাস উঠে আজ চোখের জল ঝরছে তাতে নাসিকাকর্তন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
অবশেষে পেঁয়াজের তিন রঙের যে বাহার লাল, হলুদ ও সাদা সেইখান হতে এই আহবান জানাতে মন উতলা হয় এই বলে যে-লাল রঙের নিষিদ্ধ সিগন্যাল নয় বরং সাদা পেঁয়াজ এর শান্তির সু-বাতাস বইয়ে দিক অন্দরমহলে গিন্নী বৌঠান মা চাচি বোনেদের কাছে। নিদেনপক্ষে আপাততঃ হলুদ পেয়াজ তার রঙিলা বার্তা পৌঁছে দিক আমার আপনার অন্তরে এটিই সম্ভবত আজকের প্রেক্ষাপটে মানুষের আহাজারি, সংশ্লিষ্ট মহল যত দ্রুত বুঝতে সক্ষম হবেন ততোই মঙ্গল এবং এজন্য ইউরোপ কেন গোটা বিশ্ব ঘুরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নিতে কালবিলম্ব করবেননা তাই সাধারণ মানুষ দেখতে চায়।
এবং সংশ্লিষ্ট আমলা ও ব্যবসায়ী টাইকুন যারা আপনারা অসাধারণ থাকুন! না লাগুক পেঁয়াজ এর ঝাঁজ,না হোক যন্ত্রণাক্লিষ্ঠ প্রতিদিনের ব্যবহৃত খাদ্যদ্রব্যের জন্য বাজারের ঘানি টানা। আপনাদের সর্পিল পিচ্ছিল শরীর জুড়ে এর কোন ছায়া না পড়ুক তাতে আমরা বিন্দুমাত্র আক্ষেপ করছিনা করবোওনা, তবুও আমাদের বাঁচতে দিন কারণ আমরা অতিসাধারণ।
“সুনসান নীরবতায় পেঁয়াজ ডাবল শতকের ঘরে”

প্রাবন্ধিক
01671896677
22,kalbakhani
Sylhet city

আরও পড়ুন