সুদে টাকা না নিয়েও দম্পতিকে হয়রানির করুণ কাহিনী

Alternative Text
,
প্রকাশিত : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০     আপডেট : ১ মাস আগে
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

নূর আহমদ সুদে টাকা না নিয়েও মামলার আসামী হয়ে ঘুরছেন শানুর আলী ও হাজেরা দম্পতি। ওই মামলায় দুই দফা গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করেও দরিদ্র সবজি বিক্রেতা শানুর আলী ও তার স্ত্রী হাজেরা বেগমকে হাজিরা দিতে হয় আদালতে। মামলা চালাতে গিয়ে এখন সর্বস্বান্ত তারা। এখন সুবিচারের আশায় ঘুরছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে। সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের তিলকপুর গ্রামের বাসিন্দা এই দম্পতির অভিযোগ জালালাবাদ থানার মোঃ মানিক মিয়া নামের এক এ এস আই সুদখোর সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী। এই ঘটনার প্রতিকার চেয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (এসএমপি) বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কান্দিগাঁও গ্রামের কিছু মোড়ল প্রকৃতির লোক কড়া সুদে হতদরিদ্রদের মধ্যে টাকা দিয়ে থাকে। এরপর টাকা আদায়ে নানা পন্থা অবলম্বন করে। লাঠিয়াল বাহিনীর প্রভাব খাটিয়ে টাকা আদায়ে ব্যর্থ হলে আশ্রয় নেয়া হয় থানার কিছু অসাধু কর্মকর্তার। তেমনি এক ঘটনা ঘটেছে শানুর আলী ও হাজেরা দম্পতির ক্ষেত্রে। তবে তাদের দাবি তারা সুদে টাকা নেননি। পরিকল্পিতভাবে তাদের ফাঁসানো হয়েছে। হয়রানিমূলক মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে এসএমপি কমিশনারসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ প্রদান করেন এ দম্পতি। মামলা চালাতে গিয়ে দুঃখ দুর্দশার কথা তুলে ধরে বার বার কান্নায় চোখের পানি মুছেন।
এক সময়ের সৌদি আরব প্রবাসী শানুর আলী জানান, সেখানে ভালো টাকা পয়সা কামিয়েছিলেন। বছর কয়েক আগে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে ভিসা সংক্রান্ত জটিলতায় আর যেতে পারেননি। ২০১৮ সালের শেষের দিকে ওমান যেতে চাইলে টাকার প্রয়োজন পড়ে। এই খবর পেয়ে সাহায্যের নামে এগিয়ে আসেন কান্দিগাঁও গ্রামের মৃত ইছহাক আলীর পুত্র আজির উদ্দিন। আল হেরা নামের একটি এনজিও থেকে লোন (ঋণ) করিয়ে দিতে পারবেন বলে, শানুর আলী ও হাজেরা বেগমের এনআইডি, ছবি, ও বাড়ির দলিলের ফটোকপি এবং ফি হিসেবে ৬শ’ টাকা নেন। এরপর আশ্বস্ত করতে থাকেন,কিছু দিনের মধ্যে লোন হয়ে যাবে। একদিন বাড়ি গিয়ে একটি ফরমে শানুর আলীর স্ত্রীর স্বাক্ষর নিয়ে আসেন আজির উদ্দিন। কিন্তু এরপরও লোন হচ্ছিলো না। মাসখানেক পর লোন দেয়া যাবে না বলে, শানুর আলীর দেয়া কাগজপত্র বাড়িতে গিয়ে ফিরিয়ে দেন। তখন থেকে বিদেশে যাওয়ার আশা বাদ দিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবজি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছিলেন শানুর আলী।
একদিন পুলিশ গিয়ে ধরে নিয়ে আসলে বেরিয়ে আসে মূল ঘটনা। জালালাবাদ থানায় এসে জানতে পারেন, কান্দিগাঁও গ্রামের মৃত আব্দুল মজিদের পুত্র আব্দুর রহিম জালালাবাদ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেন। যার নং ৭০২ (১৪/০৯/১৯)। অভিযোগ আব্দুর রহিমের কাছ থেকে ৭৫ হাজার টাকা এনে ৩ হাজার টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করার কথা দিয়ে কথা রাখেননি। টাকা না দিয়ে উল্টো হুমকি ধমকি দিচ্ছেন। ঐ অভিযোগের প্রেক্ষিতেই শানুর আলীকে গ্রেফতার করে নিয়ে এসে কোর্টে চালান দেয়া হয়।
এদিকে, ঐ সাধারণ ডায়েরীর তদন্ত করেছিলেন জালালাবাদ থানার এএসআই মোঃ মানিক মিয়া। তিনি আসামী শানুর আলী ও হাজেরা বেগম ‘খুব খারাপ প্রকৃতি’র লোক উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এর প্রেক্ষিতে আদালত আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
শানুর আলীর স্ত্রী হাজেরা বেগম জানান, স্বামীকে গ্রেফতারের পর কিভাবে বের করবেন তার জানা ছিলো না। নিজের অলংকার বিক্রি করে ৮ হাজার টাকা তুলে দিয়েছিলেন এক পুলিশ কর্মকর্তার হাতে। ২য় বার দেন আরো ৬ হাজার টাকা। ওই কর্মকর্তাই দুইবার জামিন পাইয়ে দিয়েছিলেন তাদের। তবে শেষের বার ৩ দিন কারাভোগ করতে হয় শানুর আলীকে।
এসএমপির কমিশনারের কাছে দেয়া অভিযোগপত্রে এ দম্পতি উল্লেখ করেন জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা জালালাবাদ থানার এ এসআই মানিক মিয়া সুদখোর আব্দুর রহিম ও দালাল আজির উদ্দিনের অত্যন্ত ঘনিষ্টজন। সপ্তাহের একাধিক দিনে আজির উদ্দিনের সাথে তাকে কান্দিগাঁও বাজারে বসে আড্ডা দিতে দেখা যায়। যার জন্য সাধারণ ডায়েরীর সুষ্ঠু তদন্ত করেননি এ এস আই মানিক।
আব্দুর রহিম জিডিতে উল্লেখ করেছেন, কান্দিগাও একতা সমবায় যুব সংঘ নামের একটি সংগঠন থেকে ৭৫ হাজার টাকা আমরা স্বামী স্ত্রী গ্রহণ করি। অথচ ঐ গ্রামে এই নামে কোন সংগঠন নেই। শানুর আলী ও হাজেরা বেগমের দাবি সুষ্ঠু তদন্ত হলে তাদের আজ আদালতে কারাবরণ ও আদালতে উঠতে হতো না।
এলাকার চিহ্নিত সুদে টাকাদানকারী মহাজন আব্দুর রহিমের দাবি তিনি নাম মাত্র সুদে শানুর আলী ও হাজেরা বেগমকে আজির উদ্দিনের মারফতে ৭৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। ওই টাকার সুদ তো নেই, আসলও দিচ্ছেন না। এর জন্য থানায় জিডি করেছিলেন। ওই টাকা শানুর আলী ও হাজেরা বেগম নেননি বলে যে দাবি করছেন, সে বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুর রহিম জানান, তাদের আইডি কার্ড ও ছবি ও দলিলের ফটোকপি আমার কাছে আছে। আজির উদ্দিন আমাকে এই কাগজপত্র দিয়েছে।
আব্দুর রহিমের দাবি আজির উদ্দিন পার্টি ম্যানেজ করেছে, সে থানায় অভিযোগ দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। এ এস আই মানিক তারই পূর্বপরিচিত। তিনিই(এএসআই) তদন্ত করে প্রমাণ পেয়েছেন। আপনার গ্রামে একতা যুব সংঘ নামে কোন সংগঠন আছে কি জানতে চাইলে আব্দুর রহিম দাবি করেন, আজির উদ্দিন পুলিশের সাথে কথা বলে জানিয়েছে, ব্যক্তির কথা বললে হবে না, এর জন্য একটা সংগঠনের নাম দিয়েছি। আসলে ঐ নামে কোন সংগঠনই নেই। আব্দুর রহিমের সাফ কথা আমি একা নয়, এই গ্রামে আরো অনেকে সুদ খায়। আমি আমার টাকা ফেরত পেলে মামলা তুলে নিব।
অভিযোগ প্রসঙ্গে আজির উদ্দিন দরিদ্র সবজি বিক্রেতা শানুর আলী ও তার স্ত্রীর সাথে প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সুদের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না বলে অস্বীকার করছেন। তিনি বলেন,সুদ লেনদেনের সাক্ষী ছিলেন বলে তিনি ওই মামলায়ও সাক্ষী।
আজির উদ্দিন বলেন, এ এসআই মানিক মিয়া তার পূর্ব পরিচিত। শহরের থানায় থাকাকালে তার সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠে। জালালাবাদ থানায় আসার পর মাঝে মাঝে কান্দিগাও বাজারে দেখা করতে আসেন।
সুদের টাকা উদ্ধারে এ এসআই মানিকের সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে বলেন, আব্দুর রহিমের জিডির বিষয়টি তদন্ত করেছিলেন। আমি এর সাক্ষী- এর বাইরে আমার কিছু জানা নেই। তবে তার গ্রামে একতা যুব সংঘ নামে কোন সংগঠন নেই বলে জানান আজির উদ্দিন।
কান্দিগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ নিজাম উদ্দিন জানান, বিষয়টি এলাকার লোকজনের মধ্যে লেনদেন সংক্রান্ত। এ বিষয়ে যদি গ্রাম আদালতে কেউ বিচারপ্রার্থী হয়, আর গ্রাম আদালতের নীতিমালার মধ্যে পড়ে-তবে তখন দেখা যেতে পারে।
জালালাবাদ থানার এ এস আই মানিক মিয়া দাবি করেন, জিডিতে হুমকি ধমকির বিষয় ছিলো। এর জন্য আমি যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। আসামীরা কেবল হুমকি দিয়েছে এমন তথ্য প্রমাণ পেলেও-যে সংগঠন থেকে ৭৫ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে বলে সাধারণ ডায়েরীতে উল্লেখ করা হয়, সেই একতা যুব সংঘ নামের কোন সংগঠনের অস্তিত্ব আছে কিনা জানতে চাইলে মানিক জানান, সে বিষয় তার নজরে ছিলো না। মানিক দাবি করেন, টহল ডিউটি ছাড়া তিনি কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের জন্য কান্দিগাও বাজারে যান না।
এ বিষয়ে জানতে এসএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া এন্ড কমিউনিটি সার্ভিস) জ্যোতির্ময় সরকার পিপিএম এর সাথে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।


  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

আরও পড়ুন

দেশব্যাপী ধর্ষণের প্রতিবাদে গ্রাসরুটস’র উদ্যোগে মোমবাতি প্রজ্জলন

         দেশব্যাপী ধর্ষণের প্রতিবাদে তৃণমূল নারী...

করোনাভাইরাস সন্দেহে সিলেটে প্রবাসী কোয়ারেন্টাইনে

          করোনাভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে সিলেটের...

মাদ্রিদে বাংলাদেশ এসোসিয়েশনে সভাপতি সংবর্ধিত

         কবির আল মাহমুদ, স্পেন :বাংলাদেশ...