সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথ| শিডিউল বিপর্যয়, টিকেট সংকট, হিজড়াদের উৎপাত

প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০     আপডেট : ১ সপ্তাহ আগে  
  

এম আহমদ আলী  সরকার নানামুখী পদক্ষেপ সত্ত্বেও সিলেট-ঢাকা এবং সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথে যাত্রী সেবার মানোন্নয়নের তেমন কোন পদক্ষেপ নেই। ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়, টিকেট সংকট, ট্রেনে হিজড়াদের উপদ্রব, কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা এবং এটেন্ড্যান্টদের অনুপস্থিতি নিয়ে যাত্রীরা যারপরনাই বিরক্ত। এ নিয়ে তাদের ক্ষোভের শেষ নেই।
সূত্র জানায়, আয় বৃদ্ধি ও যাত্রী সেবার মানোন্নয়নের জন্য টিকেটের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি মালামাল পরিবহনের মূল্যও বাড়িয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। কিন্তু সে তুলনায় সেবার মান বাড়েনি।
জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের যাত্রী ইফতেখার হোসেন সুজন জানান, যাত্রীদের আধুনিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিক। এর অংশ হিসাবে রেলওয়েকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার পাশাপাশি যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা করে পৃথক রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ও গঠন করা হয়। কিন্তু, রেলওয়ের কতিপয় অসাধু চক্রের কারণে কাঙ্খিত সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে রেলওয়ে বিভাগ। রেলওয়ে ভ্রমণকালে যাত্রীরা সিডিউল বিপর্যয়ের কারণে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছতে পারেন না। ওই যাত্রীর অভিযোগ, ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটিয়ে যাত্রীদের বিকল্প হিসাবে বাস সার্ভিসের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো হচ্ছে।
সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের যাত্রী তুহিন মিয়া জানান, ঢাকা-সিলেট এবং চট্টগ্রাম-সিলেট রেলপথের আখাউড়া রেলওয়ে সেকশনের রেল লাইন ও ব্রীজ, কালভার্টের অবস্থা খুবই নাজুক।
অভিযোগ রয়েছে, সিলেট রেলওয়ে স্টেশনসহ বিভিন্ন টিকেট কাউন্টারে গেলে প্রায়শ টিকেট কিংবা সিট খালি নেই বলে যাত্রীদের বিদায় করে দেয়া হয়। আবার অনেক সময় অতিরিক্ত টাকা নিয়ে সিটসহ টিকেট মিলে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। টিকেটবিহীন যাত্রীদের ট্রেনে উঠাতে ও সিটসহ তাদের সেবা দিতে টিটি ও এটেন্ড্যান্টদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
ট্রেন যাত্রী তাসলিমা তাসনিম কুসুম জানান, ট্রেনে হকার ও হিজড়াদের দৌরাত্মও অনেকগুণ বেড়ে গেছে। ট্রেনে যাত্রীরা অতিষ্ঠ হয়ে শিশুদের নিয়ে আতঙ্কে যাতায়াত করেন।
ঢাকা-সিলেট,চট্টগ্রাম-সিলেট রেলপথে আন্তঃনগর ট্রেন স্টেশনে পৌঁছার আগেই ট্রেনের ভেতরে স্পীকারে ঘোষণা হতো ট্রেন কোন স্টেশনে প্রবেশ করছে। কিন্তু, দীর্ঘদিন ধরে এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। যার ফলে রাতে ট্রেনে ভ্রমণকারী যাত্রীরা প্রতিনিয়ত পড়ছেন বিপাকে। কোন সহযোগিতা তো দূরের কথা এটেন্ড্যান্টদের অনেক ক্ষেত্রে খোঁজ মেলে না। উৎকোচ নিয়ে টিকেটবিহীন যাত্রীদের ছেড়ে দেবার অভিযোগ রয়েছে রেলওয়ে পুলিশ ও আরএনবি সদস্যদের বিরুদ্ধে। এর ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়েজ উদ্দিন আহমদ  অভিযোগ করেন, গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে আন্ত:নগর উপবন এক্সপ্রেসে তিনি মৌলভী বাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল আসছিলেন। রাত তখন সাড়ে ৩টা। উপবন ট্রেনটি যথারীতি বরমচাল এসে থামে। স্টেশনের বাইরে অনেক পেছনে ট্রেনের বগি থাকায় কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের অন্ধকার রাতে তিনি বুঝতে পারেননি ট্রেনটি কোথায় দাঁড়িয়েছে। এক পর্যায়ে তিনি ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অনুমান করেন তিনি বরমচাল এসে পৌঁছেছেন। তিনি ট্রেন থেকে নামার প্রস্তুতি নেন। তাড়াহুড়া করে নামার সময় ট্রেনটি দ্রুত বেগে চলার কারণে দুর্ঘটনার সম্মুখীন হন। এতে ব্যারিস্টার ফয়েজ উদ্দিন আহমদের বাম হাতের হাড় তিনটি স্থানে ভেঙ্গে যায় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। তিনি সিলেটের একটি বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে অন্যত্র চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ট্রেনের এটেন্ড্যান্টের দায়িত্বহীনতায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে তার অভিযোগ। তিনি জানান, এর আগেও একইভাবে একজন ডাক্তারের স্ত্রী এভাবে দুর্ঘটনায় পতিত হন।
রেল সূত্র জানায়, আন্তঃনগর ট্রেনের প্রতিটি বগিতে একজন করে এটেন্ড্যান্ট দায়িত্বে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, ট্রেন ছাড়ার পর তাদের দেখা মেলে না। তারা ব্যস্ত থাকেন টিকেটবিহীন যাত্রী ও হকারদের নিয়ে। রাতে চলাচলের সময় আন্তঃনগর ট্রেনের দরজা লক (বন্ধ) করার কথা থাকলেও তা এখন করা হয় না। আগে স্টেশনে ট্রেন পৌঁছার আগেই দরজার লক খুলে দিয়ে যাত্রীদের সতর্ক করা হতো। এখন তাও হয় না বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
মৌলভী বাজারের ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় ছলিম বাজারের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের (ছদ্ম নাম)। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১১ ফেব্রুয়ারি পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনে সিলেট যাবার জন্য সিট না পেয়ে আখাউড়া-সিলেট একটি টিকেট ভানুগাছ থেকে ক্রয় করেন। তিনি ট্রেনে উঠে দেখেন অন্য এক মহিলা চট্টগ্রাম থেকে একই সিটে টিকিট নিয়ে বসে আছেন। তিনি সাথে সাথে স্টেশনের কর্তব্যরতদের জানিয়ে দাঁড়িয়ে সিলেট চলে আসেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি টিকিট নিয়ে অভিযোগ দিতে গেলে টিকিট কালেক্টর বলেন, ‘কম্পিউটারে আমি যেভাবে পেয়েছি সে ভাবে দিয়েছি। আপনি অভিযোগ যেখানে পারেন করেন। আমার কিছু করার নেই।’ এসময় সহকারী স্টেশন মাস্টার কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে রেলপথের নাজুক অবস্থার কারণে ঢাকা-সিলেট, চট্টগ্রাম-সিলেট রেললাইনের নির্ধারিত স্থান ছাড়াও অনেক স্থানে ট্রেন দাঁড় করে রাখতে হয়। আবার অনেক স্থানে ধীর গতিতে চলে ট্রেন। সিলেট আখাউড়া রেলওয়ে সেকশনের সাতগাঁও, শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ, কুলাউড়া, বরমচাল রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় এই অবস্থা বেশী দেখা যায়। বরমচাল রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় সাম্প্রতিককালে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে । এ ঘটনায় হাইকোটে একটি রিট আবেদন করেন গত ১ ফেব্রুয়ারি বরমচালে উপবন ট্রেনে দুর্ঘটনায় আহত বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়েজ উদ্দিন আহমদ ।
এছাড়া, ঢাকা-সিলেট লোকাল মেইল ট্রেন ও চট্টগ্রাম-সিলেট মেইল ট্রেনে রাতে বাতি জ্বলে না, ফ্যান চলে না। কখন আসে কখন যায়-এর কোন সঠিক সময় নেই। সিলেট-আখাউড়া লোকাল ট্রেন চললেও আসা যাওয়ার সময় অনিশ্চিত ।
জালালাবাদ এক্সপ্রেস বন্ধ ॥ রেলওয়ে সূত্র জানায়,সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথে চলাচলকারী (আপ-ডাউন) জালালাবাদ মেইল ট্রেন ইঞ্জিন সংকটের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ১৩ আপ ও ১৪ নম্বর ডাউন জালালাবাদ এক্সপ্রেস নামে ট্রেন দু’টির চলাচল গত ৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার থেকে বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জালালাবাদ এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ও ক্রুদের (চালকসহ অন্যদের) কন্টেনারবাহী ট্রেনে বদলী করা হয়েছে। এ ব্যাপারে রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা আসার সাথে সাথে তাদের জালালাবাদ এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল করা হয়েছে। কন্টেইনার পরিবহনে গতি আনার জন্য জালালাবাদ এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন কন্টেনারবাহী ট্রেনে যুক্ত করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
রেল সূত্র আরো জানায়, মালবাহী ট্রেনের জন্য এখন বাড়তি লোকোমোটিভের প্রয়োজন হচ্ছে। যে কারণে জালালাবাদ এক্সপ্রেস ট্রেন সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। জালালাবাদ এক্সপ্রেস বন্ধ হওয়ায় সাধারণ গরীব যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ডিও লেটার ॥ আখাউড়া রেলওয়ে সেকশনের উন্নয়ন এবং ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট ডাবল লাইনসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এমপি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও (আধা সরকারি পত্র) লেটার দিয়েছেন।
রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন সাম্প্রতিক সিলেট সফরে রেল লাইন উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন। সিলেট-ছাতক রেল লাইন সম্প্রসারণ করে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত করারও ঘোষণা দেন।
রেলওয়ের বক্তব্য ॥ জানতে চাইলে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার মো. নাজমুল ইসলাম গতরাতে জানান , ২৩৯টি রেলওয়ে স্টেশন পরিচালনা করছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল। চট্টগ্রাম-সিলেট লাইনে ট্রেনের ভেতরের মাইক আছে। নতুন কোচ চালু হয়েছে। আগে রেকর্ড করে মাইক চালুর ব্যবস্থা করা হবে। মাঝে মাঝে সিডিউল বিপর্যয়ের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ঘন কুয়াশার কারণে এমনটি হচ্ছে। এ অবস্থা বেশীদিন থাকবে না। রেলকে যুগোপযোগী এবং বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিচালনা করার জন্য রেলওয়ে বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
টিকেট নিয়ে অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে সিলেট রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার খলিলুর রহমান জানান, ‘এখন সব কিছু অনলাইনে হয়। মোবাইলে টিকেট ক্রয়সহ যাবতীয় তথ্য জানার সুযোগ রয়েছে। টিকেট নেই, সিট নেই এসব বলার কোন সুযোগ নেই।যা হবে সব অন লাইনে দেখা যাবে। তবে যারাই অনিয়ম করবে-তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার বলেও মন্তব্য এ কর্মকর্তার।

আরও পড়ুন



বিবি অফিসার্স কাউন্সিল-এর সাধারণ সভা

আব্দুস সোবহান ইমন : বাংলাদেশ ব্যাংক...

বর্তমান সরকার মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি আন্তরিক

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: গোলাপগঞ্জ উপজেলার...

বৈশাখী ঝড়

জালাল জয়: পৃথিবীর সুখÑ বৈশাখী...