সিলেটে শীতকালীন সবজির সমারোহ

,
প্রকাশিত : ১২ জানুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইউনুছ চৌধুরীহৃষ্টপুষ্ট লম্বা সবুজ পাতা সরিয়ে উঁকি দিচ্ছে ফুলকপি, বাঁধাকপিগুলো পাতা ছড়িয়ে দিয়ে পেয়েছে পূর্ণতা। সবুজ-হলুদ ফলের ভারে নুইয়ে পড়েছে টমেটো গাছ। নাক ফুলের মতো সাদা ছোট ছোট ফুল আর মাথা নিচের দিকে দিয়ে ধরে থাকা ফল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি মরিচ গাছ। সবুজ লতাপাতার নিচে চোখ রাখলেই কচি ক্ষিরা দেখে লোভ জাগবে যে কারো। একটু দৃষ্টি ঘুরালেই চোখ আটকাবে মুলা, শিম অথবা বেগুন ক্ষেতে। শীতের সবজিতে এভাবেই সেজে উঠেছে সিলেটের রবিশস্যের ক্ষেতগুলো।
ইতিমধ্যে শীতকালীন সবজিতে ভরে উঠেছে মাঠ। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সিলেটে সবজি উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। সিলেটের শীতকালীন সবজির চাহিদার প্রায় ৮০ ভাগই এখন স্থানীয় ভাবেই পূরণ হয়। অনেক সবজি আবার দেশের বিভিন্ন স্থানে এমনকি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। ২/৩ বছরের মধ্যে সব ধরনের সবজি স্থানীয় প্রয়োজন মিটিয়ে বাইরে সরবরাহ করা যাবে বলে জানান তারা। তবে, কৃষকরা বলছেন এসব লাভের যৎসামান্যই তাদের ভাগে পড়ে।
সিলেটে উৎপাদিত শীতকালীন সবজির মধ্যে রয়েছে, শিম, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ক্ষিরা, টমেটো, মুলা, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, বেগুন, ফরাশ, বরবটি, শালগম, ডাটা ও লালশাক । কৃষিসম্প্রসারণ অফিসের তথ্য থেকে জানা গেছে, এ বছর শীতকালীন সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৫৪ হেক্টর। এর মধ্যে রয়েছে- সিলেটে ২০ হাজার ৭৫০ হেক্টর, মৌলভীবাজার ৮ হাজার ৮৬৩ হেক্টর, হবিগঞ্জ ১৪ হাজার ৫শ হেক্টর এবং সুনামগঞ্জে ১১হাজার ৪৪১ হেক্টর।
পূর্বের বছরের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ সালে মোট ৫৩ হাজার ২২২ হেক্টর জমিতে শীতকালিন সবজি আবাদ হয়েছে। উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ ছিল ১২ লক্ষ ৬ হাজার ৪৬০ মেট্রিক টন। এর পূর্বে ২০১৬-১৭ সালে সিলেট বিভাগে মোট ৫০ হাজার ৩০২ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছে ১০ লক্ষ ৮০ হাজার ৩৩৬ মেট্রিক টন সবজি।
পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ সালের তুলনায় ২০১৭-১৮ সালে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে বেশি আবাদ হয়েছে। এ সময় উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২ লক্ষ মেট্রিক টন। অপরদিকে, চলতি বছর আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৫৪ হেক্টর জমি। যা পূর্বের ২০১৭-১৮ সালের তুলনায় প্রায় পৌনে দুই হাজার হেক্টর বেশি। এ বছরের উৎপাদনের হিসাব আরো ৩ মাস পরে জানা যাবে। তবে এ বছরও উৎপাদন পূর্বের বছরের তুলনায় বাড়বে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, গতবছর ও এর পূর্বের বছরের সবজির জাতভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ফুলকপি ও বাঁধাকপি আবাদের জমির পরিমাণ না বাড়লেও উৎপাদন বেড়েছে। গত বছর ২০১৭-১৮ সালে ফুলকপি উৎপাদন হয়েছে ৮৯ হাজার ২৮৭ মেট্রিক টন এবং বাঁধাকপি উৎপাদন হয়েছে ১ লক্ষ ১৬ হাজার ১১৭ মেট্রিক টন। ফুলকপি উৎপাদন হয়েছে সিলেটে ৫৪ হাজার ৯৩২, মৌলভীবাজারে ৮ হাজার ৪২৮, হবিগঞ্জে ১৫ হাজার ১৫৫ এবং সুনামগঞ্জে ১০ হাজার ৭৭২ মেট্রিক টন। বাঁধাকপি সিলেটে ৫১ হাজার ৪০, মৌলভীবাজারে ১৩ হাজার ১৪৮, হবিগঞ্জে ৩৬ হাজার ৩৪০ এবং সুনামগঞ্জে ১৫ হাজার ৫৮৯ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে।
অপরদিকে, শিম চাষে জমি ও উৎপাদন দুটোই বেড়েছে। প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত বছর সিলেটে শিম উৎপাদন হয়েছে ৮১ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন। এর পূর্বের বছর যেখানে উৎপাদন ছিল ৬৯ হাজার ৮৯৬ মেট্রিক টন। গত বছর সিলেটে ২১ হাজার ৭২৫ মেট্রিক টন, মৌলভীবাজারে ৯ হাজার ৬৩৮, হবিগঞ্জে ১৫ হাজার ৪২১ এবং সুনামগঞ্জে ৩৪ হাজার ৭৬৬ মেট্রিক টন শিম উৎপাদিত হয়েছে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, সুনামগঞ্জে সবচেয়ে বেশি শিম উৎপাদিত হয় ।
টমেটো গত বছর উৎপাদন হয়েছে ২ লক্ষ ৪৩ হাজার ১৬৫ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সিলেটে ৯৯ হাজার ৮৪০, মৌলভীবাজারে ৪৬ হাজার ৯৫০, হবিগঞ্জে ৩৫ হাজার ২০৫ এবং সুনামগঞ্জে ৬১ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন উৎপাদিত হয়েছে। এরপূর্বের বছর উৎপাদন ছিল ২ লক্ষ ৩ হাজার ৫১ মেট্রিক টন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অন্য ফসলের উৎপাদনও বেড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সিলেটের সর্বত্র সবজির আবাদ হলেও বড় পরিসরে আবাদ হয় সিলেটের সদর উপজেলার মোগলগাঁও, কুমারগাঁও, কান্দিগাঁও, দক্ষিণ সুরমার মোগলাবাজার, লালাবাজার, কামালবাজার, গোলাপগঞ্জ উপজেলার তুড়–কভাগ, হেতিমগঞ্জ, লক্ষণাবন্দ, কানাইঘাট উপজেলার ডালারচর, মুলাগুল, লুভারমুখ, লালরচক, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সদর, তিলকপুর, আলীনগর, রানিবাজার, আদমপুর, ঘোড়ামারা, বড়লেখার দাসবাজার, কাঁঠালতলি, শাবাজপুর, হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার পুটিজুরি, দিগম্বর, মাধবপুর উপজেলার মনতলা, চৌমুহনী, জগদীশপুর, চুনারুঘাটের রানীগাও, উবাহাটা, দেউলহাট, আমুরুক, মিরাশি, সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার, বালিউরাবাজার, নশিংপুর, বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার মতুরকান্দি, বাগবেড়, কাটাখালি ইত্যাদি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফসলের পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক। কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ সার ছিঁটানোয় ব্যস্ত, কেউবা আবার পানি দিচ্ছেন। নুয়ে পড়া গাছটি পরম যতেœ তুলে দিচ্ছেন কেউ। শিম বা লাউয়ের ঝাইয়ে লাগিয়ে দিচ্ছেন বাঁশের কঞ্চি।
কানাইঘাটের কৃষক আকদ্দস আলী বলেন, প্রতি কেদারে বাঁধাকপি রোপণ করা যায় ৪ হাজার এবং ফুলকপি রোপণ করা যায় ৩ হাজার। কপি আবাদে প্রতি কেদারে খরচ হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। উৎপাদন পাওয়া যায় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা। অপরদিকে, টমেটো উৎপাদনে প্রতি কেদারে খরচ হয় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং উৎপাদন পাওয়া যায় প্রায় ৮০ হাজার টাকার। তবে, এসব উৎপাদন প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল।
শীতের রোদ মিষ্টি হলেও ছায়াহীন নদীর চরে কাজ করা গায়ে রোদ লাগানোর মতো নয়। রোদে পায়ের নিচের বালিও উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এর মধ্যে সবজির পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক আতাউর রহমান বলেন, এই সবজি খাওয়া আর বিক্রির জন্য ফলানো হলেও এর সাথে রয়েছে মমতার সম্পর্ক। অনেক যতেœ এগুলো বেড়ে উঠে। এসব সবজি রসনায়ই শুধু নই, দেখতেও প্রশান্তি লাগে। কিন্তু যখন কাক্সিক্ষত মূল্য পাওয়া যায় না, তখন খুবই কষ্ট লাগে।
কৃষক আব্দুল্লাহ ও আতাউর রহমান জানান, প্রতি বছর তাদের শীতকালীন সবজি আবাদে দেড় থেকে ২ লক্ষ টাকা খরচ হয়। ফলন ভালো হলে ৮০ থেকে ১ লক্ষ টাকার মতো আয় পাওয়া যায়। তবে, এবার আয় বের করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন তারা। কৃষি বিভাগের সহায়তার বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, এখনো কোনো কৃষি কর্মকর্তার সাক্ষাৎ বা সহযোগিতা পাননি।
এক সময় সবজি উৎপাদন ও ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন-বিয়ানীবাজারের চারখাই ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী বলেন, ‘কৃষকদের জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কৃষকরা যাতে এসব পান-তা নিশ্চিত করতে হবে।’
কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট আঞ্চলিক অতিরিক্ত পরিচালক মো. আলতাবুর রহমান বলেন, সিলেটে সবজি উৎপাদন বাড়ছে। অনেক সবজি এখন সিলেট থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানসহ দেশের বাইরেও যাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২/৩ বছরের মধ্যে সিলেটে উৎপাদিত সব ধরনের সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাইরে সরবরাহ করা যাবে।
তিনি বলেন, সিলেটে এখনো অনেক জমি অনাবাদী রয়েছে। সরকার এসব জমি চাষের আওতায় আনতে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। একই সাথে কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। কৃষি উপকরণ প্রদান, প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী, পরামর্শ এবং পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। কৃষি বিভাগ এসব কার্যক্রম দক্ষতার সাথে চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন আরো বাড়বে।
অনেক কৃষকের সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, একজন কৃষি কর্মকর্তার আওতায় দেড় থেকে ২ হাজার কৃষক রয়েছেন। সবার সাথে তার যোগাযোগ নাও হতে পারে। তবে, কৃষকরা ফসল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কিত যে কোনো সমস্যা নিয়ে কৃষি বিভাগের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। প্রতি ইউনিয়নের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রয়েছে। তাকে না পেলে কৃষক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার নিকট বলতে পারেন। তিনি অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক কমর্কর্তার নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর রয়েছে। কৃষকদের যে কোনো সমস্যায় সরাসরি অথবা ফোনে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। কৃষকদের সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

সিলেটে নয়া ডিসি নিয়োগ

         জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এম কাজী...