সিলেটে শতবর্ষে রবীন্দ্রনাথ: কবিগুরু স্মরণে এক অনন্য গ্রন্থ’

প্রকাশিত : 24 November, 2019     আপডেট : ৩ সপ্তাহ আগে  
  

নাসিম আহমদ লস্কর

রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে কাউকে চিনাতে হবে না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কর্মপরিচয়ে বেঁচে আছেন, বেঁচেন থাকবেন। বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য ব্যক্তিত্ব ১০০ বছর আগে ১৯১৯ সালে আধ্মাত্মিক রাজধানী সিলেটে এসেছিলেন। কালের পরিক্রমায় এ বছর তাঁর আগমনের শত বছর পূরণ হলো।
সিলেটের বর্তমান সাহিত্যিকগণ তাঁর এ আগমনকে স্মরণে রাখতে, কেউ তাঁকে নিয়ে লিখেছেন কবিতা, ছড়া; কেউবা লিখেছেন প্রবন্ধ। রবীন্দ্রপ্রেমিক লেখক ও প্রাবন্ধিক বিমল কর তাঁকে স্মরণে রাখতে, তাঁর আগমনের শত বছর পূর্তির বার্তা সকলের মধ্যে পৌঁছিয়ে দিতে ১০ জন প্রাবন্ধিক ও ৩১ জন কবির কবিতা নিয়ে সম্পাদনা করেছেন ‘সিলেটে শতবষে রবীন্দ্রনাথ’ নামক একটি তথ্যবহুল গ্রন্থ। প্রকাশক: মো. জসিম উদ্দিন, জসিম বুক হাউস প্রকাশনী, সিলেট। এ নিবন্ধে বইটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হলো।
প্রাবন্ধিক বিপ্রদাস ভট্টাচার্য্য ‘মানবতার জয়গানে রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে কবিগুরুর মানবপ্রেমের বিষয়টি পাঠক সমাজে সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথ এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে ধর্মের নামে থাকবেনা নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, হানাহানি। যেখানে প্রত্যেকটা মানুষের বড় পরিচয় হবে যে, সে একজন মানব প্রেমিক। প্রবন্ধের কিছু অংশ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে দেওয়া হল: ‘রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন মানবসমাজের সাথে মিত্রতা ও বন্ধন। যে বন্ধনে মানুষ খুঁজে পাবে তার কর্ম, কর্তব্য এবং দায়িত্ব। মানুষ এক বিশ^মানবের সন্ধান লাভ করবে। বিশ^ চরাচরে মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে।’ এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার চরণবিশেষ তুলে ধরেছেন:
সে আজি বিশে^র মাঝে মিশিছে পুলকে
সকল আনন্দে আর সকল আলোকে সকল মঙ্গল সাথে।
রবীন্দ্রনাথ জমিদার বংশোদ্ভূত হলেও তাঁর মাঝে এসবের কোন গৌরব ছিলো না। তিনি ছিলেন কৃষকদের বন্ধু। কৃষি ঋণ সহজলভ্য করার জন্য তিনি ১৯০৫ সালে কৃষি ব্যাংক চালু করেছিলেন। নোবেল পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্র্থ তিনি বিশ^ভারতীতে দান করেছেন এবং তারা এই টাকাগুলো কৃষকদের ঋণ দেওয়ার জন্য কৃষি ব্যাংকে রেখেছিলো। রবীন্দ্রনাথের কৃষাণ প্রেমের অনেক অজানা তথ্য রয়েছে প্রাবন্ধিক বাবুল আহমদ লিখিত ‘কৃষকবন্ধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ প্রবন্ধে।
সিলেটের মানুষের সাথে ছিল কবিগুরুর পত্র যোগাযোগ। লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী সহ অনেককেই তিনি পত্র লিখতেন। প্রাবন্ধিক নৃপেন্দ্র লাল দাসে’র ‘রবীন্দ্রপত্রে চিত্রিত সিলেটের মানুষ’ প্রবন্ধে এ নিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে অনেক তথ্য।
বইটির সম্পাদক ও প্রাবন্ধিক বিমল কর’র ‘রবীন্দ্র সাধু বাক্য জানলে ওকারন্ত উচ্চারণ সহজ’ প্রবন্ধটি আবৃত্তিকারদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রায়ই কোনটি চলিত শব্দ এবং কোনটি সাধু শব্দ তা নির্ণয় করতে এবং শব্দগুলোর সঠিক উচ্চারণ করতে জটিলতার সম্মুখীন হই। প্রাবন্ধিক প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লিখা কিছু গল্প যেমন: ‘ব্যবধান’ ‘পোস্ট মাস্টার’ সহ কিছু গল্পের লাইন তুলে ধরেছেন এবং কিভাবে শব্দের সাধু-চলিত রূপ নির্ণয় করা যায়, কীভাবে সঠিক উচ্চারণ করা যায়; এসবের কিছু কৌশল তুলে ধরেছেন।
সিলেট নগরীর চৌহাট্টায় অবস্থিত ‘সিংহ বাড়ি’। রবীন্দ্রনাথ সিলেট আসার পরে কিছুদিন এ বাড়িটিতে অবস্থান করেছিলেন। তাঁর এ বাড়িতে আগমন এবং এ বাড়িটি সম্পর্কে অনেক তথ্য রয়েছে প্রাবন্ধিক সুকান্ত গুপ্তের ‘সিংহ বাড়িতে কবিগুরুর পদধূলি’ প্রবন্ধে।
উপর্যুক্ত ৫টি প্রবন্ধ ছাড়াও গ্রন্থটিতে আরো ৫টি প্রবন্ধ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে, ‘রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা: শামসুল বাসিত শেরো’, ‘রবীন্দ্রনাথের অগ্রন্থিত কবিতা ও কবি প্রণাম: সুমন কুমার দাশ’, ‘রবীন্দ্রনাথকে যতো জানি ততো ভালোলাগে: চৈতী মালাকার’, ‘রবীন্দ্র সাধনায় অবিচ্ছেদ্য মৃণালিনী: হিমেল মাহমুদ’, ‘আমার রবীন্দ্রনাথ: শঙ্করী গিরি’। এছাড়াও রয়েছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা ৩১টি কবিতা ও ছড়া। এসব প্রবন্ধ ও ছড়াগুলোতে বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।
আমার বিশ^াস আগামী ২১১৯ খ্রিস্টাব্দে যখন সিলেটবাসী রবীন্দ্রনাথকে স¥রণ করবে তখন এ বইটিকে কেউ অস্বীকার করতে পারবেনা। রবীন্দ্রনাথের সিলেট আগমনের দু’শো বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে তাঁকে নিয়ে যখন আলোচনা করা হবে তখন বইটির ১০০ বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে একই মঞ্চে বইটি নিয়ে আলোচনা করা হবে। আমার আরও বিশ^াস সমসাময়িক পাঠকদের হাতে হাতে বইটি আপন গুণে পৌঁছে যাবে।

শিক্ষার্থী; শাবিপ্রবি।

আরও পড়ুন