সিলেটে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ প্রকল্প সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কাজ পেল না সরকারি কোম্পানি

প্রকাশিত : ৩১ মার্চ, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ উন্নয়নে সরকারের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ প্রকল্পে সর্বনিম্ন দর দিয়েও ঠিকাদারেরা কাজ পাচ্ছেন না। রাজনৈতিক প্রভাবসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতাদের কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আর সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কাজ পায়নি সরকারি কোম্পানি।

কাজ পাওয়া ১০৩ কোটি টাকার ১০টি দরপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সবকটিতেই কাজ পেয়েছেন সর্বোচ্চ দরদাতারা। এতে সরকারের অপচয় হয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, সিলেট বিভাগে বিদ্যুৎ উন্নয়নে প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ১০টি দরপত্রের ওপর অনুসন্ধান করা হয়।

সরকারি ক্রয়নীতি (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস বা পিপিআর) অনুযায়ী, কোনো দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতার কাগজপত্রে ঘাটতি থাকলে তাঁকে চিঠি দিয়ে কারণ জানাতে বলা হবে। তবে সিলেটে এসব কাজে সর্বনিম্ন কোনো দরদাতাকেই পিডিবির পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়নি। এমনকি দরপত্রে অংশ নিয়ে সরকারের নিজের প্রতিষ্ঠানও কাজ পাচ্ছে না।

‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুতের সংযোগ পৌঁছে দিতে চায়। এর অংশ হিসেবে সিলেট বিভাগের বিদ্যুতের উন্নয়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

সর্বনিম্ন হলেও সরকারি কোম্পানি বাদ

বিপিডিবির একাধিক প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি কোম্পানি সাধারণত সব ধরনের শর্ত পূরণ করে থাকে। আর পিপিআর অনুযায়ী, সরকারি কোম্পানি দরপত্রে অংশ নিলে সেটি অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। কিন্তু সিলেটে বিদ্যুতের এই প্রকল্পে সেটিরও ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কোম্পানি ‘বাংলাদেশ ইনস্যুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারিওয়্যার ফ্যাক্টরি লিমিটেড’ (বিআইএসএফ) সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কাজ পায়নি। সরকারের এ প্রতিষ্ঠানটি সিলেট প্রকল্পে ৩৩ কিলোভোল্ট লাইনের খাম্বায় ব্যবহারের ইনস্যুলেটর সরবরাহের জন্য দরপত্রে অংশ নিয়ে2 দাম দেয় ৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। সরকারের প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে আরমা ইলেকট্রিক নামে বেসরকারি কোম্পানিকে পিডিবি কাজ দিয়েছে ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকায়। অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইনস্যুলেটর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ফলে সরকারি কোম্পানির কাগজপত্রে ঘাটতি থাকার যুক্তিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মানতে নারাজ।

সর্বনিম্ন তিন দরদাতাই বাদ

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত সিকদারের স্ত্রীর ‘কম্পিউটার ওয়ার্ল্ড বিডি’ নামের প্রতিষ্ঠানকেও নিয়ম ভেঙে কাজ দেওয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটি খাম্বায় ব্যবহারের জন্য ডিস্ক ইনস্যুলেটর সরবরাহের কাজ পেয়েছে। ‘কম্পিউটার ওয়ার্ল্ড বিডি’ ডিস্ক ইনস্যুলেটর তৈরি করে না। প্রতিষ্ঠানটি চীন থেকে ডিস্ক ইনস্যুলেটর আমদানি করে বিপিডিবিকে সরবরাহ করবে। অথচ ইনস্যুলেটর উৎপাদনকারী সরকারি কোম্পানি বিআইএসএফ কাজ পায়নি।

কাজটির মোট মূল্য ৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অথচ এ দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল তিনটি; ৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় জাহাঙ্গীর হাসান মানিক, ৯ কোটি ৭ লাখ টাকায় সরকারি কোম্পানি বিআইএসএফ ও ৯ কোটি ৯ লাখ টাকায় নাহিদ কনস্ট্রাকশন।

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত সিকদার অবশ্য রাজনৈতিক প্রভাবে কাজ পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ হচ্ছে। সেখানে আমি বিদ্যুতের কয়েকটি কাজ পেয়েছি। এটা পেয়েছি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, দরপত্রে অংশ নিয়ে।’ তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে তিনি আরও কাজ পেতেন।

পাঁচটি কাজ পেয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান

এই ১০টি কাজের মধ্যে ৫টি পেয়েছে ‘আরমা ইলেকট্রিক কোম্পানি’ নামে একটি কোম্পানি। পিডিবির যুক্তি, যথাযথ কাগজপত্র না থাকায় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়া সম্ভব হয়নি

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গত মঙ্গলবার মুঠোফোনে বিপিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিলেট প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হচ্ছে না। নিয়ম মেনেই কাজ দেওয়া হচ্ছে। তবে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দিতে হবে এমন নিয়ম কোথাও নেই। সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও যারা কাজ পায়নি, তাদের কাগজপত্র সঠিক ছিল না।’

তাহলে সরকারি কোম্পানি বিআইএসএফ নিম্ন দরদাতা হয়েও কেন কাজ পেল না—প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদেরও কাগজপত্র ঠিক ছিল না।

আরমা নামে যে প্রতিষ্ঠানটি সর্বাধিক কাজ পেয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতায় ঘাটতি থাকার তথ্য-প্রমাণ হাতে আছে। এমন প্রতিষ্ঠান বেশির ভাগ কাজ পেল জানতে চাইলে খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘আপনি আন্দাজে কথা বলছেন। কোথাও কোনো দুর্নীতি হচ্ছে না। আমরা ঠিকভাবে কাজ করছি। আপনারা সংকট তৈরি করবেন না।’

 দুই কর্তার শক্তি রাজনৈতিক পরিচয়

ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল দুই ব্যক্তি হলেন বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ ও প্রকল্প পরিচালক এম এম সিদ্দিকী। পিডিবির দাপ্তরিক সম্পর্কের বাইরে এই দুই ব্যক্তির মূল শক্তির জায়গা রাজনৈতিক পরিচয়। পেশাগত স্থানে পিডিবির চেয়ারম্যান উঁচু পদ আর প্রকল্প পরিচালক তুলনামূলক নিচু পদ। তবে দুজনই বিপিডিবির বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদ শাখার নেতা। আওয়ামী লীগের বন্ধুপ্রতিম পিডিবি শাখার সংগঠনটির সভাপতি হলেন পিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ, আর এ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হলেন প্রকল্প পরিচালক এম এম সিদ্দিকী। রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়ম ভেঙে সর্বোচ্চ দামে ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে।

তবে ঠিকাদার নিয়োগে কোনো দুর্নীতি হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক এম এম সিদ্দিকী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমরা স্বচ্ছতা মেনেই কাজ করেছি, দুর্নীতি হয়নি।’

সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে গত মঙ্গলবার রাতে মুঠোফোনে বিদ্যুৎ-সচিব আহমদ কায়কাউস প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেননি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। দুর্নীতি হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিজ্ঞতায় ঘাটতি, তবুও বেশির ভাগ কাজ

প্রকল্পের ১০ কাজের মধ্য আরমা ইলেকট্রিক কোম্পানি পেয়েছে ৫টি কাজ। এগুলোর দর ছিল অন্যদের তুলনায় সর্বোচ্চ। মোট ৫টি কাজে ৫২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা সরকারের ব্যয় হবে। অথচ সর্বনিম্ন দরদাতাকে দিলে এ কাজে ব্যয় হতো ৩৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তাতে সরকারের ১৬ কোটির বেশি অর্থ বেঁচে যেত।

জানা গেছে, আরমা ২০১০-১১ অর্থবছরে মোট বছরে কাজ করে ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৯৯ হাজার টাকার। পরের দুই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি কোনো কাজ করেনি। এরপর ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১১ কোটি ৩১ লাখ, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৮ কোটি ৭৩ লাখ আর গত অর্থবছরে ১৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকার কাজ করেছে। এ হিসাবটি বিপিডিবিতে জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবদুর রাজ্জাক স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র সূত্রে পাওয়া গেছে। এ হিসাবে আরমা এখন পর্যন্ত ১৫ কোটি টাকার বেশি একক মূল্যের কাজ করেনি। অথচ সিলেটে প্রতিষ্ঠানটিকে ১৯ কোটি ১৯ লাখ টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে।

ঘরে ঘরে বিদ্যুতের সিলেট প্রকল্পে ১১ কিলোভোল্ট লাইন খাম্বার স্টিলের অ্যাঙ্গেল (পোল ফিটিং) দরপত্র আহ্বান করে বিপিডিবি। এ দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা এসএ এন্টারপ্রাইজের দাম ছিল ১৫ কোটি ৪৮ লাখ ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ট্রেড ভিশনের ১৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। তবে এদের কাউকে কাজ না দিয়ে আরমাকে কাজ দেওয়া হয় ১৯ কোটি ১৯ লাখ টাকায়। আরমার এককভাবে এ পরিমাণ টাকার কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকলেও কাজ দিতে অসুবিধা হয়নি পিডিবির।

এদিকে সিলেট প্রকল্পের ১১ কিলোভোল্ট লাইন খাম্বার স্টিলের অ্যাঙ্গেলের আরেকটি কাজ পায় কনফিডেন্স স্টিল ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। অথচ এখানেও সর্বনিম্ন দরদাতা এসএ এন্টারপ্রাইজের দাম ছিল ১৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের ক্রয় নীতিমালা রয়েছে, সেটির ব্যত্যয় করে কাজ দেওয়া উচিত নয়। সর্বনিম্ন দরদাতা এবং সর্বোচ্চ দরদাতা উভয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ঘাটতি থাকলে কোনো বিবেচনায় সর্বোচ্চ দরদাতা কাজ পাবে? এখানে অনিয়ম, দুর্নীতি হয়েছে কি না—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় কাজ পাওয়াটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর সরকারি কোম্পানি যদি সর্বোচ্চ দরদাতা থেকে কম দাম দেয়, তাহলে সরকারি প্রতিষ্ঠানকেই কাজ দেওয়া উচিত। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়ে, যা জনগণের পক্ষে যায়। তাঁর মতে, সরকারের উচিত এসব ঘটনা তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা।প্রথমআলো


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

“আলোর অন্বেষণ” ১ম বইমেলা শুরু

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: মানবতার কল্যাণে...