সিলেটে এম সাইফুর রহমানের শেষ দিন

প্রকাশিত : ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাউসার চৌধুরী তিনি সিলেট দেখে, সিলেটের মাটি দেখে মরতে চান। এজন্যে আসতে চান সিলেট। কিন্তু ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সাফ নিষেধ-জার্নি করা যাবে না, সিলেট যাওয়া যাবে না। এতে কর্ণপাত করেননি তিনি। সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন, নেতাদেরও জানিয়ে দিলেন যে, তিনি শুক্রবার সিলেট আসবেন এবং বন্দরবাজার কেন্দ্রীয় মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করবেন। হ্যাঁ, অসুস্থ শরীর নিয়ে মৃত্যুর আগের দিন এভাবেই সিলেটে ছুটে এসেছিলেন সিলেটবন্ধু এম সাইফুর রহমান। এবং সিলেট দেখার পর চির বিদায় নিলেন।
২০০৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার। রাজধানী ঢাকার গুলশানের জালালাবাদ হাউস থেকে ব্যক্তিগত গাড়ীতে করে বেলা ১টার আগেই সিলেটে পৌঁছেন সিলেট-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। সে দিন তাঁর সিলেট সফরের নিউজ কাভারের দায়িত্ব পড়ায় পুরো দিনটিই তাঁর সাথে থাকার সুযোগ হয়েছিল। আমাদের সিলেটের ডাক’র প্রধান আলোকচিত্রী আব্দুল বাতিন ফয়সল, দৈনিক জালালাবাদের ফয়সল আলম ও প্রয়াত আলোকচিত্রী সি.এম মারূফ আর আমি-এই চার সংবাদকর্মী ছিলাম সাথে সাথে।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর চোখের পানি ফেলে হাউজিং এস্টেটের বাসা থেকে চলে যান এম সাইফুর রহমান। যাওয়ার সময় আক্ষেপ বলে করে যান, সিলেটের জনগণ ভোট দিয়েছেন, কিন্তু দলের কিছু লোক বেঈমানী না করলে আমি পাশ করতাম। এর ৮ মাস পর তিনি আবার সিলেট আসছেন। আবার এখন তিনি অসুস্থ, হাটতেও পারেন না। যে কারণে তার সিলেট সফর নিয়ে আমাদের মাঝেই নয়, সিলেটবাসীর মাঝেও আগ্রহের কমতি ছিল না। সিলেট সার্কিট হাউস থেকে জুমার নামাজ আদায়ের জন্যে তিনি বন্দরবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে যান। মসজিদে নামাজ আদায় করেন। ঘোষণা দেন যে, মসজিদের উন্নয়নে ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে ১ লাখ টাকা দেবেন এবং সিমেন্ট কেনার জন্য টাকাও দেন।
১৩ রমজানের শুক্রবারের জুমার নামাজে মসজিদে মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যও দেন তিনি। বক্তব্যে তিনি বলেন, সিলেটের উন্নয়নে দলমত নির্বিশেষে কাজ করতে হবে। আমি ঢাকায় গিয়ে অর্থমন্ত্রীর (আবুল মাল আব্দুল মুহিত) সাথে কথা বলব। আপনারাও এই মসজিদের জন্যে তাঁর সাথে দেখা করবেন। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় তিনি যখন লাঠি ভর করে ধীরে ধীরে পা ফেলছিলেন, তখন শত শত লোক এম সাইফুর রহমানকে দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। তিনি দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে লোকজনের ভালোবাসার জবাব দেন। নীল রং এর জিন্সের প্যান্টের সাথে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী পরা এম সাইফুর রহমানকে দারুণ লাগছিল এই সময়ে।
সার্কিট হাউসে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে রওয়ানা হন হযরত শাহজালাল (রহ:) মাজারের উদ্দেশ্যে। মাজারে যাওয়ার পথে ভিআইপি রোডের ডিভাইডারের পাইপ ও গাছগুলোর বেহাল দশা দেখে কষ্ট পান। কেন এগুলো পরিচর্যা করা হয় না, তিনি জানতে চান। মাজারে আসার পরই তিনি যেন সুস্থ হয়ে যান। মসজিদে যেখানে আরেকজনের কাধে ভর করে হেটেছিলেন, এই এম সাইফুর রহমান শাহজালাল (রহ:) মাজারে এসেই বললেন ‘ওবা, ধরা লাগত নায়, আমি ভালা ঐগেছি’। দরগাহ মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি মাওলানা আবুল কালাম জাকারিয়া ছুটে এলেন। মুহূর্তেই কয়েক’শ লোকের উপস্থিতি। দরগাহ মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা জাকারিয়া মোজানাত পরিচালনা করলেন। এরপরই টেলিভিশন সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাবও দিলেন। এটাই ছিল সাংবাদিকদের সাথে এম সাইফুর রহমানের শেষ বক্তব্য। বক্তব্যের সারমর্ম ছিল এই, বিএনপির জন্য দুঃসময় চলছে। সামনে আরো কঠিন সময় আসছে। এজন্যে ঐক্যবদ্ধ ছাড়া কোন উপায় নেই। মাজার থেকে আবার গেলেন সিলেট সার্কিট হাউসে। মন্ত্রী থাকাকালীন তাঁরই নির্দেশে সার্কিট হাউসটি নির্মাণ করা হয়। শুরু থেকেই সার্কিট হাউসের ৩য় তলার পশ্চিম দিকের কক্ষে উঠেন তিনি। সার্কিট হাউসে পৌঁছার পর বিএনপি নেতাদের সাথে দলের নানা বিষয়, সমাপ্ত হওয়া জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলতে লাগলেন, ইলেকশনের সময় আরিফ থাকলে রেবা আরো না হয় ১৫ হাজার ভোট বেশি ফাইলামনে। অবশ্য ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের সময় আরিফুল হক চৌধুরী জেলে ছিলেন। আলোচনার এক ফাঁকে আরিফ প্রশ্ন করলেন ‘স্যার ঈদ কোথায় করবেন’। মৃদু হেসে সাইফুর রহমানের সোজা জবাব ‘তোমারারতো যাইবার জায়গা আছে, আমারতো সিলেট ছাড়া যাওয়ার জায়গা নাই’। এক সময় ডাঃ শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরীকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন একান্তে। প্রিয় নেতার আগমনে দলের নেতা আরিফ-শাহরিয়ার ছাড়াও আবুল কাহের শামীম, নাসিম হোসাইন, রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, আব্দুল মান্নান, এমদাদ হোসেন চৌধুরী, মাহবুব চৌধুরী ও সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন ছুটে আসেন। দিনভর তাঁরা তাঁর সাথেই ছিলেন। ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দলের যে কয়েকজন নেতা তাঁর পক্ষে সিরিয়াসলি কাজ করেন তাদেরই একজন সালেহ আহমদ খসরু। কিন্তু খসরুকে না দেখে ব্যক্তিগত সহকারীকে বলেছিলেন ‘খসরুকে তো দেখরাম না’। ব্যক্তিগত সহকারী শামসুল ইসলাম সেলফোনে কয়েক দফা খসরুকে কল দিলেও তিনি আসেননি। মহানগর বিএনপির আহবায়ক কমিটি নিয়ে খসরু নাকি এম সাইফুর রহমানের প্রতি অভিমান করেছিলেন।
সার্কিট হাউসে টুকেরবাজার এলাকা থেকে আসা একদল প্রবীণ কর্মীর সাথে প্রাণখুলে তিনি কথা বলেন। কথা যেন শেষ হয় না। এক সময় মৌলভীবাজারের বাহারমর্দনের উদ্দেশ্যে সিলেট ত্যাগ করেন এম সাইফুর রহমান। নীল জিন্সের প্যান্টের সাথে টকটকে লাল টি শার্ট পরিহিত এম সাইফুর রহমানের শেষ সিলেট ত্যাগের দৃশ্য আজো চোখে-ভাসছে। সিলেট ত্যাগের সময় বলেছিলেন, ঢাকায় গিয়ে সিলেটের উন্নয়নে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সাথে বসবেন। সিলেটের উন্নয়নে তিনি যে কারোর সাথে বসতে রাজি, আলোচনা করতেও রাজি।
পরদিন ৫ সেপ্টেম্বর শনিবার। বিকেল সোয়া ৩টার কিছু পর হঠাৎ সিলেটের ডাকের চিফ রিপোর্টার সিরাজুল ইসলামের ফোন। রিসিভ করতেই তনি জানালেন মর্মান্তিক দুঃসংবাদ, এম সাইফুর রহমান মারা গেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাইহি রাজিউন)। বারবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই খবর সত্য কিনা, কে বলেছে। শেষে টেলিভিশনের পর্দায় ব্রেকিং নিউজ দেখে নিশ্চিত হলাম। বাড়ী থেকে ঢাকায় ফেরার পথে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের আশুগঞ্জের খড়িয়ালা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণপুরুষ, জাতীয় সংসদে ১২ বার বাজেট পেশকারী অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। এ ঘটনায় দেশের রাজনীতিতে শোকের ছায়া নেমে আসে। ঢাকা, সিলেট ও মৌলভীবাজারে কেবল নিজ দল বিএনপিই নয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি প্রমাণ করেছিল তিনি সকলের নিকট সম্মানের ছিলেন। ৭ সেপ্টেম্বর সোমবার শাহী ঈদগাহে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ঈদের জামাত পড়ার কথা বলেছিলেন মাত্র দুদিন আগেও। এরপরে মৌলভীবাজারের বাহারমর্দনের বাড়ীতে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয় সিলেটবাসীর প্রিয় নেতা এম সাইফুর রহমানকে। এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন মানুষের ভালোবাসায় মরতে চাই। শাহী ঈদগাহের জানাজা প্রমাণ করেছিল সিলেটের জনগণ তাঁকে কতো ভালোবাসতেন। এম সাইফুর রহমান মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা নিয়েই বেঁচে থাকবেন।
লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক সিলেটের ডাক


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

সিলেট নগরীর খাসদবির থেকে মাদ্রাসা শিক্ষকের লাশ উদ্ধার

         সিলেট নগরীর খাসদবির এয়ারপোর্ট রোডে...

আবু জাফরের নির্বাচনী দপ্তর উদ্বোধন

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট সিটি...

হৃদয়ে আমার মক্কা মদিনা’

          শাহ নজরুল ইসলাম ‘হজ্জ...

সুনামগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেন মাহবুব চৌধুরী

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: একাদশ জাতীয়...