সিলেটের প্রথম সংবাদপত্র এবং কবি প্যারীচরণ

প্রকাশিত : ২১ আগস্ট, ২০১৮     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

সেলিম আউয়াল : বাংলাদেশে প্রথম ছাপাখানা বসানো হয় রংপুরে। ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে (বাংলা ভাদ্র, ১২৫৪ সাল) ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’ পত্রিকাটি এ ছাপাখানা থেকে বের হয়। এটি পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশ থেকে বের হওয়া প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা। রংপুরের কুনডি পরগণার জমিদার কালীচন্দ্র রায়ের আর্থিক আনুকূল্যে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তেমন কোন বড়ো ধরনের বিরতি ছাড়াই এর প্রকাশনা অব্যাহত থাকে।
রংপুরের পরে ১৮৪৮ সালে ঢাকার বাবুবাজারে একটি মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয়। ১৮৫৬ সালে ঢাকা নিউজ প্রেস স্থাপিত হয় এবং এখান থেকেই ‘ঢাকা নিউজ’ প্রকাশিত হয়। ফলে সংবাদপত্র প্রকাশে পূর্ববাংলায় ঢাকার চেয়ে মফস্বল এগিয়ে ছিল।
বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশের প্রায় ৫৮ বছর পর সিলেট থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম সংবাদপত্র প্যারী চরণ দাশ সম্পাদিত শ্রীহট্ট প্রকাশ। তখন সিলেট আসাম প্রদেশের অন্তর্ভূক্ত। ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট আসামের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৪৭ পর্যন্ত সিলেট আসামের অন্তর্ভূক্ত ছিলো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অন্যান্য জেলার মতো সিলেটকেও দখলে আনে ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে। এই আমলের শুরু থেকে ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সিলেট ছিলো ঢাকা বিভাগের একটি জেলা। ইংরেজ সরকার পুরনো কামরূপ রাজ্যের পাঁচটি জেলাÑকামরূপ, দড়ং, নওগাঁ, শিবসাগর ও লÿীমপুর এবং খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় নিয়ে ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ফেব্রæয়ারি চিফ কমিশনার শাসিত আসাম প্রদেশ গঠন করা হয়। কিন্তু প্রদেশটি ছিলো অনগ্রসর। প্রদেশের নিজস্ব উৎস থেকে আয়ের পরিমান পর্যাপ্ত ছিলো না। এজন্যে আসাম প্রদেশ গঠনের সাত মাস পর মূলত আর্থিক ঘাটতি পূরণের লÿ্যে সিলেট, কাছাড় ও গোয়ালপাড়া জেলাকে অনগ্রসর প্রদেশের সাথে জুড়ে দেয়া হয়। তখন আসামের লোকসংখ্যা ছিলো কম এবং ব্যয়ের তুলনায় আয় ছিলো নগন্য। আবার স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনার মতো শিÿিত লোকেরও অভাব ছিলো। অপর দিকে আসাম সংলগ্ন বাংলা ভাষাভাষী সিলেট ও কাছাড় জেলায় লোক বসতি ছিলো অপেÿাকৃত ঘন। এই দুই জেলার লোকজন ছিলো শিÿা দীÿায় বেশ অগ্রসর এবং আয় রোজগারও ছিলো যথেষ্ট। সেই ১৮৪৭ থেকে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এক নাগাড়ে ৩১ বছর পর্যন্ত সিলেট বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। বঙ্গভঙ্গের ফলে আবার সিলেট ৬ বছরের জন্যে পূর্ববঙ্গের সাথে যুক্ত হলেও বঙ্গভঙ্গ রদ হবার পরপরই আবার আসামের সাথে যুক্ত হয়। ব্রিটিশের শাসন এ দেশ থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত সিলেট আসামেই থেকে যায়। তবে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ ভাগের সময় গণভোটের মাধ্যমে দুভাগ হওয়া সিলেট পাকি¯Íানে যোগ দেয়। করিমগঞ্জ মহকুমার সাড়ে তিনটে থানাÑপাথারকান্দি, রাতাবাড়ি, বদরপুর ও করিমগঞ্জের অর্ধেক ভারতে থেকে যায়। সিলেট দীর্ঘদিন আসামের অংশ হয়ে থাকলেও সিলেটের মানুষ নিজেদের স্বকীয় বৈশিষ্ট টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে খুব সিরিয়াস ছিলেন। একইভাবে ভারতের করিমগঞ্জ, শিলচর, হাইলাকান্দি ও শিলঙের বাংলাভাষী মানুষ তাদের শেকড়ের টান ভুলতে পারেননি। সিলেটের সংস্কৃতি, ইতিহাস, কৃষ্টি ও সভ্যতাকে সম্বল করে বেঁেচ থাকার সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছেন। (হাসান শাহরিয়ার, অতীত, অতীত নয়)
শ্রীহট্ট প্রকাশ বের হবার পর সিলেট থেকে বিভিন্ন সময় ত্রৈমাসিক, মাসিক, পাÿিক, সাপ্তাহিক, দৈনিক পত্রিকা বের হতে থাকে। পায়ে ঠেলা ছাপাখানা থেকে আজ সুইচ টেপা অফসেট প্রেস। পত্রিকা বের হচ্ছে, বন্ধ হচ্ছে। বন্ধ পত্রিকা আবার বের হচ্ছে, কোনো কোনোটি আর আলোর মুখ দেখেনি। অনেক পত্রিকা আজ বিস্মৃত। অনেক সাংবাদিক হারিয়ে গেছেন বিস্মৃতির অতলে। কিন্তু সেই সব সাংবাদিকদের শ্রম আর মেধার বিনিময়ে আমাদের সংবাদপত্র জগৎ আজকের অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। এখন জাতীয়ভাবেও সংবাদপত্র ব্যবসার জন্য সিলেট একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
ফোন, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট, কম্পিউটার, অফসেট প্রিন্টিং, স্ক্যানারসহ আধুনিক প্রযুক্তির সকল সুবিধে ভোগ করেও যেখানে সংবাদপত্র প্রকাশনা নিয়মিত করা সম্ভব হয় না। সেই অবস্থায় সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চল কুলাউড়া থেকে সনাওর আলীর সম্পাদনায় ‘নকীব’ নামের সাপ্তাহিক বেরিয়েছে। বিয়ানিবাজার থানার লাউতা গ্রাম থেকে ‘লাউতা প্রকাশ’ নামে একটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে।
সিলেট থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্রটি হচ্ছে প্যারীচরণ দাস প্রতিষ্ঠিত ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’। এর আগে হাতেলেখা বেশ কয়েকটি দেয়ালপত্রিকা এ অঞ্চল থেকে বের হয়েছে। তবে শ্রীহট্ট প্রকাশই ছিলো সিলেট থেকে প্রকাশিত প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র। এর সম্পাদক প্যারীচরণ দাস ছিলেন একজন কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
সিলেটের প্রথম সংবাদপত্রটির সম্পাদক প্যারিচরণ দাস খুনের দায়ে ৩ মাসের জেল খেটেছিলেন। প্যারীচরণ দাস সম্পর্কে বাগ্মী বিপিন পাল পরিবেশিত তথ্য হচ্ছে- বাবু প্যারী মোহন (চরণ) দাস যিনি ১৮৭৪ সালে ওয়েলিংটন স্কোয়ারে এক ইঙ্গবঙ্গ স¤প্রদায়ের লোককে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন এবং তিন মাস সাজা ভোগ করে তিনি দেশে অর্থাৎ সিলেটে গিয়ে এই পত্রিকা শুরু করেন। প্রায় স্বদেশী মামলার মতো সবার চোখ কেড়েছিলো সেই মামলাটি। প্যারীচরণ দাস কলকাতার ইন্ডিয়া অফিসে পররাষ্ট্র বিভাগে কেরানির কাজ করতেন। ১৮৭৪ সালে একদিন বাড়ি ফেরার সময় দেখলেন এক এ্যাংলো ওয়েলিংটন স্কোয়ারে প্রস্রাব করছে। প্যারী বাবু তার দিকে তাকিয়েছিলেন বলে এ্যাংলোটি এসে বচসা শুরু করে দেয়। ঝগড়ার সময় প্যারী বাবু পকেট থেকে ছুরি বের করে তাকে আঘাত করেন, ফলে সে মারা যায়। এনিয়ে প্যারী বাবু ধরা পড়েন, মামলা হয়। ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে রেষারেষি হয়। ডওখখওঅগ ঈওজঈঊঝ নামের লোকটিকে হত্যার দায়ে তিনি অভিযুক্ত হয়েছিলেন এবং তিন মাস সাজা ভোগের পর সিলেট চলে আসেন। ‘শ্রীহট্ট প্রতিভা’ নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে এ্যাংলো ইন্ডিয়ান লোকটি প্যারী বাবুকে ঘুষি মারতে চাইলে নিজেকে বাঁচাতে পকেটে রাখা ছোট্ট একটি ছুরি নিয়ে তার দিকে তেড়ে যান। ছুরির আঘাতে ইংরেজ লোকটার গলার একটি রগ কেটে গিয়েছিলো এবং অতিরিক্ত রক্তÿরণে তার মৃত্যু হয়।
জেল থেকে বের হয়ে দেশে আসার আগে প্যারীচরণ দাস তার সেই ইন্ডিয়া অফিসে গিয়ে তার উর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তার সাথে দেখা করেছিলেন। তিনি প্যারীচরণকে ভালোবাসতেন। তিনি তাকে কলকাতায় থেকে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু প্যারীচরণ তার কথা আর শুনেননি। চলে আসেন সিলেটে।
সিলেটে আসার পর তিনি একটি সংবাদপত্রের অভাব অনুভব করেন এবং ১৮৭৬ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে সিলেটের প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘শ্রীহট্টপ্রকাশ’-এর সম্পাদনা শুরু করেন। ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’ বের করার আগে প্যারীচরণের সাংবাদিকতা সম্পর্কে খুব একটা ধারনা ছিলো না। তিনি ছিলেন একজন স্বভাব কবি। এরপরও তিনি নিজে সংবাদ সংগ্রহ করতেন ও লেখতেন। তখন মফস্বলে আজকালকার মতো সংবাদদাতা পাওয়া যেতো না। এজন্যে সংবাদ সংগ্রহ করা খুব কষ্টের ব্যাপার ছিলো। প্যারীচরণ নিজে সংবাদ সংগ্রহ করতেন, নিজে সংবাদ লেখতেন। এর আগে সিলেট থেকে কোন সংবাদপত্র বের না হলেও সিলেটের শিÿিত সমাজ ঢাকা ও কলকাতা থেকে বের হওয়া পত্রিকা নিয়মিত পড়তেন। সিলেটে সংবাদপত্রের একটি পাঠকশ্রেণি থাকায় খুব কম সময়েই শ্রীহট্ট প্রকাশ খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠে। সেই সময়ে সিলেটে শ্রীহট্ট প্রকাশের খুব নামডাক ছিলো। এমন কি অশিÿিত সমাজেও সংবাদপত্র বলতেই শ্রীহট্ট প্রকাশকেই বুঝাতো। তখন শ্রীহট্ট প্রকাশ-এর প্রচার সংখ্যা ছিলো ৪৪০ কপি। সিলেটের লেখাপড়া জানা মানুষের সংখ্যা ছিলো কম এবং অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাও খুব ভালো ছিলো না, এই বিবেচনায় শ্রীহট্ট প্রকাশ-এর এই প্রচার সংখ্যা খুব কম নয়। সিলেট আসাম প্রদেশে যোগ দেবার (১৮৭৪খ্রি.) দু’ বছর যেতে না যেতেই সিলেট থেকে সংবাদপত্রের প্রকাশনা শুরু হয়েছিলো। সেই সময়টায় সিলেটের জনসংখ্যা ১৭ লাখ ১৯ হাজার ৫৩৯ জন (১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দের সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী)। সেই সময়ে ‘ঢাকা বা মফস্বল থেকে প্রকাশিত প্রায় সব পত্রিকারই প্রচার সংখ্যা ছিল অস্বাভাবিক রকম কম। ১৮৬৩ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী ‘ঢাকা নিউজ’, ‘ঢাকা প্রকাশ’, ‘ঢাকা দর্পণ’ এবং ‘হিন্দু হিতৈষীণী’র প্রচার সংখ্যা ছিলো যথাক্রমে ৩০০, ২৫০, ৩৫০ এবং ৩০০ কপি। …১৮৮০ সালে পূর্ববঙ্গের দশটি পরিচিত পত্রিকার সম্মিলিত ৩২২৭ কপি।’
শ্রীহট্ট প্রকাশ প্রথম দিকে কলকাতা থেকে ছেপে আনা হতো। পরে প্যারীচরণ সিলেটে একটি প্রেসও বসিয়েছিলেন। এমনকি স্থানীয় লোকদেরকে নিজে প্রেসের কাজ শেখাতেন। শ্রীহট্ট প্রকাশ-এর অফিস ছিলো সেই সময়ের শহরের ÿেতিপাড়ায়, এখন যেখানে ওসমানি মেডিকেল কলেজের আবু সিনা ছাত্রাবাস।
প্যারীচরণ সমাজের বিভিন্ন বিষয় তার পত্রিকায় তুলে ধরতেন। এ পত্রিকা সম্পর্কে ১৮৭৬ সালে আসামের বার্ষিক শাসন বিবরণীতে লেখা হয়েছিলো-‘এ পত্রের প্রচার প্রধানত সরকারি অফিসের কেরানি ও আদালতের উকিলদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মুদ্রণযন্ত্রের কোন প্রভাব সাধারণ লোকের মধ্যে আদৌ অনুভূত হয় না।’
প্যারীচরণের পত্রিকাটি ছ’বছর টিকেছিলো। ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে বিপিন চন্দ্র পালের পরিদর্শক প্রকাশিত হবার পর ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’-এর প্রকাশনা ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে।
প্যারী চরণ দাস সাহু বংশে মৌলভীবাজার জেলার লাতুর মুন্সি পরিবারে ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম শ্যামচরণ দাস। তিনি ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীহট্ট মিশন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীÿায় উত্তীর্ণ হন। উচ্চশিÿার জন্য কলকাতা গেলেও সেখানে ইন্ডিয়া অফিসে পররাষ্ট্র বিভাগে একটা কেরানির চাকরি পাওয়ায় আর বেশি পড়াশুনা করা হয়নি। কেরানির চাকরিতে তিনি যেভাবে কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন, তার প্রমোশনের খুবই সম্ভাবনা ছিলো। সেই অফিসের হাই অফিসিয়ালরাও তাকে ভালোবাসতেন। কিন্তু হঠাৎ করে একটি খুনের ঘটনার কারনে তাকে সেই কাজটি ফেলে দেশে চলে আসতে হয়েছিলো।
প্যারিচরণ একজন কবি ছিলেন। তার কবিপ্রতিভা তার শৈশবেই পাওয়া যায়। তখন তার বয়স ছ’ সাত বছর, তবে খুব চঞ্চল ছিলেন। একবার তিনি মৈনা গ্রামে তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে যান। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে হইচই করছিলেন। বোনের শাশুড়ি হইচই বন্ধ করার জন্যে তাদেরকে ধমকান। তখন প্যারীচরণ তার বোনের শাশুড়িকে ছন্দে ছন্দে বলেছিলেনÑ‘ভেউ ভেউ করিও না, কথা কহিও কম।/নিশ্চয় জানিও বুড়ি আমি তোমার যম।’ এ কথায় শাশুড়ি লজ্জা পেয়ে চলে যান। সেই বাড়ির বাচ্চারাও প্যারীচরণের কবিতাটাও মুখস্থ করে ফেলেছিলো। তারা প্রায়ই সেই কবিতাটা আউড়ে বুড়িতে ÿ্যাপাতো।
প্যারীচরণের প্রথম বইটি ছিলো কবিতার বই। সেটি ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে বের করেন। তখন তিনি কলকাতায় ছিলেন। ‘মিত্র বিলাপ’ নামের কবিতাটি তার এক বন্ধু সারদা মোহনের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে লিখেছিলেন। সারদা মোহন ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ডা. সুন্দরীমোহন দাসের বড় ভাই। পদ্যপু¯Íক ‘প্রথম ভাগ’ ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। তিনি ভারতেশ্বরী, রণরঙ্গিনী ও মিত্র বাহিনী নামে তিনটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তার পদ্যপু¯Íক প্রথমভাগ অনেকদিন সিলেট অঞ্চলের স্কুলের পাঠ্যপু¯Íক ছিলো।
পত্রিকা চালাতে গিয়ে প্যারীচরণকে খুবই ব্য¯Í সময় কাটাতে হতো। এজন্যে কাব্যপ্রতিভা থাকা সত্বেও তিনি বড়ো বড়ো আকারের কবিতার বই লিখে যেতে পারেননি। তবু স্বল্প পরিমানে তিনি যা লিখে গেছেন, যে কেউ তার কবিতা পড়লে তা বুঝতে পারবেন তিনি যে উঁচু মানের একজন কবি ছিলেন। তার পত্রিকা শ্রীহট্ট প্রকাশে তিনি বেনামীভাবে অনেক কবিতা ছেপেছেন।
‘রণরঙ্গিণা’ নামে প্যারী চরণের কবিতার ছোট্ট একটি বই ইতিহাসবিদ অচ্যুতচরণ চৌধুরী নিজে দেখেছিলেন। ফরাসী রমণীদের স্বাধীনতার আকাঙ্খা-জ্ঞাপক একটি মাত্র কবিতা নিয়ে বইটি বের হয়েছিলো। ‘পদ্যপু¯Íক’ নামের তার তৃতীয় ভাগের কবিতাগুলোতে শুধুমাত্র তার কাব্যপ্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় না, সেই বইয়ের কবিতায় রয়েছে নিজের দেশটার প্রতি ভালোবাসা, পরিজনদের জন্যে ভালোবাসা এবং মার্জিত নীতিবোধ। তিনি যখন ছাত্র, তখন বিভিন্ন সময়ে লেখা কবিতার সংকলন ‘পদ্যপু¯Íক’। বইটি ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বের হয়। ‘ভারতেশ্বরী’ নামে তার কাব্যটি রাণী ভিক্টোরিয়ার ‘এম্প্রেস’ উপাধি গ্রহণ উপলÿে লেখা হয়। বর্ণশিÿাদানের উপদেশ (শিÿকদের) নামের শিশুদের উপযোগি এক পু¯িÍকা মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি ছেপেছিলেন। ‘উহা প্রচারিত হয় নাই, গৃহদাহে সমুদয় নষ্ট হইয়া গিয়াছে।’ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী প্যারীচরণ ‘দ্ব›দ্বযুদ্ধ’ নামে একটি নাটকও লিখেছিলেন। তার অপ্রকাশিত রচনার মধ্যে রয়েছে ‘ভিক্টোরিয়ার জীবনচরিত’।
কবি মহিউদ্দিন শীরু উলেøখ করেছেনÑ ‘প্যারীচরণ দাস ছিলেন স্বভাব কবি এবং শক্তিধর লেখনীর অধিকারী।
প্যারীচরণ সমাজের কুসংস্কার-অশøীলতা সরিয়ে একটি সুন্দর কল্যাণকর সমাজ কায়েমের জন্যে কাজ করেছেন। সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত ‘ঘাটুয়া’ গান প্রথম দিকে বেশ ভালো থাকলেও পরে তা বিকৃত হয়ে পড়ে। সিলেট শহরে তখন খুব বেশী ঘাটু নাচ হতো। ছোট ছোট ছেলেদেরকেই ঘাটু বলা হতো। সেইসব ছেলেদেরকে খুব সাজিয়ে গুজিয়ে রাখা হতো। অচ্যুত চরণ বলেছেন, ‘ঘাটু ছোকরাদের তখন অত্যন্ত আদর ছিল, উহারা ‘রাজভোগে’ আহার পাইত, রাজকুমারের ন্যায় সুবেশ ধরিয়া থাকিত, ইহাদিগকে নর্ত্তকী বেশে আসরে আসিয়া নাচিতে ও রাধা কৃষ্ণ লীলাত্মক সঙ্গীত গাইতে হইত।’ এইসব বিকৃত রুচির কাজ প্যারীচরণ মেনে নিতে পারেননি। এজন্যে তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে তার বন্ধু ধর্মপুর নিবাসী কৃষ্ণচরণ দাসের সহায়তায় এই কু-প্রথাকে সিলেট শহর থেকে দূর করেছিলেন। তবে বিষয়টি খুব সহজে তিনি করতে পারেননি। এজন্যে তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এসব কুকীর্তির সাথে জড়িত মানুষের সাথে বলা যায় তাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। ‘শহরে সর্ব্বশেষ ঘাটু নাচ হওয়ার পরদিন ছোকরাটিকে একটি গর্দ্দভের উপর উলটা চড়াইয়া শহর হইতে বিদায় দেওয়া হয়; বলা বাহুল্য যে সেই কুপ্রথার প্রতি ঘৃণা প্রকাশই এই অনুষ্ঠান করা হয়।’
প্যারীচরণ দাস ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ৫০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেই সময়ে শিলং সেক্রেটারিয়েটে তার একটি চাকরি হয়েছিলো। কাজে যোগও দিয়েছিলেন। শেষমেষ রোগের জন্যে সিলেট ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং সিলেটেই মৃত্যুবরণ করেন।
(সিলেট প্রেসক্লাব ফেলোশিপ ২০১৮ প্রবন্ধ)

আরও পড়ুন



আজ জেল হত্যা দিবস

আজ ৩ নভেম্বর, জেল হত্যা...

শাবি’তে সাবেক ডিন প্রফেসর ড. গনির বিদায় সংবর্ধনা

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়...

প্রসঙ্গ : ইফতারি প্রথা

আব্দুল্লাহ আল শাহীন শারজাহ/ইউএই থেকে:...

মানবাধিকার সংস্থা মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: উপকূল মানবাধিকার...