সিলেটী যুবকদের দুঃসাহসিক ইউরোপ যাত্রা!

প্রকাশিত : 10 November, 2019     আপডেট : ৪ সপ্তাহ আগে  
  

তি বছর সংঘাত থেকে মুক্তি ও উন্নত জীবনের আশায় হাজার হাজার মানুষ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। একটু ভালো থাকার আশা আর একটি নিরাপদ সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নে তাদের পাড়ি দিতে হয় বিপদ সংকুল পথ।

সম্প্রতি তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র একটি দেশ বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সে পাড়ি জমানো এক যুবকের এ দীর্ঘপথ পাড়ি দেয়ার অ’ভিজ্ঞতা উঠে এসেছে বিয়ানীবাজার টাইমসের রিপোর্টে।

২৫ বছর বয়সী জাহেদ আহমদ (ছদ্মনাম) সিলেটের বড়লেখা উপজেলার অধিবাসী। উন্নত জীবনের আশায় কঠিন পথ আর নানা প্রতিকুলতা পেরিয়ে পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছেছেন স্বপ্নের ইউরোপ।

পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কখনও ধরা খেয়ে ছাড়া পেয়ে হাজার হাজার মাইল পথ আর কয়েকটি দেশ পাড়ি দিয়ে জাহেদ পৌঁছেছেন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। প্যারিসে আসতে তাকে এই পথে পোহাতে হয়েছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ।

দুঃসাহসিক ইউরোপ যাত্রার বর্ননা।

জাহেদ আহম’দ বলেন, বাংলাদেশ থেকে ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে ইতালি যাওয়ার জন্য এক দালালের সাথে চুক্তিবদ্ধ হই।

সেই দালালের মাধ্যমে প্রথমে আমরা ৩ জনের একটি দল বাংলাদেশ থেকে লিগ্যাল ভিসায় ফ্লাইটে রাশিয়া যাই। সেখানে আমরা ১৩ দিন অবস্থান করি।

এরপর ১৪তম দিনে আমাদের দালাল জানায় খুব ভোরে তৈরি থাকতে হবে। আমাদের ইউক্রেন যেতে হবে। তার কথামত আমরা ভোর ৬ টায় উঠে তৈরি হই। এরপর একটি ঘোড়ার গাড়িতে করে একটা ভুট্টা ক্ষেতের মধ্য দিয়ে আমাদের একটি জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়।সেখানে ঘন্টাখানেক আমাদের রাখা হয়। তারপর জঙ্গল থেকে প্রায় ৬-৭ ঘন্টা হাটিয়ে আমাদের রাশিয়া বর্ডার অতিক্রম করে ইউক্রেনের একটি গ্রামে রাখা হয়। ভাঙা আর অতি নোংরা একটি ঘরে আমাদের বিশ্রামের জন্য রাখা হয়।

পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে আমরা সে ঘরে ঘুমিয়ে পড়ি। তারপর রাত দেড়টার দিকে ঘুম থেকে তুলে তড়িগড়ি করে আমাদের একটা গাড়িতে করে ইউক্রেন শহরে নিয়ে যাওয়া হয়।ইউক্রেন শহরে একটি আবদ্ধ ঘরে আমাদের ১ সপ্তাহ রাখা হয়। পরে একদিন খুব ভোরে আমাদের নিয়ে স্লোবাকিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে দালাল।

ইউক্রেনের বর্ডারে নিয়ে একটি জঙ্গলে রাখে আমাদের। সেখান থেকে বড় বড় পাহাড় টিলার মধ্য দিয়ে দীর্ঘপথ হাটিয়ে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় লোকালয়ে। সেখানে গোহার মত একটি জায়গায় আমাদের রাখা হয়। সেখান থেকে আরও দুই কিলোমিটার হাটিয়ে আমাদের আরও একটি জঙলে রাখা হয়।

সেই জঙলে ঘটে এক বিপত্তি।কিভাবে যেনো পুলিশ খবর পায় আমরা বর্ডার ক্রস করছি। তাই তারা আমাদের জঙল থেকে আটক করে।আটক করে তারা আমাদের থানায় নিয়ে যায়। সেখানে আমাদের ইজার বন্দি নিয়ে একটা ছোট্ট ঘরে রাখে।আরও একটি কথা। পুলিশে আমাদের আটক করলেও আমাদের দালাল আমাদের রেখে পালিয়ে যায়।পরে থানা থেকে আরও এক দালালের মাধ্যমে ৫০০ ডলার চুক্তিতে ছাড়া পাই। পরে সেই দালাল আমাদের হাঙেরির বর্ডারের কাছাকাছি একটি লজে রাখার জন্য নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে দুর্ভাগ্যবসত সেখানকার সেনাবাহিনী আমাদের পিছু নেয়। সম্ভবত পুলিশ আমাদের উপর নজরদারী করতে পাঠিয়েছিলো। তারা আমাদের ফের আটক করে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

সেখানে আমাদের জীবনের দুর্বিষহ ৩ দিন কাটে। সীমাহীন কষ্টে আমাদের রাখা হয়। সারা রাত ধরে জেরা করত। খাবার দিত না। কোন বেলা শক্ত একটা রুটি দিত। খুব কষ্ট হয় সেখানে। তিনদিন রাখার পর তারা তাদের দেশ ত্যাগের আল্টিমেটাম দিয়ে আমাদের ইউক্রেন শহরে পাঠায়। আমরা ট্রেনে করে ইউক্রেন শহরে যাই। সেখানে গিয়ে আমাদের কাছে যা খুচরা ডলার ছিলো তা দিয়ে একটা ফোন কিনে আমরা আমাদের দালালের কাছে ফোন দেই। দালাল আমাদের কাছে তার লোক পাঠাচ্ছে বলে সারাদিন ট্রেন স্টেশনে বসিয়ে রাখে।

এ দিকে আমরা খুবই ক্ষুধার্ত। পরে সারাদিন অপেক্ষা করে দালাল তার লোক না পাঠানোর কারণে আমরা আবার তার সাথে যোগাযোগ করি।রাত ৮.৩০ মিনিটের সময় দালালের লোক আমাদের কাছে আসে এবং সেই কারে করে তার বাসায় নিয়ে যায়। আমাদের সে তার বাসায় ১৫ দির রাখে। এরপর একদিন সকালে তার গাড়ি দিয়ে স্লোবাকিয়ায় বর্ডার এলাকায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে ১০-১২ ঘন্টা হাটিয়ে আমাদের স্লোবাকিয়ার একটি জঙ্গলে রাখে।রাস্তায় কোন খাবার নাই। ক্ষুধার জ্বালায় আমরা হাটতে পারছিলাম না। তবুও হাটতে হয়েছে। পরে স্লোবাকিয়া জঙ্গল থেকে দালালের অন্য এক লোক আমাদের রিসিভ করে গাড়ি করে অস্ট্রিয়ায় পৌছে দেয়।

সেখানকার আরও একটি জঙ্গলে নিয়ে আমাদের রাখে। সেখান থেকে আমাদের অস্টিয়া পুলিশ আটক করে। পুলিশ ক্যাম্পে তারা আমাদের নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে তারা আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারা আমাদের তাদের দেশে থাকার অফার করে। খুবই ভালো ব্যবহার করে অস্ট্রিয়া পুলিশ। আমরা তার দেশে থাকতে রাজি না হওয়ায় আমাদের ছেড়ে দেয়।

ইউক্রেনের মত অস্ট্রিয়ায়ও পুলিশে আটকের পর দালাল আমাদের ছেড়ে চলে যায়।আমরা অস্ট্রিয়া পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে স্থানীয় এক তরুনের মোবাইল দিয়ে দালালের সাথে আবার যোগাযোগ করি।আমাদের আগের ফোনটাও দালাল নিয়ে গিয়েছিলো। দালালকে ফোন দেওয়ার পর দালাল তখন আমরা যেখানে আছি সেখানে থাকার জন্য বলে। প্রায় ৪ ঘন্টা পর দালালের এক লোক এসে আমাদের রিসিভ করে।সে লোক এসে আমাদের ট্রেনের টিকেট করে ইতালীর ট্রেনে তুলে দেয়। আমরা ইতালি পৌছাই। ইতালিতে পৌছে আমরা সেখানে ১৫ দিনের মত থাকি। এরপর আমার ছোট ভাই ফ্রান্স থেকে এসে আমাকে ফ্রান্সে নিয়ে যায়। দীর্ঘ ২-৩ মাসের দীর্ঘ দুঃসাহসিক যাত্রার পর আমরা স্বপ্নের দেশ ফ্রান্সে পৌছাই।

আমার জীবনের কঠিন কিছু দিন কেটেছে এই যাত্রায়। আমি চাই না আর কোন সিলেটী এই মৃত্যু রাস্তায় পাড়ি জমাক। এটা অনেক কঠিন পথ।

আরও পড়ুন



বঙ্গবীর ওসমানীর জন্মশতবার্ষিকী আজ

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: মুক্তিযুদ্ধের প্রধান...

গার্ডেন টাওয়ারে ভাড়াটিয়া পরিবারকে নির্যাতনের অভিযোগ

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক:   নগরীর উপশরস্থ...