সাহিত্যের আসর অপরাহ্নে

প্রকাশিত : ০৭ জুলাই, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে

এম. আশরাফ আলী: আষাঢ়ের আকাশ। রোদ বৃষ্টি খেলা চলছে। এই আকাশ ফাঁটা রোদ, এই ঝম ঝম বৃষ্টি। দুটোই যেন অসহ্য। রোদের প্রখরতা এত বেশি যে এক মুহূর্তেই ঘেমে নেয়ে উঠার অবস্থা। শার্টের বগল ভিজে একাকার। চুলহারা মাথা ঘেমে উল্টো বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। মাঝে-মধ্যে কপালের দিকে ধাবিত হয়ে চোখের কোণে এসে থামছে। চোখ মেলে তাকানো যায় না। আবার বৃষ্টিটা ও কোনো বাঁধ মানে না। হঠাৎ বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি শুরু হলে এক মিনিটেই কাক ভেজা অবস্থা। বলা নেই, কওয়া নেই ঝলমলে রোদের মধ্যে কেই বা ভাবছে বৃষ্টি এসে যাবে?

রুবেল চৌধুরী আর আমি হাঁটছি জিন্দাবাজার থেকে কেমুসাসের দিকে। আজ ১৪ই আষাঢ়। কেমুসাসের ৯৯৮ তম সাহিত্য আসর। ঈদ পূণর্মিলনীও বটে। রুবেল চৌধুরী সাহিত্য আসরের একজন নিয়মিত অংশগ্রহণকারী। আমাকে দুপুর বারোটা থেকে এলার্ট করছিলেন।‘আশরাফ ভাই, আজ বৃহস্পতিবার মনে আছে তো? আমি একটু মজা করে বললাম ‘আজ বৃহস্পতিবার তো কী হয়েছে?’ আরে এই তো আপনি ভুলে গেছেন। আজ কেমুসাসের সাহিত্য আসর না? ও আচ্ছা। হ্যাঁ, মনে পড়েছে। যাবার সময় আমাকে নিয়ে যাবেন। আমি আরো দায়িত্ব ওর ঘাড়ে চাপালাম। বিকাল ৪ টায় একত্রিত হলাম। দুজনে চা নাস্তা খেয়ে গল্প গুজব করে কুদরত উল্লাহ মসজিদে আসরের নামাজ পড়লাম। নামাজ শেষে হেঁটে হেঁটে আসলাম রাজা ম্যানশনে। আমার লিখিত গল্পের বই ‘অদ্ভুত আলো’ নাজমা বুক ডিপোতে রেখেছি বিক্রির জন্য। কতটুকু বিক্রি হচ্ছে জানতে গেলাম সেখানে। লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী আব্দুল আজিজ লয়লু আমাদের স্বাগত জানালেন। সদা হাস্যোজ্জল লয়লু আমার অনুজের মতো। একই হাইস্কুলে পড়েছি আমরা। তিনি যা বললেন তাতে আমরা অত্যন্ত খুশি হলাম। নাজমা বুক ডিপোতে রাখা সবগুলো বই বিক্রি হয়ে গেছে। কুদরত উল্লাহ মার্কেটে আল আমিন লাইব্রেরিতে কিছু বই রাখা ছিল। আমরা আবার ছুটলাম সেখানে। ১৯টি বই সংগ্রহ করে আবার এলাম রাজা ম্যানশনে। লয়লুকে ক’খানা সমজে দিয়ে নিজে ক’খানা সাথে নিলাম। আজ কেমুসাস সাহিত্য আসর। দু-একজন সাহিত্য প্রেমিক পেলে সৌজন্য কপি দেব। তাই ক’টা বই নিজের কাছে রাখা আর কি। রাজা ম্যানশন থেকে বেরিয়ে জিন্দাবাজার সিটি সেন্টারের সামনে আসতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হল। রুবেল চৌধুরীকে বললাম, দাঁড়াই কোথাও। বৃষ্টি শেষ হলে যাব। তিনি দাঁড়াবার পাত্র নন। বললেন ‘আরে ভাই আজানের মাত্র ২৫ মিনিট বাকি। মাগরিবের নামাজ পড়েই তো সাহিত্য আসর শুরু হবে। এ পথটা যেতে তো সবটুকু সময় লেগে যাবে।
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হেঁটে চললাম। চৌহাট্টার মোড়ে যাত্রী ছাউনিতে একটু দাঁড়াতেই হল। কারণ এরই মধ্যে বেশ মাঝারি বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। যাত্রী ছাউনিতে প্রায় ২০/৩০ জন লোক ইতোমধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। কাকভেজা এক লোক সিগারেট ফুঁকছে। এমনিতে সিগারেটের অভ্যাস নেই। তারপর লোক সমাগমে ভেজা ভেজা গন্ধে টাল-মাটাল অবস্থা। এরই মধ্যে সিগারেটের গন্ধ যে কত বিরক্তিকর তা বিদগ্ধ জনই বলতে পারবেন। আমি সিগারেটযুক্ত ভাইকে বললাম, ভাই কাইন্ডলি সিগারেটটি নিভিয়ে ফেলুন। উনি লজ্জা পেলেন না বিরক্ত হলেন কিছুই বুঝতে পারলাম না। উনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, এটা কি ফেলে দিব?
না, নিভিয়ে পকেটে রেখে দিন। যখন একা থাকবেন তখন খাবেন। লোকটি পুরো সিগারেটটিই ফেলে দিল। আমি কী করব ভেবে পেলাম না, অগত্যা ছোট্ট এবং মিষ্টি একটা ধন্যবাদ দিলাম তাকে। ততক্ষণে বৃষ্টি কিছুটা হালকা হয়েছে। রুবেল চোধুরী তাড়া দিলেন। চলেন, দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, আরে ভাই আমার মাথায় তো চুল নেই। বৃষ্টির ফোটা সরাসরি আঘাত করছে মাথায়। উনার প্লাস্টিক ফাইল আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এটা মাথায় দিন। আমি না করলাম না। দুজনে কেমুসাসের দিকে হাঁটা দিলাম। মাগরিবের নামাজ পড়ে সাহিত্য আসরে যোগ দিলাম। আমি ও রুবেল চৌধুরী বসলাম পাশাপাশি। ইতোমধ্যে অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকার আগমনে সাহিত্য আসরে যেন প্রাণ সঞ্চার হল। তাসলিমা খানম বীথি, সে উপস্থাপিকা। কর্ম চঞ্চল এক চটপটে তরুণী। ওর স্মৃতি বড়ই প্রখর। একবার যার নাম শুনবে সেটাই মুখস্থ রাখে। আমি অবাক হই। এতটুকু মেয়ে, কেমুসাসের মতো একটা বিরাট সাহিত্য আসর একাই সঞ্চালন করে, সামলায়। যুবক, বুড়ো সবাইকেই অমুক ভাই-তমুক ভাই বলে। ওর কোনো জড়তা নেই। এখানে লে. কর্নেল, ডক্টর ডিগ্রীধারীসহ সমাজের টপ লেভেলের লোকদেরই আগমন ঘটে। সে অবলীলায় সবাইকে ম্যানেজ করেই চলে। সত্যিই প্রশংসা তার প্রাপ্য।
আজকের সাহিত্য সভায় প্রধান অতিথি ইকরামুল কবির (সভাপতি, সিলেট প্রেসক্লাব) আসতে দেরি করছেন অনিবার্য কারণে। ইতোমধ্যে সভাপতির আসন অলংকৃত করলেন কবি আব্দুল মুকিত অপি। সব সময়ই যিনি ফিটফাট থাকেন। সিলেটি ‘দামান’ই মনে হয় তাকে। চেয়ারে বসার পর সত্যিই চতুর্দিক উজ্জল হয়ে উঠল। ইতোমধ্যে কবি মুকুল চৌধুরী, লে. কর্নেল আলী আহমদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এম.আলী ইসমাঈল, শিক্ষাবিদ শওকত আলী, সিলেট শিশু একাডেমির সাবেক জেলা সংগঠক জামান মাহবুব, লেখা, সাহিত্য-সমালোচক অধ্যাপক বাছিত ইবনে হাবীবসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হলেন। শুরু হল কবিতা, ছড়া, গল্প, গানসহ নব্য-প্রৌঢ় সবারই সৃষ্টির উল্লাস। একে একে তাদের শিল্প-শৈলী নিজের মুখ দিয়ে প্রকাশ করছেন হর্ষ-বিষাদে। কারণ একদিকে দেরিতে হলেও ঈদ পূনর্মিলনী আর দ্বিতীয়ত প্রখ্যাত কবি মুকুল চৌধুরীর পিতা গত ২৪ রমজান ইন্তেকাল করেছেন। একারণে সবার মুখ দিয়ে একদিকে আনন্দ ঝরছে অন্যদিকে বিষাদের ছায়া। তথাপি অনুষ্ঠান প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে। ইতোমধ্যে প্রধান অতিথি তাঁর সারগর্ভ ভাষণ পেশ করে চলে গেছেন জরুরি কাজে। হঠাৎ বিথীর ঘোষণা শুনে সবাই পেছনে তাকালো। একজন কৃতী লোকের উপস্থিতিতে সবাই বিমুগ্ধ। প্রখ্যাত আবৃত্তিকার (জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত) এবং যুক্তরাজ্য ভিত্তিক চ্যানেল-এস এর সংবাদ পাঠিকা মুনিরা পারভীন লন্ডন থেকে এসে সরাসরি আমাদের সাহিত্য আসরে যোগ দিয়েছেন। তাকে মঞ্চে আসন গ্রহণের জন্য আহবান করা হল। ধীর পদক্ষেপে তিনি মঞ্চে এলেন।
উনার পরিচয় করিয়ে দিতে লে. কর্নেল সৈয়দ আলী আহমদ দ্বিতীয়বার মাইক হাতে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য রাখলেন। আরও অবাক হওয়ার বিষয় যে, এই কৃতী আবৃত্তিকারের বাবা শিক্ষাবিদ শওকত আলীও এই সভায় উপস্থিত আছেন। লে. কর্নেল সৈয়দ আলী আহমদ কিছুদিন আগে লন্ডনে মুনিরা পারভীনের সাথে সাক্ষাৎ করে এসেছেন। তাঁর (মুনিরা)‘ছান্দসিক’ নামক একটি আবৃত্তি সংস্থা লন্ডনে রয়েছে। যেখানে সঠিক উচ্চারণে আবৃত্তি শিখছে বাঙালি শিশু-কিশোররা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবি মুকুল চৌধুরী, গল্পকার জামান মাহবুবও মুনিরা পারভীনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। আসলে এক জন গুণী মানুষের প্রশংসা করতেই হয় নিজের দায়িত্ববোধ থেকে। তিনি যে একজন গুণী লোক তা এই অনুষ্ঠানেই প্রমাণ করলেন। সবার অনুরোধে কবিগুরুর নির্ঝর কবিতাটি আবৃত্তি করলেন। হ্যাঁ, তিনিই সেরা আবৃত্তিকার। পিন পতন নিরবতায়, দীর্ঘ কবিতা আবৃত্তি করলেন তিনি।
রাত ১০টায় শেষ হল সাহিত্য আসর। আমি এই গুণীকে তাঁর ছান্দসিকের জন্য এক কপি ‘অদ্ভুত আলো’ দিলাম। উনি সাদরে বরণ করলেন। অনুষ্ঠানের পরে আরও অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে অনেকের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করলেন। ততক্ষণে আমি খেয়াল করলাম আমার বইটি অতি যতেœ বুকের সাথে চেপে ধরে রেখেছেন।এই স্বল্প পরিসরেও তাঁর আবৃত্তির গুরু হেম চন্দ্রের কথা ভুললেন না। তাকে সশ্রদ্ধ স্মরণ করলেন। গুণী তখনই হয় যখন কেউ গুণীর কদর ও সম্মান করে। আমি প্রত্যক্ষই দেখলাম তাঁর বই এর প্রতি কদর। একজন লেখক হিসেবে নিজেকে ধন্য মনে করলাম। হ্যাঁ, সত্যি সত্যিই সঠিক ব্যক্তির কাছে আমার সৃষ্টি পৌছে দিতে সক্ষম হয়েছি।

এম. আশরাফ আলী
০১৭৮৭৭৫৩৬৯২

আরও পড়ুন

লিডিং ইউনিভার্সিটিতে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: লিডিং ইউনিভার্সিটির...

সিলেটের দিনকাল দিনব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনী

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: মহান স্বাধীনতা...

অনুগল্প টাই

মুনশি আলিম: – এত সাজুগুজো...