সামাজিক অবক্ষয় ও সাম্প্রতিক কথকতা

প্রকাশিত : ০৯ মে, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাজেদা বেগম মাজু : আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষ সমাজবদ্ধ প্রাণী। সমাজ ছাড়া মানুষের পক্ষে জীবন-যাপন করা অসম্ভব এক ব্যাপার। সমাজ ছাড়া যে জীবনকে বেছে নেয় সে হয় উন্মাদ আর না হয় সন্যাসী বা সংসার বিবাগী। সবাইকে নিয়ে সমাজে বসবাস করতে হলে সেখানে রয়েছে ভালমন্দের সংমিশ্রণে বিভিন্ন মত ও পথের মানুষ। রয়েছে ধনী-গরীব, শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-আচরণে বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণী পেশার মানুষ। সমাজে বিভিন্ন ধরনের মানুষ বিভিন্ন ধরনের মতাবলম্বী হওয়ার কারণে একে অন্যের সাথে অনেক সময় মতৈক্যে পৌঁছাতে পারে না ফলে সমাজে দেখা দেয় মতবিরোধ, জড়িয়ে পড়ে দ্বন্দ্ব সংঘাতে। আর সমাজ সংসারে যে জিনিসটি দ্বারা মানুষ পরিচালিত হয় সেটি হলো তার মূল্যবোধ।
সমাজের বিবর্তনের ধারায় কিছু রীতিনীতি ও আচার সমাজের সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়। এসব সাধারণ নিয়মগুলো দ্বারা সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে। অপর দিকে এই নিয়মগুলো অমান্য করলে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘিœত হয়ে দেখা দেয় চরম বিশৃঙ্খলা। এইসব রীতিনীতি ও নিয়ম-কানুনগুলোই মূল্যবোধ। সাধারণ মানুষ মূল্যবোধ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়। মূল্যবোধ কোনো সমাজেই লিপিবদ্ধ থাকে না। এটি মানুষের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণের একটি অলিখিত সামাজিক বিধান। সমাজবিজ্ঞানী আর.টি পোপেনোর (R.T Popenoe)-মতে, ‘ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিক, কাক্সিক্ষত-অনাকাক্সিক্ষত বিষয় সম্পর্কে সমাজের সদস্যদের যে ধারণা তার নামই মূল্যবোধ’। মেটা স্পেন্সার (Meta Spensar) এর মতে, ‘মূল্যবোধ হলো একটি মানদন্ড, যা আচরণের ভালো-মন্দ বিচারের এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন লক্ষ্য হতে কোনো একটি পছন্দ করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। অপরদিকে Webster New World Dictionary-তে মূল্যবোধ সম্পর্কে বলা হয়েছে, মূল্যবোধ কোনো বস্তুর সেই গুণাবলি, যা কম-বেশি সবার জন্য প্রত্যাশিত, তাৎপর্যপূর্ণ অথবা উৎকর্ষের মাত্রায় প্রশংসিত। এটি সমাজের বৃহত্তর অংশ কর্তৃক অনুমোদিত। মূল্যবোধ হতে পারে নৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় প্রভৃতি। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’-এ নীতি ধর্মীয় মূল্যবোধের অংশ। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন এবং নাগরিক দায়িত্ব পালন করা ও ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’ এই দুটি হলো যথাক্রমে রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের উদাহরণ। মূল্যবোধ হলো বিশ্বাসের অন্তর্নিহিত মূল্য আর এই মূল্যবোধের শুরু হয় নৈতিকতার মাধ্যমে এবং নৈতিকতার বড় রক্ষাকবচ হলো বিবেক।
Cambridge International Dictionary of English অনুসারে নৈতিকতা হলো একটি গুণ যা ভালো আচরণ বা মন্দ আচরণ, স্বচ্ছতা, সততা ইত্যাদির সাথে সম্পর্কযুক্ত। জোনাথন হ্যাইট (Jonathan Haidt এর মতে ‘ধর্ম, ঐতিহ্য, মানব আচরণ-এ তিনটি থেকেই নৈতিকতার উদ্ভব ঘটতে পারে।’ নীতি বিষয়ক শিক্ষাকে বলা হয় নৈতিক শিক্ষা। নৈতিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর জীবনকে কোনো আদর্শের লক্ষ্যে পরিচালিত করে তার চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন করে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে তা প্রতিষ্ঠা করা। সত্য বলা, কথা দিয়ে কথা রাখা, মানুষ ও পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীলতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দেশপ্রেম, নৈতিকতাবোধ, দয়া-করুণা, সহমর্মিতা, আত্মত্যাগ, শান্তি, মানবাধিকার, পারস্পরিক অধিকার ও মর্যাদা প্রদানের মানসিকতা ও অভ্যাস গড়ে তোলা, সংখ্যালঘুর অধিকার ইত্যাদি সামাজিক কল্যাণমূলক ও দেশের মানোন্নয়নমূলক মানবীয় গুণাবলি প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে দেয়া হয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষার এ প্রক্রিয়ায় এক প্রজন্ম তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কাক্সিক্ষত মূল্যবোধ হস্তান্তর করে যাওয়ার ফলে সুরক্ষিত হয় মূল্যবোধ।
শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্প, প্রযুক্তি নিয়ে যান্ত্রিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব সভ্যতা। বিশ্ব সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও তার শিক্ষা। বিশেষত আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে অশিক্ষা, অপসংস্কৃতি ও নৈতিকতার অভাব। ফলে ক্রমশই বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। ‘অবক্ষয়’ শব্দের অর্থ ক্ষয়প্রাপ্তি। নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের সাথে সম্পর্কযুক্ত গুণাবলিগুলির লোপ পাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়াকে বলে সামাজিক অবক্ষয়। এটি হলো সামাজিক মূল্যবোধের বিপরীত ¯্রােতধারা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক অবক্ষয়জনিত কারণে সৃষ্ট ও বিস্তৃত সামাজিক অপরাধ আমাদের সমাজে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সহ সকল ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় পরিলক্ষিত হওয়ার কারণে সমাজে বেজে ওঠেছে অশনি সংকেত।
সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে মানুষের হৃদয়বৃত্তিতে লেগেছে অকাম্য ও অনাকাক্সিক্ষত পরিবর্তনের ঢেউ। পরিণতিতে সমাজ ও পরিবারে বেজে উঠেছে ভাঙনের সুর-তলিয়ে যাচ্ছে গোটা সমাজ, নষ্ট হচ্ছে পবিত্র সম্পর্কগুলো। দিন দিন মানুষ রূপান্তরিত হচ্ছে অমানবিক জীবে। হারাতে বসেছে নিজস্ব স্বকীয়তা, মানবিকতা। অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হৃদয় বিদারক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে মানুষের মূল্যবোধগুলো আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। শংকিত হয়ে পড়েছে মানবতা।
সবার মধ্যে কেমন এক চাপা অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছে সর্বত্র। আর এর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হচ্ছে সমাজ সংসার তথা গোটা জাতি। পারস্পরিক আস্থা-বিশ্বাস, মায়া-মমতা, সহানুভূতি, সমঝোতা, আন্তরিকতা ইত্যাদির অভাবে একে অপরের সাথে লিপ্ত হচ্ছে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে। সুন্দর ও মধুর সম্পর্কগুলোর দৃঢ় বন্ধন শিথিল হয়ে দেখা দিচ্ছে ফাটল। চাওয়া পাওয়ার ব্যবধান হয়ে যাচ্ছে অনেক বেশি। ফলে বেড়ে চলেছে আত্মহত্যা, হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধ প্রবণতা। ক্ষেত্র বিশেষে বলি হচ্ছে নাড়ি ছেড়া ধন। পরিবারকে মানবজাতির প্রাথমিক শিক্ষালয় বলা হলেও বর্তমান পরিবারগুলোও আর সেই অবস্থানে নেই। যথার্থ জীবন-দর্শনের অভাবে পরিবারগুলো এখন ভোগ-বিলাস, অর্থনৈতিক অতি উচ্চাকাক্সক্ষা, পরশ্রীকাতরতার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
মানুষের অন্তরের সুকুমার বৃত্তিগুলো ক্রমান্বয়ে যেন খোদাই করা পাথরে পরিণত হচ্ছে। সামান্য বিষয় নিয়ে রাগারাগি, বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়া যার সর্বশেষ পরিণতি হত্যাকান্ড। এ রকম ঘটনা ঘটে গেল গত ২৮.০৩.২০১৯ তারিখে। উদার পরিবহনের চালক ও হেলপার কর্তৃক সড়কপথে নৃশংসভাবে খুন হন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ঘোরি মোঃ ওয়াসিম। ভাড়া নিয়ে ড্রাইভার ও হেলপারের সাথে বাকবিতন্ডার শেষ পর্যায়ে চলন্ত গাড়ির নীচে ফেলে নৃশংসভাবে খুন করা হলো তাকে। ইতোপূর্বে ২১.০৭.২০১৮ তারিখে এভাবেই আরেক নৃশংসতার শিকার হতে হয় নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ ৫ম বর্ষের ছাত্র সাইদুর রহমান পায়েলকে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গাড়ি থেকে নেমে কাজ সেরে বাসে ওঠার আগেই চালক দ্রুত গতিতে বাস ছেড়ে দেয়ার কারণে পায়েল বাসের দরজার সঙ্গে প্রচন্ড আঘাত খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলে নাক মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। তখন গাড়ি থামিয়ে সুপারভাইজার ও হেলপার ভাটেরচর ব্রিজের নীচে নদীতে পায়েলকে ফেলে দিলে তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। এ ধরনের ছেলেমেয়েরা সাধারণত ভদ্রগোছের হয় যার কারণে ইতরশ্রেণির ড্রাইভার ও সুপারভাইজাররা এই ভদ্রতার সুযোগ কাজে লাগায়। কতটুকু নির্মম ও পাষন্ড হলে মানুষ এরকম হত্যাকান্ড ঘটাতে পারে তা যেন এখন কল্পনারও বাইরে গিয়ে ঠেকেছে।
পুরোনো আরও অনেক ঘটনার ধারাবাহিকতায় অতি সম্প্রতি অসহায়ভাবে প্রাণ দিতে হলো ফেণীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে। মাদ্রাসার অধ্যক্ষের কু-লালসার শিকার নুসরাতকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পাঁচ দিন থেকে অবশেষে জাতিকে বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ১০ মার্চ পৃথিবী নামক জঞ্জালের গ্রহ থেকে মুক্ত হয় নুসরাত। চিরদিনের জন্য তার পরিবারের জন্য রেখে যায় নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ।
মূল্যবোধে কতটুকু পচন ধরলে মানুষ এমন নৃশংস ও পাশবিক হতে পারে এ নিয়ে উৎকণ্ঠায় আছেন সমাজ বিশেষজ্ঞগণ। পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, বিচারহীনতা, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা, জবাবদিহিতার অভাব, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় ইত্যাদির মতো কারণগুলোকে গুরুত্ব সহকারে দেখছেন তারা। শুধু দেশে নয়, ভৌগোলিক সীমারেখা ছাড়িয়ে সারাবিশ্বে আজ ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে মানবতা। হানাহানি, সন্ত্রাস, অস্ত্রের ঝনঝনানির কাছে বিশ্বশান্তি আজ চরম হুমকীর সম্মুখীন। আর এই সন্ত্রাসবাদের শিকার হতে হয় জায়ানের মতো নিষ্পাপ শিশুসহ নিরপরাধ মানুষদের। অতি সম্প্রতি নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নতুন করে আবার ভাবিয়ে তুলেছে বিশ্বনেতাদের।
মানুষের হিং¯্রতা দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে। ছোটদের প্রতি ¯েœহ-মমতা, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের মতো অতি সাধারণ মৌলিক শিষ্টাচার বোধটুকুও যেন হারাতে বসেছে তার নিজস্ব স্বকীয়তা। কারো কথা কেউ এমন কি কারো দুঃখ বেদনার কথাও শুনার মতো এখন যেন কারো হাতে সময় বা ধৈর্য্য কোনটাই নেই। হাসিখুশি রসবোধ এখন মনে হয় অন্যগ্রহের বস্তু। বাংলা পাঁচের মতো মলিন বদনে সবার মধ্যে এখন যেন এক যুদ্ধংদেহী অবস্থা বিরাজ করছে। কার ঘাড়ে কে কখন সওয়ার হবে এটার জন্য যেন সদা প্রস্তুত। আর তাইতো পান থেকে একটু চুন খসলেই শুরু হয়ে যায় তর্কাতর্কি, বাকবিতন্ডা, হাতাহাতি এমন কি খুনাখুনি পর্যন্ত। সবার মধ্যে কেমন যেন এক অলিখিত অসুস্থ প্রতিযোগিতা বিরাজমান। কেউ কাউকে আগে যেতে দেবেনা, কেউ কাউকে ছাড় দেবে না এটা যেন এক নিত্যনৈমিত্তিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। সবাই সবকিছু সহজে পাওয়ার লোভে অর্থাৎ আরও সহজভাবে বলতে গেলে শর্টকাটে উপরে ওঠার সিঁড়ি খুঁজতে ব্যস্ত। আমি আগে যাব, আমি আগে থাকব, আমি আগে বলব, আমি আগে বড় লোক হব, আমি আগে, আমি আগে, এটাই যেন অধিকাংশের মনোভাব। আর এই আগের দৌড়ের প্রতিযোগিতা যানবাহন থেকে শুরু করে পরিবার, শিক্ষাঙ্গন, ডাক্তারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি সবকিছুতে বিদ্যমান। মাঝখান থেকে দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ জনগণের এমনকি বিপাকে পড়ে প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়। এর চেয়েও দুঃখজনক ব্যাপার হলো এই প্রতিযোগিতার পাল্লায় জীবিত ব্যক্তিকে মৃত বলে প্রচার করা অর্থাৎ বিশিষ্ট কেউ যদি অসুস্থ থাকেন বা হাসপাতালে ভর্তি থাকেন তবে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে সঠিক তথ্য নিরূপণ না করে উক্ত ব্যক্তিকে মৃত বলে কে আগে প্রচার করবেন এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন অনেকে। প্রবীণ অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানকে জীবিতাবস্থায় রেখে অন্ততপক্ষে পাঁচ ছয় বার তার মৃত্যু সংবাদ রটানো হয় বলে এনিয়ে কয়েকবার তিনি ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেন।
সহজ কথাকে তীর্যকভাবে অথবা খোঁচা দিয়ে কথা বলা এ যেন এক সহজ সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনজনদের চেয়ে প্রিয়জন হলো গেজেট। কারো সাথে কারো কথা বলার সময় নেই অথচ গেজেট নিয়ে দিবানিশি কাটানোর সময়ের অভাব নেই কারোর।
প্রযুক্তি বিশ্বকে করেছে একীভূত কিন্তু মায়া-মমতা সহানুভূতি, সহমর্মিতা, আন্তরিকতা সাধারণ শিষ্টাচার এগুলোকে করেছে দূরীভূত। কোন অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠান চলাকালীন অবস্থায় দেখা যায় দর্শক সারিতে যারা তাদের মধ্যে তো আছেই এমনকি মঞ্চে উপবিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মাঝেও মোবাইলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অত্যন্ত মনোযোগী অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। এটি একটি সাধারণ শিষ্টাচার বহির্ভূত ব্যাপার তো অবশ্যই সেই সাথে দৃষ্টিকটু বিষয়ও বটে। গণ্যমান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে উপস্থিত সুধীবৃন্দের জন্য এটাই কি শিক্ষণীয় বিষয়-যা অপ্রত্যাশিত।
আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরতার মধ্যে নিমগ্ন সবাই। সবকিছু এখন ‘প্রচারেই প্রসার’ কেন্দ্রিক। কেউ কারো প্রশংসা করতে যেমন রাজী নয় তেমনি নিজের ঢোল নিজেই পেটাতে ব্যস্ত সবাই। ভালটুকু বর্জন করে মন্দটুকুর ছিদ্রান্বেষণে তৎপর একটি মহল। সেলফি রোগ হচ্ছে সমাজের আরেকটি ভয়ংকর ভাইরাস। বিপজ্জনক সেলফি তুলতে গিয়ে অনেকের প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হচ্ছে। তাছাড়া রোগী দেখতে গিয়ে এমনকি মুমূর্ষু রোগীর সাথে সেলফি, মৃত বাড়িতে সেলফি, জানাযায় সেলফি, কবর জিয়ারতে সেলফি, মৃতের সাথে সেলফি ও সেগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা এগুলো যেন এক চিরাচরিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। দান-খয়রাতের ছবি এবং দানের জিনিসের তলানিতে কমপক্ষে একটা আঙুলও না হয় স্পর্শ করে ছবি তোলা যা গণমাধ্যমের প্রচারিত একটি অতি সাধারণ ব্যাপার। কেউ কারো বিপদ দেখলে এগিয়ে আসা তো দূরের কথা শুরু হয়ে যায় মর্মান্তিক বিষয় নিয়েও ভিডিও করা। অথচ এই ভিডিওকারী অন্যদেরকে নিয়ে বিপদগ্রস্তের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে অনেকখানি উপকার হয়তো হতে পারত। সবকিছুর সংমিশ্রণে দিন দিন নিয়ম-নীতি বহির্ভূত সংস্কৃতির বাইরে তৈরি হচ্ছে অপসংস্কৃতি।
সমগ্র জাতির চিন্তাধারা, ভাবধারা ও কর্মধারার গৌরবময় প্রতিচ্ছবিই হলো তার সংস্কৃতি। মানবীয় আচার-পদ্ধতি, শিক্ষা-দীক্ষা, মানসিক উন্নতি, পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব এসবের ধারা সমন্বয়ে সৃষ্ট এক অপূর্ব জীবনধারাই হচ্ছে সংস্কৃতি। প্রেম ও সৌন্দর্য সংস্কৃতির প্রধান আশ্রয়। এ আশ্রয় থেকে বিচ্যুত হলে সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে মানুষ অপসংস্কৃতির দিকে ধাবিত হয়। শিক্ষা ও সভ্যতার অবনতি ঘটিয়ে যে সংস্কৃতি মানুষকে সুন্দর থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তাই অপসংস্কৃতি। দুর্নীতি, অসততা, মিথ্যাচারিতা, হিংসাপরায়ণতা, মূল্যবোধের অভাব ইত্যাদি বিষয়গুলো আমাদের দেশে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশের জন্য দায়ী বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। অপসংস্কৃতি ব্যক্তি, সমাজ ও গোটা জাতিকে কলুষিত করে। তাই এখনই সবার সচেতনতার মাধ্যমে এগুলো রোধ করা সম্ভব না হলে ধ্বংস অনিবার্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পরবর্তী খবর পড়ুন : কয়েক প্রস্থ বিড়ম্বনা

আরও পড়ুন

শাল্লায় স‍্যানিটেশন মাস ও বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালন

         হাবিবুর রহমান হাবিব, শাল্লা (সুনামগঞ্জ)...

বাংলাদেশ ব্যাংকে বিদায় সংবর্ধনা

80        80Sharesবাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মাকসুদা বেগমের...

নতুন ৯৬৯ জনের করোনা শনাক্ত, মৃত্যু আরও ১১

         দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন...