সহজবোধ্য লেখা বই প্রীতি বাড়ায়

,
প্রকাশিত : ১৪ মে, ২০১৮     আপডেট : ৪ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোহাম্মদ আব্দুল হক: এখানে বইয়ের পাঠক এখনও খুবই কম। তাই শুধু বইমেলা ঘনিয়ে এলেই বই নিয়ে লিখে দায়িত্ব শেষ করলে হবেনা। বরং পাঠক বাড়াতে চেষ্টা অব্যাহত রাখা দরকার বারেবারে। জ্ঞান অর্জনের জন্যে বই পড়ার বিকল্প নেই। আর বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হলে বিশেষ করে শিশুদের আনন্দদায়ক ও স্কুল – কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বোধগম্য হয় এমন লেখা সম্বলিত বই চাই। কারণ বইয়ের প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি হয় সাধারণত বইয়ের ভিতরে তালহীন ও আনন্দহীন ছন্দের ছড়া ও কঠিন সব শব্দে জব্দ হলেই। আমাদের বাংলাদেশে প্রতিবছর ঘটা করে বইমেলার আয়োজন করা হয় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে। উদ্দেশ্য মানুষকে বইয়ের জগতে আকৃষ্ট করা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে স্মরণ করে খ্রীষ্টিয় সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিবস থেকেই পুরোমাস ব্যাপী রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় বইয়ের মেলা যাকে ছোটো বড় সবাই একদমে ‘বইমেলা’ বলেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। খবর পাই পৃথিবীর অনেক দেশেই বইমেলা হয় এবং লোক সমাগম হয়। আমাদের মতো এতোটা জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে শুধু বই নিয়ে এতো বড়ো পরিসরে বইমেলার আয়োজন পৃথিবীর অন্য কোথাও হলেও আমি দেখেছি ঢাকাতে। এখনতো দিনে দিনে মেলার পরিসীমা আরোও বাড়ছে। বইমেলায় ছোটো শিশুরা যেমন যায় মা-বাবার হাত ধরে তেমনি ছাত্র-ছাত্রীদের পাশাপাশি শারীরিকভাবে চলতে সক্ষম বৃদ্ধ মানুষেরও সমাগম ঘটে থাকে বই প্রীতির কারণে। সবাই যান মজার বই, ভালো বই কিনে আনবেন, পড়বেন, মজা পাবেন, শিখবেন এবং জ্ঞান অর্জন করবেন এমন আগ্রহ থেকেই।

বইমেলা যে কেবল ঢাকায় হয় তা নয়। সারাদেশেই এমনটি আয়োজিত হয়ে থাকে। এতো এখন আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হয়েছে। ঢাকার পাশাপাশি সিলেট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সিলেট বাসী বইমেলা উপভোগ করেছে, দেখেছি। শুধু ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে নয় আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশের বড় বড় শহর গুলোতে বিশেষ করে সাহিত্য সমৃদ্ধ সিলট নগরীতে ও অন্যান্য নগরে বইমেলার অায়োজন হয় এবং চলে সপ্তাহ ব্যাপী কিংবা আরও বেশি দিন। বিগত কয়েক বছর যাবৎ দেশের ঐতিয্যবাহী প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ সিলেটে বইমেলা হচ্ছে । ঢাকায় যেমন সারাদেশ থেকে প্রকাশকরা অংশ নেন সিলেটে তেমনটি হয়না, আবার একেবারে কম হয় না। তবে সিলেটে এখন বেশকিছু প্রকাশনা সংস্থা আছে যার অনেক গুলোই মান সম্পন্ন বই প্রকাশ করে ইতিমধ্যেই সুনাম কুড়িয়েছেন। এটা খুবই আশার কথা। আমি ছাত্র জীবনে যেমন বইমেলায় যেতাম, সেটা ঢাকা , সিলেট কিংবা সুনামগঞ্জ যেখানেই হোক, এখনও প্রচন্ড টান অনুভব করি। তখন এখনকার মতো এতো বই প্রকাশিত হতোনা এবং বইয়ের কাগজ ছিলো অধিকাংশই কর্ণফুলি নিউজ প্রিন্ট মার্কা। আর তখন বর্তমানের বইয়ের মতো মলাটে এতোটা ঝলমলে চেহারাও দেখা যায়নি। অবশ্য মলাট নিয়ে খুব বেশি কৌতুহল যে ছিলো তাও নয়। তারপরও বইয়ের উপরের ছবি আমাদেরকে টানতো। মেলা প্রাঙ্গনে গিয়ে অল্প কিছু বইয়ের দোকান ( বর্তমানে বুকস্টল বলতেই আমরা ভালোবাসি) ঘুরে বইয়ের পাতা উল্টে এক মুহূর্তেই পড়ে ফেলতাম আর মজার মজার ছড়া বা কবিতা পড়ে বারবার পড়বো এমন আগ্রহ থেকেই ছড়া , কবিতা বা বন্দে আলি মিয়ার ছোটো ছোটো গল্প লেখা বই কিনে সযতনে সংগ্রহে রাখতাম। সত্যি বলতে কি তখন ছড়া বা কবিতা এতোই সহজে ছন্দময় করে লেখা হতো পড়লে মনে দোলা লাগতো, শরীরে নাচন অনুভব হতো। আমাদের কাছে এমনি আনন্দের এক জগত ছিলো যে প্রত্যেক দিন একবার কোনো ছড়া বা কবিতা পড়তেই হতো। কতো ছড়া কবিতা – “আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে / বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।” অথবা ” আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই/ ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ি যাই।” এমনি সব মজা মাখানো ছড়া আর ছড়া আজও আছে এবং থাকবে বহুদিন।

বলছিলাম বই পড়ার আগ্রহ বাড়ানো নিয়ে। এখন ছড়াকার, কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক অনেক এবং প্রতি বছর যথেষ্ট গল্পের বইয়ের পাশাপাশি ছড়া ও কবিতার বই বের হচ্ছে। বইমেলায় বই বিক্রি হয় একেবারে কম নয়। তবে গল্পের বইয়ে অপেক্ষাকৃত মধ্যবয়সীদের আকর্ষণ দেখা গেলেও কেমন যেন নবীন পাঠকের আগ্রহ ততোটা নাই মনে হয়। স্কুল পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ ছড়া বা কবিতায় কমে গেছে। এর কারণ আমি মনে করি অনেকেই কষ্ট করে খুঁজে খুঁজে ছন্দ মিলিয়ে ছড়া লিখে বই ছাপেন ; কিন্তু ছড়ার ছন্দে গতিময়তা খুঁজে পায়না বলেই বাচ্চারা নতুন ছড়াকারদের ছড়ার বইয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিনে নিলেও বাসায় গিয়ে দ্বিতীয়বার আর হাতে তুলে নেয়না। এটা ভালো ইংগিত বহন করেনা। কারণ ছোটোরা এখনি বইয়ে আগ্রহ হারালে বড় হতে হতে বই পাঠাভ্যাস গড়ে উঠবে না। কবিতার ক্ষেত্রেও অনেকটাই একই রকম বলা চলে। অনেকে দুর্বোধ্য শব্দ প্রয়াগে কবিতাকে হৃষ্টপুষ্ট করতে চান। তাই আজও কোনো অনুষ্ঠানে আমরা বা আমাদের সন্তানেরা ছড়া বা কবিতা পাঠের জন্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, শামসুর রাহমান, সুনির্মল বসু, জীবনানন্দ দাস, ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সুকান্ত ভট্টচার্য় প্রমুখ কবির ছড়া ও কবিতা মুখে নিয়ে আসি। আমি একথা বলছিনা যে এখন যারা লিখছেন তাদের ছড়া বা কবিতায় ছন্দ নেই। লুৎফর রহমান রিটন, রেজাউদ্দিন স্টালিন আরো অনেকে আছেন যারা সারা বাংলায় কাব্যসাহিত্যে জনপ্রিয় হয়েছেন। আছেন, হ্যাঁ অবশ্যই অনেকেই ভালো ছন্দে ও সহজ শব্দ চয়নে লিখছেন ছড়া, কবিতা এমনকি গল্প, প্রবন্ধ । ঢাকায় বসে লিখছেন কবি মাহবুব খান, সিলেটে অজিত রায় ভজন, কবি এখলাছুর রহমান, সুনামগঞ্জে কবি রোকেশ লেইস,
সুদূর প্রবাসে থেকেও লিখেছেন রণেন্দ্র তালুকদার পিংকু, কবি ইসতিয়াক রূপু, ফকির ইলিয়াছ, বাবর বখত সহ অনেকে।সিলেটে গবেষণাধর্মী নিবন্ধ ও প্রবন্ধ লিখে সুনাম কুড়িয়েছেন আব্দুল হামিদ মানিক, গল্পে আছেন সেলিম আউয়াল, কলাম ও প্রবন্ধ লিখেছেন আফতাব চৌধুরী, এই প্রবন্ধকারের কবিতার বইয়ের পাশাপাশি দুটি প্রবন্ধগ্রন্থ বের হয়েছে। তারপরও কেন পাঠক গল্প ও প্রবন্ধের পাশাপাশি ছড়া ও কবিতার বইয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা। এই চিন্তা থেকে আমি খুঁজেছি এবং আমার মনে হয়, অধিকাংশ ছড়া ও কবিতার বইয়ের ভিতরে কে কতো বেশি কঠিন ও জটিল শব্দ ব্যবহার করতে পারা যায় সেই প্রতিযোগিতা চলে। এখানে পাঠক কিছু বুঝুক বা না বুঝুক সেদিকটা খেয়াল করার প্রয়োজন যেন অনেকেই অনুভব করেন না। এ আমার দোষারূপ নয়। একজন কবির এ স্বাধীনতা আছেই। আমার কবিতা আছে, ‘কবির দীনতা’ _
“আকন্ঠ কঠিন শব্দে ডুবে/
কবি কবিতা লিখতেই পারেন/
এ তার স্বাধীনতা।/
সহজ ভাষায় শব্দচয়নে/
কবির সাধ্যে হয়নি/
এ তারই দীনতা।।” অবশ্য এর ফলাফল যা হবার তাই হচ্ছে। নতুন ছড়াকার ও কবির লেখা ছড়া কিংবা কবিতার সমঝদার বাড়ছেনা।

আমার ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে আঁতকে উঠার মতো এক চিত্র ধরা পড়েছে। ঝলমলে মলাট বা প্রচ্ছদ দেখে ও লেখকের মুখ চেয়ে যারা সন্তানের জন্যে একটি বই কিনে নেন, তারা অনেকেই নিজেরা দুই লাইন পড়ে বই বন্ধ করে ফেলে রেখে দেন কিছু বোধগম্য হয়নি বলে। এমতাবস্থায় সন্তানকে বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলার সুযোগ নিশ্চয় থাকছে না। আর এ কারণেই আমাদের এ প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা কবিতা পাঠে উৎসাহী হচ্ছেনা। আমাদের শিশুদের কাছে এ সময়ের ছড়া উচ্চারণে ও বোধে এতোটা কঠিন ঠেকে যে, এতে তাদের মাথায় ও শরীরে আনন্দ রস আসাতো দূরের কথা, বরং শিশুমনে ও দেহে বিরক্তির চিহ্ন ফোটে ওঠে। সেজন্যে ছোটোবেলা থেকেই বইয়ের পাঠক দূরে সরে যাচ্ছে। ‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’ এমন জ্ঞান ভিত্তিক কথা বলার পিছনে মনীষী সৈয়দ মুজতবা আলী মূলত মানুষকে জ্ঞান নির্ভর সমাজ গড়তে বই পড়ার গুরুত্বের কথা বুঝাতে চেয়েছেন। এখানেই সব যুগের কবি ও লেখককে ভাবতে হবে, যাতে বই পড়ায় সময়ের সন্তানেরা বিমুখ না হয়। হ্যাঁ কবিদের স্বাধীনতার মাঠেই এমন লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছাতে হবে যাতে ছড়া বা পদ্য কঠিনের আবরণে শৃঙ্খলিত হয়ে অসার না হয়ে পড়ে। আমাদের বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকগণ কতো সহজ ভাষায় লিখে গেছেন যা আজও প্রায় শতাব্দী পেরিয়ে আছে আমাদের এবং তা এ প্রজন্মের কাছে গ্রহণয়োগ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, “মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভূবনে,/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।” সেকাল বা একাল এমনকি আগামীকাল এমন কবিতাই মানুষকে টানবে। আবার সহজ শব্দ প্রয়োগে যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম চিরকালীন প্রতিবাদী কবিতা লিখেছেন, “কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙ্গে ফেল্ কর্ রে লোপাট রক্ত-জমাট/ শিকল-পূজার পাষাণ – বেদী।” তিনি আবার শিশুদের জন্যে লিখেছেন _ “ভোর হল দোর খোল,/ খুকুমনি ওঠরে/ ঐ ডাকে জুঁই শাখে/ ফুল খুকি ছোটরে।” কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন _ “তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা/ তোমাকে পাওয়ার জন্যে / আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়? ” আমরা দেখি, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য খুব বেশি লিখেন নি। অথচ সহজে বুঝা যায় এমনিভাবে লিখে, শিশু অধিকার ও মানুষের মুক্তির কথা বলে হয়েছেন মানবতাবাদী কবি। এসব লেখা আমাদেরকে সত্যে ও সুন্দরে উজ্জীবীত রাখে। তাই আমাদের প্রজন্মান্তরে জ্ঞান বিকাশে এবং কুসংস্কার মুক্ত হয়ে আলোকিত সমাজ পেতে সহজবোধ্য ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লিখে পাঠক বাড়ানোর দায়িত্ব নিতে হবে।

বিশ্বসাহিত্য আছে এই মাটিতে। হিমালয়ের বরফ গলে পানির স্রোতধারা শত স্রোতস্বিনী পাড়ি দিয়ে সুরমা, মেঘনা হয়ে মিশে গেছে বঙ্গোপসাগরে। আরো ছুটেছে সীমাহীন। এখানে ফলে ফসল, জলে মাছ, আকাশে মেঘ ওড়ে দূরের বার্তা নিয়ে, পাখির ডানায় দেখি মুক্ত দুনিয়া। হ্যাঁ, এসব কথা সহজ শব্দে সরল ছন্দে বলতে হবে। এই উপস্থাপক ‘যদি থাকো কবিতায়’ কাব্যে লিখেছেন, “যার যা লিখার লিখুন / প্রবন্ধ কলাম কবিতা গল্প, / সরল মানুষ শিখে যেন / একটু আধটু কিংবা অল্প। ” কবি ও লেখক সমাজের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আহবান জানাই, আসুন যা ই লিখি তা যেন হয় সহজে বুঝার যোগ্য। চিত্ত আকর্ষণীয় ছড়া, জীনব ঘনিষ্ঠ সহজবোধ্য কবিতা ও ছোটো ছোটো গল্প এবং জ্ঞান ভিত্তিক গদ্য অর্থাৎ প্রবন্ধ পাঠেই বইয়ে আগ্রহ বাড়বে। কবি – সাহিত্যিকগণ মনোযোগী হলে তাঁরাইতো পারবেন। এ যে স্রস্টার বিশেষ দান।।
লেখক মোহাম্মদ আব্দুল হক
কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক
01814093240


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

২২নং ওয়ার্ডে ডাস্টবিন বিতরণের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু

        সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: ডেঙ্গু প্রতিরোধে...

বিদেশগামী যাত্রীগণের করোনা পরীক্ষার নিবন্ধন আজ থেকে

        বিদেশগামী যাত্রীগণের কোভিড-১৯ পরীক্ষা করার...

জাতীয় ছাত্র সমাজ সিলেট জেলাশাখার আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন

        সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: জাতীয় ছাত্র...