সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, ঘুষ, চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে ইসলামের বিধান

,
প্রকাশিত : ১৮ অক্টোবর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মো: আব্দুল মালিক: সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করা মারাত্মক গুনাহ ও জঘণ্য অপরাধ। সাধারণ আত্মসাতে সম্পদের মালিক যেহেতু নির্দিষ্ট থাকে সেহেতু তিনি তা ক্ষমা করে দিলে সে ব্যক্তি মাফ পেয়ে যায়। সরকারি সম্পদ আত্মসাতের ক্ষেত্রে এ সুযোগ নেই। কারণ এ সম্পদের মালিক দেশের সকল জনগণ। আর সকলের কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়া অকল্পনীয় বিধায় এ অন্যায়ের গুনাহ অনেক বেশি। হাদিসে আছে; হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে খায়বার যুদ্ধে গমন করি। যুদ্ধে আমরা গণিমত হিসেবে কোন স্বর্ণ বা রোপ্য লাভ করিনি। তবে বিভিন্ন মালামাল, খাদ্যদ্রব্য ও কাপড়-চোপড় লাভ করেছি। এরপর আমরা এক উপত্যকায় চলে যাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে তাঁর একটি গোলাম ছিল। গোলামটি তাঁকে জুযাম গোত্রের জনৈক ব্যক্তি উপটৌকন হিসেবে দিয়েছিল। উপত্যকায় পৌঁছে আমরা যখন কাফেলা থেকে অবতরণ করলাম তখন সেই গোলামটি উষ্ট্রবহরে অবস্থান করছিল। এমন সময় কোথা থেকে নিক্ষিপ্ত একটি তীর তার শরীরে বিদ্ধ হয় এবং তাতে তার মৃত্যু ঘটে। আমরা বলাবলি করতে লাগলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! লোকটির কী সৌভাগ্য! সে শাহাদাতের মর্যাদা পেয়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, কখনো নয়। যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, নিশ্চয় সেই লম্বা চাদরটি আগুন হয়ে তার দেহ দগ্ধ করছে যেটি সে খায়বার দিবসে গণিমত বণ্টনের পূর্বে গোপনে তুলে নিয়েছিল। বর্ণনাকারী বলেন, সাহাবিগণ এ কথায় ভীষণ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং যার কাছে একটি বা দু’টি জুতার ফিতা ছিল তাও এনে জমা দেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, একটি জুতার ফিতা আগুনের অংশ, দু’টি জুতার ফিতা-এগুলোও আগুনের অংশ।- (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ, মুনযিরী)।
হযরত যায়দ ইবন খালিদ জুহানী (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, খায়াবার যুদ্ধে জনৈক ব্যক্তি কোন দ্রব্য আত্মসাৎ করে। পরে সে মারা গেলে রাসূলুল্লাহ (স) নিজে তার জানাযা পড়াননি। বরং বললেন, তোমাদের এ সঙ্গী আল্লাহর পথের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা তার জিনিসপত্র তল্লাসী করে তাতে একটি রেশমি বস্ত্র পেলাম যার মূল্য হয়তো দুই দিরহাম হবে। (মুয়াত্তা, আবু দাউদ, নাসাঈ, মুনযিরী, ইবনে মাজা)।
হযরত ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমাকে হযরত উমর (রা) বর্ণনা করেছেন যে, খায়বার যুদ্ধের দিন মহানবী (স) এর সাহাবিগণের একটি দল রক্ষণাবেক্ষণের কাজে সম্মুখের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর তাঁরা ফিরে এসে বললেন, অমুক শহীদ হয়েছেন, অমুক শহীদ হয়েছেন। অবশেষে তাঁরা এক ব্যক্তির নিকট দিয়ে অতিক্রম কালে বললেন, অমুক শহীদ হয়েছেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (স) বলে উঠলেন, না, তা হতে পারে না। আমি তো তাকে দেখেছি সে একটি ‘চাদর’ কিংবা বলেছেন, একটি ‘আবা’ আত্মসাতের দায়ে জাহান্নামের আগুনে জ¦লছে। তারপর রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, হে ইবনুল খাত্তাব! যাও, মানুষের মধ্যে ঘোষণা করে শুনিয়ে দাও যে, মুমিনগণ ব্যতীত অন্যরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। হযরত উমর বলেন, আমি বের হলাম এবং ঘোষণা দিলাম যে, সাবধান! মুমিনগণ ব্যতীত অন্যরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (তিরমিযী, মুসলিম, মুনযিরী)। এই হাদিস দ্বারা মনে হয়ে অন্যের সম্পদ আতœসাৎকারী মুমিনই নয়।

ঘুষ: ইসলামের দৃষ্টিতে হাদিয়ার আদান প্রদান জায়েয নয় বরং সুন্নাত। কিন্তু ঘুষ নাজায়িয। হাদিয়ার দ্বারা পরস্পরের মধ্যে আন্তরিকতা ও ভালবাসা বৃদ্ধি পায় আর ঘুষের কারণে মহব্বত নষ্ট হয়। হাদিয়া ও ঘুষের মধ্যে পার্থক্য হলো, হাদিয়ার মধ্যে দাতা ও গ্রহীতার অন্তরের পারস্পারিক মহব্বত ছাড়া পার্থিব কোন স্বার্থ হাসিল কিংবা কোনরূপ অবৈধ সুবিধা পাওয়ার আশা থাকে না। কিন্তু ঘুষের মধ্যে এ ধরনের আশা থাকে। দায়িত্বে নিয়োজিত কোন ব্যক্তিকে হাদিয়ার আকারে কোন কিছু প্রদান করাও ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। ঘুষ খাওয়ার কু-অভ্যাস পৃথিবীতে প্রথম শুরু হয় ইয়াহুদী প-িৎদের থেকে। মহান আল্লাহ তাদের সেই ভক্ষণকে তিরস্কার করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, তাদের (ইয়াহুদীদের) অনেককে তুমি দেখবে পাপাচারিতায়, সীমা লংঘনে ও অবৈধ ভক্ষণে তৎপর। তারা যা করছে নিশ্চয় তা কত নিকৃষ্ট। (তাদের) রাব্বানীগণ ও প-িৎগণ তাদেরকে পাপ কথা বলতে এবং অবৈধ ভক্ষণে নিষেধ করে না, এরা যা করছে নিশ্চয় তা অতি নিকৃষ্ট- (সুরা মায়িদা- ৬২-৬৩)। ঘুষের অনিবার্য পরিণতি হলো অন্তরে ভীতির সৃষ্টি হওয়া ও সৎসাহস হারিয়ে যাওয়া। ঘুষখোর সর্বদা ভীতুমনে থাকে। মুখ খুলে সে কখনো সত্য কথা বলতে পারে না। মানবতার জন্য এ ক্রটি মহা জঘন্য অপরাধ। হাদিসে আছে; হযরত আমর ইবনুল আস (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেছেন যেই সম্প্রদায়ে সুদ প্রকাশ্যে চলে সে সম্প্রদায় দুর্ভিক্ষ কবলিত হয়। আর যেই সম্প্রদায়ে ঘুষ প্রকাশ্যে চলে সে সম্প্রদায় ভীতি কবলিত হয়- (ইমাম আহমদ, মুনযিরী)। হাদিসে আরো আছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেছেন, ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার উপর আল্লাহ্র লা’নত- (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাযা, ইমাম ইবনে হিব্বান, ইমাম হাকিম, মুনযিরী)। যার উপর আল্লাহর লানত তার পরিনতি জাহান্নাম ছাড়া আর কি হতে পারে ?
হযরত আবূ হুমায়দ সাঈদী (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, মহানবী (স) একবার আযদ গোত্রের জনৈক ব্যক্তিকে সাদকা আদায়ের কাজে নিযুক্ত করে পাঠান। লোকটির নাম ছিল ‘ইবনুল লুতবিয়্যা’। লোকটি কাজ শেষ করার পর প্রত্যাবর্তন করে বলল, এ অংশ আপনাদের, আর এ অংশ আমাকে হাদিয়াস্বরূপ দেওয়া হয়েছে। কথাগুলো শুনে মহানবী (স) ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। তারপর মহান আল্লাহ্র হাম্দ ও সানা পাঠের পর বললেন, আল্লাহ তা’আলা আমার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা পালনের জন্য আমি তোমাদের মধ্য থেকে কোন লোককে নিয়োজিত করি। অথচ তাদের কেউ কেউ ফিরে এসে বলে, এগুলো আপনাদের আর এগুলো আমাকে হাদিয়াস্বরূপ দেওয়া হয়েছে। এটা ঠিক নয়। কারণ যদি এমনই হতো তাহলে সে তার পিতৃগৃহ কিংবা বলেছেন, তার মাতৃগৃহে বসে থাকেনি কেন ? তখন দেখতে পেত যে, তাকে হাদিয়া দেওয়া হচ্ছে কি না। সেই মহান সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন, এ ক্ষেত্রে কেউ যদি কোন কিছু অবৈধ গ্রহন করে তবে সে তা নিজ ঘাড়ে বহণ করে কিয়ামতের ময়দানে উপস্থিত হবে। বস্তুটি যদি উট হয়ে থাকে তাহলে সেটি তখন চীৎকার করতে থাকবে, যদি গরু হয় তাহলে হাম্বা হাম্বা ডাক দিতে থাকবে। তারপর নবীজী মুনাজাতের উদ্দেশ্যে হস্তদ্বয় এতখানি উঁচু করলেন যে, আমরা তার বগলের শুভ্রাংশ দেখতে পেয়েছি। তারপর বলতে থাকলেন, হে আল্লাহ! আমি কি পয়গাম পৌঁছাতে পেরেছি, হে আল্লাহ! আমি কি পয়গাম পৌঁছাতে পেরেছি ? –(বুখারী, মুসলিম)। আজকাল দেখা যায় অনেকে সরকারি চাকুরিতে থেকে নিয়মিত বেতন ভাতা নিয়ে অতিরিক্ত টেক্স-ভ্যাট আদায় করে, অনেকে মসজিদ মাদরাসার জন্য চাঁদা আদায় করে এক অংশ নিজে নেন, এক অংশ জমা দেন। যা মহানবী (স) এর হাদিস সমর্থন করে না।

চাঁদাবাজি: চাঁদাবাজিসহ যে কোন যুলম ইসলামে নিষেধ। মালিক নিজের ইচ্ছা ও সম্মতির ভিত্তিতে যে চাঁদা প্রদান করে সেটি ছাড়া অন্য কোন চাঁদা হালাল নয়। কারো কাছ থেকে তার মনের পরিচ্ছন্ন সন্তষ্টিবিহীন কোন চাঁদা আদায় করা নাজায়েয। এমনকি কোন মসজিদ কিংবা মাদ্রাসা কিংবা ধর্মীয় কাজের জন্য হলেও নাজায়িয। হাদিসে আছে; হযরত আবূ হুররা আর রুককাশী (রা) নিজ চাচা সূত্রে বর্ণনা করেছেন- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেছেন, সাবধান! তোমরা কেউ কারো উপর যুলুম করবে না। সাবধান! কারো সম্পদ তার অন্তরের সন্তষ্টি ব্যতীত কারো জন্য হালাল নয়। (মিশকাত, বায়হাকী)। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেছেন, তুমি মজলুমের বদ্ দু’আকে ভয় কর। কারণ এই বদ্দু’আ আর আল্লাহ জাল্লা শানুহুর মাঝখানে কোন আড়াল নেই- (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, মুনযিরী)। আজকাল প্রায়ই দেখাযায় মসজিদ মাদরাসার জন্য, খতম তারাবির জন্য বা অন্য যেকোনো ভাল কাজের জন্য দূর্বলদের উপর সবলরা চাপ প্রয়োগ করে চাঁদা আদায় করে থাকেন। যাহা মহানবী (স) এর শিক্ষা নয়।
আজকাল অনেকেই যেখানে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ, ঘুষ, চাঁদাবাজির সুযোগ আছে সেখানেই চাকরি খোঁজেন। অনেক মা বাবা মেয়ের বিয়ের সময় যেসব পাত্রের অতিরিক্ত আয় রোজগারের সুযোগ আছে তাদেরকে পছন্দ করেন। অথচ ইসলামে শিরকের পরে সবচেয়ে কঠিন গুনাহের কাজ হচ্ছে অন্যের সম্পদ আতœসাৎ করা। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কোরআন শরীফের বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন- “শিরককারীকে ক্ষমা করবেন না” আর অন্যের হক এর ব্যপারে বলেছেন, ‘যার হক সে মাফ না করে দিলে আমি তা মাফ করতে পারি না’। আল্লাহ সুবহানাতায়ালা যা মাফ করতে পারেন না তা যে কত বড় গুনাহের কাজ সহজেই অনুমেয়। অথচ অনেকেই উপরোক্ত উপায়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে শেষ জীবনে মক্কা- মদিনায় গিয়ে বার বার হজ্জ-ওমরা করেন, পীর আউলিয়ার মাজারে যান, বেশি বেশি দান খয়রাত করেন, তাওবা ইস্তেগফার পড়েন এই আশায় অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে যে পাপ করেছেন তাহা থেকে মাফ পাওয়ার জন্য। আসলে কী এ পদ্ধতিতে মাফ পাওয়া যায় বা যাবে ? কুরআন ও হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী পাওয়া যাবে না। একমাত্র পথ যার মাল বা যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সে যদি মাফ করে দেয়। আর এই মাফ নিতে হবে দুনিয়া থেকে। কারণ শেষ বিচারের দিন সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। সে দিন পিতা মাতা সন্তানকে, সন্তান পিতা মাতাকে, ভাই বোনকে, বোন ভাইকে, স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে চিনবে না। কেউ কাউকে ক্ষমা করবে না। ক্ষমা করার প্রশ্নই উঠে না। অথচ আমরা এ ব্যাপারে খুবই উদাসীন।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

লিডিং ইউনিভার্সিটির এলইউমুনার উদ‍্যোগে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ

         সমাজে খেটে খাওয়া দিনমজুর জীবিকার...

চুনারঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের পাশে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির লাশ

         হবিগঞ্জের চুনারঘাটে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের...

শাহজালাল জামেয়া কামিল মাদরাসা নাজিরেরগাও’র পুরস্কার বিতরণ

1        1Shareশাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা...

ধর্ষণকান্ডে জড়িতদের গ্রেফতার দাবিতে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের মিছিল

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক সমাজতান্ত্রিক ছাত্র...