সমর থেকে শিক্ষকতায় : একজন জুবায়ের সিদ্দিকী

প্রকাশিত : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে

শামসীর হারুনুর রশীদ: ব্যক্তিসত্তা একসময় সৃজনের স্রোতে লেখকসত্তায় রূপান্তরিত হয়। ব্যক্তির ভেতরদেশ থেকে উৎসারিত আবেগের ঝর্ণাধারা যখন মননের স্পর্শে একটা আদল পায় তখনই লিখনি শক্তি আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রসবিনির মতো শব্দের কলরব ওঠে ভাবের স্ফুরণে। কল্পনার মারফতে ভাবের অসীমতাকে প্রকরণের শরীরে প্রবেশ করিয়ে নির্মাণ করেন শিল্পকলা। তৃষ্ণা দিয়েই সূচনা হয় লেখালেখির। তবে একজন প্রকৃত লেখক তাঁর সমূহ লেখাজোখায় একসময় মহত্ত্ব দান করেন। সত্তরোত্তর একজন জুবায়ের সিদ্দিকীর লেখাজোখায় এমন অমরত্বের ঘ্রাণ মিলে। তার লেখা পরপর তিনটি বই আমাদের চিন্তার খোরাক দিয়েছে।
যুগ-বিবর্তনের সহজাত যন্ত্রণা, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও মানবতার চরম লাঞ্ছনার বিপরীতে এক অনিবার্য প্রতিবাদী কণ্ঠ জুবায়ের সিদ্দিকী ব্রিটিশভারতে জন্মগ্রহণ করেন। অনেক গুণে গুণান্বিত মানুষটির বয়স সত্তরের কোঠায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে কমতি নেই। সে অভিজ্ঞতা অল্প নয়, বিস্তরই বলতে গেলে। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন জুবায়ের সিদ্দিকী। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত হয়ে অবসরে যান। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে ৩২ বছরের সেনাবাহিনী জীবনের ইতি টানেন তিনি। জীবনের বাকি সময়টা বসে না থেকে তিনি শিক্ষা বিস্তারে কাজ শুরু করেন। তিনি এই মহান কাজে এতটাই ব্রতী যে, রাজধানী ঢাকা শহর ছেড়ে চলে এসেছেন নিজের জেলা সিলেটে। বাংলাদেশের অন্যান্য জেলা থেকে শিক্ষায় অনগ্রসর নিজের অঞ্চলের উন্নতি করাই এখন তাঁর লক্ষ্য।
গত ডিসেম্বর ২০১৮, ব্যক্তিগত সফরে নিউইয়র্কে যান জুবায়ের সিদ্দিকী। একপর্যায়ে মুখোমুখি হন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার। সাক্ষাৎকার দেন জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার এবং নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথা বলেন তিনি।
গত ২২ ডিসেম্বর দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় তাঁর এ সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। এ দৈনিকে বলা হয়Ñ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জুবায়ের সিদ্দিকী পাকিস্তানে বন্দী হন। দুই বছর বন্দী জীবন কাটান। এক ছোট কক্ষে ১০/১২ জনকে থাকতে হতো। সেটা কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যা ছিল বন্দিত্ব, চাইলেও কোথায় যাওয়া যেত না। বাবা-মা, আত্মীয়-বন্ধু কারও সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। খুব প্রয়োজন হলে পাকিস্তান থেকে চিঠি লিখতে হতো লন্ডনে, সেখানে রেডক্রসের মাধ্যমে বাংলাদেশে চিঠি পাঠানো হতো। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে মানবেতর বন্দী জীবনের কাহিনি তুলে ধরেন তিনি।’
বন্দী জীবন নিয়ে একটা বই “আমার জীবন আমার যুদ্ধ” লিখেছেন তিনি। বইটি পড়লে যে কেউ জুবায়ের সিদ্দিকীর সৈনিক জীবনের ইতিবৃত্ত জানতে পারবেন। জুবায়ের সিদ্দিকীর সৈনিক জীবনের উজ্জ্বলতম অধ্যায়ের নাম অপারেশন ডেজার্টে অংশগ্রহণ। ১৯৯০ সালে ইরাক অতর্কিত কুয়েত দখল করলে আমেরিকা সেখানে যৌথবাহিনী পাঠায়। বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের কমান্ডার ছিলেন হাসান মশহুদ চৌধুরী, যিনি পরে সেনাপ্রধান হন। জুবায়ের সিদ্দিকী ছিলেন ডেপুটি কমান্ডার। বাংলাদেশ থেকে আড়াই হাজার সৈন্য অংশ নেয় সেখানে। ৯ মাস ডেপুটি কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তখন জোবায়ের সিদ্দিকী ছিলেন কর্নেল পদে। ৩২ বছরের চাকরি জীবনে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন জোবায়ের সিদ্দিকী। চাকরি থেকে অবসরের পরে সিদ্ধান্ত নেন নিজ জেলা সিলেটে গিয়ে থিতু হওয়ার। সিলেটে-৫ জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট আসনে বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য হাফিজ আহমেদ মজুমদার একটি স্কুলের দায়িত্ব নিতে বলেন জুবায়ের সিদ্দিকীকে। সিলেট শহরের একটি আধুনিক মানের স্কুল স্কলার্স হোম-এর দায়িত্ব নেন তিনি। কারণ হিসেবে জুবায়ের সিদ্দিকী বলেন, ‘অবসর নেওয়ার পরে যেহেতু প্রাণশক্তি এখনো যথেষ্ট আছে, তাই ভাবলাম এটাকে কাজে লাগাই। সিলেটের বালুচর এলাকায় এই স্কুলটিতে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। এখানে ইংলিশ ভার্সনে পড়ানো হয়। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কলার্স হোম স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জুবায়ের সিদ্দিকী নিজের উদ্যোগে আরও ছয়টি শাখা খুলেছেন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। স্কুলের ছাত্রদের বেতন বিষয়ে প্রথম আলোর এই সাক্ষাৎকারে জানান- ‘আমরা ছাত্রদের কাছ থেকে মাসে দুই হাজার টাকা বেতন নিই, যেটি মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের মধ্যে। ছাত্রদের বেতনে শিক্ষকদের বেতন ও স্থাপনা বাবদ যে খরচ হয় সেটা মেটানো হয়। স্কুল চালানো আমার কাছে অনেকটা সামাজিক দায়িত্ব পালনের মতোই। কোন লাভের জন্য আমি এ কাজ করি না। স্কুলের ছাত্রসংখ্যা এখন ৫ হাজার। শিক্ষক আছে ৫০০। ২০০৮ সাল থেকে গত দশ বছরে আমাদের স্কুল থেকে এ পর্যন্ত কেউ ফেল করেনি।’
তিন মেয়ের বাবা জুবায়ের সিদ্দিকীর মেয়েরা নিজের যোগ্যতায় বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছে। তাঁর শ্বশুরবাড়ির সব আত্মীয়-স্বজন নিউজার্সিতে থাকে। তাঁর স্ত্রী শুধু বাংলাদেশের সিলেটে থাকে। তাই প্রতি বছর এই দম্পতি আমেরিকায় বেড়াতে যান। চাইলে সেদেশে থাকতে পারতেন কিন্তু শেষতক চূড়ান্ত ঠিকানা কিন্তু এই দোয়েল-নদী, লাল-সবুজ, ভাঁটফুলেরই বাংলাদেশই।
ভবিষ্যতে সিলেটে ‘অটিস্টিক’ শিশুদের উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হবে কিনা প্রথম আলোর এই প্রশ্নের জবাবে জুবায়ের সিদ্দিকীর বলেন, ‘এটা নিয়ে আমাদের সাংসদ হাফিজ আহমেদ মজুমদার আগেই চিন্তা করেছেন। কারণ তাঁর নিজের এক সন্তান অটিস্টিক। কিন্তু সমস্যা হল, এ ধরনের শিশুদের উপযোগী শিক্ষক এখনো বাংলাদেশে খুব বেশি নেই। তাই চাইলেও ‘স্পেশাল’ শিশুদের উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে পারছি না। তবে ভবিষ্যতে করার ইচ্ছা আছে।’একজন সৎ, দম্ভহীন, কোমল হৃদয়ের দেশপ্রেমিক মানুষটিকে যতই দেখি শ্রদ্ধা বাড়ে। সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তির আশেপাশে ছিলেন তিনি। কিন্তু কোনোদিন ক্ষমতার উন্মেষ দেখান নি। তবে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পদে থাকায় মাঝে মাঝে চলনে-বলনে একটু-আধটু রাগ ঝাড়েন, তা আবার তারই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে। নিজের যাপিত জীবনের নানা বিষয়ে লেখালেখি করছেন জুবায়ের সিদ্দিকী। জীবনের বেলাভূমে দাঁড়িয়ে মাটির সন্তান হিসেবে নিজের কাজটি করে যাচ্ছেন খুব যতেœ। ভালো থাকুন শ্রদ্ধেয় স্যার। দেশের জন্য, সমাজের জন্য আপনার পথচলা হোক স্বত:স্ফূর্ত সুন্দরে ভাস্বর।
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন

ফেঞ্চুগঞ্জে পুকুরে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে পুকুরে ডুবে ২...

সিলেটে বাণিজ্য মেলা বন্ধের নির্দেশ দিলো মন্ত্রণালয়

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক :  নির্ধারিত...

নবীগঞ্জে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দু’পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক

নবীগঞ্জ(হবিগঞ্জ)প্রতিনিধি হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার...