সমকালীন সমাজের সন্দর্শন

প্রকাশিত : ১২ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

সালমা খাতুন:
অনেক রকম উদ্ভিদ নিয়ে যেমন বাগান তৈরি হয় তেমনি বিভিন্ন রকম সৃষ্টি-কর্ম নিয়ে তৈরি হয় সাহিত্য। সাহিত্য তাই বর্ণিল – বৈচিত্র্যময় ও বহুধা বৈশিষ্ট্য। আর এর অন্যতম বিশিষ্ট ধারাটি হচ্ছে প্রবন্ধের ধারাটি। কেননা এর মধ্যে রয়েছে সৃজনশীলতা, সৃষ্টিময়তা, স্বকীয়তা সর্বোপরি চিন্তনের চেতনা জাগানোর চিরায়ত প্রয়াস।
আর এমনই চেতন জাগানিয়া প্রবন্ধের বই হচ্ছে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী (অবঃ) রচিত সময়, সংকট ও সম্ভাবনা নামের বইটি। এই বইটিতে যেমনই আছে বাঙালির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের চিন্তন রেখা, তেমনি আছে বাঙালির ভুল-ভ্রান্তি ও বাঙালির চমৎকারিত্বের কথনের কথকতা । মোটা দাগের এ বিভাজন ছাড়াও এই বইটিতে রয়েছে আরও কিছু বিষয়ের অবতারনা। যেমন :
১। অঞ্চল ভিত্তিক লেখা
অঞ্চল ভিত্তিক লেখাগুলির মধ্যে আছে ঃ
‘সিলেটের সংবাদপত্র শিল্প ও আমাদের প্রত্যাশা’
‘সিলেটের নাগরী লিপি ও বাংলা সাহিত্য’ এবং
‘অবহেলিত হাওড় অঞ্চল’ ইত্যাদি।
সংবাদপত্র এমনই এক গণ যোগাযোগের মাধ্যম, যে মাধ্যম গন্ডিবাসী মানুষকে বিশ্ব-সভার সভ্য করে এবং বিশ্বায়নের বৈশ্বিক পথে নিয়ে যায়। এ হিসেবে সংবাদপত্র শুধু সামাজিক বা রাষ্ট্রীক দর্পন নয় বৈশ্বিক দর্পনও বটে । তাই পরিদৃষ্ট হয় যে, যে সমাজ যত পরিশীলিত সে সমাজের সংবাদপত্রের ইতিহাস ততই পরিমার্জিত। এ বিচারে বিচার করলে দেখা যায় যে, সিলেট কেন্দ্রিক সংবাদপত্রগ্ুলো সফলতার সাফল্যে সাফল্যময়। লেখক তাই তার অঞ্চল ভিত্তিক প্রথম লেখাটিতে বেছে নিয়েছেন সংবাদপত্র-বিষয়ক বিষয়টিকে। এই বিষয়টিতে যেমনি আছে সংবাদপত্র বিকাশের ক্রম থেকে ক্রমান্বয়ের ধারা তেমনি আছে সংবাদপত্র শিল্পের কাছে নিভীঁক, নির্ভেজাল, নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের প্রত্যাশা।
আঞ্চলিক ধারার দ্বিতীয় লেখাটিতে ‘সিলেটি নাগরী’ লিপি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ লিপির উদ্ভবের কারণ পলাশীর যুদ্ধ। কেননা এ যুদ্ধের পূর্ব-পর্যন্ত বঙ্গবাসী বা বঙ্গজ জনের রাষ্ট্রীক বা সহিত্যিক ভাষা ছিল ফারসি অথবা উর্দু। কিন্তু ইংরেজের আগমনে এ ভাষাদ্বয়ের দুরবস্থা দৃষ্ট হয়, ফলে বাঙালি বাংলা ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। কিন্তু বাংলা লিপির জটিলতার কারনে অনেকটা বাধ্য হয়েই স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নিজস্ব লিপি এবং সাহিত্য রচনার দিকে মনোনিবেশ করতে হয়, আর এর ফলেই সৃষ্টি হয় ‘সিলেটি নাগরী’৷ তেত্রিশটি বর্ণে বর্ণিল সিলেটি নাগরী লিপি মাত্র ‘আড়াই দিনে’ আয়ত্ব করা যায়। এ প্রবন্ধে এই তথ্য দিয়ে নাগরী-লিপির সহজতা ও সহজবোধ্যতার কথা বলা হয়েছে এবং নাগরী লিপির ব্যাপক প্রচলন ও প্রচারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘অবহেলিত হাওড়াঞ্চল’ প্রবন্ধটিতে এ অঞ্চলের দুরাবস্থার কারণ হিসেবে শিক্ষা-সংকট, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা, চিকিৎসার অপ্রতুলতা, বৃক্ষ-নিধন, বেশুমার কয়লা উত্তোলন প্রভৃতি বিয়েকে দায়ী করা হয়েছে। সে সাথে সতর্ক সংকেত স্বরূপ বলা হয়েছে, আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হলেও সমগ্র খাদ্য-শস্য উৎপাদনের এক চতুর্থাংশ যোগানদার এ সব অঞ্চলের মানুষের সুখ-শান্তি ও প্রগতির ব্যবস্থা করতে হবে।
২। পরিবেশ-বান্ধব লেখা ঃ
পরিবেশ-বান্ধব চেতনা নিয়ে যে তিনটি রচনা রচিত হয়েছে সে তিনটিই রচিত হয়েছে টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে। এ ত্রয়ী রচনায় বাঁধ নির্মানের ফলে যেমন অসুবিধার কথা বলা হয়েছে তেমনি ভূ-পৃষ্ঠ ও ভূ-গর্ভস্থ উভয় স্তরে পানি-সংকটের কথাও ব্যক্ত করা হয়েছে, যা সাধারণ পাঠকের জ্ঞানের পরিধিকে পরিশীলিত করবে, পরিমার্জিত করবে।
৩। মুসলিম-বিশ্ব বিষয়ক লেখাঃ
কিছু কিছু রচনায় মুসলিম ও মুসলিম বিশ্বের প্রতি বিশ্ব-মোড়লদের মোড়লিপনার কথা ফুটে উঠেছে। যেমন:
‘মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিক অস্থিরতা’,
‘ফিলিস্তিন : বিস্মৃতির দ্বারপ্রান্তে’,
‘ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত’,
‘পশ্চিমা পরাশক্তির তোপের মুখে এবার ইরান’,
তবে এ লেখাগুলো কোনভাবেই পক্ষপাত দোষে দুষ্ট নয়, বরং এই লেখাগুলোতে রয়েছে নির্মোহ দৃষ্টির নির্ভেজাল দৃষ্টিপাত।
৪। রাজনৈতিক শিষ্টাচার বিষয়ক রচনা ঃ
‘আমি কারো কুৎসা রটনা করি না।’ পশ্চিম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এ আত্মকথনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ‘পশ্চিম বঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচন’ রচনাটি। এ রচনায় রাজনৈতিক চেতনার গুনগত মান হিসাবে যেমন মমতা বন্দ্যোপধ্যায়কে উপস্থাপন করা হয়েছে; তেমনি আশা করা হয়েছে সকল নেতারা যেন অনুরূপ মানদন্ডের মাপকাঠিতে নিজেদের বিচার করেন।
৫। স্মৃতিচারণ মূলক লেখাঃ
‘আমার হারিয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা’Ñএই শিরোনামে লিখিত রচনাটি স্মৃতিকাতরতায় ভরপুর একটি স্মৃতিময় লেখা। লেখাটিতে যেমন বন্ধুর প্রতি বন্ধুর মমতার বন্ধন লক্ষ্য করা যায়, তেমনি লক্ষ্য করা যায় বন্ধুদের অসময়ে-অবেলায় চলে যাওয়া মর্ম-বেদনার মর্মান্তিক দহন।
৬। রাজনৈতিক রাজ কথনঃ
এসব রচনায় এ কথন অতি কথনে জর্জরিত নয়, বরং এ কথনে আছে সত্য-প্রকাশে দুরন্ত দুঃসাহসী দুর্বিনীত প্রয়াস। উল্লেখিত রচনাগুলো ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সময় বিচারে লেখাগুলো কিছুটা পুরানো অতীত অনুসারী। কিন্তু লেখাগুলোর মর্মার্থ বা মর্মকথা উপলব্ধি করে বলা যায় অতীতে লেখা হলেও লেখাগুলোর প্রসঙ্গ বর্তমান প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক।
মুকুলিত আম গাছ যেমন তার সুবাসিত গন্ধে দশদিক আন্দোলিত করে, ঠিক তেমনি ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকী (অব.) বিরচিত ‘সময়, সংকট ও সম্ভাবনা ’ নামের বইটি আমাদের মনোজগতকে আন্দোলিত করে। পরিশেষে ¯্রষ্টার কাছে সহৃদয় প্রার্থনা স্যারের লেখালেখির কলম যেন অব্যাহত থাকে, অব্যাহত থাকে যেন তাঁর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির ধারা । স্যারের শুভ জন্মদিনে শুভ কামনায়।

সালমা খাতুন:প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, স্কলার্সহোম

আরও পড়ুন



বাংলাদেশ ব্যাংকের এর উপ-মহাব্যবস্থাপক সংবর্ধিত

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ...

সাহিত্যের আসর অপরাহ্নে

এম. আশরাফ আলী: আষাঢ়ের আকাশ।...