ষাটের দশকের লেখক আমেনা আফতাবের কলম আজো সচল

প্রকাশিত : ২৭ আগস্ট, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

তাসলিমা খানম বীথি: ষাটের দশকে প্রায় সব ক’টি জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক আর মাসিক কাগজে নিয়মিত প্রকাশিত হতো বড় বোন রওশন আফতাবের গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ। আমি তখনও স্কুলের গন্ডি ডিঙ্গাইনি। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে পড়তাম বুবুর লেখা। সবকিছু না বুঝলেও গভীর ভাব আর বৈচিত্রে ভরপুর গল্পের সান্নিধ্যে আলোড়িত হতো আমার কিশোর হৃদয়। তখন থেকে আমার মাঝে লেখার বাসনা কাজ করে। পড়ার সময় নষ্ট করে সবার অলক্ষ্যে খাতার পাতা ভরে তুলি গল্প দিয়ে। একদিন আবিষ্কার করে ফেলেন মা। কঠোর শাসন আর হুশিয়ারি। উপদেশ ছিল বাবারও বড় হয়ে যেন লিখি, এখন লেখাপড়ার ক্ষতি হবে। কিন্তু বুকের মাঝে যে ডানা ঝাপটায় অনেক কথার কবুতর, কারো হাতেই তাদের ছেড়ে দেয়া যায় না। অথচ বুকের খাঁচায় বন্দী করেও রাখা যায় না। তাই তাদের মুক্তি দিতেই হলো কালির আঁচড়ে। কথাগুলো বিশিষ্ট লেখক আমেনা আফতাবের।

আমেনা আফতাব মূলত ষাটের দশকে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেছেন। তবে আজো নিরলসভাবে তিনি সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। গল্পের পাশাপশি কবিতা, প্রবন্ধ, ফিচার, স্মৃতিকথা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তাঁর বিচরণ সাবলীল। ফেলে আসা দিনগুলোতে আমেনা আফতাব অনেক বাধার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে রক্ষণশীলতাকে উপেক্ষ করে সামনের পথে অগ্রসর হয়েছেন নিজের প্রতিভার গুনে। সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি এই মেধাবী বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডসহ সেই সময়ের প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেও সুধীমহলে আলোচিত হন। প্রচারবিমুখ কথাশিল্পী আমেনা আফতাবের গল্পে নগর জীবনের জটিলতা, নারীর ঘর সংসার, মনস্তাত্বিক ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব সংঘাত সমুজ্জ্বল চিত্রে উঠে এসেছে।
জীবন এক বহতা নদী। কখনো অনুকূল কখনও প্রতিকূল স্রোতের খেলা এ বহতা নদীতে, এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝে চলতে চলতেই আমেনা আফতাব তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছেন। জীবনের বিভিন্ন সময়ে অর্জিত তার সুখ-দুঃখের অনুভূতি বিভিন্ন গ্রন্থের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর সুন্দর উপস্থাপনা, প্রাঞ্জল ভাষায় রচিত লেখাগুলো পড়ে পাঠক অবশ্যই ভালোলাগার আমেজে অভিভূত হবেন।

আমেনা আফতাবের জন্ম সিলেট শহরের জিন্দবাজারে ১৯৫২ সালের ১২ মার্চ। বাবা আফতাবুর রাজা চৌধুরী, মা আনোয়ারা চৌধুরী। শিক্ষাগত যোগ্যতা: বিএসসি.বিএড (১মশ্রেণী), এমএড (১মশ্রেণী), গ্রন্থাগার বিজ্ঞান সাটির্ফিকেট কোর্স (১ম বিভাগ)। তারা পেশা সাহিত্যচর্চা। ব্যক্তিগত জীবনে আমেনা আফতাব একজন সুগৃহিনী এবং সফল মা। তাঁর স্বামী মরহুম ফারুক আহমেদ। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-গ্রন্থগারিক ছিলেন। তাঁর চার সন্তান তিন পুত্র ও এক কন্যা।
দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক বাংলা, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক জনতার সংবাদ, মাসিক বেগম, ত্রৈমাসিক বনলতা, মাসিক নির্ঝর. ত্রৈমাসিক নন্দিনী ছাড়াও বিভিন্ন আঞ্চলিক পত্রিকা, সাময়িকী, সংগঠনের মুখপত্র, স্যুভেনির ইত্যাদিতে এ পর্যšত বহু গল্প কবিতা প্রবন্ধ নিবন্ধ ছড়া প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থ, সংকলিত গ্রন্থ ৫৬টি, একক গ্রন্থ ১২টি। সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে উত্তর বাংলা সংস্কৃতি পরিষদ, বেসরকারীভাবে একুশে পদক এবং সিলেটের রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশন বেসরকারীভাবে একুশে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও সিলেট লেখিকা সংঘ, গীতিকার ক্লাব, ঢাকা বনলতা সাহিত্য পরিষদ, সাংবাদিক মাসুদ স্মৃতি সাহিত্য পরিষদ, উত্তরণ সাহিত্য সভা (পাবনা), কবিতা সংসদ (পাবনা), তরুণ লেখক পরিষদ, রাজশাহী প্রত্যাশা, লেখক পরিষদ রাজশাহী, ড.আব্দুল মান্নান ক্রেস্ট প্রভৃতি পদক ও সম্মাননা প্রদান করেছে।

তিনি বাংলা একাডেমীর সদস্য, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ সিলেট, রাজশাহী সাহিত্য পরিষদ, মুক্তমালা সাহিত্য পরিষদ, বনলতা সাহিত্য পরিষদ, সিলেট লেখিকা সংঘসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জীবন সদস্য ও উপদেষ্ঠা। স্বামীর কর্মস্থল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দীর্ঘ ৩৪ বছর অতিবাহিত করলেও বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছেন।

সিলেটের প্রথম অনলাইন দৈনিক সিলেট এক্সপ্রেস ডট কম-এর পক্ষ থেকে আমেনা আফতাব’র একটি সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হয়। ২৭ মার্চ ২০১৪ আজকের সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারস্থ তার নিজের বাসায় সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেন সিলেট এক্সপ্রেস-এর স্টাফ রিপোর্টার তাসলিমা খানম বীথি। এসময় আলোকচিত্রীর দায়িত্ব পালন করেন সিলেট এক্সপ্রেস-এর স্টাফ রিপোর্টার, সংস্কৃতিকর্র্মী তোফায়েল আহমদ।

বিকেল ছিলো সাক্ষাতকার নেবার সময়। আমেনা আপা বললেন চলে এসো জিন্দাবাজারের জলসিড়ি রেস্টুরেন্টে। আমরা জলসিড়িতে আপার সাথে কাবাব,তন্দুরী আর কফি খাই। আপা চুলে মেহেদী দিয়েছেন। এখনো তার মাঝে এক ধরনের সজীবতা, প্রাণচাঞ্চল্য। কথা বলতে বলতে আপা আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন। বললেন জানো এই যে জলসিড়ি,আজ থেকে পঞ্চাশ ষাট বছর আগে এখানে কিছুই ছিলো না। এটা আমাদের বাসার পাশে। শৈশবে আমরা এই জলসিড়িতে এসে খেলতাম।
জলসিড়িতে আপার সাথে এক ধরনের আড্ডা জমে উঠে। কতো কথা । সিলেট শহরে তার তারুণ্যের দিনগুলোর কথা। তাদের বাসা ছিলো সিলেটের সাহিত্য সংস্কৃতি কর্মীদের এক মিলন মেলা। কবি দিলওয়ারসহ সিলেটের প্রায় সকল লেখকই তাদের জিন্দাবাজারের বাসায় আসতেন। আড্ডার ফাঁকে আমেনা আফতাব বলেন, সিলেটের আজকের তরুণ লেখক কবিরা অনেক এগিয়ে গেছে। মেধাবী তরুণ তরুণীরা খুব ভালো লেখছে। এক সময় নারী লেখিকাদের সংখ্যা খুব কম ছিল সিলেটে। আর এখন সিলেটে আসলে দেখি সিলেটের তরুণ তরুণীরা লেখালেখিতে অনেক এগিয়ে গেছে। আমার খুব ভালো লাগে। নিজেকে খুব গর্বিত মনে হয়। আমার জন্মভূমি সিলেট অনেক এগিয়ে আছে।

বীথি: কবে থেকে লেখালেখি শুরু করেছেন? আপনার প্রথম লেখা কি ছিলো এবং কত সালে।
আমেনা আফতাব: ১৯৬৬ সাল থেকে আমার লেখালেখি শুরু। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে তখন অবসর সময় পার করছিলাম। অবসরকে কাজে লাগাতেই লেখালখি শুরু করি। আজো লিখে যাচ্ছি। আমি গল্প দিয়ে শুরু করেছি। সবার নাকি কবিতা দিয়ে শুরু হয়। কিন্তু আমার বেলা ব্যতিক্রম হল। আমার প্রথম লেখা দৈনিক সংবাদ পত্রিকা বের হয়। ১৯৬৬ সালে আমার প্রথম গল্প ‘স্মৃতি’ প্রকাশিত হলো দৈনিক সংবাদে। দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক তখন রনেশ দাশ গুপ্ত তার হাত দিয়েই আমার লেখা প্রকাশিত হয়। অনেকেই নতুন প্রজন্মেরা তাকে চিনতে পারবে না।

বীথি: লেখালেখিতে কে বেশি উৎসাহ দিয়েছেন?

আমেনা আফতাব: আমাদের পরিবারে আমার বড় বোন রওশন আফতাব লেখালেখি করতেন। তার লেখা পড়ে আমি খুব উৎসাহ পেতাম। মূলত বড়বোনের লেখা পড়ে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। আর লেখালেখিতে আমাকে বিশেষ করে উৎসাহ দিতেন গণমানুষের কবি দিলওয়ার এবং শেকড় সন্ধানী গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল। তাদের উৎসাহ খুব বেশি পেয়েছি। গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তিনি আমাকে এত স্নেহ করতেন যে তুই করে ডাকতেন তিনি বলতেন, দেখিস একদিন তুই অনেক বড় হবি।

বীথি: নতুন কোন বই বের করার পরিকল্পনা আছে কী?
আমেনা আফতাব: অবশ্যই নতুন বই বের করার পরিকল্পনা আছে। আমি যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন লিখে যাবো। আরো বেশি লিখে যেতে চাই। সামনে যে বইটি বের হবে, বইটির শিরোনাম হচ্ছে-‘তিন কিশোরের যুদ্ধে যাওয়া’।

বীথি: আপনার শৈশব কৈশোর কোথায় কেটেছে? শৈশোবের দূরন্তপনার কথা মনে পড়ে কী?
আমেনা আফতাব: সিলেট শহরের জিন্দাবাজারেই আমার শৈশব কৈশোর কেটেছে। অনেক অনেক মজার স্মৃতি আছে। সবকিছু এখন বলতে পারব না। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে এসব স্মৃতি থাকে। এই যে ৬২ বছরে পা রেখেছি, আমার ইচ্ছে করছে আবার যদি সেই সময়ে ফিরে যেতে পারতাম। বড্ড ইচ্ছে করে ফেলে আসা শৈশব কৈশোর ফিরে যেতে।

বীথি: কার বই বেশি পড়েন?

আমেনা আফতাব: আমি সবার বই পড়ি। যখন যে সময় হাতের কাছে যার বই পাই, তা-ই পড়ি। তবে একসময় আশাপূর্না দেবী, শরৎচন্দ্র, বিমল মিত্র তাদের বই বেশি পড়া হত। এখন তো যুগ পাল্টাচ্ছে অনেক লেখকের বই বের হচ্ছে। নতুন লেখকদের বইও আমি পড়ি। সুভোদ ঘোষ এর বই এতবেশি মনে নাড়া দিত যে তখন আরো বেশি উৎসাহ চলে আসতো লিখতে। আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্বপশ্চিম’ বইটি। বার বার ঘুরে ঘুরে আসে মনের ভেতর। অনেক লেখকই প্রিয়। নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না।

বীথি: কবিতা বলতে কী বোঝেন ?

আমেনা আফতাব: শেলী বলে গেছেন, পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর যা কিছু মহৎ কবিতা তাকে চিরঞ্জীব করে রাখে। উইলিয়াম কনজার্ভ এর মতে- কবিতা সমস্ত শিল্পকলার জৈষ্ঠ ভগিনী এবং সব ভাবধারার জন্মদাত্রী। আর রবীন্দ্রনাথের লেখায় আছেÑকবিতা শুনিয়া কেহ যখন বলে ‘বুঝিলাম না ’ তখন ভীষণ মুশকিলে পড়িতে হয়। কেহ যখন ফুলের গন্ধ শুকিয়া বলে ‘কিছু বুঝিলাম না’ তাহাকে এই কথা বলিতে হয়, ইহাতে কিছু বুঝিবার নাই। এ যে কেবল গন্ধ, এরপর আর কি দেব কবিতার সংজ্ঞা ? আমার মন বলে মানুষের অনুভূতি প্রকাশের এরচেয়ে সুন্দর মাধ্যম আর নেই। ওয়ার্ডসওয়ার্থ যাকে বলেছেন, একটি শক্তিশালী অনুভূতির স্বত:স্কৃর্ত বহি:প্রকাশ।

বীথি: আপনার কবিতার মধ্যে প্রেম কতটুকু আছে?
আমেনা আফতাব: আমার কবিতার মধ্যে প্রেম অবশ্যই আছে। প্রেম ছাড়া কোন কবিই কবিতা লেখতে পারে না। প্রেম, প্রকৃতি এবং সুন্দর এসব অন্বেষনে আমি ঘুরি আর লেখি।

বীথি: কবিতার মধ্যে প্রেম কতটা জরুরী?
আমেনা আফতাব: কবিতার মধ্যে প্রেম অবশ্যই জরুরী। এবারের বইমেলায় আমি দেখেছি প্রেমের কবিতার বই বিক্রি হয়েছে বেশি। প্রেমই কবিতাকে ঐশ্বর্যময় করে তোলে, আমার তাই মনে হয়।

বীথি: আজকের অবস্থান থেকে পেছন পানে চাইলে কী কথা মনে পড়ে?
আমেনা আফতাব: আজকের অবস্থানে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয় আজ এই পর্যন্ত আসলাম কীভাবে। আমার লেখক জীবনে অনেক বাধা এসেছিলো। এসবের সাথে যুদ্ধ করে বাঁধা ডিঙ্গিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছি। বিশেষ করে বিয়ের পর আমাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। এজন্যে কবি দিলওয়ার আমাকে বলেছিলেন-আমি সিলেটের বেগম রোকেয়া। কারণ লেখালেখিতে আমার পরিবারের তেমন কোন মত ছিলো না। পরিবার থেকে লেখালেখির জন্য অনেক শাসন করত। বিশেষ করে আমার মা খুব বেশি শাসন করতেন। সেই জন্য মায়ের ভয়ে আমি বিভিন্ন ছদ্ম নামে লেখতাম।

বীথি: কী কী ছদ্মনামে লিখতেন?
আমেনা আফতাব: আমি বিভিন্ন ছদ্মনামে লেখতাম। যেমন-রুমেলা, অলকা, ঝরাফুল, মিরা চৌধুরী ও বনলতা সেন। মায়ের ভয়ে এসব নামে লেখতাম। এখন বুঝতে পারি মা কেন এত শাসন করতেন।

বীথি: একজন ভালো লেখক হতে হলো কী কী গুণ থাকতে হবে?
আমেনা আফতাব: সাধনা করতে হবে, সাধনা থাকতে হবে। ভালো লেখক হতে হলে অবশ্যই বই পড়তে হবে। ধৈর্য থাকতে হবে। যন্ত করে লেখতে হবে। মনোযোগ থাকতে হবে। পাঠকের কথা ভাবতে হবে।

বীথি: আপনার লেখার মধ্যে কোন লেখাটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয় বা উৎসাহ দেয়।
আমেনা আফতাব: আমি ১৯৬৬ সাল থেকে লেখছি। এ দীর্ঘ সময়ে আমার লেখার ভান্ডার সমৃদ্ধ। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণ, শিশুতোষ ছড়া, স্মারকরচনা, গ্রন্থ আলোচনা সব মিলিয়ে আমার প্রকাশিত লেখার সংখ্যা হাজারের উপরে। এক সময় সিলেট ও রাজশাহী বেতারে আমি জীবন্তিকাও লিখতাম। এই বিশাল ভান্ডার থেকে কোন একটিকে বাছাই করতে পারি না আমার আনন্দের খোরাক বলে। আর আমার তো নিয়তই মনে হয়, এখন পযর্ন্ত আমি ভাল কিছু লিখতে পারিনি। এছাড়া সময় ও মনের ব্যাপার আছে। সময়ে মানুষের মন পাল্টায়, লেখার ধরণও পাল্টায়। আজ নিজের যে লেখাটাকে সুখ বলে জড়িয়ে ধরি, কাল তাতে সে আবেদন থাকে না। নতুন একটি লিখা সে জায়গা দখল করে। তবে এটাও ঠিক একজন লেখকের সব লেখাই তার কাছে ভালোবাসা। তাকে নতুন লেখার প্রেরণা যোগায়।

বীথি: পাঠকের ভালোবাসা বা সমালোচনা আপনাকে কতটা উৎসাহিত বা বিমর্ষ করে ?
আমেনা আফতাব: লেখক জীবনের প্রথম অধ্যায়ে আমার একজন গুণমুগ্ধ পাঠক ছিল। একটা নিবিড় স্নেহের বন্ধনে যে আমাকে বেঁধে ফেলেছিল। সে আমাকে প্রায়ই উপদেশ দিত উপন্যাস লেখার জন্য। আমি হাসতাম আর বলতাম ‘উপন্যাস লেখলে কে তা বই আকারে বের করবে’। আর সেই মানুষটি তখন নিশ্চিত আশ্বাস দিতো-সে দায়িত্ব আমার। তুমি লেখেই দেখ না। কত যুগ চলে গেছে তার সাথে আমার দেখা নেই। জীবনের দূর্লব মূহুর্তে মানুষ এমন কত প্রতিশ্র“তি দিতে পারে। কিন্তু তার মূল্য রাখে ক’জন। তার জন্যে আমার কোন আফসোস নেই। পাঠকের ভালোবাসাই লেখকের বড় পাওয়া। কাজেই ভালোবাসাতো উৎসাহীত করবেই। কিন্তু সমালোচনায়ও নিরুৎসাহিত হওয়ার কারণ নেই। পাঠকের নিরপেক্ষ দিক নির্দেশনা মূলক সমালোচনা লেখককে নতুন দিক দেখাতে পারে। আমি বলব পাঠকের সমালোচনা আমাকে সমৃদ্ধ করেছে, বিষর্ম নয়।

বীথি:এ পর্যন্ত আপনার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা কয়টি এবং কী কী বই বেরিয়েছে?
আমেনা আফতাব: আমার এই পর্যন্ত ১৭টি বই বেরিয়েছে। যৌথভাবে ৬৮টি আর একক ১৭টি বই বেরিয়েছে। আমি কবি, ছড়াকার, কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক। কাজেই আমার লেখা বহুমাত্রিক। স্মারকরচনা, গ্রন্থ আলোচনা এবং জীবন্তিকাও লিখেছি। আর এখন বের হবার পথে আছে তিনটি বই।
আমার প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হচ্ছেÑÑ১.রুমাল: পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ১৬টি গল্প নিয়ে ১৯৯৯ সালে প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। রুমাল ঢাকার সাম্রাজ্ঞী প্রকাশনী বের করে। রুমাল এর গল্পগুলো নারীবাদের প্রবক্তা-পাঠকের অভিমত। ২.সময়ের গল্প: ১৯৮২ থেকে ৯২ সাল, এই সময়ের মাঝে লেখা এবং দৈনিক বাংলা, দৈনিক সংবাদসহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত মোট ২৭টি গল্পের সমাহার। এ সময়ে জীবন বোধ, মনমানসিকতা সুখ দুঃখের অনুভূতি। চারপাশের মানুষের আশা নিরাশায় দ্বন্দ্ব সংঘাত গল্পগুলোর বিষয় বস্তু। এ বইয়ের ‘আগামী মাসের স্বপ্ন’ গল্পটি নন্দিনী পুরস্কার পায়। রূপম প্রকাশনী ২০০৫। ৩.বৃত্ত: ১৮টি ভালোবাসার গল্প, সবকটি পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৬। ৪.স্বপ্ন এবং কয়েকটি মুহূর্ত: পত্রিকায় প্রকাশিত ১৮টি গল্পের সমাহার। ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা, ২০০৮। ৫.জ্যোতির্ময় সময় ও ক্ষয়িত মাংসপিন্ড: দৈনিক জনকন্ঠ, দৈনিক ইনকিলাব ও বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রকাশিত ২২টি জীবনমুখী গল্প, নারী নির্যাতন, যৌতুক প্রথা এবং শ্রমজীবি ও ছিন্নমূল নারীদের জীবনের গল্প। ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ , ঢাকা, ২০১০। ৬.ডোরাকাটা লাল শাড়ি: গল্প সংখ্যা ১৩, মহিয়সী প্রকাশ, ২০১৩, পরিবেশক-বনলতা। ৭.কাল, তুমি নিষ্ঠুর: মুক্তিযুদ্ধ নিঃস্ব করেছিল এমন একজন মাকে নিয়ে রচিত উপন্যাস। ইত্যাদি-গ্রন্থ প্রকাশ। ২০০৯ (মাসিক কোলাচোখে-ধারাবাহিক প্রকাশিত)। ৮.যোজন যোজন দূরে: সমাজ সংসার প্রেম-ভালোবাসা সব নিয়ে বিয়োগঘান্তক ধারাবাহিক এক উপন্যাস। বনলতা প্রকাশন,২০১৪। ৯.সুখে-দুঃখে রবীন্দ্রনাথ: পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত রবীন্দ্রকাব্যের উপর লেখা ১৬টি প্রবন্ধ নিয়ে গ্রন্থ। বনলতা প্রকাশন, ২০১৩। ১০.কৈশোরে বেড়ে ওঠার কান্না ভেজা স্মৃতি: মোট ২২টি স্মৃতি চারণ মূলক রচনা, সবগুলো পত্রিকায় প্রকাশিত, বনলতা প্রকশনী ২০১২। ১১.যা দেবে নেব: কাব্যগ্রন্থ, ইত্যাদি, ২০১০। ১২.যে যায় সব নিয়ে যায়: কাব্যগ্রন্থ, বনলতা প্রকাশন, ২০১২। ১৩.বসন্ত দেখার আমন্ত্রণ: কাব্যগ্রন্থ কথা প্রকাশ ২০১১। ১৪.হৃদয়ের কথা কবিতা হয়ে ঝরে: অনুকাব্য, সম্রাজ্ঞী প্রকাশন ২০১৩। ১৫.ক্ষমা কর প্রিয় বন্ধু: অনুকাব্য, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০০৪। ১৬.এক ঝুড়ি ছড়া: শিশুতোষ, বনলতা প্রকাশন ২০০৮। ১৭.এক যে বুড়ি: শিশুতোষ ছড়া, চয়ন প্রকাশন, ২০১১।

বীথি:লেখালেখির জন্য আপনি কখনও পুরস্কৃত হয়েছেন কী ?
আমেনা আফতাব: আমার পুরস্কার পাওয়া শুরু স্কুল থেকেই। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়েও আমি বরাবর রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হয়েছি। জেলা এবং জাতীয় পর্যায়েও পুরস্কার পেয়েছি। তার কিছু কিছু মনে পড়ে। যেমন: বিশ্বরাজনীতি ও ছাত্রসমাজ রচনা লিখে আমি প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলাম। সিলেট চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন শাখা আয়োজন করেছিলো সে প্রতিযোগিতা। গল্প প্রতিযোগিতায় হাজার তমালিন ভিড়ে-গল্পের জন্যে ১ম পুরষ্কার পাই, সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়ন আয়োজন করেছিলো সে প্রতিযোগিতার। ‘বন্যা সমস্যা ও সমাধানের উপায়’Ñ পূর্ব পাকি¯তান ছাত্র ইউনিয়ন আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় ২য় পুরস্কার পাই। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হল ময়দানে কবি বেগম সুফিয়া কামালের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করার ডাক এসেছিল। ‘জাতীয় উন্নয়ন স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে’ শীর্ষক রচনা প্রতিযোগিতায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ একাডেমী রাজশাহী থেকে ১ম পুরস্কার পাই। ‘ইসলামের দৃষ্টিতে কর্ম ও ভাগ্য’ শীর্ষক রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পাই, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সস্টিটিউট, রাজশাহী থেকে। ‘আগামী মাসের স্বপ্ন’ গল্পের জন্যে নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্র পুরস্কার পাই। ‘হে তরুণ’ কবিতায় প্রত্যাশা, সাহিত্য সংগঠন পুরস্কার, রাজশাহী। ‘একখানি পা’ মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গল্পের জন্যে বনলতা সাহিত্য সংগঠন থেকে পুরস্কৃত। এমন অনেক পুরস্কার অর্জনের গৌরব আমার।

বীথি: আপনার সাহিত্য কর্মের মূল্যায়ণ কী ভাবে হয়েছে ?
আমেনা আফতাব: আমার সাহিত্য কর্মের মূল্যায়ণ স্বরুপ বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠন। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন আমাকে পদক ও সম্মাননা প্রদান করেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১.বেসরকারীভাবে একুশে পদক ও সংবর্ধনা (সাহিত্য), উত্তর বাঙলা সংস্কৃতি পরিষদ, কেন্দ্রীয় কার্যালয়, পাবনা ২০০১। ২.ছোট গল্পে সম্মাননা পদক, তরুণ লেখক পরিষদ বরেন্দ্র, রাজশাহী, ২০০০। ৩.সাহিত্যে পদক ও সংবর্ধনা, প্রত্যাশা লেখক পরিষদ, রাজশাহী, ২০০৩। ৪.বনলতা পত্রিকার যুগপূর্তিতে বনলতা সাহিত্য পদক ও সংবর্ধনা, ২০০৪, ঢাকা। ৫.বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ড. আবদুল মান্নান পদক (রাজশাহী সাহিত্য পরিষদের সৌজন্য), ২০০৪। ৬.সমগ্র সাহিত্য অবদানের জন্য পদক ও সম্মননা, কবিতা সংসদ, পাবনা, ২০০৬। ৭.সিলেট লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক, ২০০৮। ৮.পুন্ড্রবর্ধন সাহিত্য কল্যাণ পরিষদ পদক ও সম্মননা, ২০০৯। ৯.সাংবাদিক মাসুম স্মৃতি সাহিত্য পদক ও সম্মাননা (সার্বিক সাহিত্য, নাটোর বার্তার সৌজন্যে, নাটোর ২০১০। ১০.সিলেটের রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশন কর্তৃক একুশে সম্মাননা চেক, ক্রেস্ট ও সম্মাননা পত্র, ২০১০। ১১.গীতিকার ক্লাব সম্মাননা পদক (কবিতায়), ঢাকা ২০১০। ১২.অধ্যাপক আবু তালিব স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, উত্তরণ সাহিত্য সভা পাবনা ২০১১। ১৩.সুরমা রোটারী ক্লাব পদক ও সম্মাননা (সাহিত্যে) সিলেট ২০১২। ১৪.কবিতায় সম্মাননা (কবি সমুদ্রগুপ্ত পদক) সিরাজগঞ্জ, কবিতা ক্লাব, পাবনা ২০১৩। ১৫.তৃণমূল লেখক সংগঠন পদক, ২০১৩ (উত্তরবঙ্গ)ইত্যাদি।

বীথি: লেখালেখি এবং সাংগঠনিক ক্ষেত্রে কারো সহযোগিতার কথা মনে পড়ে কী ?
আমেনা আফতাব: আমি আজ যে পর্যায়ে এসেছি সেটা আমার নিজের অর্জন। আমার আত্মবিশ্বাস আর লেখালেখির প্রতি ভালোবাসাই আমাকে এক্ষেত্রে স্থায়ীত্ব দিয়েছে। কাজেই আমার লেখালেখি কিংবা সাংগঠনিক ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য কারো সহযোগীতার কথা না বলে উৎসাহ প্রেরণার কথা বলতে পারি। এবং সে সংখ্যাটি নগন্য নয় , বিশাল এক তালিকা। যেখানে সর্বাগ্রে আসে পাঠকের ভালোবাসার কথা।

বীথি: আপনার জীবনে সবচেয়ে মধুর মুহূর্ত কী ছিল ?
আমেনা আফতাব: র্দীঘ দিন পর প্রিয় বন্ধুর সান্নিধ্য লাভ।

বীথি: আপনার জীবনের অনাকাঙ্খিত মুহূর্ত কোনটি ? যে মুহূর্তটি আপনাকে কষ্ট দেয় ?
আমেনা আফতাব: জীবনের অনেক অনাকাঙ্খিত মুহূর্তই চোখের জলে ধুয়ে গেছে। কিন্তু কখনও যা মন থেকে মুছে যাবে না…..সেটা ২০০৪ সালে ৩০ শে অক্টোবর ……সেই অনাকাঙ্খিত মুহূর্তটি ছিল আমার জীবন সাথির মৃত্যু কোলে ঢলে পড়া। আমার কোলের উপর মাথা রেখে চোখ বুজলেন আমার জীবন পথের সাথী। মসজিদ থেকে আসরের আজানের ধ্বনি আসছে, আমার চোখের জলে ভিজে গেল তাঁর নিথর দেহ। জীবনের এ অনাকাঙ্খিত মুহূতটি খুবই কষ্টের, যা আমাকে সবসময় কষ্ট দেয়।

বীথি: আপনার কখন মন খারাপ হয় ? মন খারাপ হলে কী করেন ?
আমেনা আফতাব: কেউ যখন দুর্ব্যবহার করে। আমাকে ভুল বুঝে। তুচ্ছ ব্যাপারেও স্বার্থপরতা দেখায়। এ ছাড়া মানুষের সংকীর্ণ মনোবৃত্তির পরিচয়। ঈর্ষাকাতরতা এসব দেখলে মন খারাপ হয়। এ থেকে মুক্তির জন্য বইয়ের পাতায় মনোযোগ বসাতে চেষ্টা করি। নিজের লেখালেখিকে আকড়ে ধরেও শান্তি পাই। মনের মতো কিছু লিখতে পারলে। আমার মন ভাল হয়ে যায়।

বীথি: আপনার সাংগঠনিক জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন?
আমেনা আফতাব: বর্তমানে আমি বিভিন্ন সংগঠনের সাথে আছি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-১.সদস্য বাংলা একাডেমী, ঢাকা। ২.উপদেষ্টা, প্রত্যাশা লেখক পরিষদ, রাজশাহী। ৩.উপদেষ্টা, সিলেট লেখিকা সংঘ। ৪.জীবন সদস্য, বনলতা সাহিত্য পরিষদ, ঢাকা। ৫.সদস্য, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, ঢাকা। ৬.জীবন সদস্য, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট। ৭.জীবন সদস্য, রাজশাহী সাহিত্য পরিষদ। ৮.জীবন সদস্য, উত্তর বাঙলা সংস্কৃতি পরিষদ, কবিতা সংসদ, পাবনা, উত্তরণ সাহিত্য সভা, পাবনা….ইত্যাদি। এছাড়া মাসিক সাগরদি-ঢাকা, মাসিক নির্ঝর-রাজশাহী এসব কাগজের সাথে আমি সম্পৃক্ত।

বীথি:আপনার লেখক জীবনে এ পর্যন্ত বড় প্রাপ্তি কী ?
আমেনা আফতাব: পাঠকের ভালবাসা আমার বড় প্রাপ্তি। আমার একটি লেখা যে পড়েছে (গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণ যা-ই হোক না কেন) সেই আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। সম্প্রতি রাজশাহীর সাহিত্য অঙ্গনে ‘আলোকিত নারী’ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে পঞ্চাশ জন নারী লেখকের মাঝে আমার জীবন ও সাহিত্য কর্ম স্থান করে নিয়েছে। যদিও আমি সিলেটের তনয়া। রাজশাহীতে র্দীঘ ৩৪ বৎসর অবস্থানকালে এটা আমার সাহিত্য কর্মের অর্জন। এ এক বড় পাওয়া। আমার নিজ শহর সিলেটে। অনেক জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিত্বের কাছে সমাদৃত হয়েছি। তাদের মুখে যখন শুনি …….লেখককে কেউ চেনাতে হয় না। তার কলমই চিনিয়ে দেয় তাকে। মনটা তখন ভরে উঠে। মনে হয় কিছুটা হলেও আমি সার্থক। আর তরুণ লেখকরা যখন আমার প্রশংসা করে, একবার দেখা করার জন্য ছুটে আসে তখন ভাবি….এত ভালবাসা রাখব কোথায়? পাঠকের আকাল চলছে….এ কথাটি আমি মেনে নিতে পারি না। উত্তর বঙ্গের পত্র পত্রিকায় আমার লেখা পুনঃমুদ্রিত হয়। প্রায়ই আমি পাঠকের ফোন পাই। লেখা পড়ে তারা আমার দীর্ঘায়ু কামনা করেন। বিশিষ্ট লেখক-গবেষক প্রফেসর নন্দলাল শর্মা ‘তোমার সৃষ্টি পথ’ গ্রন্থে আমার জীবন ও কর্ম তুলে ধরেছেন। এটাও তো আমার এক বড় প্রাপ্তি।

বীথি: আপনার কয় ভাইবোন ? ভাইবোনদের মধ্য আপনি কততম ?
আমেনা আফতাব: আমরা সাত বোন তিন ভাই ছিলাম। বর্তমানে আছি পাঁচ বোন, দুই ভাই। ভাই বোনদের মধ্যে আমি তৃতীয়।

বীথি: লেখক জীবনে আপনার স্বামীর কোন অবদান আছে কী ?
আমেনা আফতাব: প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষভাবে তো অবশ্যই আছে। বিয়ের পর আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চত্বরের বাসিন্দা হলাম। সে এক বিশাল জগৎ। জ্ঞানী গুণী মানুষের সাথে ওঠা বসা। তাদের সংস্পর্শে এসে অনেক জানার দেখার ছিল আমার। নিজেকে স্মার্ট সুন্দর সামাজিক করে তৈরী করার বিশাল সুযোগ আমি পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের বই আমি হাতে পেয়েছি। এসব আমার লেখালেখিকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। বিয়ের পরই আমি পড়াশুনার ক্ষেত্রে তিন বার প্রথম শ্রেণী অর্জন করি, এর আগে নয়। দৈনিক ইনকিলাবে আমার ধর্ম বিষয়ক বেশ কিছু রচনা বেরিয়েছিল। এসব বিষয় বই আমার স্বামী এনে দেন। কাজেই তাঁর অবদানকে আমি অস্বীকার করতে পারি না। স্বামীর সামাজিক অবস্থান আমার চলার পথকে সুগম করেছে।

বীথি: আপনার ছেলে মেয়ে কয়জন ? তারা কে কি করেন ?
আমেনা আফতাব: আমার তিন ছেলে এক মেয়ে। আমার বড় ছেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং বিষয়ে এমবিএ করে লেকচার পাবলিকেশনস এ ব্যবস্থাপক (ডিসট্রিবিউসন)ঢাকা। মেজো ছেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশুনা শেষ করে ব্যবসায় নিয়োজিত। ছোট ছেলে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনীয়ারিং বিষয়ে পড়া কমপ্লিট করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সে আইএফআইসি ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার। আর মেয়ে তাহমিনা আহমদ শম্পা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃ-বিজ্ঞানে এম,এস,এস করেছে। তার স্বামী ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করে।

বীথি: অবসরে আপনি কী করেন?
আমেনা আফতাব: এক সময়ে অবসরে খুব বাগান করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের চব্বিশ শ স্কয়ার ফিটের বাড়িতে থাকতাম, আমার লম্বা বারান্দায় শ খানেক টব ছিল। গ্রীল বেয়ে উঠেছিল ঘৃত কাঞ্চন, অপরাজিতা, মাধবীলতা। আমার নাইট কুইন এক রাতে ২৫/৩০টি করে ফুল ফুটতো। হালকা মিষ্টি গন্ধ। প্রতিবেশিরা দেখতে আসতো। কেউ কেউ শান্তি নিকেতন বলতো আমার বারান্দায় দাড়িয়ে। কেউ বিশ্বাস করবে কীনা এখন। একসময় আমি কিন্তু সেলাইও করতে পারতাম। আমাকে সিঙ্গার-এর জিগজার মেশিন কিনে দিয়েছিল। ভাল রাধুনীর সার্টিফিকেটও পেয়েছি অনেক। আমরা দুজন খুব সামাজিক ছিলাম (লেখালেখি বাদ দিলে)। প্রায়ই বাসায় ছোটখাট পার্টি হত। বন্ধুবান্ধবরা মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে ছুটে যেত। সময়কে খুব সুন্দরভাবে কাটিয়েছি। জীবনের সেসব দিন তো আর নেই। সে সঙ্গীও নেই। ঢাকায় আছি ছোট্ট ফ্ল্যাটে। এক চিলতে বারান্দা। অবসরে এখন বই হাতে নিই কিংবা লিখতে বসি। কখনও পুরাতন বন্ধুদের খোঁজ নিতে ফোন করি। বই আর পত্রিকা অবসর সময়ের বড় সঙ্গী এখন।

বীথি: জীবনে কী হতে চেয়েছিলেন?
আমেনা আফতাব: আমি লেখক হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বাবার স্বপ্ন ছিল আমি যেন তার মতো শিক্ষক হই। আমি চেয়েছিলাম একজন ভালো লেখক হতে। কতটুকু ভালো লেখক হতে পেরেছি জানি না।
বীথি: একজন নারী হিসেবে এবং লেখক হিসেবে আপনার অনুভব কেমন?
আমেনা আফতাব: নারী হিসেবে নিজেকে সার্থক মনে করি আর লেখক হিসেবে কতটা সার্থক তা আমার পাঠকদের কাছে ছেড়ে দিলাম।

বীথি: দেশের উন্নয়নে লেখকরা কী ভূমিকা পালন করতে পারে?
আমেনা আফতাব:-লেখকরাই দেশ গড়ার কারিগর। লেখকরা সমাজকে, দেশকে উন্নতি ও অগ্রগতির পথ দেখাতে পারে। লেখকের কলম দিয়ে মানুষকে আশার বাণী শুনাতে পারে। লেখকরা সামনে চলার পথে প্রেরণা হতে পারে। লেখকরা সমাজের কাছে দায়বদ্ধ। নতুন প্রজন্মের জন্য লেখকরা দায়বদ্ধ থেকে লিখতে হয়। লেখকরা কেন দায়বদ্ধ, তার কারন হল সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজের দর্পণ। এজন্যেই দেশ ও জাতির দিক নির্দেশক হল তারাই।

বীথি: মুক্তিযুদ্ধের কোনো বিশেষ স্মৃতি আছে কী?
আমেনা আফতাব: মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি মুরারী চাঁদ কলেজে ¯œাতক বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। তখন ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলাম। আমাদের জিন্দাবাজারের বাসায় প্রায় অবরুদ্ধ দিন কাটাচ্ছিলাম। একদিন একটা চিরকুট হাতে একজন লোক এসে আমার খোঁজ করল। চিরকুটে সময় এবং স্থান উল্লেখ করে আমাকে যেতে বলা হয়েছে। চিরকুটে লেখা ছিলÑআমার নাম ব্ল্যাক লিস্টে আছে। না গেলে বিপদ হবে। যিনি চিরকুট পাঠিয়েছিলেন তিনি আমার পূর্ব পরিচিত। মনে হয়েছিল আমার ভালোর জন্যই ডেকেছেন আমাকে, মা বাবাকে না জানিয়ে আমি ছুটে গেলাম। বাসা থেকে বের হবার আগে আমার ছোট বোনকে বলে যাই। সেদিন সেখানে শান্তি কমিটির মিটিং চলছিল। পৌঁছানোর সাথে সাথে আমাকে বক্তৃতা দেবার জন্য মঞ্চে তোলা হল। আমার কোন অজুহাত টিকলো না সেখানে। চারদিকে বন্দুকধারী সৈন্য, হল ঘর ভর্তি লোক। পাকিস্তানী আর্মি অফিসাররা সামনের সারিতে। আর আমার পরিচিত আরো অনেককে দেখলাম আতষ্কিত চেহারা নিয়ে বসে আছেন। সাদা কাপড় পরিহিত আমার শ্রদ্ধের শিক্ষক অধ্যক্ষ হোসেন আরা আহমদকেও দেখলাম বিষন্ন চাহনী নিয়ে বসে থাকতে। মাত্র ক’দিন আগে যার স্বামী ডা: শামসুদ্দীন আহমদকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমার হাত পা কাঁপছে। পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। কী সব বুলি আওড়ালাম। নিজের কানেও ঢুকলো না। অনেকে হাততালি দিল। আমি বলির পাঠা হয়ে বেরিয়ে এলাম। তখন মনে একটাই চিন্তা । আমি এখান থেকে বেরুতে পারব তো ? আতষ্কিত পা ফেলে বেরিয়ে এলাম উইমেনস কলেজের গেইটে। সৈন্যরা টহল দিচ্ছে। বন্দুক উচু করা। দেখে মনে হচ্ছিল যে কোন সময় আমার উপর গুলি চালাবে। রিকশায় উঠার সময় চোখ পড়ল রাস্তার ওপারেই গণকবর। এই কবরেই শায়িত সমাজ সেবক ডা: শামসুদ্দিন। এক টুকরো লাল কাপড় ঝুলছে কঞ্চির মাথায়। আর তাঁরই সহধমিনীকে বন্দুকের মুখে নিয়ে আসা হয়েছে পিস কমিটির মিটিংয়ে। মুক্তিযুদ্ধের দু:সহ সময়ের স্মৃতি কি ভুলা যায়।

বীথি: নতুন প্রজন্মকে আপনি কী উপদেশ দেবেন?
আমেনা আফতাব: আগামী প্রজন্মকে নৈতিকতা মানবতাবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই। আমি চাই নতুন প্রজন্মেরা দেশকে ভালোবাসুক, মানুষকে ভালোবাসুক।

বীথি: বাংলাদেশকে আপনি কীভাবে দেখতে চান?
আমেনা আফতাব: আমি বাংলাদেশকে শোষণ মুক্ত, দূনীর্তি মুক্ত দেশ হিসেবে দেখতে চাই। আমার দেশের মানুষের মুখে যেন হাসি লেগে থাকে।

বীথি: সিলেট এক্সপ্রেসের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।
আমেনা আফতাব: আপনাকে এবং সিলেট এক্সপ্রেসকে ধন্যবাদ।

পরবর্তী খবর পড়ুন : ছড়ার ঝাড়ু

আরও পড়ুন



কানাইঘাটে শিক্ষা ট্রাস্ট বৃত্তি প্রদান

কানাইঘাট উপজেলা বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা...

রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ছিলেন মানবতার অগ্রপথিক : মিসবাহ সিরাজ

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক...