শৈশবের দিনগুলো বার বার ফিরে পেতে চাই

প্রকাশিত : ০৯ মার্চ, ২০১৮     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তাসলিমা খানম বীথি: সিলেট এক্সপ্রেসের সাথে একান্ত স্বাক্ষাতকারে রম্যলেখক হারান কান্তি সেন:
আমার জীবনে আম্বরখানা কলোনির স্মৃতি কখনো মলিন হওয়ার নয়। বিভিন্ন সময় এই প্রিয় স্থানকে নিয়ে লেখার কথা চিন্তা করলেও বাস্তবে তা হয়ে উঠেনি। বাবা স্বর্গীয় ননী গোপাল সেনের চাকুরির সুবাদে এই সরকারি আবাসিক কোয়ার্টারের ফ্ল্যাটে আমরা ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৬ পর্যন্ত অবস্থান করি। কলোনির বাসা ছেড়ে চলে আসলেও সেখানকার ভবনগুলো আর মানুষের প্রতি গভীর মমতার টান প্রায়ই আমাকে নিয়ে যেত আম্বরখানা কলোনিতে। এখানের সবার সাথে প্রায়ই দেখা হত এবং কলোনিতে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘সাইক্লোন’ এর সাথে জড়িয়ে থাকায় প্রায় সবার জন্ম-মৃত্যু-বিয়ের খবর আমার কাছে আসতো। টিলার উপর ৬৪ পরিবারের ওই আবাসস্থল যেন সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হিসেবে আমার মনে চিরদিনের জন্য স্থান করে নেয়। সবসময় মনে হয় এ যেন আমার নিত্য আবাসস্থল।

আম্বরখানা সরকারি কলোনিতে গেলেই যাদের সাথে দেখ হতো, কথা হতো স্মৃতিকাতর হয়ে পড়তাম। একদিন মনে হলো কলোনিতে ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি মলাটবন্দী করলে কেমন হয়। যেই ভাবা সেই কাজ। কথা বললাম গল্পকার সেলিম আউয়ালের সাথে, যাকে আমি গুরু বলে ডাকি। আম্বরখানা কলোনিতে থাকাকালীন যাদের পরিবারের সাথে আমি ছিলাম সবচেয়ে ঘনিষ্ট। গুরু আমার কথা শুনে বললেন দারুন আইডিয়া। তার সহযোগিতা অবশেষে আম্বরখানা কলোনিকে ‘নস্টালজিক কলোনি লাইফ’ বাস্তবায়ন করলাম। ২০১৮ সালে একুশে বইমেলায় বের হওয়া ‘নস্টালজিক কলোনি লাইফ’ গ্রন্থ নিয়ে সিলেট এক্সপ্রেসের কার্যালয়ে বসে একান্তে কথাগুলো বলছিলেন লেখক হারান কান্তি সেন।

লেখক হারান কান্তি সেন স্কুল ম্যাগাজিনে ছড়া দিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও মুলত রম্যলেখাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বিশিষ্ট রম্যলেখক, সংগঠক এডভোকেট হারান কান্তি সেন জন্মগ্রহণ করেন সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার তাজপুর ইউনিয়নের দুলিয়ারবন্দ গ্রামে ১৯৬৮ সালে ১০ জুলাই। তার বাবা ননী গোপাল সেন, মা সাধনা রানী সেন। তিনি জিন্দাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পুলিশ লাইন উচ্চ বিদ্যালয়, মদন মোহন কলেজ, এমসি কলেজ ও সিলেট আইন কলেজে অধ্যয়ন করেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি হলেন তৃতীয়। লেখক হারান কান্তি সেনের সহধর্মীনী পম্পা রানী দত্ত একজন গৃহিনী। তারা তিন সন্তানের জনক। বড় মেয়ে শতাব্দী সেন পৌষি, মেঝো মেয়ে শাঁওলি সেন পিউ ও একমাত্র পুত্র সন্তান পিদিম সেন তোজো।

লেখক হারান কান্তি সেন ছাত্রজীবন থেকেই জড়িয়েছেন বিভিন্ন পেশায়। সবশেষে তিনি যোগ দেন আইন পেশায় এবং সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হয়েছেন। তিনি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন সাইক্লোন গ্রুপের সাথে তার সম্পর্ক সেই শৈশব থেকেই। সাইক্লোন গ্রুপের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে একাধিকাবার। ডা. এ. রসুল সাইক্লোন শিক্ষাবৃত্তি প্রকল্পের সদস্য সচিব হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘ ২৭ বছর। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আজীবন সদস্য তিনি। আন্তর্জাতিক সেবামূলক সংগঠন এপেক্স বাংলাদেশের জেলা গভর্ণর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন চারবার। এছাড়াও বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত তিনি।

সিলেটের প্রথম অনলাইন দৈনিক সিলেট এক্সপ্রেস ডট কম-এর পক্ষ থেকে রম্যলেখক হারান কান্তি সেন’র একটি সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সিলেট এক্সপ্রেস কার্যালয়ে সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেন সিলেট এক্সপ্রেস-এর স্টাফ রিপোর্টার তাসলিমা খানম বীথি এবং আলোকচিত্র ধারণ করেন সাংবাদিক মো. আব্দুল বাছিত।

বীথি: কবে থেকে লেখালেখি শুরু করেছেন? সেটি কত সালে দিকের কথা?
সেন : তখন ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। স্কুল ম্যাগাজিনে লেখার মাধ্যমে আমার লেখা শুরু হয়। সেটি ৮০ সালের দিকে কথা।

বীথি: প্রথম লেখা কোথায় প্রকাশিত হয়েছে? তখন অনুভূতি কেমন ছিলো?
সেন : দৈনিক সিলেটের ডাকে বের হয় আমার প্রথম লেখা ১৯৯২ সালে। সেই অনুভূতি ছিলো অসাধারণ।

বীথি: লেখালেখি ব্যাপারে পরিবারের ভূমিকা কতটুকু ছিলো?
সেন : আমার পরিবার থেকে কোন বাধা ছিলো।

বীথি: উৎসাহ পেয়েছেন কাদের কাছ থেকে?
সেন : ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব রণজিৎ দাস ও বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকে।

বীথি: এ পর্যন্ত কতগুলো বই বের হয়েছে?
সেন : এ পর্যন্ত তিনটি বই বের হয়েছে। ২০০৫ সালে ‘গোল সমাচার, দ্বিতীয় বই একুশে বইমেলা ২০১৮ সালে বের হয় ‘নস্টালজিক কলোনি লাইফ’ এবং তৃতীয় বই ভ্রমণ বিষয়ক বই ‘হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ ২০১৮ সালে মার্চে বের হয়।

বীথি: শৈশব ও কৈশোর কোথায় কেটেছে। শৈশবের যে দুরন্তপনা কথা মনে পড়ে?
সেন : আমার শৈশব কেটেছে নগরীর প্রাণ কেন্দ্র জিন্দাবাজারে। আর কৈশোর কেটেছে আম্বরখানা সরকারি কলোনিতে। আমাদের কৈশোরে দুরন্তপনা ছিলো অনেক স্বপ্নে ঘেরা। একদিকে যেমন লাফ দিয়ে মজুমদারি দিঘিতে গোসল করা, সাঁতার দেয়া, অন্যদিকে গ্রীষ্মের ছুটিতে বা অন্যান্য ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে গিয়েও দুরন্তপনা কম হতো না।

বীথি: পাঠকের মনে দাগ কেটেছে এমন কোন লেখা আছে কী? তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কোনটি?
সেন : আমার বিভিন্ন রম্যরচনার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ‘বিবৃতি সমাচার’ ও ‘ঘৃত মধু সমৃদ্ধ সম্বর্ধনা’।

বীথি: লেখালেখিতে কোন বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন?
সেন : সিরিয়াস বিষয় নিয়ে রম্য করে লেখা (স্যাটায়ারধর্মী)।

বীথি : কীসের তাড়নায় লিখতে বাধ্য হন?
সেন : নিজের আনন্দ ও অনুভূতি প্রকাশের জন্য লিখতে বাধ্য হই।

বীথি: প্রিয় লেখক কে, কার বই পড়তে ভালো লাগে?
সেন : সমরেশ মজুমদার, হুমায়ুন আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হক। তাদের বই পড়তে ভালো লাগে।

বীথি: একজন লেখক হিসেবে নিজেকে কতটুকু সফল ভাবেন?
সেন : আমি মনে করি সফলতা বিষয়টি একটি আপেক্ষিক ব্যাপার। কাজেই কোন লেখকই লেখালেখি নিয়ে পুরো জীবনেই একশত ভাগ আত্মতৃপ্ত হতে পারেন না। এজন্যে সফলতাও প্রশ্নবিদ্ধ। অপরদিকে একজন লেখকের বই যদি প্রকাশের পরই পাঠকরা লুফে নেন, তার একটি পর একটি বই বাজারে আসতে থাকে এবং বিক্রি হতে থাকে এরপরও তিনি নিজেকে সফল মনে করলে খুব একটা ভুল হবে না। এদিক থেকে আমি নিজেকে সফল লেখক ভাবি না।

বীথি: লেখালেখি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
সেন : নিয়মিত লেখালেখি করার ইচ্ছে আছে। যাতে প্রতিবছর বইমেলায় অন্তত: একটি করে বই বের করতে পারি।

বীথি: লেখক না হলে কী হতেন?
সেন : পাঠক হতাম। এখনো নিজে বই কিনে পড়ি।

বীথি: কেন পাঠক হতেন?
সেন : না পড়লে একদিন চেনা পৃথিবীকে অচেনা মনে হতে পারে। তাই সবাইকে লেখক হবার আগে ভালো পাঠক হতে হবে।

বীথি: একজন ভালো লেখক হতে হলে কী গুণ থাকতে হবে?
সেন: বেশি করে পড়তে হবে এবং লেখার বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে হবে।

বীথি: যে স্বপ্ন আপনাকে ঘুমাতে দেয় না?
সেন : পৃথিবীর তাবৎ সেরা বই পড়ার স্বপ্ন ঘুমাতে দেয় না।

বীথি: জীবনে কী হতে চেয়েছিলেন?
সেন : স্কুল জীবনে ডাক্তার হবার স্বপ্ন ছিলো। কলেজে এসে সব স্বপ্ন ছুটি নিয়ে চলে যায়। তবে এখন যেমন আছি খুব ভালো আছি।

বীথি: মধুর কোন স্মৃতি আছে কী?
সেন : বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে সিলেটের আম্বরখানা সরকারি কলোনিতে কৈশোর আর তারুণ্যের দশটি বছর কেটেছিলো। এই সময়টা ছিলো আমার জীবনে সবচেয়ে মধুর স্মৃতি।

বীথি: যে স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায়?
সেন : বাবার র্দীঘ অসুস্থতার দিনগুলো আর তাঁর মৃত্যু।

বীথি: কাকে সবচেয়ে বেশি মিস করেন?
সেন : বাবা ও সুনীল কাকুকে।

বীথি: কোন সময়টাকে বার বার ফিরে পেতে ইচ্ছে করে?
সেন : আম্বরখানা সরকারী কোয়াটারের সময়টুকু।

বীথি: কার আর্দশে অনুপ্রাণিত হন?
সেন : বাবা আর ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব রণজিৎ দাস।

বীথি: কী খেতে ভালোবাসেন?
সেন: মাছ ভাত, ভর্তাসহ দেশী সব খাবার।

বীথি: প্রিয় শখ?
সেন : ভ্রমণ, বই পড়া ও গান শুনা।

বীথি: কার গান ভালো লাগে? প্রিয় শিল্পী?
সেন: মান্না দে, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সুবীর নন্দী ও হৈমন্তি শুক্লা।

বীথি: যে গান গুনগুন করে গাইতে থাকেন?
সেন: কফি হাউজের সেই আড্ডাটা, আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি, আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়, আমি অবুঝের মত একি করেছি।

বীথি: অবসরে কী করেন?
সেন : সুযোগ পেলেই ভ্রমণ করি।

বীথি: নতুন প্রজন্মের প্রতি আপনার পরামর্শ?
সেন : ফেইসবুক, নেট, চ্যাট ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় কর্মে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট না করে শিক্ষায় তা ব্যয় করলে অবশ্যই আগামীদিনগুলো সুখময় হবে এবং বাবা মার কথাকে সবসময় গুরুত্ব দিতে হবে।

বীথি: আপনি তো কয়েকদিন পর প্রবাসী হচ্ছেন? তার অনুভূতিটা কেমন?
সেন : আমরা একই শহরে থাকতাম এবং কারো কারো সাথে বছরেও একবার অন্তত দেখা হতো। কিন্তু প্রবাসী হবার কারনে এভাবে কারো সাথে দেখা হওয়া থেকে বঞ্চিত হবার ব্যাপারটি খুব পীড়া দিচ্ছে।

বীথি: বাংলাদেশ নিয়ে আপনার ভাবনার কথা বলেন?
সেন: এদেশ সবদিক থেকে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে একদিন বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে একটি উন্নত দেশ হবে এটি আমি সবসময় ভাবি। কারন এটি সোনার বাংলা।

বীথি: সিলেট এক্সপ্রেসের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।
সেন: তোমাকে ও সিলেট এক্সপ্রেসকে ধন্যবাদ।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

বীরাঙ্গনা কথায় কাঁদলেন, কাঁদালেন মুনিরা

         অন্যরকম এক আবৃত্তি অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ...

কানাইঘাটে নিহত মাদ্রাসা ছাত্রদের পরিবারকে আর্থিক অনুদান

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: গতবছর কানাইঘাটে...

কবিতায় পোঁচ

         অনিন্দ্য আনিস ধার করা জ্ঞান...

তেলে তেলে তেলাকার: ছন্দে ছন্দে বাস্তবতা

         নাসিম আহমদ লস্কর: সাহিত্যের অন্যতম...