শেষসময়ে ‘আম-কাঁঠলি’র উৎসব

প্রকাশিত : ১২ জুন, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

কমলগঞ্জ ( মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি :
মৌলভীবাজারের সাত উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় এখন আম-কাঁঠলি’র উৎসব চলছে। জ্যৈষ্ঠ পেরিয়ে আষাঢ় চলে আসার এই মুহুর্ত্তে এ উৎসব যেনো মহোৎসবে রূপ নিয়েছে।
জেলার প্রতিটি ঘরে ঘরে এখন চলছে পার্বণ। এর নাম ‘আম-কাঁঠলি’। ধনি-গরিব নির্বিশেষে, নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী প্রায় সবাই কমবেশি ফল নিয়ে মেয়ে, ভাতিজি-ভাগনি কিংবা বোনের বাড়িতে ছুটছেন। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অনেক এলাকাতেই বংশপরম্পরায় উদযাপন করা হয় এই পার্বণ। এ উপলক্ষে শহরের কোর্ট মার্কেট, চৌমুহনী ও পশ্চিমবাজার এলাকার ফলের মার্কেটগুলো এখন সরগরম।
একটি পিকআপ ভ্যানে আম, কাঁঠাল, আনারস-লিচু এবং খইয়ের বস্তা তুলছেন কয়েক শ্রমিক। মিষ্টির প্যাকেটও রাখা হচ্ছে। ঠেলাগাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিক্সায়ও তোলা হচ্ছে এসব মৌসুমী ফল-ফলাদি। জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ়-এ দু’মাস মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের গদার বাজার, কমলগঞ্জের আদমপুর ও শমসেরনগর বাজার এবং কুলাউড়ার রবিরবাজারের পাইকারী ও খুচরা ফলের দোকানগুলোতে প্রতিদিন সকাল-দুপুরে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। সেখানে মৌসুমি ফলে গাড়ি বোঝাই হয়, কিছুক্ষণ পর পর ছুটে যায় দূর-দূরান্তের দিকে।
কমলগঞ্জ সফাতআলী সিনিয়র মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবদুল মালিক জানান, আমরা ছোটোকাল থেকেই এই আম-কাঁঠলি দিতে দেখে আসছি। দেওয়ার আগে মেয়ে বা বোনের বাড়িতে জানানো হয়। দু’পক্ষের সম্মতিতে নির্দিষ্ট তারিখে ঠেলা বা ট্রাকে করে যার যার সামর্থ্য মতো আম-কাঁঠাল, আনারস, খই-মিষ্টি নিয়ে যাওয়া হয়। কনেপক্ষও এ’দিন সামর্থ্য মতো ঘটা করে খাবারের আয়োজন করেন। আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত করেন। এটা এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রেওয়াজ।
গত মঙ্গলবার সকালে আদমপুর বাজারে ফল কিনছিলেন কমলগঞ্জ উপজেলার করিমপুর গ্রামের আছলম আলী। মেয়ের বিয়ে হয়েছে সম্প্র্রতি। ‘মেয়ের বাড়িতে আম-কাঁঠলি দিব, তাই কিনছি’ বললেন তিনি। উপজেলার বড়চেগ গ্রামের মবশ্বর মিয়া বলেন, ভাতিজির বাড়িতে আম-কাঁঠলি দিব। এবারই প্রথম দিচ্ছি। তিনি জানালেন, ৪ হাজার আনারস, ৬ হাজার টাকার কাঁঠাল, ২ হাজার টাকার আম, ১ হাজার ৮ শ টাকার লিচু, ৪৫০ টাকার খই এবং ২ হাজার ৭শ টাকার মিষ্টি কিনেছেন। এসব দিয়ে সাজানো হচ্ছে তাঁর ‘আম-কাঁঠলি’।
জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই বিশেষ করে নববধূরা শ্বশুরবাড়িতে প্রতীক্ষায় থাকেন, কখন বাবা বা ভাইয়ের বাড়ি থেকে পাঠানো হবে ‘আম-কাঁঠলি’। মেয়ের চুলে পাক ধরলেও অনেকের বাবার বাড়ি থেকে যায় আম-কাঁঠলি।
বিয়ের প্রথম বছর ‘আম-কাঁঠলি’ দেওয়া হয় বেশ ঘটা করেই। এই উপলক্ষে দুইপক্ষের আত্মীয়-স্বজনদের ঘটে মহামিলন। শ্বশুরপক্ষের বাড়িতে ছোটখাটো একটা বিয়ের মতো আয়োজন হয়ে থাকে। বিত্তবানদের ক্ষেত্রে এই উৎসব যতোটা আনন্দের, হতদরিদ্র বাপ-ভাইদের জন্যে এটি বিষাদে রূপ নেয়। অনেকে বেশ বেকায়দায়ও পড়ে যান। তবু মেয়ের মান রাখতে, জামাই, নাতি-নাতনি ও মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকদের খুশি করতে দুই-চারটা কাঁঠাল, দুই-চার হালি আনারস, এক-দুই কেজি আম ও এক কেজি খই হলেও ‘আম-কাঁঠলি’ দিতে হয়।
সংস্কৃতিকর্মী সমর রায় জানালেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এইভাবে আম-কাঁঠলি দেওয়া হয় না। কিন্তু ফলের মৌসুমে মেয়েকে নাইওর আনার রেওয়াজ আছে।
কমলগঞ্জ উপজেলার বালিগাঁও এর বাসিন্দা মৌসুমি ফল বিক্রেতা মনির মিয়া বলেন, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে প্রতিদিন সকাল হলেই জেলার আদমপুর, ব্রাহ্মণবাজার, মুছাই, মির্জাপুর, শমশেরগঞ্জ, শমশেরনগর থেকে কাঁঠাল ও আনারস এনে শ্রীমঙ্গল পাইকারী মার্কেটে স্তূপ করা হয়। প্রতিদিন অন্তত ১৫০ থেকে ২০০টি পিকআপ ভ্যান কিংবা ট্রাক এখান থেকে বোঝাই করে আত্মীয় বাড়ি নিয়ে যান লোকজন। এছাড়া অটোরিকশা, ঠেলা, টমটম— এসব তো আছেই।
খই বিক্রেতা বাবুল মোদক বলেন, ৫ কেজি থেকে শুরু করে ৩০ কেজি করে খই নেওয়া হয়। এটা নির্ভর করে কাঁঠালের ওপর। কাঁঠাল যতো বেশি, খইও ততো বেশি ক্রয় করা হয়।
এই অঞ্চলের মানুষদের সংসারে যতোই থাক টানাপোড়েন, অর্থকষ্ট, ‘আম-কাঁঠলির’ এ উৎসব উদযাপন করেন ঘটা করেই। এর সঙ্গে মিশে আছে এক অন্যরকম আবেগ, উচ্ছ্বাস, যা পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করে-এমনটা বিশ্বাস এ জেলার মানুষদের।

আরও পড়ুন