শিশু নির্যাতনকারীদের কঠোর শাস্তি পেতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত : 18 October, 2019     আপডেট : ২ মাস আগে  
  

শিশু হত্যাকারী ও নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিশুদের প্রতি কোনো অন্যায়-অবিচার কখনোই বরদাশত করা হবে না। কাজেই যারা শিশু হত্যা করবে, নির্যাতন করবে তাদের অবশ্যই কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তি পেতে হবে।

শুক্রবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ আয়োজিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট ভাই শহীদ শেখ রাসেলের ৫৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

প্রতিটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে তার সরকার কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিটি শিশুর ভেতর একটা মনন, চেতনা ও শক্তি রয়েছে। সেটাকে বিকশিত করতে হবে। শিশুরা যাতে লেখাপড়া শিখে আধুনিকমনস্ক হয়ে গড়ে উঠতে পারে, প্রতিটি শিশুর জীবন যেন অর্থবহ হয়– সেজন্য সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। শিশুদের যাতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে না হয় এবং ঝরেপড়া কিংবা প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্যও নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার।

সম্প্রতি দেশব্যাপী শিশু হত্যা ও নির্যাতনের কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, শিশুদের ওপর অত্যাচার বেড়েছে। বাবা হয়ে সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে অন্যকে ফাঁসানোর জন্য। কী এক বিকৃত মানসিকতা! এ ধরনের হীন মানসিকতা সমাজে বেড়েই চলেছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ছোট্ট শিশু শেখ রাসেল হত্যার পর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে আজ শিশু হত্যা ও নির্যাতনের মত ব্যাধি সমাজে ছড়িয়ে পড়তো না।

তিনি বলেন, ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর এর বিচার হবে না বলে আইন করা হয়। ১৯৮১ সালে যখন দেশে ফিরে এলাম, তখন মামলা পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি। বাবা-মা, ভাই হত্যার বিচার পাওয়ার অধিকার থেকেও আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। ঘাতকরা কেবল একটা দেশের রাষ্ট্রপতিকেই হত্যা করেনি। নারী-শিশুও হত্যা করেছে। অথচ এই খুনিদের বিচার না করে, তাদের রক্ষা ও পুরস্কৃত করা হয়েছে। এর প্রভাবটা সমাজে পড়তেই পারে। পঁচাত্তরের পর যারাই ক্ষমতায় থেকেছে, তারা দেশ ও মানুষের কথা ভাবেনি। তারা কেবল নিজেদের আরাম-আয়েশ আর সম্পদ বানানোর চেষ্টাই করেছে।

ছোট ভাই শেখ রাসেলের জন্ম ও তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, রাসেল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য। বাবা তখন রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর নির্বাচনের প্রচারণার কাজে চট্টগ্রামে। আমরা চার ভাই-বোন বসেছিলাম, ওই ছোট্ট শিশুটির জন্মক্ষণের জন্য। তাকে কোলে নেওয়ার জন্য। তাকে আদর করার জন্য। ১৯৬৪ সালে রাসেলের জন্ম।

তিনি বলেন, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হলো। ছোট্ট রাসেল যখন দু’বছরের শিশু, তখন থেকেই সে বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত। কারাগারে বাবাকে দেখতে গিয়ে সে কিছুতেই ফিরে আসতে চাইতো না। তখন বঙ্গবন্ধুকে বাধ্য হয়েই বলতে হতো– ‘এটাই আমার বাড়ি। তুমি তোমার মায়ের সঙ্গে তোমার বাড়ি যাও।’ একটা ছোট্ট শিশু বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত, আমরা তো ছিলামই, আর এই ছোট্ট বাচ্চাটাও! তারপর ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু যখন বাসায় এলেন, তখনও রাসেল খেলার ছলে বারবার ছুটে যেত বাবাকে দেখার জন্য। বাসায় নেতাকর্মীরা আসতেন– তখনও সে আব্বার কাছে ছুটে যেত। না জানি আবার আব্বাকে ছাড়া থাকতে হয় তার। তার মনে একটা ভয় ছিল, বাবাকে হারানোর ভয়।

শেখ হাসিনা বলেন, যেদিন জেলখানায় যেতাম, আগের দিন থেকেই রাসেল খুবই অস্থির থাকতো। ভাই বোনদের কাছে ছুটে আসতো। কী যেন বলতে চাইতো। কিন্তু তার ব্যথাটা কিছুই প্রকাশ করতে পারতো না। মা বলতেন, ‘আমিই তোমার আব্বা, আমিই তোমার আম্মা।’ তারপর সত্তরের নির্বাচন হল, কিন্তু শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা দিল না। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিলেন। তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হলো পশ্চিম পাকিস্তানে। আমাদের রাখা হলো ১৮ নম্বরের একটি ছোট বাড়িতে।

তিনি বলেন, আবারও রাসেল বাবার স্নেহ বঞ্চিত। খুব চাপা স্বভাবের ছেলে ছিল সে। মাঝেমাঝে তার চোখে পানি দেখা যেত। কাঁদছে কেন, জিজ্ঞাসা করলে বলতো– চোখে কিছু একটা পড়েছে। ‘জয়কে (সজীব ওয়াজেদ জয়) খুবই আদর করতো রাসেল। তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে। রাসেল পকেটে তুলা রাখতো, যখনই গুলির শব্দ হতো রাসেল সেই তুলা জয়ের কানে দিত, যাতে জয় ভয় না পায়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরে আসেন, তখনও রাসেল তার সঙ্গে সঙ্গে থাকতো। আব্বা যখন যেখানে যেত, রাসেলও সঙ্গে যেত।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বত্রিশ নম্বরের ওই বাড়িতে একটি প্রাণীও বেঁচে থাকতে পারেনি। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা। ভেবেছিলেন, হয়তো রাসেল বেঁচে রয়েছে। কিন্তু তাকেও মেরে ফেলা হয়েছিল।

শেখ রাসেলের মানবতা ও দরদী মনের পরিচয় তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিটা শিশুরই একটা ইচ্ছা থাকে, বড় হয়ে কী হবে! রাসেলেরও শখ ছিল, বড় হয়ে আর্মি অফিসার হবে। এ নিয়ে তার অনেক আগ্রহও দেখেছি। যখন গ্রামে যেত, সেখানে গিয়ে কাঠের বন্দুক নিয়ে শিশুদের নিয়ে খেলতো। তার ভেতরে একটা দরদী মনও ছিল। গরিব শিশুদের জামা-কাপড় দিতো, মায়ের কাছ থেকে চেয়ে তাদের টাকা-পয়সা দিয়ে সহযোগিতাও করতো। এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, বেঁচে থাকলে রাসেল কেমন হতো দেখতে! কিন্তু ঘাতকের নির্মম বুলেট কাউকে বাঁচতে দেয়নি।

শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চায় শিশুদের অংশ নিতে হবে, সবক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতে হবে। আর সমাজের খারাপ দিকগুলো, যেমন মাদক, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস থেকে দূরে থাকতে হবে। সততার সঙ্গে জীবনযাপন করতে হবে।

শিশুদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, কারও একটা বড় গাড়ি কিংবা বাড়ি থাকলেই যে আমারও থাকতে হবে– এমন মানসিকতা দেখানো যাবে না। শুধু নিজে খাব, নিজে করবো তা নিয়ে ভাবলে হবে না। অন্যদের চিন্তাটাও করতে হবে। প্রয়োজনে নিজে না খেয়েও অন্যকে খাওয়াতে হবে, যেটা জাতির পিতাও করতেন। অন্য শিশুদের পাশে দাঁড়াতে হবে। একটা অনুরোধ থাকবে, তোমাদের পাশে দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী শিশু দেখলে তাদের অবহেলা করো না। কারণ তারাও তো তোমাদের মতই মানুষ। এতে তাদের তো কোনো দোষ নেই। কাজেই তারা যেন কোনোভাবেই অবহেলার শিকার না হয়। এটা অমানকিতা ও নিষ্ঠুরতা।

একই সঙ্গে শিশুদের দেশপ্রেম এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের কল্যাণে উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদেশটা আমাদের। দেশটাকে আমাদেরই গড়ে তুলতে হবে। ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী আর ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হবে। ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ আর দরিদ্র থাকবে না। সব মানুষই উন্নত জীবন পাবে। আর ২০৪১ সালে যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ গড়ে উঠবে- আজকের শিশুরা সেই দেশের কর্ণধার হবে। ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষপূর্তি হবে। ২১০০ সালে দেশকে উন্নত থেকে উন্নততর হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ডেল্টা প্ল্যান ঘোষণা করেছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে শিশুদেরও উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী পরে শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বিজয়ী শিশু-কিশোরদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। সব শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।

শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের চেয়ারম্যান রকিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের মহাসচিব মাহমুদ উস সামাদ এমপি, উপদেষ্টা তরফদার রুহুল আমীন, সাংগঠনিক সচিব কে এম শহীদুল্লাহ, শিশু বক্তা আফিয়া আদিবা প্রমুখ।

আরও পড়ুন