শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক মমতাজ বেগম বড়ভূইয়া’র বাংলা কথাসাহিত্যে মুসলিম নারী

প্রকাশিত : 24 November, 2019     আপডেট : ৩ সপ্তাহ আগে  
  

হাসনাইন সাজ্জাদী
বাংলা কথাসাহিত্যে নারী চরিত্র বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছে। লেখকের মানসকল্পনা ঘিরে একজন নারী গল্পে, উপন্যাসে, কবিতায়, নাটকে বিচিত্ররূপে চিত্রিত হন। বাংলাসাহিত্যে নারী চরিত্রের চিত্রায়ন নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণায় নারীর বর্তমান ও অতীত অবস্থানের মৌলিক বিচার-বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাসাহিত্যের খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও গবেষক ড. মমতাজ বেগম বড়ভূইয়া সাম্প্রতিক সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। ‘বাংলা কথাসাহিত্যে মুসলিম নারী’ নামে একটি সাহিত্য সমালোচনা গ্রন্থ তিনি লিখেছেন। তাঁর এই গবেষণাধর্মী কাজ বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
ড. মমতাজ বেগম বড়ভূইয়া একাধারে কবি, গল্পকার ও গবেষক। বাংলা সাহিত্যের সব শাখাতেই রয়েছে তাঁর সাবলীল বিচরণ। নিরলস সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তিনি সুধীসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি শেকড়ের টানে বাংলাসাহিত্যে অমর সৃষ্টিকর্ম রচনা করে যাচ্ছেন। তাঁর মেধা, মনন ও কর্মশৈলী শিল্পচিন্তার আপনভুবনকে আলোকিত করেছে। ড. মমতাজ বেগম বড়ভূইয়া ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের আসাম প্রদেশের হাইলাকান্দি জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবিদ রাজা বড়ভূইয়া (মরহুম)। তিনি একজন আইনজীবী ছিলেন। মা রওশন আরা বেগম একজন আদর্শ গৃহিণী। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি কনিষ্ঠ। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু ৫২০নং টাউন গোলালিয়া প্রাইমারি মক্তব স্কুল। তারপর ইন্দ্রকুমারী গালর্স হাইস্কুল থেকে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে মেট্রিক পাশ করেন। অতঃপর হাইলাকান্দির শ্রীকিষাণ সারদা কলেজ থেকে ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা অনার্স নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ এবং গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর লাভ করেন। কর্মজীবনে ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে প্রভাষক হিসেবে হাইলাকান্দি-আলগাপুর আব্দুল লতিফ চৌধুরি কলেজে যোগদান করেন। একই সঙ্গে শ্রীকিষাণ সারদা কলেজেও খ-কালীন শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করেন। তিনি ২০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ওই কলেজে বাংলা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
ড. মমতাজের গবেষণাধর্মী এই গ্রন্থটি বাংলাদেশ থেকে প্রকাশ করে সিলেটের প্রকাশনা সংস্থা পা-ুলিপি প্রকাশন। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটিতে অভিমত লিখেছেন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান নন্দলাল শর্মা। অধ্যাপক নন্দলাল শর্মা তাঁর অভিমতে গ্রন্থটি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ড. বড়ভূইয়া একজন পরিশ্রমী গবেষক। তাঁর গবেষণাকর্ম সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, নির্লিপ্ত ও নিরাসক্ত। পরম মমতায় তিনি উভয় বাংলার লেখক ও লেখিকাদের কথাসাহিত্য অধ্যয়ন করেছেন এবং এখানে মুসলিম নারী সমাজের যে চিত্রাবলী অঙ্কিত হয়েছে তা নিরপেক্ষভাবে অননুকরণীয় শৈলীতে বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার রীতি হচ্ছে সঠিক সত্য উদঘাটন করা। গবেষক একজন নারী হয়ে নারীদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট কোন বচন রচনা করেননি। তিনি কথাসাহিত্যে মুসলিম নারীদের অবস্থান সম্পর্কে উভয় বাংলার লেখক-লেখিকাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সঠিক চিত্র উন্মোচন করেছেন। আধুনিক যুগের সূচনালগ্ন থেকে একুশ শতকের প্রথম দিক সময় পর্যন্ত কালের নির্বাচিত কথাসাহিত্য তিনি বিচার বিশ্লেষণ করেছেন।
লেখক তাঁর ভূমিকা বক্তব্যে লিখেছেন, ‘নারী মানে পাপ-এ ধরনের দীর্ঘ লাঞ্ছনাময় ঐতিহ্যে প্রত্যাঘাত করেছেন সাম্প্রতিক কথাকাররা। ধর্মতন্ত্রের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য যারা নারীনিগ্রহ করে তাদের মুখোশ টেনে খুলে দিয়েছেন তারা। সাম্প্রতিককালের বাংলা কথাসাহিত্যে মুসলিম নারীর বাচনে নিরন্তন প্রতিবাদী সুর ধ্বনিত। ‘নারী’ শব্দের কোনো সমার্থক তান’ নেই যদিও পুরুষ শব্দের আছে ‘মানুষ’ কথাকারদের তীর্যক দৃষ্টি তা এড়ায়নি। তবে ‘নারীত্ব’ শব্দটির পর্যালোচনা করেছেন। নারীত্ব ও মাতৃত্ব দুটিই পুরুষের স্বার্থসিদ্ধির সোপান। উভয়ই যৌনতাকেন্দ্রিক। পুরুষ সর্বস্ব পৃথিবীতে নারী শুধু যৌন সামগ্রী- এমনকি বিবাহিত অবিবাহিত বিবাহ বিচ্ছিন্ন, বিধবাÑসকল ক্ষেত্রেও নারীর নারীত্ব যৌননিগ্রহের উপাদান।’
গবেষণা গ্রন্থটি ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত। ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ শিরোনামে একটি পরিশিষ্ট রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে এসেছে আধুনিক যুগের সূচনালগ্নে যুগোপযোগী শিক্ষার অগ্রগতির ধারা সূচিত হলে মুুসলিম নারী মানসের জাগরণ ঘটে। অবরোধবাসিনীরা কেউ কেউ নিজেদের অবস্থান বুঝতে কিছুটা সক্ষম হন। এ পর্যায়ে প্রথমে যে গ্রন্থটি রচিত হয় সেটি হচ্ছে নবাব ফয়জুন্নেসার আত্মজৈবনিক রচনা ‘রূপজালাল’ (১৮৭৬)। ড. বড়ভূইয়া যথার্থই লিখেছেন, ‘মুসলমান নারীর জীবন অন্তঃপুরের চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকে এবং তাঁদের সামাজিক অর্থনৈতিক ভূমিকা নেই এবং তাৎপর্যপূর্ণ কিছু করার ক্ষমতা নেইÑএ ধরনের ধারণার বিরুদ্ধে মূর্তিমতি প্রতিবাদ ফয়জুন্নেসা।’ এই অধ্যায়ে আলোচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরীর ‘রূপজালাল’; মমলুকুল ফাতেমা খানমের ‘দর্পচূর্ণ’ ও ‘বোঝা’ গল্প; বেগম রোকেয়ার ‘পদ্মরাগ’ (১৯২৪) উপন্যাস; আখতার মহল সৈয়দা খাতুনের ‘নিয়ন্ত্রিতা’ ও ‘মরণবরণ’ উপন্যাস; শৈলবালা ঘোষজায়ার ‘অবাক’ উপন্যাস; নুরুন্নেছা খাতুনের গল্প ‘ভয়’ ও উপন্যাস ‘স্বপ্নদ্রষ্টা’ ও ‘আত্মদান; গৌরকিশোর ঘোষের উপন্যাস ‘প্রেম নেই’ এবং কমরুন্নেসার গল্প ‘ব্যথার কাঁটা’। এ অধ্যায়ে আলোচিত অনেক রচনার সাথেই সাধারণ পাঠক সুপরিচিত নন। গবেষকের আলোচনা থেকে তাঁদের মনে একটি নতুন বাতায়ন খুলে যাবে। তাঁর মতে সূচনা পর্বে মুসলিম নারীদের চিন্তাভাবনার যে পরিসর আলোচিত হয়েছে তাতে ‘প্রতিকূলতা ভেদ করে আপন মননশীলতার সীমিত সাধ্যে কালাতীত কীর্তি রেখে যেতে না পারলেও চেতনার দীপ্তিতে উদ্ভাসিত হয়েছে কারো অবগুণ্ঠনের আড়ালে বহ্নিশিখা।’
দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেখা যায়, ‘নিজেকে স্রষ্টা ও দ্রষ্টা দুই সত্তায় ভাগ করে দেখার প্রবণতা…নারীকে সাহিত্যের অঙ্গনে জায়গা করে দেয়।’ এ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের উপন্যাস ‘অলীক মানুষ’; আফসার আমেদের উপন্যাস ‘আত্ম পরিচয়’, ‘ধ্যানজ্যোৎস্না’ ও ‘বিবির মিথ্যা তালাক ও তালাকের বিবি’ এবং হলুদ পাখির কিসসা’। ‘ধর্মীয় অনুশাসনে আবদ্ধ বাঙালি মুসলমান নারীর জীবন যন্ত্রণার উৎস ও তার সমাধানের ইঙ্গিত তুলে ধরা হয়েছে তৃতীয় অধ্যায়ে।’ এ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে আবু ইসহাকের উপন্যাস ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’; শহীদুল্লা কায়সারের মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘সংশপ্তক’; আবুল বাশারের উপন্যাস ‘ফুলবউ’ ও ‘ধর্মের গ্রহণ’; আবুল ফজলের উপন্যাস ‘চৌচির’; সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর উপন্যাস ‘লালসালু’ এবং বেগম সুফিয়া কামালের গল্প ‘বিজয়িনী’।
চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে আইনি বৈষম্যের কারণে নারীদের বঞ্চিতা ও অপমানিতা হওয়ার কাহিনি। সম্পত্তি বণ্টনে অসাম্য ও আর্থিক শোষণ কীভাবে পারিবারিক বিপর্যয় ডেকে আনে সে সম্পর্কে গবেষক চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন। এ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে সেলিনা হোসেনের উপন্যাস ‘দীপান্বিতা’ ও ‘গাছটির ছায়া নেই’ এবং গল্প ‘ইজ্জত’, ‘ঘর’, ‘মতিজানের মেয়ে’ এবং ‘ছবি ও বুলেট’; আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প ‘পায়ের নিচে জল’, ‘উৎসব’, ‘দুধেভাতে উৎপাত’ ও ‘অসুখবিসুখ’; আনসার উদ্দিনের গল্প ‘জবকার্ড’ ও ‘ফরজ গোসল’ এবং তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প ‘নাজায়েজ আওলাদ’। বাঙালি মুসলিম নারীদের পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যাজনিত বিভিন্ন জটিলতার প্রেক্ষিতে তাদের সামাজিক অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ে। এ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে তসলিমা নাসরিনের উপন্যাস ‘নিমন্ত্রণ’, ‘অপরোক্ষ’, ‘শোধ’ ও ‘ভ্রমর কইও গিয়া’; পূরবী বসুর গল্প ‘সালেহার ইচ্ছা অনিচ্ছা’; সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের উপন্যাস ‘রেশমির আত্মচরিত’; মহাশ্বেতা দেবীর গল্প ‘তালাক’ এবং মুনীর চৌধুরীর গল্প ‘একটি তালাকের কাহিনী’। দেশবিভাগ, বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধÑএই বিস্তৃত পটভূমিতে আমাদের কথাসাহিত্যে নারীসত্তার যে অভ্যুদয় ঘটেছে তা বিস্তারিতভাবে গবেষক ষষ্ঠ অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন। এ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস ‘বাহান্ন গলির এক গলি’, ‘রাজাবাগ শালিমার বাগ’ ও ‘ফেরারী সূর্য’; জাহানারা ইমামের কালজয়ী গ্রন্থ ‘একাত্তরের দিনগুলি’ এবং গল্প ‘উপলব্ধি’; রিজিয়া রহমানের উপন্যাস ‘রক্তের অক্ষর’; নাসরিন জাহানের উপন্যাস‘উড়–ক্কু’, ‘সোনালি মুখোশ’ ও ‘ক্রুশকাঠে কন্যা’ ও ‘স্বর্গলোকের ঘোড়া’ এবং শাহীন আখতারের ‘তালাশ’ ও ‘পালাবার পথ নেই’।
প্রতিটি সমালোচনা সাহিত্যের একটি মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে। ড. মমতাজ তাঁর লেখনীর মাধ্যমে সেই উদ্দেশ্যকে সার্থকভাবে বাস্তবায়িত করেছেন। আগামিদিনের সাহিত্যের গবেষকদের জন্য তাঁর এই কাজ যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ ও ছাপার মান চমৎকার। মূল্য রাখা হয়েছে পাঁচশ’ টাকা। গ্রন্থটি প্রচুর পাঠক সমাদর পাবে এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : কবি, গবেষক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন