শিক্ষক পিতার শিক্ষক সন্তান

প্রকাশিত : ০৬ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ১২ মাস আগে  
  

ডা. মুহম্মদ আবদুল জলিল চৌধুরী: আমি একজন শিক্ষক পিতার শিক্ষক সন্তানের কথা লিখছি। তিনি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এন্ড কলেজ স্কলার্সহোম সিলেট-এর অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জুবায়ের সিদ্দিকী। পারিবারিক ডাক নাম ‘সাথী’ এবং সাথী ভাই হিসেবেই তিনি অনেকের কাছে পরিচিত।
তিনি আমার খুব ঘনিষ্টজন এমনও নয়। তবে আমরা পরস্পরকে চিনি। তিনি দি এইডেড হাইস্কুল থেকে ১৯৬৪ সালে এসএসসি পাশ করে এম. সি. কলেজে ভর্তি হন। আমি সিলেট রাজা জি.সি. হাইস্কুল থেকে ১৯৬২ সালে তদানিন্তন‘ মেট্রিকুলেশন পরীক্ষার’ সর্বশেষ ব্যাচ হিসেবে মেট্রিক পাশ করে এম. সি. কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হই।
স্বাভাবিকভাবে পরস্পর পরিচিত হওয়ার তেমন সম্ভাবনা ছিল না। তবে তার ঘনিষ্ট খালাত ভাই বরইকান্দি চৌধুরী বাড়ির মুহাম্মদ দীনুল ইসলাম চৌধুরী (খসরু) রাজা জি.সি হাইস্কুলে আমার সহপাঠী ও অন্তরঙ্গ ছিলেন (পরবর্তীকালে একই স্কুলে দীর্ঘ দিনের শিক্ষকও বটে)। এ সূত্রে কলেজ জীবনে সাথী ভাইয়ের আব্বার ঈদগাহের বাসায় দু’একবার গিয়েছিলাম। সেখানে তাঁর শিক্ষক পিতার সাথে সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হয়েছে। সেই সময় আমার মনে হয়েছে তিনি স্বল্পভাষী। কতকটা রাশভারী ও একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক। কথা বলেছি, তবে একই সাথে একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষকের সাথে কথা বলতে যেমন ভয় ও শ্রদ্ধা-দুটোই কাজ করেছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের (অব.) সিদ্দিকীকে পরবর্তীতে একাধারে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসক হিসাবে যেভাবে দেখে আসছি, বা লোকমুখে বা ছাত্রদের অভিভবকদের কাছ থেকে তাঁর যে পরিচিত জানতে পেরেছি, তাতে তার মাঝে তাঁর মরহুম পিতার শিক্ষাদর্শ,নীতি ও নিষ্ঠার প্রতিচ্ছবিই যেন খুঁজে পাওয়া যায়।
সাথী ভাই একাধারে সামাজিক অঙ্গনে স¦াভাবিক মিশুক ও প্রাণবন্তও। অনেক বার দেখা হয়েছে, মাঝে মাঝে দেখা হয়,কুশলবার্তা বিনিময়ও হয়। তবে তাঁর মাঝে একটি একান্ত স্বাতন্ত্র্যবোধও বিরজমান। এটাই শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে তাঁর একান্ত বৈশিষ্ট্য। এ স¦াতন্ত্র্য বোধই তাকে অনেকের মাঝে একটি নিজস্ব স্বত্তায় পরিস্ফুটিত করে রেখেছে।
তার এ বিশিষ্ট্য অবস্থানই সিলেট স্কলার্স হোম কলেজের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে অদ্যাবধি একজন খ্যাতিমান অধ্যক্ষরুপে তাঁকে সুপরিচিত করে রেখেছে।
১৯৬৭ সাল। আমি তখন একটি হাই স্কুলে শিক্ষকতা করছি। সহপাঠী দীনুল ইসলামের কাছ থেকে জানতে পারলাম সাথী ভাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন পদে রিক্রুট হয়ে তদানিন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের এ্যাবটাবাদ চলে গেছেন। ১৯৬৯ সালে আমিও দি এ্যাইডেড ম্যাল্টিলেটারেল হাইস্কুলের শিক্ষকতার পদে ইস্তফা দিয়ে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের একটি পদে মাত্র কয়েক মাস চাকুরিরত ছিলাম। এ সময় পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের একটি পদে যোগদানের আমন্ত্রণ পাই। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের লোভনীয় পদের যোগদানের জন্য ১ নভেম্বর ১৯৬৯, পি.আই.এ বিমান যোগে পশ্চিম পাকিস্তনে করাচি চলে যাই।
সম্ভবত ১৯৮৯-৯০ সাল। সাথী ভাই তখন সপরিবারে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে। আমি তখন সপরিবারে চট্রগ্রাম আগ্রাবাদ জাম্বুরী মাঠ দক্ষিণ ড্রাগস কলোনিতে চাকুরী উপলক্ষে বসবাস করছি। দু’একবার সপরিবারে দেখা সাক্ষাত হয়েছে। কথাবার্তা, চাল-চলনে সব সময় একজন নিষ্ঠাবান সৈনিক কর্মকর্তার ছাপ ছিল লক্ষ্যনীয়।
১৯৯০ সালে তিনি উপসাগরীয় যুদ্ধে অংশ নিতে আড়াই হাজার বাংলাদেশী সৈন্যের ডেপুটি কমান্ডারের একটি কঠিন দায়িত্ব পালনে সউদি আরবের দাহরাইনে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রেরিত হন। সম্ভবত: সেটিই ছিল দেশের বাইরে বাংলাদেশের সৈনিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সর্ব প্রথম কৃতিত্বের পরিচিতি স্বাক্ষর। বাংলাদেশ আর্মি তাদের দক্ষতা ও নিয়মানুবর্র্তীতার জন্য জাতিসংঘের শান্তি-মিশন দপ্তরের নজরে পড়ে।
যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরেই কিছুদিনের মাথায় জুবায়ের সিদ্দিকী ভারতের নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের সামরিক এটাচি হিসেবে কূটনৈতিক দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি সেখান থেকে দেশে ফিরেন ও সামরিক বাহিনীতে ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্বে উন্নীত হন। ১৯৯৯ সালে ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকী সামরিক বাহিনী থেকে অবসরে আসেন।
এরপরের জীবন,
এরপরের জীবনটাই মূখ্যত আজকের সম্মাননা ও সংবর্ধনা প্রাপ্তির মূল অনুঘঠক। আর দশজন অবসর প্রাপ্ত সৈনিক অথবা বেসামরিক পদস্থ কর্মকর্তার মত তিনি রাজধানী কেন্দ্রিক জীবন বেছে নেননি। তিনি চলে এলেন তাঁর প্রিয় জন্মভূমির জেলা শহর সিলেটে। এখানে তিনি হাতে তুলে নিলেন কলমÑসাহিত্যচর্চা, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে জীবনের প্রতিপাদ্যের অন্বেষা, সামাজিক দায়িত্ববোধের অঙ্গনে আপন অবদান খুঁজতে ও তা কাজে লাগাবার প্রয়াস।
প্রথমেই পরিচয় করিয়েছি, শিক্ষক পিতার শিক্ষক সন্তান।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে কানাইঘাট-জকিগঞ্জের চার-পাঁচবারের গণপ্রতিনিধি, শিক্ষা-সম্প্রসারে নিবেদিত ব্যক্তিত্ব হাফিজ আহমদ মজুমদার সিলেটে একটি ইংরেজি মাধ্যম আদর্শ স্কুল স্থাপনের জন্য একজন বিশিষ্ট শিক্ষা- সংগঠক, শিক্ষা-প্রশাসক ও নিবেদিত প্রাণ প্রশিক্ষক খুঁজছিলেন। তিনি পেয়ে গেলেন জুবায়ের সিদ্দিকীকে। এদিকে শিক্ষক পিতার এই আদর্শবান সন্তানও দিনরাত ভাবছেন, পিতার আদর্শ পথে নিজেকে নিবেদিত করার একটা ক্ষেত্র। চাওয়া-পাওয়ার এ এক অর্পূব সমম্বয়। জুবায়ের সিদ্দিকী পরিতৃস্ত। হাফিজ মজুমদার সাহেবও পরম নিশ্চিন্ত। দীর্ঘ বছর ধরে স্কলার্সহোম ইংরেজি মাধ্যম কলেজ হিসেবে শিক্ষা, নিয়ম নিষ্ঠা, দক্ষতা ও মেধার স্বীকৃতি নিয়ে সিলেট বিভাগে দিপ্তিমান সূর্য রশ্মির বিকিরণ ছড়িয়ে জ্বলছে, আর জ¦লতে থাকবে বলে আমরা দৃঢ় চিত্তে আশান্বিত। এর পেছনে এ প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত সবার অবদান স্বীকার করে নিয়েও বলা যায় ‘একজন জুবায়ের সিদ্দিকী প্রদীপের এ শিখাটিকে নিজ প্রেরণার দৃশ্য ও অদৃশ্য প্রভায় প্রজ্জ¦্রলিত করে রেখেছেন’।
মরহুম আমীনূর রশীদ চৌধুরী যেমন অন্তরে বাইরে ছিলেন খাঁটি সিলেটি। অঢেল বিত্ত-সম্পদ থাকা স্বত্বেও তিনি ঢাকায়, লন্ডনে কিংবা নিউইয়র্কে বসতি স্থাপন না করে শহর সিলেটে নিজের নিবাস গেড়েছিলেন। অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেটি ছাত্রদের বৃত্তি-ষ্টাইপেন্ড দিয়ে এসব মেধাবী, দরিদ্র ছাত্রদেরেকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তাদের হত দরীদ্র জীবনে দিয়েছেন মেধার প্রতিষ্ঠা ও কর্ম দক্ষতার স্বীকৃতি। তেমনি জুবায়ের সিদ্দিকীও ঢাকা নয় কিংবা নিউইয়র্কের সুউচ্চ অট্রালিকার তল্লাশে নয়, সিলেটের মাটিতে শিক্ষা ও আদর্শ শিক্ষার বীজ বপণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন অক্লান্ত বদনে ও পরিতৃপ্ত মন-মানসে।
এজন্যই আমরা এ লেখার প্রথমেই বলেছি, ‘শিক্ষক পিতার শিক্ষক সন্তান’। তাঁকে তার সত্তর বর্ষ পূর্তিতে একাত্তরতম জন্মদিনে সম্মাননা প্রদান করে আমরা, এ মহানগরবাসী, এ বিভাগের জন সাধারণ তথা সারাদেশের শিক্ষা-মেধা ও ব্যক্তিত্বের অনুসন্ধানী আমজনতাÑশুধুমাত্র জুবায়ের সিদ্দিকীকে নয়, একই সাথে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রী, তাদের শিক্ষক-শিক্ষিকাগণসহ সামগ্রিকভাবে ‘শিক্ষার আলোকেও আমরা অনুপ্রাণিত বোধ করছি।
এটাই এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের অন্তরবহ বার্তা।

লেখক: সাবেক ড্রাগ সুপার, গল্পকার ও কবি।

পরবর্তী খবর পড়ুন : লাল টি-শার্ট

আরও পড়ুন



সবুজ শ্যামল ক্রীড়া সংস্থার সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: দক্ষিণ সুরমা...

শিশু আখাউরা মাজার থেকে নিখোঁজ

গোয়াইনঘাট (সিলেট) থেকে নিজস্ব সংবাদদাতাঃ...

আরিফকে তাহসিনা রুশদীর লুনার অভিনন্দন

বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা...