লড়াই, শেষ পর্যন্ত

,
প্রকাশিত : ০২ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নাইমা চৌধুরী: বৈচিত্র্যময় সংসারে চলার পথে সব সময় একটা লড়াকু মনোভাব রাখতে হয়। অধিকাংশই এই লড়াই চালিয়ে যেতে হয় নিজের সঙ্গে। ভাগ্য যুদ্ধের অনেক ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে নিজেকে। মাঝে মাঝে আমি আমার বাস্তবতা হারিয়ে ফেলি। তখন একটা বই আমাকে আবার বাস্তব জীবনে ফিরিয়ে আনে। চমৎকারভাবে বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে বইকে জীবনের অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছি, তাই এই বইয়ের সন্ধানে নিরন্তর ছুটে চলা।
একদিন গল্পকার সেলিম আউয়াল ‘আমার জীবন আমার যুদ্ধ’ গ্রন্থটা আমার হাতে তুলে দিলেন। গ্রন্থটা হাতে নিয়ে প্রচ্ছদে চোখ পড়তেই মনে হলো ভিন্ন স্টাইলের কোন এক সিনেমার নায়ককে দেখছি। একটা গ্রন্থের প্রথম আকর্ষণ হচ্ছে প্রচ্ছদ এবং শিরোনাম, গ্রন্থটির দু’টোই বেশ আকর্ষনীয় যে কোন পাঠকের নজর কাড়বে।
হাতে একটা বই এলে যে অভ্যাসটা আজও ছাড়তে পারিনি, তা হচ্ছে বই’র গন্ধ শুকা পাতা উল্টাতে উল্টাতে যতই গভীরে যাই মনে হয় হৃদয়ের সঙ্গে ঘনিষ্টতম সম্পর্ক তৈরি করে দিচ্ছে। ঘনিষ্ট সম্পর্কে গভীর থেকে যখন জড়িয়ে যাই নিজের একাকীতে¦ তখন অনেক মানুষ ছায়ার মত ঘুর ঘুর করে, নানা ঘটনার বিচ্ছিন্ন টুকরো কল্পনার চোখে ছবি হয়ে ফুটে ওটে। এক সময় নিজের মধ্যে অন্য অনেক মানুষকে খুঁজে পাই, যে সব মানুষ অজ্ঞাতসারে মনের মধ্যে লুকিয়ে ছিল দেখা না দেখার কথা কাহিনীর অদৃশ্য মায়াজালে যুক্ত হয়ে।
জীবন যুদ্ধে সংগ্রামী সেনানায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী’র ‘আমার জীবন আমার যুদ্ধ’ গ্রন্থটা পড়লে মনে হয়না এটা কোন আত্মকাহিনী। আমার কাছে মনে হয়েছে এক যোদ্ধ্রা ত্রিকালে ঘটে যাওয়া বিগ ট্যাজেডির সেরা উপন্যাস, যা খুব যতেœর সংগে নানা ঘটনার টুকরো স্মৃতি সাদা কাগজে কলমের খস্ খস্ শব্দে পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছেন।
ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকীর সমস্ত জবিনে অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভাবনার তোলপাড় হচ্ছি আমি তার কোন অভিজ্ঞতা ছেড়ে কোন অভিজ্ঞতার কথা বলব। যদি বলি নিজ গ্রামে বেড়ে ওঠার গল্প তবে বলতে হয় পালতোলার নৌকার নাইয়রী নিয়ে যাওয়া-আসা, বাঁেশর সাকোতে নদী পার হওয়া, নদীর দু’পাশে হিজল ডুমুর, থোকা থোকা সাদা বেত ফুল ঝুলে থাকা, গ্রামের ঈদ, বুবুর হাতের বোনা জামা, একত্রে ঈদের চাঁদ দেখা, হারিকেন জ¦ালিয়ে জম জমাট আড্ডা, ‘বঙ্গুলা’ ফুটানো, ঈদের দিনে খুব ভোরে প্রতিযোগিতা করে গোসল করা। বাংলার এসব চিত্র যে কোন পাঠকের কল্পনার চোখে ছবি হয়ে ফুটে উঠবে। মনে করিয়ে দেবে হারানো অতীত। যদি বলি সাহসি মহিলা ক্ষুদির কথা, লেখকের বর্ণনায় সুঠাম দেহ, কালো কুচকুচে রঙ্গের চুলগুলো আফ্রিকার অধিবাসীদের মত কোকরানো, প্রায় হাঁটু সমান উচ্চতায় শাড়ি পরা। ক্ষুদির বর্ণনা পড়ে কল্পনার চোখে ভেসে উঠল এস এম সুলতানের রং তুলির ক্যানভাসে আঁকা ফুলে ওঠা পেশির সুঠাম দেহের বলিষ্ঠ মানুষগুলোর ছবি।
তারপর যদি বলি জীবন যুদ্ধে প্রথম পদক্ষেপের কথা, তবে বলতে হয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া এক সাহসি তরুণ যুবকের গল্প। এম সি কলেজে পড়াকালীন সময়ে উদ্দেশ্যবিহীন পথে বন্ধু কাইসারকে নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বক্তৃতা কৌতূহলবশত শুনতে গিয়ে প্রথম জীবনে অপ্রস্তুত হয়ে ইন্টারভিউ দেয়া, সেই সময়ে ঘটে যাওয়া বিচিত্র সব ঘটনা’র বর্ণনা, ‘সুধীর আমার বাংলা জানে’ খ্যাত ব্যতিক্রম অধ্যাপক সুধীর চন্দ্র পালের বাংলা পড়ানো, আমার নিজের উপজেলা কুলাউড়া তথা দেশের কৃতি সন্তান অধ্যাপক মোকাজ্জর করিমে’র ইংরেজি পড়ানো, খুটিয়ে খুটিয়ে এম সি কলেজের সৌন্দর্যের বর্ণনা, থ্যাকারে টিলা সব যেন কোন এক সাদাকালো সিনেমার গল্পের মত মনে হচ্ছে।
অতঃপর ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকী’র জীবনের কঠিন অধ্যায়Ñপাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যাত্রা শুরু করে ১৯৭১ সালে স্বদেশের মানুষ যখন বিজয়ের-মুক্তির আনন্দে উল্লসিত, প্রিয় স্বজনদের নিয়ে যখন মুক্তির আনন্দে হই চই করার অভিলাষ, তখন-ই পাকিস্তানে তিন তলা সমান উচু দেয়ালের অভ্যন্তরে দুর্ভেদ্য দুর্গে বন্দী জীবন কাটাতে হলো। সেই দুঃসহ বন্দী জীবন থেকে মুক্তির জন্য শুরু হলো নতুন সব ভাবনা। প্রতিদিনের ভাবনা ছিলো কিভাবে তীক্ষè দৃষ্টি সম্পন্ন সন্দেহ প্রবণ লোক মেজর কাজীর দৃষ্টি এড়িয়ে কড়া পাহারা ভেদ করে পালানোর পথ খুঁজে পাওয়া যায়। অবশেষে হতাশা আর বিষন্নত্রা অনিশ্চিত বন্দী জীবনের অবসানে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে প্রত্যয়ী একদল সাহসী অফিসার মাটির নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ করে পালিয়ে যাবার পরিকল্পনা করলেন। অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে এই ঝুকিপূর্ণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কিছু অফিসার নেমে পড়লেন সুড়ঙ্গ খননের কাজে। প্রথমে রূম নির্বাচন হলো, ছোট খাটো যন্ত্রপাতির জোগাড়ও হলো। তারপ সুরঙ্গ খোড়া কাজ, কিন্তু প্রতিদিনই কিছু না কিছু সমস্যা এসে জুটে। প্রথমেই যে সমস্যা উদয় হলো পাকা ফ্লোর ভাঙ্গার শব্দ গোপন করা যায় কিভাবে। তারপর খুব চতুরতার সঙ্গে একটা উপায়ও বের হলো কুড়াল দিয়ে যখন রান্না ঘরের কাঠ কাটা হবে ওই শব্দের সঙ্গে মিল রেখে ফ্লোর ভাঙ্গার কাজ শুরু করা। তারপর ভাঙ্গা ইট-সুড়কি যাতে মেজর কাজীর নজরে না পড়ে তারও ব্যবস্থা হলো। মাটি খননের শব্দ বন্ধের জন্য হারমোনিয়াম দিয়ে গানের রেওয়াজ করা হতো, খননকৃত মাটি সরানো ছিলো আরেক সমস্যা, তারও সমাধান হলো গোসলে যাওয়ার সময় বালতিতে মাটি তুলে কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেলা হত। মাটির পরিমান যতই বাড়তে লাগলো সেটা লুকানোর জন্য ব্যবহার করা হলো ট্রাঙ্ক, সুটকেইস, বক্স প্যাটরা। সুড়ঙ্গের কাজ যতই এগিয়ে যেতে লাগলো নিত্য নতুন সমস্যাও দেখা দিতে শুরু করলো, সুড়ঙ্গে ভেতরের অন্ধকার দূর করার জন্য আলোর ব্যবস্থা করা হলো। অক্সিজেনের জন্য খালি টিন কেটে দুই ভাগ করা হল এক ভাগ পানি আর অন্য ভাগ খালি, খালি অংশে ছোট্র ছিদ্র করে একটা লম্বা রাবারের নল লাগানো হল এই নলের ভিতর দিয়ে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা হলো। প্রচন্ড গরম থেকে রক্ষার জন্য একটা টেবিল ফ্যানের ব্যবস্থা হলো সুড়ঙ্গের লেভেল টিক রাখার জন্য বোতলের মধ্যে পানি শুধু একটা বাতাসের বুদবুদ রাখা হলো। অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে অবশেষে শেষ হলো সুড়ঙ্গের কাজ। আর ঠিক তখুনি ঘটলো আসল ঘটনা, যেখানে গিয়ে সুড়ঙ্গের মুখ বের হলো ঠিক সেখানে একজন প্রহরী দাঁড়িয়েছিল, এই সংবাদ দ্রুত পৌঁছে যায় মেজর কাজীর কানে সঙ্গে সঙ্গে পাগলা ঘন্টা বেজে উঠল, হায়রে জীবন, সত্যি জীবন-ই দর্শন শেখায়। জীবন মানে সংগ্রাম, শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার লড়াই।
শেষ করার আগে বলতে চাই, আমাদের সাহিত্যের স¤্রাট সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা জীবন-ই অভিজ্ঞতা, অভিজ্ঞতার সমষ্টির নাম জীবন, জীবনকে খন্ড খন্ড করে ভাগ করলে দেখা যাবে এক একটি অভিজ্ঞতা যেন এক এক ফোটা চোখের জলের রুদ্রাক্ষ, আর সব ক’ট তসবি হয়ে যে মালা গাঁথা হয় তার-ই নাম জীবন।
নাইমা চৌধুরী: কবি, সাহিত্যকর্মী


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

ভালো মানের সেবার মাধ্যমে সফলতা অর্জন সম্ভব

        সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: দেশজুড়ে চালু...

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে মেয়র আরিফের পুস্পস্তবক অর্পণ

        মুজিববর্ষের ক্ষনগননা শেষে সূর্যোদয়ের সাথে...