লৌকিকতায় ধ্বংস হচ্ছে আমাদের সমাজ!!

,
প্রকাশিত : ০৯ মে, ২০২০     আপডেট : ১২ মাস আগে
  • 127
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    127
    Shares

মোশাররফ হোসেন সুজাতঃ
আমাদের সমাজে যৌতুক কে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন রূপে আমরা লালন করে আসছি। সমাজের নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিভিন্ন সাঝে এগুলো প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত। যৌতুক দেয়া নেয়া দুটোই পাপ ও শাস্তি যোগ্য অপরাধ। তবুও আমাদের চোখের সামনে এগুলো চলছে অথবা চালিয়ে যাচ্ছি। আবার কেউ বাধ্য হয়ে মেনেও চলছি অবিরত। আমরা মঞ্চে ময়দানে সভা সমিতিে এর বিরুদ্ধে কথা বলি ওয়াজ করি আবার বাস্তবে যার যার পাড়া মহল্লায় এসব কুসংস্কার মুখ বুজে সহ্য করি অথবা সানন্দে গ্রহণ করি।
এসব শুধু গ্রামে নয়। গ্রামে শহরে শিক্ষিত অশিক্ষিত সব জায়গায় সমান তালে প্রচলিত ও প্রযোজ্য। সাধারণ তো অনেক বিষয়ে শিক্ষিত অশিক্ষিতের মধ্যে পার্থক্য থাকে। কিন্তু এসব জঘন্য অপরাধ ও কুসংস্কারে তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বার্থ ও লোভের কারণে এগুলোকে উৎসাহ দেন প্রাধান্য দেন। কেউ আবার পরিস্থিতির কারণে দিতে বাধ্য হন।

বছর ঘুরে একবার আমাদের সামনে ক্ষমা মাগফেরাত আর নাযাতের বার্তা নিয়ে হাজির হয় পবিত্র মাহে রমজান। নামাজ, রোজা, কোরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা ইত্যাদি ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ মেলে এ মাসে। কিন্তু পবিত্র এ মাসে প্রচলিত কিছু ঘৃণ্য প্রথা ও কুসংস্কার ক্ষুণ্ণ করছে মাসের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মেয়েদের শ্বশুরালয়ে প্রথাগত ভাবে ইফতারি প্রেরণ। দারিদ্র্যদের জন্যে এটা এক মহা-আতঙ্কের নাম আর বিত্তশালীদের কাছে ইহা এক বিলাসী প্রথা বা আনন্দ উৎসব।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই প্রথার প্রচলন আছে। তবে বিশেষ করে সিলেট আর চিটাগং এটা একটা মহামারী আকারে ছড়িয়ে গেছে। যদি শ্বশুরবাড়ি থেকে সময়মতো ইফতারি না পাঠানো হয় তাহলে স্বামীর বাড়িতে মেয়েকে শিকার হতে হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের। অনেক সময় দারিদ্র্য বাবা মেয়ের সুখের জন্যে শতকষ্ট বুকে চাপিয়ে হাসিমুখে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি ইফতার পাঠান। তবে ইফতারি প্রেরণেই যে মেয়ের নিষ্কৃতি মিলবে এমন নয়। বাড়ির অন্য বউদের শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঠানো ইফতারের সঙ্গে তুলনা করা। ব্যতিক্রম হলে মেয়েকে শুনতে হয় তার মা বাপ ও চোদ্দগুষ্টি নিয়ে বাজে মন্তব্য ও উপহাস। এখানেও শেষ নয় এসব কারণে জঘন্য শারিরিক মানষিক নির্যাতনে অনেক কে মরতেও হয়। আজকাল এ নিয়ে হত্যা, আত্মহত্যা ও ডিভোর্সের মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ।

অন্যদিকে বিত্তশালী পরিবারগুলোতে চলে ইফতার প্রেরণের প্রতিযোগিতা। কে কতো মন ইফতার পাঠালো, কে কতো টাকা খরচ করলো, কতজনকে খাওয়ালো এ হিসাব নিকাশ চলে সারা রমজান। বিশ রমজান এরপর থেকে সাতাইশ আটাইশ উনত্রিশ রমজান পর্যন্ত মার্কেটে মার্কেটে চলে বাজার আর কেনাকাটার ধুম। যে মাসের অপেক্ষা আমরা সারা বছর অব্দি করি, সে মাহে রমজানের মাহাত্ম্য ও পুণ্য অর্জনের ভাণ্ডার তখন শূন্য। বরং এসব কারণে রমজান ও শবেকদর শুধু অর্থহীনই হয় না বরং কলহ বিশৃঙ্খলা আর জুলুমের কারণে উল্টো গোনাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এভাবেই আমাদের সমাজে চলছে মুসলমানদের অতিগুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যের মাহে রমজান।

অথচ একজন মুসলিমের কখনই উচিত নয় এমন কাজে অংশ নেওয়া কিংবা এমন কাজকে সমর্থন করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘অন্তরের স্বতঃস্ফূর্ত অনুমোদন ছাড়া এক মুসলমানের সম্পত্তি অন্য মুসলমানের জন্যে হালাল নয়।’ আর এসব ইফতারি প্রথা প্রকাশ্য জুলুমের নামান্তর।
অনেক ইসলামি স্কলার বলেন, বিত্তশালীরা যদি স্বেচ্ছায়ও দিয়ে থাকেন, তবুও এতে লুকিয়ে থাকে লৌকিকতা ও অহংকার। আর লৌকিকতাকে সূক্ষ্ম শিরক আখ্যা দিয়ে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা.) বলেন, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামানায় রিয়াকে ছোট শিরক গণ্য করতাম।’ -মুসনাদে উমার: ২/৭৯৬
আমাদের সমাজে আজকাল ইফতার আদান-প্রদানের এ প্রথা হয় জুলুম, নতুবা শিরক। এই দুয়ের ভিতর কোন একটি। যে প্রকারেরই হোক না কেন উভয়টিই কবিরা গোনাহ। আর যদি বলেন এসব না, তবে এটা একটি প্রচলিত কুপ্রথা। যার অনুমোদন ইসলামে নেই। ইসলাম কঠিন কিছু কারও উপর চাপিয়ে দেয়না।
মোদ্দাকথা, এমন ইফতার প্রথার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই। উপরন্তু কারণে যদি কাউকে কোনো প্রকার নির্যাতন বা অপমান তাচ্ছিল্য করা হয়, যদি এর কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত বা অসন্তুষ্ট হয় তবে সেটা আরও কঠিন গোনাহের কাজ। কেননা জালেমকে আল্লাহ্ পছন্দ করেন না। ইফতার করানো ছওয়াবের কাজ। যে কেউ যে কাওকে ইফতার করাতে পারে ছওয়াবের জন্যে। এক্ষেত্রে ছেলেও শশুর বাড়ির সবাইকে ইফতার করাতে পারে। কিন্তু সেটা কেন কখনো হয়নি।
তাই একতরফা শ্বশুরবাড়ীর ইফতারি সামাজিক বন্ধন নয় হতে পারেনা। বরং সামাজিকতার নামে একটা মেয়ের বাবার উপর এক নীরব অত্যাচার অবিচার যা যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজে প্রচলিত হয়ে আসছে। শুধু অবিচার নয় এটা একটা প্রচলিত কুসংস্কার। যার কারণে নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে একটা মেয়ের সাজানো সংসার ও তার মা বাবা পরিবার। শুধুমাত্র ভুক্তভোগী অসহায় পরিবারগুলো জানে এ কুপ্রথার বলি হয়ে তারা কতটা বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত। এটা প্রথা কত পরিমাণ ভয়াবহ ক্যান্সার সমাজের জন্যে, যেখানে আজ করোনায় হতাশা ও দূর্দশাগ্রস্ত গোটা জাতি। লকডাউনের কারণে মানুষ বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্টীয় সাহায্যে কোনমতে দিনাতিপাত করছে। এই অবস্থায় ইফতারি নামক এ কুপ্রথা বহাল তবিয়তেই আছে শহর ও গ্রামগঞ্জে।

এমনিতেই বিয়ের সময় ছেলে পক্ষকে ধুমধাম করে খাওয়ানো বাধ্যতামূলক। সাথে বরের পোশাক থেকে শুরু করে মোটর সাইকেল, ফার্নিচার, রান্নাঘরের থালাবাসন সোফা, ফ্রিজ, টিভি, বেড মেট্রেস আরও কত কিছু দিতে হয়। এক কথায় একটা ঘর সাজানোর জন্য যা যা লাগে সে সবকিছু যেন ছেলের বিয়েতে শশুর বাড়ি থেকে প্রাপ্য। আর এতে আমরা বিন্দুমাত্র লজ্জিত হইনা বরং এসবকে আরও গর্বের বিষয় মনে করি, যেন এটা আমাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে।
বিয়ের পর শুরু হয় মেয়ের উপর বারোমাসি নির্যাতন যৌতুক, ইফতার, আমকাটলি চাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন উদ্ভট নিয়মনীতির প্রয়োগ। অনেকেই আছেন ছেলের শশুর বাড়ি থেকে এসব ঠিকই আনেন কিন্তু নিজের মেয়ের বাড়িতে দিতে চান না। আবার অনেক আছেন ছেলের শশুর বাড়ি থেকে আনেন না কিন্তু মেয়ের বাড়ি দিতে বাধ্য হোন।

সুতরাং আমাদের সবাইকে বিয়ের আগের ও বিয়ের পরের যৌতুক দেয়া, রমজানে শশুরালয়ের ইফতার, আমখাটলি ইত্যাদি কুপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ঘৃণা প্রদর্শন করা শুধু উচিত। এটা মুসলমানদের নৈতিক ও ঈমানী দায়িত্বের ভিতর। এসব বিষয়ে সোচ্চার হওয়া অবশ্যই আমাদের কর্তব্য।
তবে আফসোস প্রতিটি বিবেকবান মানুষ এসব কুপ্রথার ভয়াবহতা সমাজে দেখেও রহস্যজনক নিরবতা পালন করে এটাকে মৌন সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। শুধুমাত্র নিজে পাওয়া এবং দেয়ার মোহনীয় লোভে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নৈতিক মুল্যবোধ সম্পন্ন বিবেকবান মানুষ হিসেবে করে গড়ে তুলুন। আর এসব কুপ্রথার বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার তৌফিক দিন। আমিন,,,,

লেখক- কবি ও সম্পাদক সিলেট টাইম ২৪ ডটকম।


  • 127
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    127
    Shares

আরও পড়ুন

ওসমানী বিমানবন্দর এলাকা থেকে ফেসনিডিলসহ আটক ৩

         বিমানবন্দর বাইপাস এলাকা থেকে ১৬০...

প্রতিদিন ৩২ শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়

1        1Share সিলেট এক্সপ্রেস ডেক্স বাংলাদেশে...