লিবিয়া থেকে ফিরলেন ১৫২ জন সঙ্গে তিন লাশ

প্রকাশিত : 29 November, 2019     আপডেট : ১ সপ্তাহ আগে  
  

মিজানুর রহমান   যুদ্ধকবলিত লিবিয়ায় সর্বশেষ ড্রোন হামলায় নিহত রাজশাহীর বাগমারার আবুল হাছান (বাবুলাল)-সহ পৃথক ঘটনায় মারা যাওয়া ৩ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে এসেছে। ত্রিপলিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে-লিবিয়া ও বাংলাদেশ সরকারের তত্ত্বাবধানে আইওএম’র সক্রিয় সহায়তায় চার্টার্ড ফ্লাইটে গতকাল ৩ লাশসহ হামলায় মারাত্মক আহত ১০ জন প্রবাসীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশে পাঠানো হয়েছে। ওই ফ্লাইটে ভূমধ্যসাগর থেকে সম্প্রতি জীবিত উদ্ধার হওয়া ১৪২ বাংলাদেশিও ফিরেছেন। ৩ লাশসহ ১৫২ বাংলাদেশির দেশে ফেরা সংক্রান্ত এক সচিত্র প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছে ত্রিপলিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রচারিত বার্তায় জানানো হয়েছে-বাংলাদেশিদের বহনকারী চার্টার্ড ফ্লাইটটি লিবিয়ার মিসরাতা বিমানবন্দর থেকে আকাশে ওঠে। ঢাকাগামী ওই ফ্লাইটে ত্রিপলীর ড্রোন হামলায় আহত ১০ জন প্রবাসীসহ ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধারকৃত ১৫২ জন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন।’ বিজ্ঞপ্তি মতে, আইওএম এর কোন চার্টার্ড ফ্লাইটে প্রথমবারের মতো তিনজন বাংলাদেশির মৃতদেহ দেশে প্রেরণ করা হয়েছে। লিবিয়া পরিস্থিতি দিন দিন নাজুক হয়ে ওঠার প্রেক্ষিতে দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় স্বেচ্ছায় দেশে ফেরত যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের মধ্য থেকে অনেকে ইতোমধ্যে আইওএম এর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।

তাদের অতিসত্বর দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
৩ লাশের একজন ক্রসফায়ারে, অন্যজনের মৃত্যু বৈদ্যুতিক শকে: এদিকে বাংলাদেশ মিশনের বরাতে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- লিবিয়া থেকে কফিনবন্দি হয়ে বৃহস্পতিবার দেশে ফেরা ৩ বাংলাদেশির মধ্যে বাবুলাল ড্রোন হামলায় নিহত হলেও বাকী দু’জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে পৃথক দু’টি ঘটনায়। এর মধ্যে নাটোরের লালপুর উপজেলার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম নিহত হয়েছেন মারজুক শহরের বিবাদমান দুই পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে (ক্রসফায়ারে) পড়ে। চরম গোলযোগপূর্ণ ওই শহরে থেকে বেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে ক’দিন আগে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন নজরুল। তার লাশ এতদিন স্থানীয় একটি হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা ছিল। তৃতীয় যে বাংলাদেশির লাশ দেশে এসেছে তিনি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আরশাদ। নিজ কর্মস্থলের কাছে বৈদ্যুতিক শক লাগার পর তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে দূতাবাস।

ড্রোন হামলায় আহতদের ১০ জন দেশে, উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন: ওদিকে দূতাবাস জানিয়েছে-ত্রিপলির ড্রোন হামলার ঘটনায় আহত ১৫ জনের মধ্যে কিছু সুস্থ হয়ে ওঠায় ১০ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশে পাঠানো হয়েছে। তারা হলেন-  মো. রবিউল ইসলাম, আল আমুন, গৌতম চন্দ্র শীল, মো.মানিক চাঁদ, আবুল কালাম,  মো. মোহাব্বত আলী, আলীমউদ্দিন, মো. মোহসিন, সৈকত ও মো. ইসমাঈল হোসেন। বাকী ৫ জনের এখনও বিমানে ওঠার মত অবস্থায় নেই। আহত মনির কুদ্দুস ও ইমনের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। তারা আইসিইউতে আছেন।

দূতাবাসের বরাতে ঢাকার এক কর্মকর্তা বলেন, আহত সবারই উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে হয় ঢাকায় কিংবা তৃতীয় কোথাও পাঠানো যেতে পারে। যুদ্ধাবস্থায় ড্রোন হামলায় মত ঘটনা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়ারা দ্রুত স্বাভাবিক হতে পারে বলে চিকিৎসকরা মত দিয়েছেন বলেও জানান ওই কর্মকর্তা। তার মতে, ত্রিপলিতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত শেখ সিকান্দার আলী আগেই ঢাকাকে জানিয়েছে- ড্রোন হামলায় আহত ১৫ বাংলাদেশির মধ্যে কুমিল্লার ইমন এবং ঝিনাইদাহের মোহাব্বত আলীর অবস্থা গুরুতর। ১৮ই নভেম্বর সকালে ত্রিপলীর ওয়াদি রাবিয়া এলাকার একটি বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে ড্রোন হামলায় এক বাংলাদেশিসহ মোটা ৭ জন শ্রমিক নিহত হন। ৩০ জনের মত গুরুতর আহত হন। গতরাতে রাষ্ট্রদূত মানবজমিনকে বলেন, যে দশ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন তাদের মধ্যে ৬ জনকে হাসপাতাল থেকে হুইল চেয়ারে করে বের করতে হয়েছে। তাদের ত্রিপলি থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে মিসরাতা বিমানবন্দরে নিতে হয়েছে।

সাগর থেকে উদ্ধার হওয়াদের সর্বশেষ অবস্থা: গত ৩০শে অক্টোবর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ  যাওয়ার চেষ্টাকালে নৌকা থেকে আটক হন ১৭১ বাংলাদেশি। উপকূল থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া ওই বাংলাদেশিদের ত্রিপলির কাছাকাছি জানজুর ও আবু সালিম বন্দি শিবিরে রাখা হয়। বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে অনলাইন আরব নিউজ জানায়- ওই ঘটনায় সব মিলিয়ে উদ্ধার করা হয় ২০০ অভিবাসীকে। লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর এএসএম আশরাফুল ইসলামকে উদ্বৃত করে আরব নিউজ জানায়- বাংলাদেশি সব অভিবাসীর রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়েছে। তাদের সবাইকে পর্যায়ক্রমে নভেম্বরের শেষ নাগাদ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। ওই কর্মকর্তা তখন বলেন, লিবিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে রাজধানী ত্রিপলির বিমানবন্দরগুলোতে কোনো কার্যক্রম নেই। তাই ত্রিপলি থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মিসরাতা বিমানবন্দর থেকে বিশেষ ফ্লাইটে যাবেন ওইসব বাংলাদেশি। তার ভাষায়, ত্রিপলি বিমানবন্দর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বোমা হামলা ঘটছে ঘন ঘন। চালানো হচ্ছে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।

লিবিয়া থেকে বাংলাদেশে কোনো আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার বিমান ওড়ে না। তাই ওইসব অভিবাসীকে দেশে ফেরাতে বিমান ভাড়া করতে হবে, যার খরচ বহন করবে অভিবাসন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন আইওএম। আটক ওইসব বাংলাদেশিদের সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন দূতাবাসের কর্মকর্তারা। তারা তাদেরকে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আরব নিউজ আরও লিখেছে, ইতালি ও ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধ উপায়ে অভিবাসী পাচারের জন্য লিবিয়াকে গেটওয়ে বা প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করছে মানব পাচারকারীরা। ইউরোপিয়ান বর্ডার অ্যান্ড কোস্ট গার্ড এজেন্সি ফ্রনটেক্স-এর মতে, গত এক দশকে অবৈধভাবে ইউরোপ প্রবেশের চেষ্টাকালে প্রায় ৩০ হাজার বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। এই সংস্থার মতে, সামপ্রতিক বছরগুলোতে যেসব দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে সবচেয়ে বেশি অভিবাসী ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন তার অন্যতম বাংলাদেশ। এর আগেও লিবিয়া থেকে বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত পাঠাতে সুবিধা দিয়েছে আইওএম। ২০১৭ সালে ৯২৪ জনকে, ২০১৬ সালে ৩০৭ জনকে এবং ২০১৫ সালে ৫২১ জনকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে আইওএমের সহযোগিতায়।সুুত্র মানবজমিন

আরও পড়ুন