লন্ডনে যাপিত জীবন – ১৭ মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসিদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে

,
প্রকাশিত : ০৯ জুন, ২০২০     আপডেট : ৯ মাস আগে
  • 40
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    40
    Shares

সাঈদ চৌধুরী :

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম নিয়ে রয়েছে অজস্র শিল্পগাথা। স্বাধীনতাযুদ্ধ বাঙ্গালির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। এই যুদ্ধকে সার্বিকভাবে তুলে ধরতে সাংবাদিক-সাহিত্যিক এমনকি ফটো-সাংবাদিকেরা তাদের জীবনের সেরা সৃষ্টি উপহার দিতে বহুভাবে প্রয়াস চালিয়েছেন। যুদ্ধকালীন ঐতিহাসিক চিত্র ও চরিত্র ধারণ করেছেন প্রাণময় ভালবাসা দিয়ে। এমনি একজন প্রবাসী চিত্রশিল্লী ইউসুফ চৌধুরী।

১৯৯৭ সালে বৃটিশ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (বিবিআইএস) প্রতিষ্ঠার পর বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রধান কবি ও কথা সাহিত্যিক আল মাহমুদ, স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবিধানিক ইনস্টিটিউট ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিক্সের সভাপতি কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেসক্লাব সভাপতি গিয়াস কামাল চৌধুরী, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মেয়র জে আর রামানুপ, বিবিসির সাংবাদিক ফ্রান্সেস হরিসন, বৃটিশ হাইকমিশনার ডেভিড সি ওয়াকার সহ দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও কুটনীতিক বিবিআইএস পরিদর্শণ করেছেন।

প্রবাসী চিত্রশিল্লী ইউসুফ চৌধুরীকেও আমি বিবিআইএস প্রাঙ্গণে নিয়েছি এবং আমাদের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানবার সুযোগ করে দিয়েছি। তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সমূহ রুটস অ্যান্ড টেইলস অব বাংলাদেশি সেটেলার, একাত্তরে বিলেত প্রবাসী, সন্স অব এম্পায়ার, বাংলাদেশ টু বার্মিংহাম, দ্য রুটস অব ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্টাল কেটারিং ইন ব্রিটেন, অ্যান অ্যালবাম অব ১৯৭১ বাংলাদেশ লিবারেশন মুভমেন্ট ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।

২০০০ সালের জানুয়ারি মাসে বিলেত আসার পর মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসিদের অবদান নিয়ে গবেষনা মূলক কাজ শুরু করি। এরই এক পর্যায়ে ইউসুফ চৌধুরীর সাথে আবারো সংযোগ হয়। এ্তে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন চেলতেনহাম নিবাসী মাসিক অভিমতের সম্পাদক মন্ডলির চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান। বাংলাদেশে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে সক্রিয় ভাবে জড়িত, আমার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ও মহৎপ্রাণ মানুষ তিনি। ইউসুফ চৌধুরীর সাথে হাফিজ ভাই ঘনিষ্ট হয়েছিলেন তারই বন্ধু একসময় সাপ্তাহিক জনমতের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম হোসেনের মাধ্যমে।

ইউসুফ চৌধুরীর সাথে সংযোগকে আরো সুদৃঢ় করেন তার জামাতা লন্ডনের সুপরিচিত মুখ ক্রয়ডন কাউন্সিলের পর পর চার বার নির্বাচিত কাউন্সিলার শেরওয়ান চৌধুরী ও তার স্ত্রী (ইউসুফ চৌধুরীর মেয়ে) স্থানীয় ক্রয়ডন স্কুলের টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্স রহিমা খাতুন। ইউসুফ চৌধুরীর স্বার্থক উত্তরাধিকারী হিসেবে তারাও আমার খুব কাছের মানুষ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা যখন অস্ত্র হাতে লড়ছেন। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসিরা আপনজনদের নিয়ে ভীষন উদ্বিগ্ন। লন্ডনের বাঙ্গালিরা তখন পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বের সমর্থন ও সহানুভূতি আদায়ে মুক্তিযুদ্ধের অঘোষিত কূটনৈতিক ফ্রন্ট চালূ করেন এখানে। শুরু হয় বৃটিশ পার্লামেন্টের সামনে নানা রকম প্রচার তৎপরতা আর বিক্ষোভ সমাবেশ। ইউসুফ চৌধুরী সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে আলোকচিত্রে ধারণ করেছেন, যা ছড়িয়ে পড়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে। উত্তাল সেই দিনগুলোতে সেই রাজপথ কাঁপানো তার অসংখ্য ছবি বিবিসির তথ্যচিত্রেও ব্যবহার করা হয়েছে।

ইউসুফ চৌধুরীর সাথে মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় বেরিয়ে আসে অনেক অজানা তথ্য। ইতিহাসের অমূল্য বর্ণনা। দেশের সংবাদ মাধ্যমে কারো কারো স্মুতিচারণ ও বাহবা কুড়ানোর সাথে বাস্তবতার ফারাক রীতিমত জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হয়। সাধারণ প্রবাসিদের দান ও অবদানকে তথাকথিত শিক্ষিতজন কুক্ষিগত করে ফেলেছেন বলে উষ্মা প্রকাশ করেন ইউসুফ চৌধুরী। তার মতে, যারা তখনকার মিছিল সমাবেশে কোন চাঁদা দিয়ে কিংবা মানুষজনকে বিক্ষোভ সমাবেশে জড়ো করতে কোন ভূমিকাই রাখেনি। বরং মাঝে মধ্যে এসে সামনে থেকে দু চারটা ছবি তুলতেন। তারা এখন ঢাকায় বসে প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বনে গেছেন।

এই আলোচনা থেকে মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসিদের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সাথে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত একাত্তরের আন্দোলনকারীদের নিয়ে অনুষ্ঠান করার মাধ্যমে প্রকৃত মুক্তিসংগ্রামী মানুষদের মূল্যায়ন করার উদ্যোগ গ্রহন করা হয়। হাফিজুর রহমান তার কয়েকজন বন্ধুকে একত্রিত করেন এবং বিস্তারিত আলোচনার পর আমরা সকলের মোবাইল নাম্বার দিয়ে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি ও পরে বিজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে সর্বস্তরের জনগনকে অংশ গ্রহনের আহবান জানাই।

২০০০ সালের ১৪মে বার্মিংহ্যামের স্মলহীথ কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত এই মহতি অনুষ্ঠানে গ্রেট বৃটেনের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ গ্রহন করেন। সোশ্যাল হিষ্ট্রি এন্ড রিসার্চ গ্রুপ ও আমরা ১১ জনের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ ফটো-সাংবাদিক ও সেন্টারের পরিচালক ইউসুফ চৌধুরী।

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত একাত্তরের আন্দোলনকারীদের নিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামকে প্রচার মাধ্যমে বিশ্বচরাচরে ছড়িয়ে দিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়, অর্থের যোগান, অস্ত্র ক্রয়ের ব্যবস্থা এবং মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে প্রবাসিরা যে ভূমিকা পালন করেছেন তা বাংলাদেশের মানুষ কখনো ভুলবে না। অনন্তকাল ধরে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

বক্তারা যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মত একাত্তরের আন্দোলনকারীদের নিয়ে অনুষ্ঠান ও পদক প্রদানকে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এ কাজ সরকারীভাবে করা উচিত ছিল। বাংলাদেশের সরকার সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আগামীতেও এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তারা বলেন, নতুন প্রজন্মকে সত্যিকার ইতিহাস জানানোর জন্য এর বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ দূতাবাসের সহকারী রাষ্ট্রদূত এনামুল কবির, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব সভাপতি ও নতুন দিন সম্পাদক মহিব চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করি আমি সাঈদ চৌধুরী। উদ্যোক্তাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মোঃ হাফিজুর রহমান, আবুল কালাম আজাদ ছোটন, এলাইছ মিয়া মতিন, শাহ আবিদ আলী, আব্দুল মোতালিব চৌধুরী, সেলু মিয়া ও ইসরাইল মিয়া।

উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাপ্তাহিক পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ নাহাস পাশা, মুক্তিযোদ্ধা সবুর চৌধুরী, বদরুন্নেছা পাশা, তজম্মুল হক টনি, ফরিদা বেগম, মতিয়ার চৌধুরী, ইকবাল আহমদ চৌধুরী প্রমুখ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন জালাল আহমদ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সৈয়দ হেমায়েত কবীর।

ইউসুফ চৌধুরীকে কাপ ও মাল্য প্রদান করেন মুক্তিযোদ্ধা মিছির আলী। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সঙ্গীত পরিবেশন করেন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। চিত্র প্রদর্শনীতে সহায়তা করেন মকবুল চৌধুরী, সেরওয়ান চৌধুরী ও নাসের চৌধুরী। একাত্তরে বিলেত প্রবাসী গ্রন্থ ক্রয় করে উপস্থিত সকলকে ফ্রি প্রদান করেন অধ্যাপক শাহীন চৌধুরী।

সহকারী রাষ্ট্রদূত এনামুল কবির তার বক্তব্যে স্বাধীনতা সংগ্রামে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ঠিক এই ফর্মে আমরা আমাদের স্বাধীনতা চাইনি। আমরা পাকিস্তানের সেন্টার সরকারে ইলেকশনে জয়লাভ করে কর্তৃত্বের ম্যান্ডেট পেয়েছিলাম। তারা দেয়নি। বন্দুকের গুলীতে জবাব দিয়েছে। আমরাও অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছি। আর প্রবাসিরা আমাদের সংগ্রামকে বিশ্বচরাচরে মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

নতুন দিন সম্পাদক মহিব চৌধুরী তার বক্তৃতায় মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান বিশ্বে ৮০% ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে যুদ্ধ জয় করতে হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রবাসিরা এ কাজটি করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের মন্ত্রী আমলারা এখানে আসলে আমাদের তাৎক্ষণিক খুশি করার জন্য দু’একটা প্রশংসা সূচক কথা বললেও ফিরে গিয়ে তারা সব ভুলে যান। প্রবাসিদের মূল্যায়ন কিংবা অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাস্তবে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।

অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ মুক্তিযুদ্ধের চিত্র প্রদর্শনীতে ইউসুফ চৌধুরীর নিজস্ব তোলা ৭৪টি ফটোসহ বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছবি ছিল। মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমাম, ওসমানীসহ যুদ্ধের সময়কালীন যুক্তরাজ্য, ভারত ও বাংলাদেশে আন্দোলনের চালচিত্র এতে সময়ের সাক্ষী হিসেবে চিত্রিত হয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ৬ ডিসেম্বর ২০০২ সালে ৭৫ বছর বয়সে ইউসুফ চৌধুরী ইহকাল ত্যাগ করেন। তবে প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন তাঁর অনন্য কর্ম। অ্যান অ্যালবাম অব বাংলাদেশ লিবারেশন মুভমেন্ট। এই বইয়ে নতুন প্রজন্ম জানবে ১৯৭১ সালে বিলাতের রাজপথে ক্যামেরা নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিলেন আমাদের প্রিয় বীরযোদ্ধা ইউসুফ চৌধুরী। বিলাতে মুক্তি সংগ্রামের আন্দোলন মুখর দিন গুলোতে তাঁর ক্যামেরায় তোলা আলোকচিত্রগুলো বাঙালির আগুনঝরা দিনের একেক টুকরো গল্প।

এখানে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করতে হয়, ইউসুফ চৌধুরীর ঐতিহাসিক আলোকচিত্র গুলো অ্যালবাম আকারে প্রকাশ করেছেন প্রবাসী লেখক ড. রেনু লুৎফা ও গবেষক ফারুক আহমদ। ২০০৪ সালে তারা দ্য এথনিক মাইনরিটি অরিজিনাল হিস্ট্রি অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার ইউকের মাধ্যমে যুদ্ধদিনের ছবি নিয়ে প্রকাশ করেছেন ‘অ্যান অ্যালবাম অব ১৯৭১ বাংলাদেশ লিবারেশন মুভমেন্ট’।


  • 40
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    40
    Shares

আরও পড়ুন

এক লন্ডন প্রবাসীর মহতি উদ্যোগ লাউয়াই মাদ্রাসায় ১০ শতক ভূমি প্রদান

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: ইসলামী শিক্ষার...

সংযোগ স্বাভাবিক রাখতে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে

         সিলেটে বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক হলেও...

*জিজিএ মেধাবৃত্তি’১৮এর ফলাফল প্রকাশিত *

         জিজিএ এডুকেশন গ্রুপ কর্তৃক আয়োজিত...

বঙ্গবন্ধু ছিলেন শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের আপনজন

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের...