লন্ডনে যাপিত জীবন – ১৪ শাহগির বক্ত ফারুক তাপময় যৌবনের প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ০২ জুন, ২০২০     আপডেট : ১ মাস আগে

 

সাঈদ চৌধুরী :

বৃটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের (বিবিসিসি) সাবেক প্রেসিডেন্ট ও কনজারভেটিভ দল থেকে বৃটিশ পার্লামেন্টে ২বার প্রতিদ্বন্দ্বী অধ্যাপক শাহগির বক্ত ফারুক একজন দক্ষ ও মননশীল ব্যক্তিত্ব। ছাত্রজীবন থেকেই মেধাবী, নিষ্ঠাবান ও সেবামন্ত্রে উজ্জীবিত। আপদে বিপদে যেকোন সমস্যা মোকাবেলায় অন্যকে সহযোগিতা করাই যেন তার মৌলিক দায়িত্ব। কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত থেকে নিজ যোগ্যতা ও সততার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। ২০০০ সালে ক্যানারি ওয়ার্ফ গ্রুপ কর্তৃক দ্যা ফ্রিডম অব লন্ডন সিটি সম্মাননা লাভ করেছেন তিনি।

অধ্যাপক শাহগির বক্ত ফারুক বিলেতে কনজারভেটিভ পার্টির সবচেয়ে পুরনো বাংলাদেশী সদস্যদের অন্যতম। ২০০০ সালে বৃটেনের রাণী কুইন এলিজাবেথ লন্ডন মিলেনিয়াম ব্রিজ উদ্বোদন করেন, যেখানে শাহগির বক্ত ফারুকও ছিলেন এবং এই ব্রিজে তার নাম উৎকীর্ণ আছে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজর কর্তৃক ১৯৯৬ সালে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে আমন্ত্রিত হন তিনি। ২০০১ ও ২০০৫ সালে বৃটিশ পার্লামেন্টে কনজারভেটিভ পার্টি থেকে বেথনাল গ্রিন এন্ড বো আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

অধ্যাপক শাহগির বক্ত ফারুক ৫ বছর কনজারভেটিভ এসোসিয়েশন বেথনাল গ্রিন এন্ড বো অঞ্চলের চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমানে অনারারি ভাইস চেয়ারম্যন হিসেবে সামগ্রীক সহায়তা অব্যাহত রেখেছেন। ২০০৬ সালে তিনি কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভুমিকা পালন করেন। এখনো তিনি এই সংগঠনের অনারারি ভাইস প্রেসিডেন্ট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স ডিগ্রীধারী শাহগির বক্ত ফারুক বিলেতে এসে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডাইরেক্টর অব চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হ্যাল্থ, রয়্যাল সোসাইটি অব পাবলিক হ্যাল্থ এবং হাইফিল্ড কুয়ালিফিকেশন থেকে বিশেষ কোর্স করেছেন। এখানকার ফুড হাউজিন বিষয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ বই রয়েছে। ২০১৬ সালে তার বহুল আলোচিত ‘বৃক লেন : বাড়ি টু বাসা’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে। এ এক অন্যরকম রচনাসৌকর্য, বেশ দারুণ ও মোহনীয়। আর তিনি যেন তাপময় যৌবনের প্রতিনিধি।

বৃটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের (বিবিসিসি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ডাইরেক্টর শাহগির বক্ত ফারুক বিবিসিসি’র প্রেসিডেন্ট হবার আগে ডাইরেক্টর কমিউনিকেশন ও লন্ডন রিজিওনাল প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বাংলাদেশে ২বার এবং ইউনাইটেড ন্যাশনে ১বার বিবিসিসি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

অধ্যাপক শাহগির বক্ত ফারুক বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন, বৃটিশ বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন, গ্রেটার সিলেট ডেভেলপমেন্ট এন্ড ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল সহ অনেক সংস্থা ও সংগঠনের নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অস্কার খ্যাত বৃটিশ কারি এওয়ার্ডের অন্যতম প্যানেল জাজ হিসেবেও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০০০ সালে বিলেত এসে যেদিন বৃকলেন ঘুরলাম, মনটা ভরে গেল। দেশের বাইরে একথন্ড বাংলাদেশ। বাংলা সংস্কৃতির এক চমৎকার মিলন কেন্দ্র বৃকলেনের সঙ্গীতা বুকশপ। বাংলা বই-পত্র, সিডি-ডিভিডি, ম্যগাজিন কত কিছূ। সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে আমাদের হুমায়ূন আহমেদ, আল মাহমুদ, ইমদাদুল হক মিলন প্রমুখের বই থরে থরে সাজিয়ে রাখা আছে।

মজার ব্যাপার হলো সঙ্গীতায় এসে নিজের বইয়ের খোঁজ পেলাম। এমন একটি সংস্করণ যা বাংলাদেশে নিজেও দেখিনি। কেমনে কি বুঝতে পারলাম না। তবে আমার উপন্যাস ’ছায়াপ্রিয়া’ আমার আগে বিলেত এসেছে দেখে ভালই লাগল। মনে হল আমার চেয়ে আমার লেখার শক্তি ও পরিধি অনেক বড়।

সঙ্গীতায় দেখা হল হামিদ মনসুরের সাথে। হামিদ সিলেট আলিয়া থেকে ফাজিল দিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সাথে বিএ পরীক্ষার্থি ছিলেন। অনেক দিন পর তার সাথে সাক্ষাৎ। তিন বছর আগে বিলেত এসেছেন। কথা বলতে বলতে আমাকে নিয়ে গেলেন প্রিন্সলেস স্ট্রিট শাহনান এমপ্লয়মেন্টে। সেখানে ১০ পাউন্ড দিয়ে একটা ঠিকানা নিয়ে দ্রুত ছুটে গেলেন নতুন কর্মক্ষেত্রে।

আমাকে আটকিয়ে দিলেন এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সির মালিক শাহগির বক্ত ফারুক। দেশের বাড়ি সুনামগঞ্জ। আমার শশুর বাড়ি সুনাগেঞ্জের দরগাপাশা। শশুর আবু বকর চৌধুরীও তার বেশ ঘনিষ্ট। আমাকে চা পানে আপ্যায়িত করলেন।দেশের খোঁজ খবর নিলেন। তারপর বিলেত প্রসঙ্গের অবতারণা হল। জোহরের নামাজের পূর্ব পর্যন্ত সেখানে ছিলাম। অনেক ইতিহাস জানা হল। তিনি বললেন, ভারত অঞ্চলের মজাদার খাবারে জন্য ১৮৭৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কয়েকজন সিলেটি রন্ধন শিল্পীকে নিয়ে আসে বৃটেনে। আর এরাই ছিলেন বিলেত আসা প্রথম ধাপের বাংলাদেশী। পরবর্তিতে একই ধারায় বিভিন্ন সময়ে আরো কিছু লোক এসেছেন। তবে গত শতাব্দির সূচনা কালে এ সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে।

১৯২৫ সালে প্রবাসিরা তাদের আত্বীয় স্বজনদের নিয়ে আসেন স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য। ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সালে একটি বড় অংশ সিলেটি বিলেত আসেন। তারপর এসেছেন বিয়ে-শাদির সুবাদে ও পড়াশোনার জন্য। এছাড়া বংশানুক্রমেও সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটেছে। ৭০ দশকে বিপুল সংখ্যক লোক এসেছেন এবং লন্ডন ছাড়াও লোটন, ব্রাডফোর্ড, বার্মিংহাম, ওল্ডহাম, কার্ডিফ, মানচেষ্টার, নিউক্যাসল সহ বিলেতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছেন। কিন্ত দেশে তাদের সকলের পরিচয় তারা লন্ডনি।

অধ্যাপক শাহগির বক্ত ফারুক আরো বললেন, এখানে বর্ণবাদ ও বেকার সমস্যা প্রকট ছিল। জীবনমান খুব কঠিন। জনসংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি এবং স্বাস্থ্যগত সমস্যাও রয়েছে। নতুন অভিবাসী প্রাথমিক ভাবে নিম্ন আয়ের খাতগুলোতে নিযুক্ত হতেন। কর্মস্থল প্রধানত ছিল কারখানা ও বস্ত্রশিল্প, তারপর ক্যাফে ও রেস্তোরা। এখানে রয়েছে বিপুল সংখ্যক দক্ষিণ এশীয় রেষ্টুরেন্ট যা ইন্ডিয়ান হিসেবে প্রসিদ্ধ, যদিও এর মালিক বেশির ভাগই বাংলাদেশী। অভিবাসিদের একটি বড় অংশ লন্ডনের বৃকলেন এলাকায় বসবাস শুরু করেন। ধীরে ধীরে বাংলাদেশী সংস্কৃতি ও জীবন যাত্রার প্রভাব ও অবস্থান দৃঢ় হতে থাকে।

শুরুর দিকের বাংলাদেশী মানুষ মূলত পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস অঞ্চলের ছোট কামরা বিশিষ্ট বাসস্থানে বসবাস করতেন। এদের মাঝে অধিকাংশই ছিলেন স্বল্পশিক্ষিত এবং ইংরেজি ভাষায় অদক্ষ। এর ফলে স্থানীয় ইংলিশদের সাথে সহজে মনের ভাব প্রকাশে অক্ষম ছিলেন। এমন সব কঠিন বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন তিনি। সম্প্রতি তার প্রকাশিত বইয়ে এসব বিষয় চমৎকার ভাবে আরো সমৃদ্ধ আকারে তুলে ধরেছেন দেখে বেশ মুগ্ধ হলাম।

লন্ডন হিস্টরিক সোসাইটির মেম্বার অধ্যাপক শাহগির বক্ত ফারুক শিক্ষা ও গবেষণায় এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। মননশীল চেতনা, ইতিহাস ও নীতিজ্ঞান এবং সত্য সুন্দরের মহিমায় তার সমাজকর্ম সমৃদ্ধ। দূর-দুরান্ত থেকে আসা সেবা গ্রহীতাদের সঠিকভাবে সেবা নিশ্চিত করাই যেন তার দায়িত্ব। তিনি প্রতিটি কাজের সুষ্ঠু সমাধান দিয়ে থাকেন। তার কাছ থেকে কাজ পাওয়ার পর সেদিন বড্ড তাড়াহুড়ো করে চলে গেলেন হামিদ মনসুর। দু’দিন পরে আমাকে ফোন করে বললেন, আমি যেন তার প্রতি মন খারাপ না করি। কাজটা তার খুবই দরকার ছিল। কোনভাবেই যাতে ছুটে না যায়, সেজন্য কাল বিলম্ব না করে চলে গেছেন।

আমি বিলেত আসার পরদিন সাপ্তাহিক নতুন দিনে যোগদান করি। মূলত দেশে থাকতেও এই সাপ্তাহিকের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। এজন্য আমাকে কাজ খুঁজতে হয়নি। এরমাঝে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর দ্যা ট্রেইনিং অব জার্ণালিজম (এনসিটিজে) থেকে সাংবাদিকতার উচ্চতর প্রশিক্ষণ এবং লন্ডন গিল্ডহল ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার বিষয়ে কোর্স সম্পন্ন করে সাপ্তাহিক ইউরো বাংলা প্রতিষ্ঠা করি। এতে নিজের কাজ নিজে করার মত একটা অবস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে কাজ না পাওয়ার সমস্যা খুব একটা গভীর ভাবে জানা হয়নি।

২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে লন্ডনের রাস্তায় কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছে বাঙ্গালী শিক্ষার্থিরা। তখন পূর্ব লন্ডনের এলএমসিতে আমার অফিস। বৃকলেন বাংলা টাউন আর হোয়াইটচ্যাপেল এর মধ্যবর্তী স্থান বা প্রাণকেন্দ্র বলা যেতে পারে। বিকেলে অফিস থেকে বেরিয়ে আলতাব আলী পার্কের দিকে তাকাতেই দেখি অসংখ্য তরুণ। সংবাদপত্রের মানুষ হিসেবে কোন সভা সমাবেশ হলে জানার কথা। একটু এগিয়ে গেলাম সেখানে। দেখলাম এরা সকলেই শিক্ষার্থী। কাজ-কর্ম না পেয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার তারা। বাংলাদেশ থেকে নবাগত। ন্যুনতম মুজুরির বিনিময়ে যে কোন কাজ করতে রাজি। কিন্তু কিছুই পাচ্ছেনা। যেনো-তেনো একটি কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে বৃকলেন ও আশেপাশের পথে-ঘাটে।

দুই জনের সাথে কথা বলে যে করুণ চিত্র ফুটে উঠল, তাতে আমার মত দূর্বল চিত্তের মানুষ বাসায় ফেরা কঠিন। আমি তাদের নিয়ে শাহনান এমপ্লয়মেন্টে গেলাম। কিন্তু শাহগির বক্ত ফারুক সেদিন অসিসে নেই। ম্যানেজারের সাথে কথা বলে এই দুইজনের কাজের ব্যবস্থা হল। এজেন্ট ফি আমি দিয়ে দিলাম। তারপর যখন বিদায় নেব, একজন লজ্জা মিশ্রিত ভাবে বলল, তাদের কাছে ভাড়ার পয়সা নেই। সে ব্যবস্থাও করলাম।

বাকি যাদের মাঠে দেখে এসেছি তাদের কথা চিন্তা করে অফিসে অবার ফিরে গেলাম। পরিস্থিতি নিয়ে অনেক্ষণ ভাবলাম। আল্লাহর মেহেরবানীতে মাথায় একটা আইডিয়া আসল। পরিক্ষামূলক ভাবে আমার ইউকে বাংলা ডাইরেক্টরি ও ইউকে এশিয়ান ডাইরেক্টরির লিস্ট ধরে ধরে টেলিফোন শুরু করলাম। গাভনারদের কাছে শিক্ষার্থিদের সমস্যা তুলে ধরে তাদের জন্য আশ্রয় চাইলাম। রেষ্টুরেন্টের কাজ দিলে বাড়তি হিসেবে মালিকের ছেলে-মেয়েদের বাংলা বা আরবি শিক্ষা লাভের অবকাশ আছে বলেও জানালাম।

বিকেল ৫টা থেকে রাত এগারটার মধ্যে ২৫ জনের ব্যবস্থা হল। অফিসে তখন মাত্র দুজন স্টাফ আর আমি। তিনজনে মিলে পরের দিন চেষ্টা করে বেশ সফল হলাম। যারা ইতিমধ্যে কাজ পেয়েছে, তাদেরও সহায়তা নিলাম। তারাও অন্যদের জন্য ডাইরেক্টরির লিষ্ট মোতাবেক যোগাযোগ শুরু করল। প্রতিদিন প্রায় শতাধিক মানুষের কর্ম সংস্থান হল। একমাসে একটা নিরব বিপ্লব সাধন করে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। আমরা কোন মিডিয়াকে এই চেষ্টা-সাধনার কথা বলিনি। কিন্তু দুই চার জনকে সহায়তা কিংবা তাদের জন্য মতবিনিময় করে অনেকে সংবাদপত্রে খবর পাঠিয়েছেন দেখে তাজ্জব হয়েছি।

এই সময় আমি শিক্ষার্থিদের বিড়ম্বনার চিত্র দেখেছি, বিশেষ করে যাদের কোন আত্মীয় স্বজন এখানে নেই। আর তখনই শাহনান এমপ্লয়মেন্ট ও শাহগির বক্ত ফারুক ভাইয়ের সার্ভিসের কদর অনুভব করেছি। তখন আমার কাছে মনে হয়েছে, ব্যবসার জন্য তিনি যে সামান্য ফি নিযে থাকেন, তা কিছুই নয়। এটা একটা অর্থবহ সমাজসেবা বলেই আমার কাছে প্রতিয়মান হয়েছে।

শাহগির বক্ত ফারুক একজন উচ্চ শিক্ষিত বাংলাদেশী। একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়া জাগানো ছাত্র। বিলেতে এসে অন্য কাজে না জড়িয়ে নিজের সামান্য আয়-উপার্জনের পাশাপাশি গণ মানুষের উপকার যাতে হয়, সে পথ বেছে নেন। শুরু করেন বেকার লোকজনের চাকরির ব্যবস্থা। শুধু কি চাকরি দেয়া? কর্মচারি সংকটে রেষ্টুরেন্ট বন্ধ করা বা কাষ্টমার সার্ভিস ঠিকমত দিতে না পারার কারণে ব্যবসার সর্বনাশ হবার মত অবস্থা থেকে মালিকের বাঁচানোও ছিল তার কাজ। এই কাজে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। নিরব সাধক।

বিলেতে প্রবাসিদের মধ্যে চাকরি নেই মানুষজনের সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি। প্রতিবছর নতুন করে লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। চাকরি পায় ক’জন। যারা নতুন কাজ খুঁজছেন, তারা জানেন একটি ভাল কাজ পাওয়া কতটা কঠিন। এই সংকটে যারা অনভিজ্ঞ তারা বিষয়টি অনুধাবন করা সহজ নয়। আসলে চাকরির অভাব নেই। অভাব হচ্ছে সংযোগ সাধনের। শাহনান এমপ্লয়মেন্ট এই অনন্য সাধারণ কাজটা করেছে বছরের পর বছর। আজকাল বহু সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু তখন কোন বিকল্প ছিলনা। কত শত সহস্র লোকের আয় রোজগারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন শাহগির বক্ত ফারুক।

অবিবাহিতদের চাকরি নেই, মানে ঘড়বাড়া নেই। চাকরি নেই, মানে খাবারের ব্যবস্থা নেই। কী অসহায়ত্ব! আর বিবাহিতদের চাকরি নেই, মানে সংসার নষ্ট। শাহগির বক্ত ফারুক তাদের অভিভাবক। হৃদয় দিয়ে তিনি তাদের কাজের ব্যবস্থা করেন। মোটিভেশনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বৃদ্ধি ও ঘর সংসার ঠিক রাখেন। একাজ সকলের দ্বরা সম্ভব নয়। এমনকি অনেকে এর প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব বুঝা প্রায় অসম্ভব।

আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা এক ধরণের বাঙ্গালিয়ানা অহংবোধ, চাপাবাজি ও আত্ম অহংকারের খেলায় জড়িয়ে পড়েছি। নিজেদের মানুষকে অবহেলা করতে বা গালি দিতে পারলেই একটু সুখ অনুভব করি। সমাজের জন্য তার অবদান ও সৃষ্টিশীল কর্মকান্ডকে তুলে ধরা তো দূরের কথা, তাকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে আমরা খুবই পারঙ্গম। এর প্রমান মিলে শাহগির বক্ত ফারুক যখন বৃটেনের কনজারভেটিভ তথা টোরি দল থেকে পার্লামেন্টে দাড়ালেন তখন আমরা তাকে সঙ্গবদ্ধ ভাবে ভোট দেইনি। দিলে ২০০১ সালেই বৃটেনের হাউজ অব কমন্সে আমাদের অভিষেক হত।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অধ্যাপক শাহগীর বক্ত ফারুক রচিত ‘বৃকলেন : বাড়ি টু বাসা’ গ্রন্থের প্রকাশনা ২০১৬ সালের ২২ মার্চ মঙ্গলবার বৃটিশ হাউস অব লর্ডসে অনুষ্ঠিত হয়। হাউস অব লর্ডসের সদস্য ব্যারোনেস পলা মনজিলা উদ্দিনের সঞ্চালনায় লেখক শাহগির বক্ত ফারুকের কর্মময় জীবন ও তার বই নিয়ে আলোচনা হয়। পরে পার্লামেন্ট প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয় মিডিয়া ব্রিফিং।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বৃটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটির সংগ্রাম ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কাহিনী থেকে পরবর্তী প্রজন্ম উৎসাহিত হবে। শাহগির বক্ত ফারুক সুদীর্ঘ চল্লিশ বছরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বইটি লিখেছেন। তিনি তার গ্রন্থে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় কমিউনিটির নানা চিত্র ও কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বৃটিশ কারি এওয়ার্ডের প্রবর্তক এনাম আলী এমবিই, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের স্পীকার কাউন্সিলার আব্দুল মুকিত চুনু এমবিই, বৃটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহতাব চৌধুরী, তৎকালীন ডাইরেক্টর জেনারেল মহিব চৌধুরী, বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি এম এ মুনিম, বৃটিশ বাংলাদেশী ক্যাটারার্স এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ইয়াফর আলী, কাউন্সিলার পারভেজ আহমদ, কাউন্সিলার আয়শা বেগম, ড. আবুল কালাম আজাদ, এনটিভির সিইও সাবরিনা হোসেইন, কলামিস্ট শাহিদা রহমান, কবি সালমা বখত চৌধুরী, ড. জাকি রেজওয়ানা আনওয়ার, টিভি প্রেজেন্টার নাদিয়া আলী, সংস্কৃতিকর্মী গোলাম মোস্তফা।

প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট জনের মধ্যে অংশগ্রহণ করেন, বাংলাদেশ হাইকমিশনের কমার্শিয়াল কনস্যুলার শরীফা খান, লেখক শাহগির বক্ত ফারুকের সহধর্মিনী শেরিনা ফারুক, বিবিসিসি’র বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও তৎকালীন লন্ডন রিজিয়নের প্রেসিডেন্ট বশির আহমদ, ডাইরেক্টর শফিকুল ইসলাম, ক্যাটারার্স এসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অলি খান, সাপ্তাহিক দেশ সম্পাদক তাইছির মাহমুদ, চ্যানেল এস এর চীফ রিপোর্টার মুহাম্মদ জুবায়ের, একাউন্টটেন্ট আবুল হায়াত নুরুজ্জামান, ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর ফিরোজ, ওয়েম্যান এন্টারপ্রেনার দিলারা খান, সাংবাদিক এম এ কাইয়ূম, এনটিভি’র চীফ রিপোর্টার আকরাম হোসেইন, রিপোর্টার সুমন আহমদ, বাংলা টিভির রিপোর্টার আব্দুল কাদির মুরাদ, চ্যানেল আই’র রিপোর্টর মোঃ আব্দুর রশিদ, ব্যবসায়ী এ.কে আজাদ, ক্যাটারার্স নেতা মালিক আজাদ, আজমল হোসেইন ও সাঈদুর রহমান, কনজার্ভেটিভ নেতা সৈয়দ সাঈদ আহমদ, সংস্কৃতিকর্মী সাঈদা চৌধুরী প্রমুখ।

অনষ্ঠিানে ব্যারোনেস পলা মনজিলা উদ্দিন বলেন, ‘বৃকলেন : বাড়ি টু বাসা’ বইটি পড়ে যে কেউ বৃটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটি সম্পর্কে জানতে পারবে, বুঝতে পারবে। এটি একটি দলিল ও রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে গণ্য হবে।

অস্কার খ্যাত বৃটিশ কারি এওয়ার্ডের প্রবর্তক এনাম আলী এমবিই বলেন, বৃটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটির সত্যিকারের ইতিহাস যতো বেশি লেখা হবে, ততই বিভ্রান্তিকর তথ্য হারিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে শাহগির বক্ত ফারুকের গ্রন্থ একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত।

বক্তারা গ্রন্থ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি লেখক শাহগির বখত ফারুককে একজন অমায়িক সজ্জন ব্যক্তি আখ্যায়িত করে বলেন, তার জীবনের অভিজ্ঞতা তিনি সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। তার বইয়ে কমিউনিটির চ্যালেঞ্জ, সংগ্রাম ও সাফল্য ফুটে উঠেছে। শাহগির বক্ত ফারুক সকলকে বইটি পড়ার আহবান জানিয়ে বলেন, বর্তমানে লন্ডনের বিভিন্ন বুকশপ ছাড়াও আমাজনে পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে ২০১৬ সালের ১৬ মার্চ বুধবার অধ্যাপক শাহগির বক্ত ফারুক রচিত “বৃকলেন : বাড়ি টু বাসা” গ্রন্থের মোড়ক উন্মেচন হয় বৃকলেন প্রেম রেস্টুরেন্টে। কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও সূধীজনের উপস্থিতিতে বেশ আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। বৃটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের ডাইরেক্টর জেনারেল (পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট) মহিব চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও একাউন্টেন্ট আবুল হায়াত নুরুজ্জামানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন কবি ও কলামিস্ট অধ্যাপক ফরিদ আহমদ রেজা।

মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব সাংবাদিক-কলামিস্ট কেএম আবুতাহের চৌধুরী, গ্রেটার সিলেট কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট নুরুল ইসলাম মাহবুব, বৃটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বশির আহমদ, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমাদুর রশিদ, ক্যাটারার্স এসোসিয়েশনের সাবেক সেক্রেটারি আশরাফ উদ্দিন, ক্যাটারার্স নেতা আলহাজ্ব মানিক মিয়া, ব্যবসায়ী এম এ মতিন, বৃটিশ বাংলাদেশী ক্যাটারার্স এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি শাহানুর খান, সাবেক কাউন্সিলার আবদাল উল্লাহ, কাউন্সিলার আতিকুল হক, সাপ্তাহিক দেশ সম্পাদক তাইছির মাহমুদ, জনমতের বার্তা সম্পাদক মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, সাংবাদিক আনসার আহমদ উল্লাহ, সাংবাদিক মিছবাহ জামাল, কলামিস্ট ড. মুজিবুর রহমান, ব্যবসায়ী আজমল হোসেইন, একাউন্টেন্ট শহীদ আলী, আলী মুহাম্মদ জাকারিয়া, খালেদ আহমদ, মনির আহমদ, শেখ মুহাম্মদ ইয়াওর, এ হালিম, পারভেজ কোরেশী, নাসির উদ্দিন, আশিকুর রহমান, নাজিনুর রাহিম, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, শাহ এ মালিক, জামাল আহমদ, তারাউল ইসলাম, শফিকুর রহমান, আব্দুল মুমিন, সালেহ আহমদ প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, শাহগীর বক্ত ফারুক ১৯৭০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বৃকলেন তথা বৃটেনের বাঙালি কমিউনিটির উত্থানের ইতিহাস রচনা করেছেন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। এই বইটি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তথ্য-উৎস হিসেবে ভুমিকা রাখবে। গ্রন্থটিকে কমিউনিটির মিরর উল্লেখ করে বলেন, আয়নায় তাকালে যেভাবে নিজের চেহারা ভেসে উঠে এই গ্রন্থ পড়লে ঠিক তেমনী আমরা আমাদের কমিউনিটির চিত্র দেখতে পারবো। অধ্যাপক শাহগির বক্ত ফারুক তার জীবদ্দশায় আমাদের কমিউনিটির জন্য একটি বড় অবদান রাখলেন। এ জন্য তিনি প্রশংসার দাবীদার।

বৃহত্তর সিলেটের কৃতি ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক শাহগির বক্ত ফারুক ১৯৪৮ সালে সুনামগঞ্জের আরেফিন নগরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বিলেত আসেন। তার বাবা আলহাজ শাহ বক্ত একজন ব্যাংক কর্মকর্তা ছিলেন। তার বোন সালেহা খাতুন সুনামগঞ্জের প্রথম মহিলা ডাক্তার। তার ছোট ভাই হুমায়ুন বক্ত সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ছিলেন। বৃটেন ও আমেরিকার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং ইউনাইটেড ন্যাশনের শান্তি মিশনে বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আরও পড়ুন

সিলেট প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দের শোক

সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্য ও ইন্ডিপেনডেন্ট...

নগরীতে ফারহীন অটো ফ্লাওয়ার মিলস’র উদ্বোধন

পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি...