রোকেয়া বানু

,
প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

 সৈয়দ সাকিব আহমদ
লোকমান মিয়া। মাতব্বর সাহেবের খাস
চাকর লোকমান মিয়া। ষাটঊর্দ্ধো বয়স,
ফর্সা মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি,লম্বা
চুল। সারাজীবন বিচার-সালিশ করেই চুল
দাড়ি পাকিয়েছেন মাতব্বর সাহেব।
নাম জমিরুদ্দিন খা। যেমন ধনি ঠিক
তেমনই কৃপন। মুখ খুলবে তবুও হাত খুলবে
না। বিরাট জায়গা জমির মালিক। অনেক
ফসল। অনেক টাকা। পূবের জানালার
পাশে দাঁড়িয়ে নিজের সম্পদের হিসাব
রাখান জন্য লোক রাখবেন ভাবেন,
কিন্তু টাকা! টাকা দিতে হবে হবে
মাসে মাসে। তার মানে সম্পদের জন্য
সম্পদ খরচ হবে। নাহ! এটা নিতান্তই
বোকামি। লোক রাখা যাবে না। বরং
নিজের এর হিসাব রাখবেন। একটা
ছেলে থাকলে ভালো হতো,তাও
নেই।ছোট শালা তো কোনো কাজেরই
না।ওকে দিয়ে কিছু করানো যাবে না।
বিশ্বস্তদের মধ্যে লোকমান মিয়াই
আছে। নুন খেলেও গুন গাইবে,না
খেলেও গাইবে। কখনো বেঈমানি
করবে না। এই বিশ্বাস টুকো জমির
উদ্দিনের লোকমান মিয়ার প্রতি আছে।
রোজ রাতেই সালিশ থাকে। হাতে
হারিকেন নিয়ে সাথে থাকেন
লোকমান মিয়ে। বিভিন্ন জায়গায়
যেতে হয় বিচার সালিশের জন্য।
লোকমানও পাকা মানুষ। খুবই ভালো।
বাড়ি ফিয়ে মা হারা একমাত্র
মেয়েটির দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট ভুলে
যায় সে। মেয়েটির জন্যই এসব করছে
সে।এতটুকো কষ্ট কিছুই না। মেয়ের
হাসিমুখ তার সব দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।
মেয়েটির নাম রাকেয়া বানু। হাল্কা
পাতলা গঢ়ন, লম্বা দেহ, বয়স বেশি হলে
১৮-১৯, শ্যমলা বর্ণের গোল মুখ।
একদিন সকালে লোকমান মেয়েকে
বললেন তার বেগুন বর্তা খাওয়ার খুব শখ
হয়েছে। মায়ের মতোই বেগুন বর্তা
করতে পারে রোকেয়া। লোকমান
মিয়ার খুবই প্রিয় জিনিস। দুপুরে গরম
ভাতের সাথে একটি বেগুন বর্তা, আহ!
সমস্ত কিছুকেই হার মানায়।
লোকমান মিয়া কাজে চলে গেলেন।
ঘরে বেগুন নেই। থাকার কথাও না।
তাহলে কিভাবে হবে বাবার বেগুন
বর্তা? সকালে বাসন মাজতে মাজতে
এসবই ভাবছে রোকেয়া। একটা বুদ্ধি
এসেছে তার মাথায়। মাতব্বর সাহেবের
ক্ষেত থেকে ২-৩ টা বেগুন আনলেই
তো হয়। পূবের ক্ষেতের দিকে হাটা শুরু
করে দিলো রোকেয়া। জমিরুদ্দিনের
ক্ষেতে এবার অনেক বেগুন এসেছে।
২-৩ টা নিয়ে আসলে তেমন কোনো
ক্ষতি হবে না। ক্ষেতে গিয়ে
রোকেয়া বড় বেগন খুজায় ব্যস্ত, ৩ টা
বেগুন নিয়ে নিজের শাড়ির আচলে
বাধতে যাবে এমন সময় জমিরুদ্দিনের
পাহারাদার চুর চুর বলে চেচিয়ে
উঠলো। তাকে ধরে ফেললো
পাহারাদাররা। অনেক ভাবে বুঝালো
রোকেয়া যে সে এখানে চুরি করতে
আসে নি। বাবার জন্য ২-৩ বেগুন নিতে
এসেছে। কেউ শুনলো না তার কথা।
বেগুন চুরির অপরাধে তাকে বেধে
মাতব্বর সাহেবের বাড়িতে নিয়ে
যাওয়া হলো।
” কি! আমার ক্ষেত থেকে বেগুন চুরি
করতে এসেছিলো! মেয়ের সাহস তো
কম নয়! ” চুরির কথা শুনে মাথাটা গরম হয়ে
উঠলো মাতব্বর সাহেবের। বললেন ”
ওকে এখানে বেধে রাখো। সন্ধ্যার
পরেই ওর বিচার হবে”। গায়ের সবার
মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো ‘লোকমানের
মেয়ে বেগুন চুরি করতে গিয়ে ধরা
পড়েছে’। সন্ধ্যার পরে একে একে সবাই
এলেন মাতব্বরের বাড়িতে। সালিশ শুরু
হলো বাড়ির উঠানে। একটা সরু গাছের
সাথে বাধা রোকেয়া, ওর পাশের ঐ ৩
টা বেগুন। মেয়ের পাশেই মাথা নিচু
করে দাঁড়িয়ে আছেন লোকমান মিয়া।
তার মুখে আজ কোনো কথা নেই।
হারিকেনের আলোয় তার পড়ন্ত
চোখের পানি কেউই দেখতে পাচ্ছে
না। রোকেয়া সেটা অনুভব করছে।
সালিশ শুরু হলো, লোকমান মিয়া সবকিছু
বললেন। ওনি বেগুন বর্তা খেতে
চেয়েছিলেন তাই হয়তো ওনার
মেয়ে…লাইনটা শেষ করার আগেই
কান্নার ভেঙে পড়লেন। রোকেয়া
বললো ও চুরি করার জন্য আসে নি। বাবার
জন্য মাত্র ২-৩ টা বেগুন নিতে
এসেছিলো।
কারো কোনো কথাই কাজে এলো না।
জমিরুদ্দিন অনেক অপমান করলেন
লোকমান মিয়া কে। গ্রামের সবাই
তাতে তাল দিলো। জমিরুদ্দিন চুরির
শাস্তি হিসেবে রোকেয়া কে ৪০ টা
বেত্রাঘাত করার আদেশ দিলেন। আরো
বললেন লোকমান মিয়া নিজের মুখে
চুনকালি মেখে মেয়েকে মারবেন।
লোকমান মিয়া নিজের মুখে চুনকালি
মেখে মেয়েকে মারলেন। অনেক কষ্ট
হচ্ছিলো ওনার,মনে হচ্ছিলো নিজের
শরীরে নিজেই মারছেন। কোনো
প্রতিবাদ করলো না রোকেয়া। ওর পিঠ
রক্ত বর্ণ ধারন করলো। হারিকেনের
আলোয় রোকেয়ার কান্না সবাই
দেখছিলো। মেয়েকে শাস্তি দেয়ার
পর সবাই চলে গেলো। মাতব্বর সাহেব
বলবেন ‘ কাল থেকে আর তুমার কাজে
আসতে হবে না লোকমান, নিজের
মেয়েকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে
যেও’।
সবাই চলে যাওয়ার পর মেয়েকে
জড়িয়ে ধরে অনেক কাঁদলেন লোকমান
মিয়া। কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ শক্ত হয়ে
এলেন তিনি। মেয়েকে নিয়ে
বাড়িতে চলে গেলেন। মেয়েকে
বিছানায় শুয়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে
গেলেন তিনি। সারা রাত অচেতনের
মতো বিছানায় পড়ে রইলো রোকেয়া।
সকালে তার হুশ এলো। বাবা কোথায়?
পিঠের ব্যাথায় দাড়াতে পারছেনা
সে। এমন সময় মালেকা বানু ঘরে এলেন।
রোকেয়াকে নিয়ে গেলেন নদীর
ধারের বড় গাছটার পাশে। অনেক
লোকজন দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। দূর
থেকে একটা শব্দ কানে আসছিলো
রোকেয়ার… ‘ লোকমান গলায় দড়ি
দিয়েছে ‘
গাছটার কাছে এসে রোকেয়া
দেখলো তার বাবার দেহটি ঝুলে
আছে! রাতের অপমান হয়তো সহ্য করতে
পারে নি। রোকেয়া তার বাবার
দেহটির দিকে তাকিয়ে রইলো,,কিছুই
বললো না, এক বিন্দুও নড়লো না সে।
অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো তার
বাবার লাশের দিকে। গায়ের লোকজন
মিলে লোকমান মিয়ার লাশ টাকে
নামালো। মাতব্বর সাহেবের বাড়িতে
খবর গেলো যে লোকমান গলায় দড়ি
দিয়ে মরেছে। তিনি এলেন,দেখলেন,
আবার চলে গেলেন। নদীর পাশের কবর
দেয়া হলো লোকমান মিয়া কে। কবর
দিয়ে সবাই চলে গেলো। বাবার কবরের
পাশেই নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলো
রোকেয়া…
ঐ দিনের পর থেকে রোকেয়াকে আর
দেখা যায় নি গ্রামে। আজ পর্যন্তও
কেউ জানেনা রোকেয়া কোথায়
গেছে। কেউ কেউ বলে হয়তো বাবার
সাথে সেও ওপারে পাড়ি
দিয়েছে,নয়তো এখান থেকে চলে
গেছে দূরে,বহুদূরে…


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

কানাইঘাটে ৮ দিন পর কবর থেকে মামুনের লাশ উত্তোলন

         খাসিয়াদের গুলিতে নিহত লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব...

সিলেটে শিয়াবাদ প্রতিরোধ দিবস পালন

251        251Sharesইসলাম ধংসাত্মক বিপর্যয় ইরানে বাতিল...