রীতিমতো সচেতন উপদ্রব

প্রকাশিত : ১৫ নভেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

মোহাম্মদ আব্দুল হক: রসালো সাহিত্য সৃষ্টি নয় এই লেখার উদ্দেশ্য। এটি রীতিমতো উৎপাতসৃষ্টিকারী পোশাকি ভদ্রমানুষের সচেতন কিংবা অচেতন ঘটনায় বিরক্তি প্রকাশ। আমরা এই দেশে এমনিতেই কতো রকম বিরক্তিকর ব্যাপার মান মর্যাদার ভয়ে সয্য করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। কোনো বাসস্টপে দাঁড়িয়ে হয়তো বাসের অপেক্ষা করতে করতে ভাবছি, মাস শেষ হয়ে এলো ঘর ভাড়া দিবো কিভাবে? কিংবা ভাবছি, মহল্লার দোকানে বাকি পড়েছে হাজার পাঁচেক টাকা, বলেছে আজই দিতে হবে। ঠিক তখনই দুদিক থেকে তিন চারজন এসে হাত পেতে চাইতে শুরু করলো, ‘ স্যার কাল রাত থেকে পেটে দানাপানি কিছু পড়েনি, কয়টা টাকা দেন, ভাত খামু।’ এমনও হয়, হয়তো ডাক্তার দেখিয়ে কোনোরকম ভিজিট দিয়ে কেউ প্রেসক্রিপশন নিয়ে বের হইছেন ডাক্তারের চেম্বার থেকে। চেহারায় দুঃশ্চিন্তার ছাপ। কারণ ডাক্তার বেশকিছু টেস্ট লিখে দিছেন এবং সেই সাথে প্রচুর ঔষধ আজই কিনতে হবে। কিন্তু আপনার কাছে এতো টাকা কোথায়? এমন সময় লাঠিতে ভর দিয়ে একজন পথ আগলে বলছে, ‘বাবা আমি শ্বাসকষ্টের রোগী। একটি ইনহেলার কিনার পয়সা নাই, একটু সাহায্য করেন।’ আর মখমল সদৃশ জায়নামাজে এয়ার কন্ডিশনার সংযুক্ত পবিত্র মসজিদ থেকে আপনি পবিত্র জুম্মার নামাজ আদায় করে বের হলে ভিক্ষুকদেরকে সারি সারি ( মহিলা, পুরুষ, শিশু) দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় সারাদেশব্যপী। তারাও টাকা চাইতে গিয়ে কখনও গায়ে হাত দিয়েও আদায় করে নিতে চায়। আজ স্বাধীনতার প্রায় আটচল্লিশ বছর পরও আমাদের দেশটিতে এমন দৃশ্য খুবই চেনা সকলের। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদেরকে হয়তো আরো শতেক বছর অপেক্ষা করতে হবে। এপর্যন্ত যেসব উৎপাতের কথা বলেছি তার অনেকটাই অসচেতন এবং অশিক্ষিত লোকদের দ্বারা হয়ে থাকে। কিন্তু সচেতন ও লেখাপড়া জানাদের ব্যাপার কেমনে মেনে নিবো এবং কেনইবা মানতে হবে।

বছরখানেক আগে আমি জালালাবাদ রাগিব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী দেখতে গেছি। যাবার সময় সাথে করে ওই তারিখের একমাস আগে উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে যে ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন বাসায় ছিলো তা সাথে নিই। এতে ডাক্তার সাহেব দুই মাসের ঔষধ লিখে দিয়েছিলেন। কিছু ঔষধ কেনার বাকি ছিলো। আমার উদ্দেশ্য হলো প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে রাগিব – রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এর বাহিরে এসে কোনো এক ঔষধের দোকান বা ফার্মেসি থেকে বাকি ঔষধ কিনে নিয়ে আসবো। আমি রোগী দেখে হাসপাতাল থেকে বের হতে হতে পকেট থেকে পুরনো প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে হাসপাতাল গেটের বাহিরে আসতেই মোটর সাইকেল একটি এসে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। আমি প্রথম মনে করলাম হয়তো খুব পরিচিত কেউ। কারণ মাথায় হেলমেট থাকায় চিনতে পারছিলাম না। কিন্তু ভদ্রলোক যখন বললেন, দেখি আপনার প্রেসক্রিপশনটা তখন আমার মনে পড়ে গেল ঠিক একই রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলাম উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এই প্রেসক্রিপশন নিয়ে বের হওয়ার পরে। কাজেই আমার বুঝতে আর বাকি রইলোনা ইনি বা এরা কে বা কারা। সেদিন না বুঝেই প্রেসক্রিপশন এগিয়ে দিয়েছিলাম এবং ভদ্রলোক আমার প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ পড়লেন এবং ফিরিয়ে দিলেন। যেহেতু আমার খুব তাড়া নেই তাই এদিনও আমি প্রেসক্রিপশন এগিয়ে দিলাম। ভদ্রলোক প্রথমে দেখলেন তারপর পড়লেন এবং আমার দিকে তাকাতেই আমি হাত বাড়ালাম। কিন্তু না এবার তিনি মোটর সাইকেল থেকে নেমে তার পকেট থেকে এক চমৎকার মোবাইল ফোন বের করলেন। প্রেসক্রিপশনটি এবার মোটর সাইকেলের সিটের উপর রেখে তিনি তার স্মার্ট ফোন দিয়ে প্রেসক্রিপশনের যে পিঠে ঔষধের নাম লিখা সে পিঠের ছবি উঠালেন। ছবি উঠানো শেষে তিনি তৃপ্তির হাসি হাসলেন। এমন সময় এক বেয়াদব বাতাসের ঝটকায় প্রেসক্রিপশন উড়ে গিয়ে পড়লো রাস্তার মাঝখানে। তিনি তখন তার স্মার্ট ফোন আমার হাতে দিয়ে দৌড়ে ছুটলেন প্রেসক্রিপশনের পিছনে। আমার প্রচন্ড রাগ হলো আবার তার দৌড় দেখে হাসিও পেলো। মুহূর্ত দেরি না করে আমিও তার ফোনের ফটো গ্যালারীতে ঢুকে আমার প্রেসক্রিপশনের ছবিগুলো একে একে সিলেক্ট করে ডিলিট করে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। সবগুলো আমার প্রেসক্রিপশনের ছবি নয় বরং অনেক প্রেসক্রিপশনের ছবি আমি নিশ্চিত জেনে এ কাজটি আমি করিনি। এদের এধরনের বিরক্তিকর কাজে মেজাজ খারাপ হয়েছিলো খুব তবুও ছবিগুলো রিমুভ করতে পারলাম না।

সুপ্রিয় পাঠক এতোক্ষণে নিশ্চয় বুঝে গেছেন এরা হচ্ছেন পোশাকে পরিপাটি, লেখাপড়া জানা আমাদের সমাজে বিচরণরত আমাদের দেশের বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানিতে চাকরিরত ‘মেডিকেল রেপ্রেজেন্টেটিভ’। এরা আজকাল খুবই বিরক্তিকর ভূমিকায় অবতীর্ন হচ্ছেন দেখতে পাওয়া যায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডাক্তারের চেম্বারের সামনে এমনকি ফার্মেসিতে। আমার চোখে পড়ে অহরহ এমন পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন আমাদের দেশের অতি সাধারণ অসহায় অসুস্থ মানুষ এবং তাদের সাথে থাকা স্বজনেরা। এতেকরে অনেক জরুরী সময় নষ্ট হচ্ছে জরুরী রোগীর এবং সাধারণ মানুষের। এভাবে চলতে পারেনা মনেকরি। তাই আমি এধরনের কাজ যে বা যারা করেন তাদের প্রতি এই সংবাদ মাধ্যমে আহবান জানাই, দয়া করে আপনারা আমাদের সাথে এরকমটি করবেন না। আর সেই সাথে ঔষধ কোম্পানি সমূহের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সহ আমাদের সরকারি যথোপযুক্ত সু সচেতন দৃষ্টি কামনা করছি।।

লেখক কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন