রম্যলেখক হারান কান্তি সেন

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

শামসুল করিম কয়েস: হারান কান্তি সেন রম্যরচনা দিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও পরবর্তীতে ছড়া, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, উপন্যাস, নাটক রচনা করেছেন। তবে রম্যরচনা লেখতেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ্যবোধ করেন। রম্যরচনা বাক্যনির্ভর, বিষয় কাহিনী অথবা ঘটনানির্ভর হতে পারে। গল্পের আঙ্গিকে যেমন রম্য বা হাসির খোরাক যোগানো যায়, তেমনি চারদিকে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির ভিত্তিতেও রম্যরচনা সৃষ্টি করা যায়। চলতি ঘটনাকে হাস্যরস অথবা বিদ্রুপের মাধ্যমে উপস্থাপন করে হারান কান্তি সেন পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন। তাঁর ভাষা সহজ এবং অত্যন্ত সরলভাবে চেনাজানা বিষয়কে তিনি হাস্যরসের মাধ্যমে পরিবেশন করতে চান বলে সকল শ্রেণীর পাঠক তাঁর রচনার স্বাদ পান।
হারান কান্তি সেন ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুলাই সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার তাজপুর ইউনিয়নে দুলিয়াবন্দ (ইলাশপুর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ননীগোপাল সেন, মাতা সাধনা রানী সেন। পিতার সরকারি চাকুরির সুবাদে সিলেটেই বেড়ে উঠেন। ঐতিহ্যবাহী এম.সি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন এবং সিলেট আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। আন্তর্জাতিক সেবাধর্মী সংগঠন এপেক্স বাংলাদেশের জেলা গর্ভনর-০৪ হিসেবে ২০০৪ বর্ষে এপেক্সকে নেতৃত্ব দেন। শিশু-কিশোর যুব কল্যাণ সংগঠন সাইক্লোন এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সম্পৃক্ত, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ-এর আজীবন সদস্য; রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত (ইসকন), নজরুল একাডেমি সিলেট-এর আজীবন সদস্য। বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের তিনি নিয়মিত জীবন্তিকা, রেডিও কার্টুন ও স্পট ড্রামা রচনা করে থাকেন।

হারান কান্তি সেন দৈনিক আজকের কাগজ, যায় যায় দিন, সিলেটের ডাক, যুগভেরী ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রায় নিয়মিত লেখালেখি করেই চলেছেন।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গোল সমাচার (রম্যরচনা ২০০৫)। হারান কান্তি সেনের রম্যরচনা গ্রন্থ গোল সমাচার লেখক ফান্ড ইউ. কে থেকে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ৭৯ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটিতে মোট ১৭টি রচনা স্থান পেয়েছে।
গোল সমাচার গ্রন্থটিতে লেখকের সমকালীন চেতনা স্বাক্ষর বিদ্যমান। চলমান সময়ে লেখক তাঁর পরিম-লে যেসব অসঙ্গতি প্রত্যক্ষ করেছেন, তাকেই তিনি রচনার বিষয়বস্তু হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। এ ব্যাপারে সুগভীর সমাজসচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। গ্রন্থের রচনাগুলোর শিরোনাম হচ্ছে-ঘৃত-মধুসমৃদ্ধ সংবর্ধনা; বহুরূপে গাড়িচালক; চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী দমনে ষাঁড়; ত্রিরতেœর ঐতিহ্য; বিশ্বপেয়ালা পদগোলক প্রতিযোগিতা; স্বর্গে পাঠানো ও ফিরিয়ে আনা; অন্য রকমের ফুটবল; বিবৃতি সমাচার; নির্মম রসিকতা; চাইনিজের পাঁচ কাহন; ষাঁড় বরণ; বাংলাদেশি সময়; ধনে আসে জ্ঞান; শ্রীকৃষ্ণ ভরসা ও অন্যান্য; শরবত ন’রস; ভগ্ন হৃদয়বানদের আটাশ বছর; উপদেশমুক্ত সমাচ চাই প্রভৃতি।
গ্রন্থের প্রথম রচনার শিরোনম ‘ঘৃত-মধুসমৃদ্ধ সংবর্ধনা’। রচনাটির বিষয়বস্তু বাংলাদেশের ক্রিকেট। গল্পের কাহিনীটি কানু নামের এক যুবকের স্বপ্ন-বৃত্তান্ত। কানু স্বপ্ন দেখে দুলিয়াবন্দের জাগ্রত তরুণ সংঘ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেটদলের সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে। বিরাট মাঠ জুড়ে ষাট ফুটের স্টেজ নির্মিত হয়েছে। সভা শুরুর তিনঘন্টা পূর্ব থেকে মাইকিং চলছে। দর্শকদের যত্রতত্র ঘোরাফেরা না করে আসনগ্রহণ করতে অনুরোধ কর হচ্ছে। ক্রিকেটারদের জন্য বিচিত্র উপহারসামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথমে ছক্কা মিয়া এলো নিজের ঘরে তৈরি ঘৃত। ক্রিকেটারদের শরীর গঠনে ঘি-এর উপকারিতা ব্যাখ্যা করল সে। অতঃপর স্টেজে ওঠে এলো টেরা মানিক। তার হাতে ছিল জয়ন্তিয়া পাহাড় থেকে চাক ভাঙ্গা মধু। সে চিৎকার করে বলল-এই মধু ক্রিকেটারদের শরীরে এমন বর্ধিত বল দান করবে যে, বিশ্বের কোন দলই তাঁদের সামনে পারবে না। এই মধু নিয়মিত সেবন করলে সেরা টিমকে কুপোকাত করে এরা বিশ্বকাপ ঘরে তুলতে পারবে। অতঃপর এক বৃদ্ধ নিয়ে এলো বাঘের দুধ। সুদূর সুন্দবন থেকে সংগৃহীত। দলের প্রত্যেককে এক কাপ করে দুগ্ধ পান করানো হলো। প্রচুর হাততালি পড়ল। অতঃপর স্বর্ণপদক প্রদানের পালা। অসংখ্য স্বর্ণপদক নিয়ে স্টেজে উঠতেই স্টেজ ভাঙতে শুরু করল। আর তখনই কানুর পা পড়ল কাঠের চিপার মধ্যে। কানু আর্তচিৎকার দিয়ে উঠল। সাথে সাথে তার স্বপ্ন ভেঙে গেল। নিজেকে সান্তনা দিলÑভাগ্যিস স্বপ্ন দেখছিল সে, বাস্তবে হলে তাকে সারাজীবন পঙ্গু হয়ে থাকতে হতো। এভাবে আমাদের ক্রিকেটের অর্জনকে ধরে রাখার জন্য কঠোর অনুশীলনের পরিবর্তে তাদের অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার বিষয়কে ব্যঙ্গ করা হয়েছে আলোচ্য রচনাটিতে।
গ্রন্থের পরবর্তী রচনার শিরোনাম ‘বহুরূপে গাড়ি চালক’। রচনাটিতে তিনটি খ-চিত্রের অবতারণা করা হয়েছে। প্রথমে চিত্রটিতে বাসের ড্রাইভার ও কন্ট্রাক্টর মিলে অধিক যাত্রী তোলার জন্য যেখানে সেখানে বাস থামানো ঘটনা বিধৃত হয়েছে। হঠাৎ করে একটা বাড়ির সামনে এক ব্যক্তিকে হাত উঠাতে দেখে ড্রাইভার বাস থামিয়ে দেয় তাকে নিয়ে যাবার জন্য। তার আশা ছিল হয়তো বাড়িশুদ্ধ লোক তার বাসে উঠবে। অনেকক্ষণ বাস থামিয়ে রাখার ফলে অনেক যাত্রী নেমে যায় এবং হেলপারকে বকা দিয়ে থাকে। কিন্তু ততক্ষণ যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া তোলা হয়ে গেছে। শেষপর্যন্ত বেশ কিছুক্ষণ পরে বাড়ির লোকটি নানা কাজকর্ম সেরে বাসে ওঠে। অনেকটা হতাশ হয়ে ড্রাইভার আবার বাস স্টার্ট দেয়। রচনাটিতে বাসের ড্রাইভার-কন্ট্রাক্টরের খামলেয়ালিপনাতে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
দ্বিতীয় চিত্রটির বিষয়ও বাসযাত্রীদের দুর্ভোগের কাহিনী বিধৃত হয়েছে। গাড়ির হেলপারের মিষ্টি কথায় ভুলে অনেক যাত্রীকেই প্রতারিত হতে হয়। বিরতিহীন সার্ভিস বলে যাত্রী তোলে অবশেষে লোকাল হিসেবে বাস চালায়। তারপরে বসার স্থান তো দূরের কথা, দাঁড়াবার স্থানও পাওয়া যায় না। আর বাসের গতি থাকে সর্বোচ্চ ঘন্টায় ১৫/২০ কিলোমিটার। গন্তব্যে পৌঁছাতে পৌঁছাতে যাত্রীর অবস্থা হয় আধামরা। এভাবে বাসযাত্রার বিড়ম্বনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
তৃতীয় চিত্রটিতে ফুটে উঠেছে বাস দুর্ঘটনার কথকতা। রোজকার পত্রিকার পাতা উল্টালেই দেখা যায় সড়ক দুর্ঘটনার খবর। বছরে কত মানুষ যে মারা যায় তার সঠিক সংখ্যা নির্ণয় দুষ্কর। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চালকের গাফলাতির কারণে দুর্ঘটনায় পতিত হয় বাস। আবার তাদেরকে আইনগত শাস্তি দিতে গেলেও দেখা দেয় নানা বাধাবিপত্তি।
গ্রন্থের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য রচনার শিরোনাম ‘ত্রিরতেœর ঐতিহ্য’। সমাজে যারা নানা উপায়ে অর্থ উপার্জন করে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হয়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ শুরু করে তাদের উদ্দেশ্যে ব্যঙ্গচিত্র রচনা করা হয়েছে আলোচ্য রচনাটিতে। দুলিয়ারবন্দের একজনের বাড়ির বারান্দায় শাদা ওয়ালে আলকাতরা দিয়ে লেখা ‘জুতা বাইরে রাখুন’। সে অনুযায়ি এক অতিথি তার দামি সেন্ডেলটি বাইরে রেখে ঘরে ঢোকে। কিন্তু ঘন্টাখানেক পরে যখন তিনি বাইরে এসে দেখেন জুতাটি কুকুর কামড়িয়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। তা আর পরার উপযোগী নেই; পরের দিন ছেলের টিচার বাড়িতে এলে সেন্ডেল পরেই ঘরে ঢোকেন। তিনি ঘরময় কফের অস্তিত্ব দেখে নিজেকে সেন্ডেল না-খোলার জন্য বারবার ধন্যবাদ। জানাতে থাকেন।
এলাকায় একটি বাড়ির গেটের নম্বর ফলকের নিচে লেখা ‘কুকুর হতে সবাধান’। বেশ কিছুদিন থেকে বাড়িতে যেসব চিঠিপত্র আসে তার ঠিকানায় লেখা থাকে ‘কুকুর হতে সাবধান’। প্রকতপক্ষে সে বাড়িতে কোন কুলিন জাতের কুকুর ছিল না। কিছুদিন পরে জার্মান শেফার্ড কেনা হবে বলে এমন সাইনবোর্ড লেখা হয়েছে। কুকুরছানার মূল্য বাইশ হাজার টাকা শুনে সে বাড়িওয়ালার কুকুর পোষবার সাধ উবে যায়। লেখকের ভাষায়- ‘তখন তার রক্তের উচ্চচাপ ২০০/১৮০ পৌঁছায়’।
গ্রন্থের পরবর্তী শিরোন ‘বিশ্বপেয়ালা পদগোলক প্রতিযোগিতা’। রচনাটিতে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে আমাদের উন্মদনাকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। প্রথম চিত্রটিতে বাবা ও মেয়ের কথোপকথনের মাধ্যমে বিশ্ববরেণ্য ম্যারাডোনার ড্রাগ গ্রহণের বিষয়টি উঠে এসেছে। রাত জেগে স্কুলের ছেলেদের খেলা দেখার জন্য পড়াশোনার ক্ষতির দিক উঠে এসেছে লেখাটিতে। শুধু ছোটরাই নয়, বয়স্করাও নানাভাবে বিশ্বকাপের বিষয় নিয়ে মেতে উঠেছে। দোকান কর্মচারীর মুখেও রুমানিয়ার দলের সাপোর্ট করার কথা শোনা যায়।
অনুরূপ বিষয়ে আরেকটি রচনার শিরোনাম ‘অন্য রকমের ফুটবল’। রচনাটিতে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে কখনো কখনো মাঠে তুমুল মারামারি শুরু হয়, তার খ-চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রথমে প্লেয়াররা উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় শুরু করে, পরে মাঠের দর্শকের মাঝে শুরু হয় মারপিট।
পরের রচনাটির শিরোনাম ‘বিবৃতি সমাচার’। আমাদের দেশে কিংবা জাতীয় পর্যায়ে কোন কিছু ঘটলেই শুরু হয় বিশিষ্টজনদের বিবৃতির ঝড়। কখনো তা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। লেখক ব্যঙ্গার্থে কতিপয় সমিতির নামোল্লেখ করেছেন। ভিক্ষুক সমিতি; ক্ষুধা সমিতি; পেনশন ক্লাব প্রভৃতি নানা সংস্থা থেকে যেন মুখপাত্রের মাধ্যমে বিবৃতি প্রদান করা হয়। প্রকৃতপক্ষে রচনাটিতে বিবৃতিসর্বস্বতাকে কটাক্ষ করা হয়েছে।
গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য রচনার শিরোনাম ‘উপদেশমুক্ত সমাজ চাই’। রচনাটিতে আদর্শ যুব কল্যাণ সংঘ-এর পক্ষ থেকে ‘উপদেশমুক্ত সমাজ চাই’ শীর্ষক একটি সেমিনারের উল্লেখ করা হয়েছে। তরুণ সমাজকে কর্মের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার প্রেরণা রয়েছে রচনাটিতে।
হারান কান্তি সেন রচিত আলোচ্য গোল সমাচার গ্রন্থটির ভাষা প্রাঞ্জল। লেখক বিষয়বস্তুকে তীর্যকভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস পেয়েছেন। ফলে পাঠককে গ্রন্থটি থেকে হাস্যরসের সন্ধান পেতে কষ্ট করতে হয় না। সবমিলিয়ে বলা যায় রম্যরচনা হিসেবে গোল সমাচার গ্রন্থটি শিল্প সফলতার দাবি রাখে।

—–বিশিষ্ট গবেষক, অবসরপ্রাপ্ত বেতার কর্মকর্তা শামসুল করিম কয়েস রচিত বাংলা সাহিত্যে সিলেট (১০ম খন্ড) থেকে সংকলিত

পরবর্তী খবর পড়ুন : “শিমুল বাগানে ভ্রমণ”

আরও পড়ুন



মাদ্রাসা ছাত্রের লাশ উদ্ধার

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর...

সাংবাদিক তাজুল ইসলাম বাঙ্গালী আর নেই

সাংবাদিক তাজুল ইসলাম বাঙ্গালী আর...

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানকে হাওর উন্নয়ন পরিষদের সংবর্ধনা

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সুনামগঞ্জ-৩ আসনের...