রমজান মাসের ফজিলত

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০১৯     আপডেট : ১০ মাস আগে  
  

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল:

রমজান মাসের আগমনে মুসলিমগণ আনন্দ প্রকাশ করে থাকেন। আনন্দ প্রকাশ করাই স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন : ‘বল, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে এটা তার চেয়ে উত্তম।’ সূরা ইউনুস : ৫৮
পার্থিব কোন সম্পদের সাথে আল্লাহর এ অনুগ্রহের তুলনা চলে না, তা হবে এক ধরনের অবাস্তব কল্পনা। যখন রমজানের আগমন হত তখন রাসুলে করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অতিশয় আনন্দিত হতেন, তার সাহাবাদের বলতেন : ‘তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে।’ নাসায়ী
এরপর তিনি এ মাসের কিছু ফজিলত বর্ণনা করে বলতেন : ‘আল্লাহ তাআ’লা তোমাদের জন্য সিয়াম পালন ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দ্বারসমূহ খুলে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। অভিশপ্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়। এ মাসে রয়েছে একটি রাত যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল।’ নাসায়ী
আমাদের কর্তব্য : আল্লাহর এ অনুগ্রহের মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করা, এ মাসের ফজিলত ও তাৎপর্য অনুধাবনে সচেষ্ট হওয়া ও ইবাদাত-বন্দেগিসহ সকল কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত থাকা। এ মাসের যে সকল ফজিলত রয়েছে তা হল :
এক. এ মাসের সাথে ইসলামের একটি গুুরুত্বপূর্ণ রুকনের সম্পর্ক রয়েছে ; আর তা হলে সিয়াম পালন : হজ্ব যেমন জিলহজ্ব মাসের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে সে মাসের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে এমনই সিয়াম রমজান মাসে হওয়ার কারণে এ মাসের মর্যাদা বেড়ে গেছে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন : ‘হে মু’মিনগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমনই ফরজ করা হয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার।’ সূরা আল বাক্বারা : ১৮৩
রাসুলে করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : ইসলাম যে পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তার একটি হল সিয়াম পালন। এ সিয়াম জান্নাত লাভের একটি মাধ্যম; যেমন হাদিসে এসেছে : ‘যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনল, সালাত কায়েম করল, জাকাত আদায় করল, সিয়াম পালন করল রমজান মাসে, আল্লাহ তাআ’লার কর্তব্য হল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো…।’ বুখারী
দুই. রমজান হল কুরআন নাজিলের মাস : আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন : ‘রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে আল-কুরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য ও অসত্যের পার্থক্যকারী।’ সূরা আল বাক্বারা : ১৮৪
‘রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র আল-কুরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান হতে আবার রমজান মাসে অল্প অল্প করে নবী করিম (সা.)-এর প্রতি নাজিল হতে শুরু করে। কুরআন নাজিলের দুটি স্তরই রমজান মাসকে ধন্য করেছে। শুধু আল-কুরআনই নয় বরং ইব্রাহীম (আ.)-এর সহিফা, তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল সহ সকল ঐশী গ্রন্থ এ মাসে অবতীর্ণ হয়েছে বলে তাবরানী বর্ণিত একটি সহি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।’ সহীহ আল-জামে
এ মাসে মানুষের হেদায়াত ও আলোকবর্তিকা যেমন-নাজিল হয়েছে তেমনই আল্লাহর রহমত হিসেবে এসেছে সিয়াম। তাই এ দুই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে বেশি বেশি করে কুরআন তেলাওয়াত করা উচিত। প্রতিবছর রমজান মাসে জিব্রাইল রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে পূর্ণ কুরআন শোনাতেন এবং রাসুল (সা.) ও তাকে পূর্ণ কুরআন শোনাতেন। আর জীবনের শেষ রমজানে আল্লাহর রাসুল দু’বার পূর্ণ কুরআন তেলাওয়াত করেছেন। সহি মুসলিমের হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত।
তিন. রমজান মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় ও জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয় শয়তানদের : রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : ‘যখন রমজান মাসের আগমন ঘটে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে : ‘শয়তানদের শিকল পড়ানো হয়।’ মুসলিম
তাই শয়তান রমজানের পূর্বে যে সকল স্থানে অবাধে বিচরণ করত রমজান মাস আসার ফলে সে সকল স্থানে যেতে পারে না। শয়তানের তৎপরতা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে দেখা যায় ব্যাপকভাবে মানুষ তাওবা, ধর্মপরায়ণতা ও সৎকর্মের দিকে অগ্রসর হয় ও পাপাচার থেকে দূরে থাকে। তারপরও কিছু মানুষ অসৎ ও অন্যায় কাজ-কর্মে তৎপর থাকে। কারণ, শয়তানের কু-প্রভাবে তারা অনেক বেশি প্রভাবিত হয়ে পড়েছে।
চার. রমজান মাসে রয়েছে লাইলাতুল কদর : আল্লাহ তাআ’লা বলেন : ‘লাইলাতুল কদর সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সে রজনির ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত।’ সূরা আল ক্বদর : ৩-৫
পাঁচ. রমজান মাস দোয়া কবুলের মাস : রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : ‘রমজান মাসে প্রত্যেক মুসলিমের দোয়া কবুল করা হয়।’ মুসনাদ আহমদ
অন্য হাদিসে এসেছে : আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রমজানের প্রতি রাতে ও দিনে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং প্রতি রাত ও দিবসে মুসলিমের দোয়া-প্রার্থনা কবুল করা হয়। (সহি আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব)
তাই প্রত্যেক মুসলমান এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের কল্যাণের জন্য যেমন, দোয়া-প্রার্থনা করবে, তেমনই সকল মুসলিমের কল্যাণ, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জ্ঞাপন করবে।
ছয়. রমজান পাপ থেকে ক্ষমা লাভের মাস : যে ব্যক্তি রমজান মাস পেয়েও তার পাপসমূহ ক্ষমা করানো থেকে বঞ্চিত হলো আল্লাহর রাসুল তাকে ধিক্কার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন : ‘ওই ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক যার কাছে রমজান মাস এসে চলে গেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করা হয়নি।’ তিরমিযী
সত্যিই সে প্রকৃতপক্ষে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত যে এ মাসেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল।
সাত. রমজান জাহান্নাম থেকে মুক্তির লাভের মাস : রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : ‘রমজান মাসের প্রথম রজনির যখন আগমন ঘটে তখন শয়তান ও অসৎ জ্বীনগুলোকে বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, এ মাসে আর তা খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, এ মাসে তা আর বন্ধ করা হয় না। প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে ঘোষণা দিতে থাকে যে, হে সৎকর্মের অনুসন্ধানকারী তুমি অগ্রসর হও! হে অসৎ কাজের অনুসন্ধানকারী তুমি থেমে যাও! এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তাআ’লা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।’ তিরমিযী
আট. রমজান মাসে সৎকর্মের প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেওয়া হয় : যেমন হাদিসে এসেছে যে, রমজান মাসে ওমরাহ করলে একটি হজ্বের সওয়াব পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বরং, রমজান মাসে ওমরাহ করা আল্লাহর রাসুলের সাথে হজ্ব আদায়ের মর্যাদা রাখে। এমনইভাবে সকল ইবাদাত-বন্দেগিসহ সকল সৎকাজের প্রতিদান কয়েক গুণ বেশি দেওয়া হয়।
নয়. রমজান ধৈর্য ও সবরের মাস : এ মাসে ঈমানদার ব্যক্তিগণ খাওয়া-দাওয়া, বিবাহ-শাদি ও অন্যান্য সকল আচার-আচরণে যে ধৈর্য ও সবরের এত অধিক অনুশীলন করেন তা অন্য কোন মাসে বা অন্য কোন পর্বে করেন না। এমনইভাবে সিয়াম পালন করে যে ধৈর্যের প্রমাণ দেওয়া হয় তা অন্য কোন ইবাদাতে পাওয়া যায় না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন : ‘ধৈর্যশীলদের তো বিনা হিসাবে পুরস্কার দেওয়া হবে।’ সূরা আয যুমার : ১০
প্রিয় ভাইয়েরা! আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে আমরা রমজানে সিয়াম পালন করব। সকল প্রকার পাপ-গুনাহ থেকে তাওবা করবো। সমাজে সকল প্রকার জুলুম অন্যায় প্রতিরোধ করব। ভাল কাজের মাধ্যমে রমজানের দিবস-রজনি অতিবাহিত করব। যদি এমন হয় যে রমজানে, পূণ্যের বদলে, পাপ ও বক্রতা কারো কারো জীবনে বেড়ে যায়, তবে এটা নিশ্চয়ই একটি আত্মিক পরাজয়, এটা নিশ্চয় শয়তানের ক্রীড়া, যার বিরূপ প্রভাব ব্যক্তি ও সমাজের উপর পড়তে বাধ্য। আল্লাহ আমাদেরকে রমজানের শিক্ষা অর্জন করে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন ॥

লেখক : প্রকাশক ও সংগঠক।

আরও পড়ুন



অন্ধকারে আলোর ঝলক

সাদিক শামসুল: গভীর অন্ধকার ভেদ...

মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহরিয়ারের জন্মদিন পালন

সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সিনিয়র...