রপ্তানী তালিকায় এখন নাগা মরিছ

,
প্রকাশিত : ১২ মে, ২০২০     আপডেট : ২ বছর আগে

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি ।।
সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলার পাহাড়ি টিলায় উৎপাদিত নাগা মরিচ হাসি ফোটাচ্ছে চাষীদের মুখে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপক চাষ তাদের সাফল্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। নানা জাতের লেবু আর মরিচ চাষ হচ্ছে একই সাথে একই বাগানে। পাশাপাশি এই দু’ফসলের চাষে লাভবান হচ্ছেন চাষীরা। এ দু’ উপজেলার উৎপাদিত ‘নাগা’ মরিচের বাৎসরিক বিক্রয় মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। এমন তথ্য সংশ্লিষ্টদের।
স্থানীয় ও দেশ বিদেশের ব্যাপক চাহিদার এ মরিচ ঝাল, ঘ্রাণ আর রং-এই তিন গুণেই আকৃষ্ট করে ভোজন রসিকদের। সিলেট অঞ্চলের ব্যাপক জনপ্রিয় ‘নাগা’ মরিচের ঘ্রাণ আর সাতকরা কিংবা আদা লেবুর স্বাদে তৃপ্ত এ অঞ্চলের ভোজন রসিকরা। রন্ধন শিল্পের শৈল্পিকতার অন্যতম এ উপকরণ তিনটি-ই খাবারে বাড়ায় রুচি। পরিবেশনে আনে বৈচিত্র্যতা। আর স্বাদে দেয় এক অন্যরকম তৃপ্তি। তাই ঐতিহ্যের এই চলিষ্ণু রেওয়াজ অনুযায়ী, সিলেটিদের খাবারের তালিকায় পছন্দের শীর্ষে এই তিন পদই।
পাহাড়ি এ অঞ্চলে নানা জাতের লেবুর মধ্যে সাতকরা আর আদা এ দু’জাতের লেবুই স্থ’ান করে নিয়েছে স্বাদ ও ঘ্রাণের অনন্য গুণে। অনুরূপ এখানকার নানা জাতের মরিচের মধ্যে ‘নাগা’ স্বাদের চাইতে তার যাদুময়ী ঘ্রাণ আর রং বিমোহিত করে ভোজন রসিকদের। নাগামরিচ শুধু ঝালমুড়ি, ভর্তা, চাটনি, শাক-সবজি কিংবা শুটকির তরকারিতে নয়, এখন নাগামরিচের আচারও ব্যাপক জনপ্রিয় হচ্ছে দিন দিন। দেশের নামি-দামি কোম্পানীগুলোও তৈরি করছে নাগামরিচের আচার, জেলি ও সস। দিন দিন যেমন বাড়ছে নাগা মরিচের চাহিদা। তেমনি স্থানীয়ভাবে বাড়ছে এর উৎপাদনও।
অল্প খরচে স্বল্প জায়গায় কম পরিশ্রমে অধিক লাভজন এ ফসল চাষে এখন ঝুঁকছেন স্থানীয় চাষীরা। স্থানীয় চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে নাগা মরিচের উৎপাদন যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি ধীরে ধীরে দেশের গন্ডি পেরিয়ে এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তাই দেশ-বিদেশের চাহিদার যোগান দিতে স্থানীয় কৃষকরা এখন ব্যাপক পরিসরে চাষ করছেন ঝালের রাজা ‘নাগা’ মরিচ।
জেলার ৭টি উপজেলার পাহাড়ি টিলায় দিন দিন নতুন করে বিস্তৃত হচ্ছে ‘নাগা’ মরিচের চাষ। সখের বশে বাড়ির আঙিনা আর ক্ষেতের আইলের চাষকৃত ‘নাগা’ মরিচ এখন পাহাড়ি টিলার বিশাল এলাকাজুড়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হচ্ছে। জেলার কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল ছাড়াও কুলাউড়া, জুড়ী বড়লেখাসহ অনান্য উপজেলাতে কম-বেশি ‘নাগা’ মরিচ চাষ হলেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপক পরিসরে চাষ হচ্ছে কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলে। কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের উত্তর-পশ্চিম পাশের (কমলগঞ্জ ইউনিয়নের ৪নং ওর্য়াড এলাকায়) পাহাড়ি এলাকায় ১৫-২০টি লেবু বাগানের সাথে চাষ হচ্ছে ‘নাগা’ মরিচ। ওখানকার চাষী দেলওয়ার হোসেন, এনামুল হক, নাজমুল হক, হেলেনা আক্তার, দিলারা বেগম ও বালিগাঁও’র সানুর মিয়াসহ অনেকেই জানালেন, লেবু বাগানের সাথে তারা চাষ করছেন ‘নাগা’ মরিচ।
প্রতিটি বাগানে ১ হাজার থেকে শুরু করে ১৫-২০ হাজার গাছও লাগানো হয়েছে। তারা জানালেন, লেবু গাছের গোড়া ঠান্ডা রাখতে লেবু গাছের গোড়ার পাশেই রোপণ করা হয় ‘নাগা’ মরিচের গাছ। মরিচ গাছের পাতা ও ডাল-পালা রোদের আলো থেকে রক্ষা করে ঠান্ডা রাখে লেবু গাছকে। আর লেবু গাছের গোড়ায় দেয়া সার, গোবর থেকে খাদ্য পায় মরিচ গাছ। তাই উভয় ফসলই একে অপরের উপকারী হয়ে ভালো ফলন দেয়। ফলে লেবুর পাশাপাশি বাড়তি আয় হচ্ছে ‘নাগা’ মরিচ চাষ করে। কমলগঞ্জের মাধবপুর ইউনিয়নের টিপরাবাড়ী মৌজার মাঝের ছড়া এলাকার বাসিন্দা সাবেক মেম্বার মোঃ হারিছ মিয়া, চাষী লেবু মিয়া, লুৎফুর মিয়া জানান, তাদের এলাকায় কম- বেশি ‘নাগা’ মরিচের চাষ হলেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপক পরিসরে শতাধিক লেবু বাগানের সাথে ‘নাগা’ মরিচের চাষ করা হচ্ছে। শ্রীমঙ্গলের রাধানগর, বিষামণি, মহাজিরাবাদ, ডলুবাড়ি ও ইস্পাহানী, কমলগঞ্জের মাবপুর ইউনিয়নের পদ্মছড়া, পুরানবাড়ী, মাঝের ছড়া, টিলাগাঁও, কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বালিগাঁও,সরইবাড়ী,বাঘমারা এলাকা এবং আলীনগর, শমশেরনগর, আদমপুর ও ইসলামপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় চাষ হচ্ছে এ জাতীয় মরিচ।
চাষীরা জানান, ‘নাগা’ মরিচের আরেক নাম বোম্বাই মরিচ। নাগা মরিচের তেমন বেশি জাত নেই। তবে ইদানিং আমাদের নাগা মরিচ বিশ্বে পরিচিতি পাবার কারণে অনেক গবেষক গবেষণা করে নতুন জাত আবিষ্কার করেছেন। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে হাইব্রিড নাগা মরিচও উদ্ভাবন করেছেন। ২০০৮, ২০০৯ এর দিকে কিছু নাগা মরিচের হাইব্রিড জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। ২০০৭ সনে গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বুকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঝাল ও সুগন্ধি মরিচের স্বীকৃত পাওয়ার পর থেকে এই নাগা মরিচ নিয়ে এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠিানে গবেষণা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ‘নাগা’ মরিচের পরিবার হলো সোলানেসি, জাত-ক্যাপসিকাম এবং প্রজাতি-ক্যাপসিকাম চাইনিজ। ‘নাগা’ মরিচের ঝাল পৃথিবীর সব মরিচের চেয়ে অনেক বেশি বলে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ঝাল মরিচ হিসেবে খ্যাত। ঝালের ইউনিট এস.এইচ.ইউ। স্কোভিল (ঝাল পরিমাপের মানদন্ড) অনুযায়ী, ‘নাগা’ মরিচের সাধারণ মান ১০ ++++। ‘নাগা’ মরিচের ঝাল ১ লাখ থেকে ৩ লাখ এস.এইচ.ইউ পর্যন্ত।
শীত ও গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ হয় নাগা মরিচ। ফসলের প্রাাথমিক অবস্থায় অল্প বৃষ্টিপাত এবং ফসলের বাড়বাড়তির সময় পরিমিত বৃষ্টিপাত হলে মরিচ খুব ভালো হয়। অতিরিক্ত ও পরিমাণের কম বৃষ্টিপাত এই মরিচের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে ফুল ও ফল ধরা কমে যায় এবং অধিক আর্দ্রতায় ফল পচে যায়। ফলের পরিপক্বতার সময় শুকনো আবহাওয়া থাকলে এর গুণগতমান ও রঙ অক্ষুন্ন থাকে। জৈবপদার্থ সমৃদ্ধ উর্বর দোআঁশ মাটি চাষাবাদের বেশি ভালো। প্রায় সারা বছর এতে ফলন আসে। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে কিছু অংশ হাটবাজারেও চলে যায়। প্রাকৃতিক অবস্থা অনুকূলে থাকলে বছরে প্রতি একর জমিতে অন্যান্য ফসলের সঙ্গে উৎপাদিত নাগা মরিচ বিক্রি করে সব খরচ শেষে ৮০ হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা আয় হয়।
জেলার মধ্যে ‘নাগা’ মরিচের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার শ্রীমঙ্গল। এই বাজারের মজই মার্কেটের ‘নাগা’ মরিচের আড়তদার তুহিন মিয়া, আইনুল হক, জিতু মিয়া, কুদ্দুছ মিয়া জানান, লেবু বাজারের পর দুপুর থেকে বিক্রি চলে ‘নাগা’ মরিচের। হাজার বা বস্তা হিসেবে তারা ‘নাগা’ মরিচ ক্রয়-বিক্রয় করে থাকেন। তারা জানান, মৌসুমে প্রতিদিন শ্রীমঙ্গল বাজারে ৩-৪ লক্ষ টাকার ‘নাগা’ মরিচ বিক্রি হয়। এছাড়াও এঅঞ্চলের আরও বড় ২টি পাইকারী বাজার আদমপুর ও শমসেরনগরের আড়ত গুলোতে এই মরিছের কেনা বেচা হয়। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ‘নাগা’ মরিচের দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ক্রেতারা পাইকারি হিসেবে তাদের কাছ থেকে হাজার হাজার ‘নাগা’ মরিচ দেশের নানা স্থানে পাঠানোসহ ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করে থাকেন। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে ‘নাগা’ মরিচের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে ।
অনেকটা অনাদর-অবহেলায় বেড়ে ওঠা এই নাগা মরিচের সেদিন আর নেই। নাগা মরিছ এখন রপ্তানির তালিকায় চলে এসেছে। প্রতিবছর কেবলমাত্র এ পণ্যটি রপ্তানি করে আসছে শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। এটি রূপ নিয়েছে বাণিজ্যিক চাষে। স্থানীয়ভাবে যেমন একের পর এক তৈরি হচ্ছে নাগা মরিচের খামার, বাড়ছে চাষ। তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর ফলে হাজারও চাষী নাগা মরিচ চাষে অর্থনৈতিকভাবে হচ্ছে লাভবান। যা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা মজবুত হতে সহায়তা করছে।
সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা যায়, সর্বপ্রথম ২০১১ সালে জাপানে মরিচ রপ্তানি শুরু হয়। জাপানের পরে মালয়েশিয়াসহ আরো একাধিক দেশ এতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এরপর থেকে ক্রমে রপ্তানির পরিমাণ যেমন বাড়ছে, তেমনি চাষও সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলা এ্যাগ্রো নামের একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জাপানের ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী চাষীদের কাছ থেকে নাগা মরিচ সংগ্রহ করে এবং তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে তা শুকিয়ে গুঁড়া করে প্যাকেটজাত করে রপ্তানি করছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, নাগা মরিচ রপ্তানি ইতোমধ্যে শতকোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই অঞ্চলের মাটি নাগা মরিচ চাষের জন্য খুবই উপযোগী। আন্তর্জাতিক বাজার আরো সম্প্রসারণ করা গেলে ভবিষ্যতে এটি হবে বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য রপ্তানি যোগ্য কৃষিপণ্য। তবে এজন্য কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আন্তরিক হতে হবে। দেশের সর্বত্র এর চাষ ছড়িয়ে দিতে হবে। চাষীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ব্যবসায়ীদেরও এগিয়ে আসতে হবে। যা আমাদের কৃষি অর্থনীতিকে আরো বেগবান করবে।


আরও পড়ুন

সিলেটে অর্ধেকের বেশি কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ

 সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট সিটি...

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পরিকল্পনা

 দেশে করোনা সংক্রমণের কারণে ১৭...

সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমানের মৃত্যুতে সিসিক মেয়রের শোক

 বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক পীর...