যে কথাগুলো না বললে নয়

,
প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল, ২০২১     আপডেট : ১ বছর আগে

মুহিত চৌধুরী :
আমার জীবন গভীর সংকটের মধ্যে ছিলো। মহান আল্লাহর অশেষ রহমত আর অগনিত মানুষের দোয়ার বরকতে আমি ফিরে এসেছি। করোনা আক্রান্ত হয়ে ১০ এপ্রিল থেকে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের আইসিইউ বেডে ছিলাম ৭দিন এবং ২দিন কেবিনে। আমি দেখেছি করোনার ভয়াবহতা, শ্বাস-প্রশ্বাস নেবার আকুলতা। দেখেছি প্রতিদিন মৃত্যু মিছিল। একই দিনে অল্প সময়ের ব্যবধ্যানে আমার ডানে বামে এবং সম্মুখের বেডে থাকা তিন জন করোনা আক্রান্ত মানুষের মৃত্যু। আমি দেখেছি স্বজনদের বুক ফাটা কান্না আর আর্তনাদ। এমনি পরিস্থিতিতে আমি মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে থাকি। আমি ভেঙ্গে পড়িনি এবং মনবল হারাইনি।
কোভিড ডেডিকেটেড ‘শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের’ ডাক্তার,নার্স,বয়,আয়া এরা যে কত আন্তরিক রোগীর প্রতি তা না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবেন না। তাদের মধ্যে করোনার কোন ভয় আমার চোখে পড়েনি। রোগীর সেবা করাই তাদের প্রধান কাজ।এমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে তারা দায়িত্ব পালন করছেন। এইসব করোনা যোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহ এই উত্তম কাজের বদলা দুনিয়া এবং আখেরাতে অবশ্যই দেবেন।
কথায় আছে বিপদে বন্ধুর পরিচয়। জীবন-মরণ এই সন্ধিক্ষণে সর্তীর্থদের ভূমিকায় সত্যি আমি অভিভূত,আমি কৃতজ্ঞ। অসংখ্য মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। মনোবল অটুট রাখতে ফোন করেছেন, ক্ষুধে বার্তা পাঠিয়ে দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। শুধুমাত্র ফেইসবুকেই দেশ- বিদেশের ২৬১৬ জন মানুষ আমার সুস্থতা কামনা করেছেন। আমি কখনও ভাবিনি মানুষ আমাকে এতোটা ভালোবাসে।
করোনা পজেটিভ এই খবর জেনে সর্বপ্রথম ফোন করেন সিলেটের সুযোগ্য জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম। তিনি চিকিৎসা বিষয়ক প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেন।
সিলেটের কৃতিসন্তান মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এমপি খবর পেয়ে সিলেট ওসমানী হাসপতালের উপপরিচালক ডা. হিমাসু লাল রায়কে ফোন করে বলেন, চিকিৎসা বা অন্য কোন কারণে আমি যাতে ভেঙ্গে না পড়ি মনোবল না হারাই সে দিকে খেয়াল রাখতে। একই বার্তা তিনি আমার মোবাইলেও পাঠান। পরবর্তিতে তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা শফিউল আলম জুয়েলের মাধ্যমে আমার চিকিৎসার খোজ খবর নিয়েছেন। নগন্য একজন গণমাধ্যম কর্মীর প্রতি মাননীয় মন্ত্রী আপনার এ ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ সত্যি অতুলনীয়।
দ্রুত সুস্থতা কামনা করে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয় ভারতীয় দূতাবাস সিলেট অফিস থেকে। সে জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ভারতের সরকার ও জনগণকে। প্রার্থনা করছি বর্তমান করোনা পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠার।
দ্রুত সুস্থতা ও দৃঢ় মনোবল রাখার আহ্বান জানিয়ে আরো বার্তা পাঠান, বিভাগীয় কমিশনার মো: মশিউর রহমান এনডিসি, সাবেক বিভাগীয় কমিশনার বর্তমান খাদ্য মন্ত্রনালয়ের সচিব . ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ নিশারুল আরিফ, সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন পিপিএম, সিলেট জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী দেবজিৎ সিনহা প্রমুখ। আপনাদের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞা।
সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনের নেতা কর্মীরা সবসময় আমার খবর নিয়েছেন। মনোবল দৃঢ় রাখতে এবং সুস্থতা কামনা করে বার্তা পাঠিয়েছেন। কেউ কেউ সরাসরি ফোনে কথা বলেছেন। আপনাদের এ ভালোবাসায় আমি ধন্য আমি চির কৃতজ্ঞ। এ তালিকা অনেক দীর্ঘ তারপরও কয়েক জনের নাম এখানে উল্লেখ করছি। তারা হলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক
অধ্যাপক জাকির হোসেন। সিলেট জেলা যুবলীগের সভাপতি ভিপি শামীম আহমদ,সিলেট মহানগর যুবলীগের সভাপতি আলম খান মুক্তি, রাহাত তরফদার প্রমুখ।
আমার জীবনের এই কঠিন সময়ে সিলেটের গণমাধ্যম কর্মীরা আমার প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন তা সারা জীবন স্মৃতির ভাঁজে অমলিন হয়ে থাকবে। প্রিন্ট,ইলেকট্রনিক এবং অনলাইন গণমাধ্যম যে এক মোহনায় দাঁড়িয়ে ছিলো। সকলের কন্ঠে ছিলো ‘মুহিত ভাই আপনি ভালো হয়ে যাবেন, চিন্তা করবেন না, আমরা আপনার পাশে আছি দোয়া করছি। যে কোন প্রয়োজনে আমাদেরকে বলবেন।’
প্রাণের প্রতিষ্ঠান সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ মকসুদ, সহ সভাপতি গোলজার আহমদ হেলাল, সহসাধারণ সম্পাদক তাওহীদুল ইসলাম, কোষাধ্যাক্ষ আব্দুল মুহিত দিদার, পাঠাগার ও প্রকাশনা সম্পাদক মবরুর আহমদ সাজু, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সম্পাদক জহিরুল ইসলাম মিশু, কার্যকরি পরিষদ সদস্য আশীষ দে, মাহমুদ খান ও সাইফুল ইসলামসহ আমার সহকর্মীরা উদ্বেগ আর উৎকন্ঠার মধ্যে দিয়ে পার করেছেন প্রতিটি মুহূর্ত। তারা সম্মিলিতভাবে দোয়া মাহফিল করেছে। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবেও এতিমখানায় দোয়া মাহফিল করেছেন। এখনও প্রতিদিন তারা আমার খোজ খবর নেন। তাদের ভালোবাসায় সত্যি আমি অভিভূত।
সরাসরি টেলিফোন করে খবর নিয়েছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আল আজাদ। ক্ষুদে বার্তায় সুস্থতা কামনা করেছেন সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ রেনু, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সামির মাহমুদ। প্রবীন সাংবাদিক আফতাব চৌধুরী।
করোনা ঝুকিকে উপেক্ষা করে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আইসিইউ বেডে সরাসরি দেখা করেছেন সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ্ দিদার আলম চৌধুরী নবেল এবং সাংবাদিক সালমান ফরিদ। আপনাদের সকলের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞা।
কবি, সাহিত্যিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভালোবাসা আমাকে ভীষণভাবে উজ্জীবিত করেছে। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস) আমার সুস্থতা কামনা করে দোয়া মাহফিল করেছে। সে জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ কর্তৃপক্ষকে । কবি সাহিত্যিকরা বার বার আমার খোজ নিয়েছেন। দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। এ তালিকা অনেক দীর্ঘ।এ মুহূর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলেন নাট্যকার বাবুল আহমদ, বিশিষ্ট গীতিকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্ত্বিত শামসুল আলম সেলিম, প্রিন্স সদরুজ্জামান চৌধুরী, সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সভাপতি মিশফাক আহমেদ মিশু,সাধারণ সম্পাদক রজত কান্তি গুপ্ত,, কবি পূলিন রায়, কবি আবিদ ফায়সাল, কবি মাসুদা সিদ্দিকা রুহী, কবি আয়শা মুন্নি, লেখক আহমদ বকুল প্রমুখ।
শাহ আলম বাবু আমাদের পারিবারিক বন্ধু। অত্যন্ত হেল্পফুল একজন মানুষ। যে কোন প্রয়োজনে যাকে সবার আগে পাওয়া যায়। লকডাউন এই সময়ে নিজের একটি গাড়ী ড্রাইভারসহ আমার বাসায় পাঠিয়ে দেন। যার ফলে হাসপাতালে আসা যাওয়া অনেক সহজ হয়ে যায় আমার পরিবারের সদস্যদের। অসংখ্য ধন্যবাদ প্রিয় বাবুভাই।
প্রবাসী সাংবাদিক,কবি এবং সাহিত্যিকরা আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারা সবসময় যোগাযোগ রেখেছেন সুস্থতা কামনা করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমার রোগমুক্তির জন্য দোয়া মাহফিল করেছেন। তাদের এ ভালোবাসা শোধ করার শক্তি আমার নেই। তাদের কয়েক জন হলেন, কবি ফকির ইলিয়াস, লেখক সুজাত মনসুর, কবি মালেক ইমতিয়াজ,মোহাম্মদ বিলাল বদরুল, কবি আতাউর রহমান মিলাদ,জুয়েল সাদাত, সাংবাদিক ইব্রাহিম খলিল, মেহেদী কাবুল,জাবেদ আহমদ, রাহিব ফয়সাল প্রমুখ।
আত্মীয়-স্বজন আর পরিবারের সদস্যদের ভুমিকা আমাকে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখিয়েছে। এ ভালোবাসা এ আদর-যত্নের কোন পরিমাপ নেই।
আজ মায়ের কথা ভীষণ মনে পড়ছে। ছোট বেলায় মা বলতেন সৎ পথে থেকো, কোন মানুষের অনিষ্ট চিন্তা করোনা, মিথ্যা কথা কখনও বলোনা, অবৈধ প্রন্থায় রোজগার করো না। তা হলে মানুষ তোমাকে ভালোবাসবে, স্নেহ করবে, সম্মান করবে।
আমার ৬০ বছর ৬ মাসের এই জীবনে মায়ের কথাগুলো আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি।
এই শহরে আমার বাস প্রায় ৪০ বছর ধরে (প্রবাস জীবন বাদ দিয়ে)। না আমি কারো সাথে কোন দিন বিবাধে জড়াইনি, জেনে বুঝে কারো অনিষ্ট করিনি, কারো অধিকার নষ্ট করিনি, কারো হক নষ্ট করিনি, কারো অর্থ আত্মসাত করিনি, অবৈধ এবং হারাম উপায়ে কোন অর্থ উপার্জন করিনি,আমার কাছে কেউ একটি টাকাও পাবেনা আমিও কারো কাছে পাবো না। আমি সব মানুষকে ভালোবাসি। মানুষও আমাকে কতটা ভালোবাসে তা আমি অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছি জীবন-মনণের এই সন্ধিক্ষণে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি অগনিত মানুষের ভালোবাসা এবং দোয়ার বরকতে মহান আল্লাহ আমাকে আমার জীবনকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। ফিরিয়ে দিয়েছেন আমার স্ত্রী-সন্তানদের পরম আশ্রয়স্থল। শোকর আল হামদুলিল্লাহ।
যত দিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকি তত দিন যেন মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারি, মানুষের ভালোবাসার মধ্যে যেন ডুবে থাকতে পারি পরিশেষে মহান আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা।
( এটি তাৎক্ষনিকভাবে স্মৃতি থেকে লেখা। লেখায় হয়তোবা অনেকের নাম বাদ পড়েছে, তবে এটা ইচ্ছাকৃত নয়। আশা করবো নিজগুনে সবাই আমাকে ক্ষমা করে দিবেন)


পরবর্তী খবর পড়ুন : মৃদু ভূকম্পন অনুভূত

আরও পড়ুন

মাধবপুরে শেখ রাসেলের ৫৮ তম জন্মদিন পালিত

 মাধবপুর(হবিগঞ্জ)প্রতিনিধিঃ হবিগঞ্জের মাধবপুরে সারাদেশের তুলনায়...