যানজট মুক্ত সিলেট মহানগরী -কিছু প্রস্তাব

প্রকাশিত : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯     আপডেট : ৯ মাস আগে  
  

মোঃ আব্দুল মালিক
বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত ছোট্ট পৌর শহর সিলেট কালের পরিক্রমায় আজ বিভাগীয় শহর ও মহানগরীতে পরিণত হয়েছে। দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এর কলেবর ও জনসংখ্যা। ফলে নাগরিক সুবিধা ক্রমেই সংকোচিত হয়ে আসছে। এই মহানগরীর সম্মানিত নাগরিকবৃন্দ প্রতিদিন যেসব সমস্যার সম্মুখীন হন তন্মধ্যে যানজট সমস্যাই প্রধান।
এই যানজটে আটকা পড়ে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল-ক্লিনিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদেশগামী যাত্রী, ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ডাক্তার-রোগীর ঘন্টার পর ঘন্টা মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, রোগীর জীবন হচ্ছে বিপন্ন। সময় মত মালবাহী যানবাহন শহরে গমনাগমন করতে না পারায় পরিবহণ ভাড়া বৃদ্ধি পেয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইত্যাকার নানাবিদ সমস্যার সৃষ্টি করছে এই যানজট।
এই যানটজের প্রথম এবং প্রধান কারন হচ্ছে মূল শহরের উপর দিয়ে বাস-ট্রাকের গমনাগমন এবং প্রয়োজনের তুলনায় সরু রাস্তা। শহরের টিলাগড় পয়েন্ট দিয়ে সদর উপজেলার পূর্বাংশ, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জাফলং, তামাবিল গমনাগমণকারী বাস-ট্রাক, আম্বরখানা পয়েন্ট দিয়ে কোম্পানিগঞ্জ ও ভোলাগঞ্জগামী বাস-ট্রাক এবং চালিবন্দর সোবহানীঘাট পয়েন্ট দিয়ে স্থানীয় ও আন্তঃজেলা ট্রাক শহরে প্রবেশ করে বন্দর বাজার সুরমা মার্কেট হয়ে সিলেট মহানগরীর ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র কালীঘাট, লালদিঘীরপার, মহাজনপট্টি যাতায়াত করে বিধায় বন্দর বাজার থেকে শিবগঞ্জ, টিলাগড়, সোবহানীঘাট, উপশহর পর্যন্ত তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এই যানজট নিরসনের জন্য কর্তৃপক্ষ স্থানীয় ট্রাক সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ২টা এবং আন্তঃজেলা ট্রাক রাত ০৯টা পর্যন্ত শহরে প্রবেশ নিষেধ করেছেন। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রভূত ক্ষতি হলেও যানজট কমানো সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে আন্তঃজেলা ট্রাকগুলো শহরে প্রবেশ করার জন্য সকাল থেকে রাত ০৯টা পর্যন্ত শহরের বাইরে সড়ক, মহাসড়কের পাশে সারাদিন অবস্থান করে ফলে ঐ এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। সারাদিন ঐ ট্রাকগুলোকে অলস দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় বিধায় পরিবহণ ভাড়া বেশি দিতে হয়, যার জন্য দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়।
মূল শহরে যানজটের আরেকটি কারন হচ্ছে, বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার সময় স্থানটি ছিল খুবই মনোরম কিন্তু বর্তমানে তা আর নেই। বিদ্যালয়টি সিলেটের ব্যবসা কেন্দ্র কালীঘাটে অবস্থিত। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ঐ বিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক বৃদ্ধি পেয়েছে পূর্বের তুলনায় কয়েকগুন। অন্যদিকে বাড়তি জনসংখ্যার জন্য বাড়তি দোকান-মার্কেট, বাড়তি যানবাহনের কারনে স্কুল শুরু ও ছুটির পর, অভ্যন্তরীন ও পাবলিক পরীক্ষার সময় যানজটের মাত্রা বহুগুনে বৃদ্ধি পায়। ফলে বর্তমানে ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবকদের বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসায় খুব বেশী দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তীব্র যানজট, যানবাহনের তীব্র শব্দ দূষণ ইত্যাদি কারনে ঐ বিদ্যালয়ে পড়ালেখার পরিবেশ বর্তমানে চরম হুমকির সম্মুখীন। অন্যদিকে তীব্র যানজটের কারনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও মালামাল পরিবহণে নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে। জায়গার অভাবে বাড়তি জনসংখ্যার জন্য বাড়তি দোকান, মার্কেট, রাস্তা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এসব নানাবিদ সমস্যার কথা বিবেচনা করে যদি সরকারী পাইলট স্কুলটিকে শিক্ষার পরিবেশ বান্ধব অন্য কোন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকদের যানজট যন্ত্রণা আর থাকবে না। অন্যদিকে বিদ্যালয়ের পরিত্যাক্ত জায়গায় রাস্তা সম্প্রসারণ ও পরিকল্পিত মার্কেট নির্মাণ করে ব্যবসা বান্ধব পরিবেশ ঘটানো সম্ভব।
বর্তমানে সিলেট শহরের ব্যবসার মূল কেন্দ্রস্থল কালীঘাট, মহাজনপট্টি, লালদিঘীরপাড় এলাকায় মালবাহী ট্রাক শহরের কেন্দ্রস্থল বন্দর বাজার হয়ে গমনাগমন করে। ফলে উপশহর, সোবহানীঘাট, বন্দর বাজার, সুরমা মার্কেট, সার্কিট হাউজের সামনে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। শহরের ভিতরের এই যানজট কমানোর জন্য কালীঘাট থেকে পূর্ব দিকে কারখানাঘাট-ছড়ারপার হয়ে যে রাস্তা মেন্দিবাগের দিকে চলে গেছে ঐ রাস্তা সম্প্রসারণ করে ট্রাক চলাচলের উপযোগী এবং কাজীরবাজার সেতুর জিতু মিয়ার পয়েন্ট থেকে পূর্ব দিকে কালীঘাট পর্যন্ত একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করে ঐ ফ্লাইওভার দিয়ে দক্ষিণ সুরমা থেকে কালীঘাট মহাজনপট্টিতে আগমনকারী মালবাহী ট্রাক চলাচলের ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রিক সাপ্লাই আম্বরখানা, লাক্কাতুরা চা বাগান পর্যন্ত আরেকটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হলে শহরের মধ্যে আর যানজটের সৃষ্টি হবে না। কালীঘাট ছড়ারপারের দিকে রাস্তা সম্প্রসারণ করতে গিয়ে যেসব দোকান ও বাড়ির মালিক ক্ষতিগ্রস্থ হবেন তাদের পাইলট স্কুলের জায়গায় দোকান বরাদ্ধ দিয়ে পূর্নবাসিত করা সম্ভব হবে।
মূল শহরের যানজটের আরেকটি কারন পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত বন্দর বাজারের হাসান মার্কেট। নগর ভবন, বিভাগীয় ডাকঘর, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ি, জেলা ও মহানগর জজ আদালত, জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদের কার্যালয়, কয়েকটি মসজিদ ও বিদ্যালয়ের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আছে এই হাসান মার্কেট। এই হাসান মার্কেটের কারনে বন্দর বাজারের রাস্তা সম্প্রসারণ ও শহরের সৌন্দর্য্য বর্ধন করা সম্ভব হচ্ছে না। বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কারাগার বাদাঘাটে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই পরিত্যক্ত জায়গায়র এক পাশে যদি হাসান মার্কেটকে পরিকল্পিতভাবে পুর্নবাসন করা হয়, তবে একদিকে শহরের সৌন্দর্য্য বর্ধন হবে, অন্যদিকে জেলের চতুরপার্শ্বের রাস্তা সম্প্রসারণ করে শহরকে যানজট মুক্তও করা যাবে।
তাছাড়া শহরে প্রবেশদ্বারে, মূল সড়কের পাশে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অনুমতি প্রদানের সময় সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সূদুর প্রসারী ভাবনা করতে হবে। যেমন-সোবহানীঘাট পয়েন্টে ইবনেসিনা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর এখানে দিন দিন যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানকে অনুসরণ করে আল-হারামাইন সহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান শহরের বাইরে নিরিবিলি পরিবেশে প্রতিষ্ঠা করা হলে প্রতিষ্টানের ব্যবসাীয়ক ক্ষতিও হবে না। আবার শহরও যানজটমুক্ত থাকবে। তেমনিভাবে সরকারেরও নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এদিকে নজর দেয়া দরকার। নির্মাণাধীন সিলেট জেলা হাসপাতাল চালু হলে মূল শহরের যানজট কোন পর্যায়ে দাঁড়ায় তা দেখার জন্য নাগরিকদের অপেক্ষা করতে হবে। আমার বিশ^াস ইবনে সিনা হাসপাতালের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি যানজট সৃষ্টি করবে সিলেট জেলা হাসপাতাল।

সিলেট সিটি কর্পোরেশন, সিলেট জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসন, সিলেট চেম্বার অব কমার্স, কালীঘাট ব্যবসায়ী সমিতি, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতি, সিলেটের ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক সহ নেতৃস্থানীয় সকল সংগঠন, নাগরিক সমাজ, সর্বোপরি সিলেট -১ নির্বাচনী এলাকার মাননীয় এমপি আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কুটনীতীবিদ, বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড: এ কে আব্দুল মুমিনের সু-দৃষ্টি কামনা করছি।

আরও পড়ুন