মেঘ বৃষ্টি

প্রকাশিত : ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে

তাসলিমা খানম বীথি: ১.দুটি মানুষ অথচ দেখতে একই রকম। তাদের হাসি, কথা বলার ভঙ্গি, দুষ্টুমি সবকিছুতেই মিল। ওরা যমজ। নাম ‘মেঘ বৃষ্টি’। আমার পাশে বসা যে ছেলেটি তার নাম মেঘ। অনেকক্ষন থেকে টিফিন হাতে নিয়ে বসে আছে সে। ভেবেছিলাম ছোট ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু না! সে অপেক্ষা করছে তার বোনের জন্য। কিছুক্ষন পর একজন কিশোরী এসেই মেঘকে জড়িয়ে ধরে বলছে, ভাইয়া আমি দৌড়ে প্রথম হয়েছি। খুশিতে তারা গদগদ হচ্ছে। তাদের আনন্দ উপভোগ করছি আমি।

২. একদিন আমার ছোট বোনের স্কুলে গিয়েছিলাম বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে। সেখানে মেঘও এসেছে তার বোন বৃষ্টির জন্য বাসা থেকে খাবার নিয়ে। ভাই বোন মিলে খাচ্ছে। ভাই বোনকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। তাদেরকে দেখে মনে হচ্ছে দুটি চুড়–ই পাখি একসাথে বসে খাচ্ছে। হঠাৎ শুনতে পেলাম।
-মেঘ বৃষ্টিকে জিজ্ঞাসা করছে। হোমওয়ার্ক করেছে কি না।
-বৃষ্টি বলল, করিনি। খেয়েই বৃষ্টি দৌড় দিলো। মেঘ বৃষ্টির দৌড় দেখে বলতে লাগলো। বৃষ্টি বোন আমার আস্তে আস্তে যা, পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবি।
বোনের প্রতি ভাইয়ের যে গভীর ভালোবাসা তা অনুভব করলাম। আমার খুব ভালো লাগছে আবার কষ্টও হচ্ছে। তাদের ভাইবোনের ভালোবাসা দেখে। তারপর মেঘকে জিজ্ঞাসা করি তাদের দু’জনের নাম কে রেখেছেন।
– মেঘ বলল, বাবা-মা। মেঘ আরো বলল, আমরা তো যমজ তাই আমাদের নাম মিলিয়ে রেখেছেন ‘মেঘবৃষ্টি’।

৩.আমরা তিন বোন। কোন ভাই নেই। বোনদের মাঝে আমি মেঝ। মাঝে মাঝে ভাইয়ের অভাবটুকু প্রচন্ড মিস করি। সেদিন দুই বোন মিলে কম্পিউটার কিনে যখন বাসায় ফিরি তখন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। তাই বাসায় ভেতরে সিএনজি ঢুকার জন্য গেইট খুলতে ধাক্কাতে থাকি। কিছুতেই খুলতে পারছিলাম না। তখন সিএনজি চালক নিজেই এসে গেইটটা খুলে দেয়। তারপর কম্পিউটারসহ অন্য জিনিসগুলো ঘরে তুলি আমরা। ভাইয়ের শূন্যতা অনুভব করেছিলাম তখন। পরিবারের আরো অনেক কাজ আছে, যে কাজগুলো ভাইয়েরা করে থাকে। আমার পরিবারের সেই কাজ গুলো আমিই করে থাকি। মাঝে মাঝে অফিস থেকে বাসায় যেতে দেরি হলেই আম্মা কিংবা ছোটবোনের কল করে বলবে কখন বাসায় ফিরবো। আর তখন ভাবি সে কলটি যদি আমার ভাইয়ের হতো। তখন হ্যালো বলার আগেই বকাঝকা শুরু করতো। কিংবা নিজেই চলে আসতো আমাকে নিতে।

৪. ভাইয়েরা বোনের সুখের, আনন্দের আর কষ্টের কথা ভেবে থাকে। ভাই থাকলে হয়তো আমাদের সুখ-দু:খের কথা ভাবতো। একটি পরিবারে একজন ভাই থাকা কতটা প্রয়োজন তা অনুভব করি প্রতি মুহুর্তে। যে কেউর পরিবারে ছেলে থাকা মানেই তো সেই পরিবারের বাবা-মা’র আশা ভরসা। ছেলে বড় হয়ে পরিবারে হাল ধরবে। মা বাবার প্রতিটি স্বপ্ন পূরণ করবে। আমি যখন আব্বা আম্মার কথা ভাবি। তখন খুব মন খারাপ হয়। তাদের জন্য অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করে। তবে সাধ্যের ভেতরে যতটুকু পারি তা করার চেষ্টা করি। ছেলে নেই বলে আব্বা আম্মাকে কখনো মন খারাপ করতে দেখেনি। কারন, আব্বা-আম্মার পৃথিবী জুড়ে শুধু আমরা।

৫. পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ভালোবাসা হল ভাইয়ের প্রতি বোনের ভালোবাসা। ভাই বোনের তুলনা কী দিয়ে দেব। ভাইয়ের স্থান যে বাবার পরেই। ভাইয়ের তুলনা জন্ম-জন্মান্তরেও লিখে শেষ করা যায় না। ভাই যে বোনের কী অমূল্য ধন। তা শুধু যার ভাই নেই সেই জানে এ কষ্ট কতটুকু যন্ত্রণাদায়ক, কতটুকু গভীর। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যে কষ্ট আমাকে তাড়া করবে সেটি হলো একটি ভাইয়ের অভাব। কারন আমার কাছে ভাই মানে স্বার্থহীন শর্ত ছাড়া সুখ-দুঃখের প্রেরণা।

যখনই কোন ভাই-বোনকে দেখি খুনসুটি করে, ঝগড়া করে, ভাই বোনকে শাসন করে, আদর করে খু-উ-ব অনুভব করি ভাইয়ের ভালোবাসাকে। তারপরও মানুষের চাওয়ার কোন শেষ থাকে না। তখন মনে হয় জীবনের পাওয়া আর না পাওয়ার মাঝে বেঁচে থাকার নামেই তো জীবন।

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আরও পড়ুন