মুসা আল হাফিজের মননবিশ্ব : মৃন্ময়ে চিন্ময়

,
প্রকাশিত : ২৬ জানুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এম এ আসাদ চৌধুরী:

এক
এই বই নিয়ে আলোচনার জন্য সর্বপ্রথম তৃতীয় চোখের তালাশ করতে হবে। এই চোখ দিয়ে মুসা আল হাফিজ দেখেন। তাঁকেও দেখতে হলে এই চোখ দরকার। আমরা সেই চোখ পাবো কোথায়? কিন্তু আমাদের সুবিধা হলো তৃতীয় দৃষ্টিসম্পন্ন কিছু বিদগ্ধ মানুষ আমাদের কাজকে সহজ করে দিয়েছেন। সাগর সেঁচে আমাদের সামনে মুক্তোর ডালা সাজিয়েছেন একজন মহৎপ্রাণ গবেষক, প্রফেসর ডক্টর মো. রিজাউল ইসলাম। কাজটির জন্য বিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন ছিলো। সে ক্ষেত্রে ডক্টর রিজাউল ইসলামের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। এর আগে তিনি কাজ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে।
লিখেছেন ‘রবীন্দ্র- নজরুল সাহিত্য এবং’ (২০১৬) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাশিল্পী শাহেদ আলীকে নিয়ে ঋদ্ধ ও উন্মোচক বইটি তার রচনা ‘শাহেদ আলীর কথাসাহিত্যে সমাজবাস্তবতার স্বরূপ ও শিল্পরূপ’ (২০১৪) এ দেশে প্রগতিশীল সাহিত্যধারার নেতৃপুরুষ আহমদ শরীফকে নিয়ে তার অনবদ্য কাজ ‘আহমদ শরীফ: সাহিত্য সাধনা ও জীবনদর্শন’ এর জন্য তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন ২০০৫ সালে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করেন শ্রেষ্ঠ গবেষক পুরষ্কার। বর্তমানে তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। সাথে সাথে অব্যাহত রেখেছেন উচ্চমার্গীয় রচনাধারা।২০১৮ তিনি লিখেছেন ‘মুসা আল হাফিজের মননবিশ্ব’ নামে একটি আলোকময় গ্রন্থ। এই গ্রন্থে তার তৃতীয় দৃষ্টি দিয়ে মুসা আল হাফিজকে আবিষ্কারের বিবরণ রয়েছে। এই বিবরণ পাঠে আমাদের নিস্তরঙ্গ মনেও নতুন আলোড়ন জাগে ।
ফলে মুসা আল হাফিজের চিন্তা ও চেতনার নানা দিক আলোচিত হতে থাকে নতুন করে। সে আলোচনা শুধু গল্পে, তর্কে, আড্ডায় সীমিত থাকে না। প্রাজ্ঞ ও বিদগ্ধজনের বাচনিকতায় অনুষ্ঠিত হয় ব্যতিক্রমী জ্ঞানমজমাও। ২০১৮ এর ২৭ মার্চ, মঙ্গলবার, সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘মুসা আল হাফিজের মননবিশ্ব’ শীর্ষক গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব ও সেমিনার। এতে উপস্থিত ছিলেন ত্রিশজনের অধিক ডক্টর, প্রফেসর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষক। বহু সংখ্যক কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থী ছিলেন সেই সেমিনারের মুগ্ধ শ্রোতা। সেমিনারটির আয়োজনে ছিলেন সিলেটের বোদ্ধাসমাজের অগ্রগণ্য অনেকেই। অন্য দশটি সেমিনার থেকে এ ছিলো সম্পূর্ণ পৃথক আয়োজন। মূলত এ ছিলো একাডেমিক চরিত্রের সেমিনার। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরবৃন্দ এতে মূল প্রবন্ধের উপর মুক্ত বিশ্লেষণে অংশ গ্রহণ করেন। এতে উপস্থাপন, উপস্থিতি, বিষয়, বক্তা ও বক্তৃতা; সবই ছিলো উন্নতমার্গের। সেই সেমিনারে মুসা আল হাফিজ যেভাবে বিশ্লেষিত হয়েছেন, তাত্ত্বিক বিচারে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রফেসর রিজাউল ইসলামের গবেষণা সেখানে নানা মাত্রিক আয়নায় বিশ্লেষিত হয়। ফলে এই বিচার ও পর্যালোচনা থেকে মুসা আল হাফিজের মননবিশ্বের চিত্র অনেকটা পরিষ্কার হয়। মুসা আল হাফিজের মননবিশ্ব বইটিতে মূলত তার কবিতা ও গবেষণা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
বিষয় দুটি নিয়ে আলোচনাধারা অবশ্যই নতুন নয়। শিল্প-সাহিত্য ও বুদ্ধিজীবিতায় শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ নানা সময়ে সে আলোচনায় যুক্ত হয়েছেন। এর মাধ্যমে সচেতন ও অগ্রসর পাঠক তাকে নানা মাত্রায় অবলোকন করেছেন। তিনি ও তার মানসের বিবরণ আমরা শুনেছি বিভিন্ন ভাষ্যে।

দুই
মুসা আল হাফিজের মূল পরিচয় কবি। তার ‘ঈভের হ্রদের মাছ’ সম্পর্কে কবি, কথাশিল্পী আল মাহমুদের একটি মুল্যায়নে সংক্ষেপে তার কবিতার নানা দিক স্পষ্ট হয়। তিনি তাঁকে চিহ্নিত করেন এই সময়ে তরুণদের মধ্যে সবচে ‘সবল প্রাণস্পন্দন সম্পন্ন কবিতার জনক হিসেবে। তার কবিতা প্রসঙ্গে আল মাহমুদ বলেন—স্বপ্নের ভেতর দিয়ে যে জীবন দেখা যায়,তার নাম কবিতা। কল্পনায় তৈরী হয় কবিতার জগত। কিন্তু সে জগতে বাস্তব জীবনের শব্দ ও দৃশ্যাবলী চিত্ররূপময় হয়ে উঠে। স্বপ্ন ও বাস্তবতার এই জড়াজড়িতে কবির মস্তিস্কে তৈরি হয় প্রেমরাজ্য। এ কারণে আমি বলি, কবি মাত্রই প্রেমিক। যে স্বপ্ন দেখে না, সে প্রেমিক নয়। কিন্তু প্রত্যেকমানুষ যেহেতু স্বপ্নচারী,অতএব প্রত্যেকেই কবি। আর মানুষ যেহেতু প্রেমিকনা হয়ে পারে না,অতএব প্রত্যেকমানুষ কবি। কিন্তু অসাধারণ কবি থাকেন খুবই কম। একটি জাতির হাজার বছরের পূণ্যে একজন অসাধারণ কবি জন্ম নেন। আমি দীর্ঘ দিন ধরে অসাধারণ কোনো কবিতার গন্ধ শুঁকতে উন্মুখ হয়ে আছি। বাংলা কবিতার শরীর হাতড়াচ্ছি অসাধারণ সৃষ্টিবেদনার লক্ষণের আশায়। এ সময় যাদের কলমে বৈশিষ্ট্যম-িত কবিতার বীর্য রয়েছে, তাদের মধ্যে শক্তিমান এক কবি মুসা আল হাফিজ। মুসা আল হাফিজ যে শক্তিমান, তার স্বাক্ষ্য ঈভের হ্রদের মাছ কাব্যে রয়েছে। সত্যিকার কবি হৃদয় নিয়ে তিনি এ গ্রন্থে আবির্ভূত হয়েছেন। আমি এতে প্রকৃত কবিতার এই আকালে তার প্রতি বড় আশার দৃষ্টিতে চেয়ে আছি। কারণ মানুষ ও মানুষের পৃথিবীর জন্য সবচে’ জরুরী যে বিশ্বাস, সেই বিশ্বাসের স্বচ্ছল আনন্দে অবগাহন করে বিদ্যুচ্ছমকের মতো উজ্জ্বল দৃশ্য ও বাক্য নির্মাণে মুসা আল হাফিজ পারঙ্গম। তার শব্দ ও বিষয়সচেতনতা উচ্চমানের। গভীর আধ্যাত্মিকতার রহস্য তৈরিতে তার প্রচেষ্টা নিয়োজিত হয়েছে। আমি এতে বৈদগ্ধ ও শিল্পসাফল্যের চিহ্ন লক্ষ করেছি। ডান-বাম মিলিয়ে এই প্রজন্মের তরুণ কবিদের মধ্যে মুসা আল হাফিজের কবিতায় সবচে সবলভাবে প্রাণের স্পন্দন শুনা যায়। তার দেখার তৃতীয় চোখ অন্তর্ভেদী বলেই মনে হলো। তিনি দেখেছেন ‘বাতাসের ঢেউয়ে ভাসে পর্বতের পাঁজরের গুঁড়া’ ‘প্রকৃতির গলিত পুঁজে ভরে যাচ্ছে ইথারের ঝিল।’ তাঁর সাহসী উচ্চারণ ‘মৃত্যুর বুকে আমি পা রাখলেই পৃথিবীর বিজয় উৎসব’। মুসা আল হাফিজের সদ্য প্রকাশিত ঈভের হ্রদের মাছের কয়েকটি কবিতা শুনে আমি আপ্লুত। এই কবির প্রতিদেশ ও জাতির আশাবাদী হবার কারণ রয়েছে।
দেশবরেণ্য কবি লোকবিজ্ঞানী ড. আশরাফ সিদ্দিকী লিখেন, ‘মহাজনরা বলে গেছেন, কবিরা নিজেকে দিয়ে তার কালকে প্রকাশ করেন আবার কালকে দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন। কবির ব্যক্তিসত্তা প্রসারিত মূল্যবোধের প্রতীক হয়। প্রবল গতি ও সবল বিরামের মধ্যে ভারসাম্য এনে কবি কাল ও কালান্তরের দূরত্বকে একই মোহনায় নিয়ে আসেন। এ জন্য জীবনানন্দের ভাষায় কবিকে কোবিদ বা জ্ঞানী হতে হয়। শুধু কোবিদ নয়, আমি বলি দ্রষ্টাও হতে হয়। নতুবা তার আহরণ ক্ষমতা গড়ে উঠবে না। প্রকাশও হবে দরিদ্র। মুসা আল হাফিজের কবিতা পড়ে মনে হলো এই কবি দ্রষ্টা। তার মনের ভেতরে চোখ মেলে আছে দার্শনিক শিশু। তার কবিতা একটি প্রসারিত মূল্যবোধের মোহনার দিকে ধাবমান। ব্যক্তি ও বিশ্ব, ব্যক্তি ও নিসর্গ, ব্যক্তি ও কালের কঠিনতা একটি ঐকসূত্রে মিলিত হয়েছে।
‘আমার দৃষ্টির প্রভা বিমুগ্ধ বৃষ্টি ঝরায় ¯েœহের সৌরলোকে
কঠিন গাম্ভীর্যের শহর ডাগর পলির জরায়ূতে নেয়ে
ভাসিয়ে নেয় তুমুলশ্রী শ্রাবণ। চোখের মৃত্তিকা নড়লেই
উল্লাসে মেতে ওঠে নিসর্গের বিশাল তৃণাঞ্চল’

অথবা
‘বানর শূকর আর ব্যাঘ্রতা নিকৃত রেখে চরাচরে দেখো কতো আয়ুর আয়াত
এই যে আমাদের ধর্ম, হেমন্তের পুড়ো মাঠে ফুলের বাগান
অদৃষ্টে সওয়ার হয়ে নিয়ে যাওয়া তাকে নিজ লক্ষ্যের মঞ্জিলে ’
এ রকম পঙ্ক্তিমালা তার কবিতায় কাকতালিয় নয়। এগুলো তার দার্শনিক মনের সহজাত নির্মাণ। অদৃষ্টের ¯্রােতে না ভেসে অবাধ্য ¯্রেেতর উপর সওয়ার হয়ে তার গতিপথ পাল্টে দিয়ে আপন লক্ষ্যের গন্তব্যের দিকে তাকে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের সাথে আল্লামা ইকবালের খুদি দর্শনের মিল পাওয়া যায়। সে দিক থেকে মুসা আল হাফিজ ইকবালের অনুবর্তি। একজন লেখকের বড় গুণ হলো মানবতার প্রতি তার মমত্ববোধ, অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত, ভাগ্যহতদের জন্য তার অশ্রু, সর্বোপরি তার বিশ্বমানবতা। মুসা আল হাফিজ লিখেছেন—
‘দেখো দেখো আমার খুলি
প্রতিদিন ওরা এতে বিজাতীয় ক্যাসেট ঢুকাতে আসে
দেহের লাবণ্য লুটে শোষক কোম্পানী
সঞ্চিত শস্য গিলে কারুণ মহাগ্রাসে
তাই মেরুতে মেরুতে বাজে আমার গোংগানী।’
মানবতার জন্য তার গোংগানী ও কান্নায় আছে অঙ্গীকার । তার ভাষায়—
‘মানুষের জন্য নিরাপদ পৃথিবী ও সূর্যময়
ভোরের অঙ্গীকারে আমার অভ্যুদয়।’ —তার এই অভ্যুদয় সাফল্যম-িত হোক।’

আল মাহমুদ ও আশরাফ সিদ্দিকীর বক্তব্যের পরে সম্ভবত তার কবিতা নিয়ে আর কোনো বক্তব্যের প্রয়োজন নেই। তবুও একটি গ্রন্থের উল্লেখের লোভ সামলাতে পারছি না। যেটি লিখেছেন কবি, সাহিত্য সমালোচক মুকুল চৌধুরী। ২০১০ সালে প্রকাশিত বইটির নাম ‘মুসা আল হাফিজ : কবিতার নতুন কণ্ঠস্বর।’বইয়ের শুরুতে সাহিত্যের ‘সঙ্গসরব দহলিজে’ এক আগন্তুকের অনুপম বিবরণ রয়েছে। যে আগন্তুক সুরসুধা নিয়ে এসেছেন। তার আগমনে দহলিজে সমবেত বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের প্রতিক্রিয়া কী কী হতে পারে, তার একটি বিবরণ দিয়েছেন। পরে তিনি ‘সুরের মাধুযর্’ ও ‘শিল্পের সুখাদ্য’ গ্রহণকারীদের সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করেন।এরপর শুরু হয়েছে গভীর আলোচনা। আলোচনার ধরণ হৃদয়গ্রাহী। যেমন—
মুসার কবিতাকে বিষয়-বিন্যাস বেশ কঠিন। মুসা এক কবিতায় বহু রঙের পালকের ডানা মেলে উড়াল দিয়েছেন। কোনটির কোন রং- সবুজ না হলুদ; কোনটি অমাবস্যার-আঁধারের, কোনটি পূর্ণিমা-উজ্জ্বলতা; কোনটি আশাবাদের, কোনটি হতাশার; কোনটি প্রেমের, কোনটি দ্রোহের; কোনটি দর্শনের, কোনটি অধ্যাত্ববাদের-এ বিন্যাসে নাই বা গেলাম।
মুকুল চৌধুরী প্রথমে‘আজ রাতে তারাগুলো’ কবিতার ব্যাখ্যা করেন। কবিতার বিভিন্ন অংশ উল্লেখ করে তার কাব্যভাষা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং প্রশ্ন তুলেন, ‘এ কোন সময়ের কাব্যভাষা? এ কবিতা কোন সময়কে প্রতিনিধিত্ব করছে? এ কী বাংলা কবিতার পাশ ফেরানোর কোনো ইঙ্গিত? না কী আকাশের বিদ্যুৎ-চমকের মতো ক্ষণস্থায়ী কোনো বিস্ময়?’
মুকুল চৌধুরী লেখেন—
আমাদের আধুনিক কবিরা গ্রীক কিংবা হিন্দু মিথ ব্যবহারে যেভাবে কুণ্ঠাহীন, নিজস্ব ঐতিহ্য থেকে সত্যাশ্রয়ী মিথের ব্যবহারে ততোখানি কুণ্ঠাবোধ করে থাকেন। মুসাকে ধন্যবাদ তার মিথের এ সফল প্রয়োগ এবং ফেরাউনের পটভূমিকায় দাজ্জালকে সংস্থাপনের জন্য।
তিনি মুসা আল হাফিজের প্রতিটি কবিতা নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন। করেছেন অন্তর্ভেদী আলোচনা। যেমন— ‘মহাবিশ্বের করতালি’ কবিতা নিয়ে লেখেন,
“‘মহাবিশ্বের করতালি’ পাঁচ অংশে লেখা দীর্ঘ কবিতা। কবি এখানে এক বিশ্ব-নাগরিক। ধমনী তার নদী, হৃদয় তার সমুদ্র, প্রেম তার গহীন আফ্রিকা, আত্মা তার আকাশ। ‘স্নেহের সৌরলোকে’ তিনি এক ‘ক্ষিপ্র মাছরাঙ্গা’, যার ‘ছাদ ছেয়ে আছে হাওয়ায় ছুটন্ত মেঘের হ্রেষা’। ছুটতে ছুটতে তার আশ্রান্তপ্রশ্নের স্পর্ধা :‘হাহাশ্বাসে তরপানো মানুষের পাঁজরে পা রেখে ওই হায়ান কারুন কেনো শিখরের লিফটে চড়বে প্রভু?’ একই সাথে তিনি বাংলাদেশরও। তার উদর ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল’, যার প্রসব গর্বে মৌ মৌ করছে ‘লালন-তিতু; অটল সহোদর’। তার স্ফুর্তিতে মোচড় মারে ‘ফারাক্কার ক্রোধ’, সমুদ্রকন্যাদের উষ্ণতায় ‘তৃষ্ণার্ত কক্সবাজার’, ‘চাষার রোদভাজার সরল চিত্রকল্প’, ‘তার লুণ্ঠিত শস্যের মাটি’। মুসা এ কবিতায় আরও স্পষ্ট। আদর্শবাদিতা তার অনুধ্যান। বিশ্ব-বিশৃংখলায় তার বিতৃষ্ণা। দ্বন্দ্ব-সংঘাত আর অসুস্থ ও বিকারগ্রস্ততায় তিনি বিক্ষুব্ধ। এ থেকে তিনি পরিত্রাণ চান। তাই তো তারঅনুসিদ্ধান্ত: বিক্ষোভের কাল সমুপস্থিত’, ‘পুনরুত্থানের পতাকা হাতে’ কেউ একজন আসছেন। অতএব ‘গর্বউদ্ভিদেরা হাত মুখ ধুয়ে রেখো’, ‘প্রান্তর মাথা তোলা, মেরুদ- প্রদর্শনের বাজছে নাকাড়া ’।
প্রথম অংকের মতোই পাঁচ অংকে লিখিত দীর্ঘ ১৭৭ লাইনের এ কবিতা জুড়ে একই অনুরণ। এ শতাব্দী তার ভাষায় – তুষার শতাব্দী’। ‘তোমার রহস্য’ এর আলোচনায় লেখেন, ‘এই অধ্যাত্মবাদ’ তোমারই রহস্যে’ কবিতায় আরও প্রগাঢ়, নিগুঢ় ও প্রসারিত। মুসা সুফিবাদি কবিদের মতো মহাচেতনায় নিজেকে লীন করে দিয়ে পুনরুদ্ধারে ব্রতী—
খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও
মৃত্তিকা নক্ষত্র অরণ্যের গর্ত
চন্দ্র কুয়োতলা বাগানের সব ফুল
পাহাড় সমুদ্র তছনছ করে চিত্রপ্রদর্শনী, কবিতার শিবিরে, প্রাচীন সরলভোর
জ্যোৎস্নার দারুণ ঢেউ- নেই কোথাও
কোথাও পাচ্ছি না হৃদয় আমার
আয়াজের মতো আমি মাতাই মাঠের ঘাস
পাখির মতো নীলিমায় ছড়াই বুকের আগুন নিখোঁজ নিখোঁজ বলে হাতড়াই মেঘের নাড়ি-ভূড়ি
পেলাম না কোথাও
হৃদয়!
হৃদয়!
পেলাম না।
হে প্রভু আমার আশিক হৃদয়
তোমারই আলোয় তবে লীন হয়ে গেছে?
বাহ! সত্যিই এক অনাস্বাদিত পঙ্ক্তিমালা। হৃদয় কারবারীরাই (এখানে ‘হৃদয়’ অর্থ -ক্বলব, রুহ ইত্যাদি ইত্যাদি) শুধু খোঁজ রাখেন, বাংলা কবিতায় পরম সত্তার সাথে নিজ সত্তাকে লীন করে দেওয়ার এমন আস্বাদন খুবই কম। কবি ফররুখ আহমদের ‘ডা-ক’ কবিতায় প্রতীকী হয়ে এমন শব্দমালা ঝরতে দেখেছি। আফজাল চৌধুরীর কিছু কিছু কবিতায়- সেও প্রতীকে এবং শেষমেষ আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘সকল প্রশংসা তাঁর’ কাব্যগ্রন্থে- কিন্তু তাও এমন সোজাসাপ্টা নয়। তাছাড়া, মুসা তো একবিংশ শতাব্দীর কবি। এ কবির তো উত্তরাধিকার বাংলা কবিতার যুক্তিবাদী নান্দিপাঠ। ফার্সি কবিতার ভাববাদী পদাবলী নয়। অর্থাৎ মুসা এখানে-এই সময়ে একক এবং স্বীকার করতেই হয় আগামী কবিদের পথপ্রদর্শক।
তিন
মুসা আল হাফিজের চিন্তক ও গবেষক সত্তা প্রভাবশালী। অসংখ্য তরুণ এর দ্বারা উদ্দীপিত। নিরন্তর গবেষণা ও গদ্যচর্চায় তিনি চিন্তা ও চেতনার বিচিত্র ফসল উপহার দিচ্ছেন। এতে সময়ের শুন্যস্থান পুরণ হচ্ছে। বিশিষ্ট কবি গবেষক প্রফেসর ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ এ দিকটায় আলোকপাত করেছেন সুন্দরভাবে। তাঁর ভাষায়—
সাহিত্যচর্চা এবং গবেষণা একসাথে চালিয়ে নেয়া কঠিন। তবে কেউ কেউ এ কঠিন কাজটি করেছেন অত্যন্ত সফলতার সাথে। সৈয়দ আলী আহসান, আবদুল মান্নান সৈয়দ এ ক্ষেত্রে প্রাণবন্ত নজির বৈকি। কবিতার মাঠে তাঁরা যেমন সফলতার আলোয় উদ্ভাসিত তেমনি গবেষণা এবং মননশীল গদ্যসাহিত্যেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আত্মবিশ্বাসের সাথে। দুই মেরুর দুটি বিষয়কে সমন্বয় করার এমন পারঙ্গমতা সবার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাইতো তরুণ লেখকদের অধিকাংশই গবেষণামূলক মননশীল গদ্যসাহিত্যকে নির্বাসন দিয়ে শুধুমাত্র ছড়া-কবিতা কিংবা সৃজনশীল গদ্যসাহিত্য নিয়েই মাতামাতি করছেন। বাংলাসাহিত্যের এমন হতাশাব্যঞ্জক সময়ে যে কয়জন লেখক কাব্যচর্চার পাশাপাশি গবেষণামূলক মননশীল গদ্যসাহিত্য চর্চা করে যাচ্ছেন ‘মুসা আল হাফিজ’ তাদের অন্যতম। ইতোমধ্যে তিনি কবিতার মাঠে যেমন অবস্থান তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন তেমনি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন গবেষণামূলক মননশীল গদ্যসাহিত্যেও।
শুরুর দিকে অনেকেই মাদরাসা শিক্ষা ও বয়সের স্বল্পতার কারণে মুসা আল হাফিজকে প্রাপ্য গুরুত্ব দিতে চাইতেন না। এর স্পষ্ট প্রতিবাদ করেন দুই মনীষী। একজন, পঞ্চাশের দশকের অগ্রগণ্য কবি, গণমানুষের কবি দিলওয়ার। আরেকজন ইতিহাস-ঐতিহ্যের বরেণ্য গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরষ্কার ও একুশে পুরষ্কারে ভূষিত প্রবীণ কবি দিলওয়ার ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতির অভিভাবক। তিনি মুসা আল হাফিজকে উৎসর্গ করে একটি অসাধারণ কবিতা লিখেন। কবিতার নাম ‘রোদ নিয়ে খেলা’। এটি প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে দৈনিক ইত্তেফাক, ঈদুল আযহা সংখ্যায়। এতে তিনি মুসা আল হাফিজকে অভিহিত করেন ‘কুয়াতে সাগরদর্শী’ বলে। তার কলমী সামর্থ্য সম্পর্কে লিখেন, ‘চিরকবি নেমে আসে সৌরলোকে কলম শানিয়ে।’ এটি ছিলো স্পষ্ট এক ঘোষণা। কলম শানানোর কাজ সৌরলোকেই করে এসেছেন মুসা আল হাফিজ ।
সৈয়দ মোস্তফা কামালও ছিলেন তার পক্ষে উচ্চকণ্ঠ। ২০০৭ সালে ‘একজন সীমান্তপ্রহরী’ শীর্ষক প্রবন্ধে তার গদ্য ও গবেষণা সম্পর্কে তিনি লিখেন, ‘প্রাচীন তত্তবিদ ক্যাসিয়াস লঙ্গিনাস লিখেছিলেন, ‘রচনার উৎকর্ষতা শ্রেয়তর দক্ষতা ও বিশিষ্ট প্রকাশভঙ্গির মধ্যে নিহিত।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘কারণ উৎকর্ষময় রচনার একটা অন্তর্নিহিত ক্ষমতা আমাদের আত্মাকে উন্নত করে; আমরা গর্বের মহিমায় এবং স্পর্ধিত আনন্দের অনুভূতিতে পরিপূর্ণ হই; ঠিক যেন মনে হয় এ আমাদের রচনা।’ লঙ্গিনাসের কথাটি উল্লেখ করলাম মুসা আল হাফিজের রচনা নিয়ে কথা বলার জন্য । তার রচনা পড়ে আমার মনে হয় ঠিক যেন আমার মনের কথা। তার রচনার মধ্যে জ্ঞান ও সত্যের উল্লাস আছে। ফলে তাতে আমি আনন্দিত হই। গর্বের মহিমা অনুভব করি। তার রচনার উৎকর্ষ দেখে কখনোই অনুমান করা যায় না যে, তিনি একজন আলেম বা তিনি কম বয়সী একজন। আমাদের ইতিহাস যখন চুরি হচ্ছে আর ঐতিহ্য লাঞ্ছিত হচ্ছে, তখন ইতিহাস-ঐতিহ্যের পক্ষে তার গবেষণা এক ধরনের সীমান্ত পাহারা। তিনি শক্ত হাতে সশস্ত্র হয়ে আমাদের সীমান্তে পাহারা দিচ্ছেন। তাকে মূল্যায়ন করা উচিত তার কাজ দিয়ে। আপনি, আমি চাই বা না চাই, তার কাজ তার অবস্থানকে অনেক উঁচুতে, অনেক সম্মানের জায়গায় নিয়ে গেছে। ফলে বয়স বা পোশাক দিয়ে তাকে মূল্যায়ন করা হবে মূর্খতা।’
মুসা আল হাফিজের অনবদ্য গবেষণাগ্রন্থ ‘প্রাচ্যবিদদের দাঁতের দাগ’। বইটি সম্পর্কে বিচারপতি আবদুর রউফ লিখেন—
পাশ্চাত্যের দার্শনিকদের সিংহভাগই ইসলামের অন্তর্নিহিত স্বরূপকে সম্যক উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়ে, অন্য ধর্মদর্শনের অপরিপক্ক বেড়াজালে আটকা পড়ে ভীষণভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। অনেকেই স্বীয় পূর্বপুরুষ থেকে অনুসৃত জিঘাংসাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মুসলমানের বিরুদ্ধে অহেতুক বিদ্বেষ ছড়ানোর মনমানসিকতা নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করেই চলেছেন। তারা জেনেশুনেই, উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্ধেষপূর্ণ মনগড়া খোঁড়া অসত্য, ভিত্তিহীন, যুক্তিতর্ক দাঁড় করানোর ষড়যন্ত্রে দুঃখজনকভাবে জড়িয়ে পড়েছেন।
প্রাচ্যবিদের দাঁতের দাগ গ্রন্থটি উপস্থাপনায় বিজ্ঞ গ্রন্থকার মুসা আল হাফিজ উল্লেখিত বিদ্বানদের এককথায় প্রাচ্যবিদ এবং তাদের কর্মকা-কে প্রাচ্যবাদ বলে আখ্যায়িত করেছেন। জনাব হাফিজ পা-িত্যপূর্ণভাবেই ঐসব প্রাচ্যবিদের নিজস্ব কর্মকা- থেকে উদ্ধৃত সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি নিপুণতার সাথে সন্নিবেশিত করে সংগত কারণেই ভুল সংশোধনের আহবান জানিয়েছেন। একমুখি সীমিত জ্ঞানের অহমিকায় প্রভাবাম্বিত হয়ে পরষ্পর বিরোধী কাঁদা ছুড়াছুড়ি কারো জন্যেই কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
পাশ্চাত্যের সিংহভাগ অমুসলিম দার্শনিকদের ইসলামের প্রতি অহেতুক শ্যেনদৃষ্টি প্রদর্শনের বিষয়টি বিজ্ঞ গ্রন্থকার পাঠক সমীপে সুন্দর ও সাবলীল ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। এতে গ্রন্থকারের প-িত্যের পরিস্ফুটর লক্ষ্যণীয়। বিষয়টি নিয়ে সুদূর অতীত থেকে বর্তমান ক্রমধারার বর্ণনা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে নন্দিত দার্শনিকেদের উদ্ধৃত আলোচনাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। জটিল বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েও বিজ্ঞ লেখক আলোচ্য বিষয়কে অত্যন্ত সহজভাবে সরলীকরণের মাধ্যমে সাধারণ পাঠকদের বোধগম্যের পরিসীমায় এনে দিয়েছেন। এটা অবশ্যই তার লেখায় স্বকীয়তার ছাপ রেখেছে। মুদ্রণ বিভ্রাট এড়িয়ে যাওয়া যদিও প্রায় দুষ্কর, তবু ছাপা, বাঁধাই, প্রচ্ছদ অলঙ্করণ ইত্যাদি সর্বদিক দিয়েই বইটি সর্বসমক্ষে উপস্থাপন যোগ্য হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ। এই বৈঠকেই বইটি পড়ে ফেলতে আমি কোনরূপ ক্লান্তিবোধ করিনি। সুখপাঠ্য বলেই মনে হয়েছে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটা জোর দিয়েই বলা চলে, আগামীদিনের গবেষকদের গবেষণাকর্মে প্রণীত গ্রন্থটি অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ তথ্যসূত্রের বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে।
তাঁর গবেষণাকর্ম নিয়ে মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের উচ্ছ্বসিত আশাবাদ—
দীর্ঘদিন ধরে আমরা আরব কবির অনুকরণে ‘উলায়িকা আ-বা-য়ী, ফাজি’নি বিমিসলিহিম’ অর্থাৎ ওরা হচ্ছেন আমার বাপ-দাদা। ওদের মতো বাপ-দাদা তোমার থাকলে হাজির করো, এই কবিতা উচ্চারণ করে আসছি। এখন আমাদের কিছু সন্তান তৈরী হয়েছেন। যাদের দিকে চেয়ে আমার বলতে ইচ্ছা হয় ‘উলায়িকা আবনা-য়ী, ফাজি’নি বিমিসলিহিম’ অর্থাৎ এরা হচ্ছেন আমার সন্তান, এদের মতো সন্তানাদি থাকলে তাদের নিয়ে উপস্থিত হও। মুসা আল হাফিজ এই সব সন্তানের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়।
চার
মুসা আল হাফিজের কবিতা ও গবেষণাকর্ম আলোচিত হয়েছে ড. রিজাউল ইসলামের বইটিতে। এ বই উঁচুমার্গের একটি সমালোচনাগ্রন্থ। বস্তুত মুসা আল হাফিজ-গবেষণায় বইটিকে পথপ্রদর্শক বলা যায়। বইটিতে আলোচনার মান ও প্রকৃতি সম্পর্কে একাডেমিক বিশ্লেষণের জায়গা থেকে একটি ভিন্নমাত্রিক রচনা এখানে যুক্ত করবো। রচনাটি প্রফেসর ড. আশ্রাফুল করিমের। ‘মুসা আল হাফিজের মননবিশ্বে এক চক্কর’ শিরোনাম রচনায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, বিদগ্ধ গবেষক আশ্রাফুল করিম লিখেন—
‘মুসা আল হাফিজের মননাবিশ্ব’ ড. মো. রিজাউল ইসলামের ঘোরলাগা ও ঘোর লাগানো একটি বই। একটি মন আর মনের মধ্যকার একটি বিশ্ব সেখানে অঙ্কিত। সেই বিশ্ব আমাদের চেনা বিশ্ব নয়, বদলে যাওয়া ও রূপান্তরিত এক জগৎ। এ জগতে আছে আশ্চর্য দৃশ্যাবলি। রিজাউল ইসলাম এর নাম দিয়েছেন ‘রহস্যরাজ্য’। সেখানে আছে ‘শহর, নগর, গ্রাম, অরণ্য সমুদ্র, নদী, নক্ষত্র, বৃক্ষ, তরুলতা, রোদ-বৃষ্টি, চন্দ্র-সূর্য, মানুষ, পশু-পাখি সবই।’ এগুলোর স্বরূপ চিহ্নিত করেছেন তিনি এক কথায়— ‘যা বাস্তব হয়েও বাস্তবের অধিক আবার কল্পনা হয়েও বাস্তব।’ যারা সেই জগতের স্বাদের সাথে পরিচিত, রিজাউল এর ভাষায়-তারা ‘রহস্যরাজ্যের’ নাগরিক হয়ে যান।’
আমরা সেই বিশ্বে একবার পর্যটন করতে পারি। যারাই পর্যটন করবেন, অবাক দৃশ্যাবলির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করুন। আবার মনে রাখুন দৃশ্যগুলো বিস্ময়কর হলেও এর মর্ম ও রহস্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা প্রবেশ করতে পারি একটি কবিতার ভেতর। কবিতার নাম ‘আজ রাতে তারাগুলো’। এখানে কী দেখছি? ‘তারাগুলো ঝুলে পড়েছে পৃথিবীর তারার বলয়ে’, ‘মর্ত্যের চাঁদের টানে বেসামাল চাঁদের হৃদয়’ ‘হরিৎ উপত্যকায় বাতাস মাতিয়ে তোলা স্বপ্ননীল কস্তুরিহরিণ’, ‘ডানা মেলা এক ঝাঁক অলৌকিক পাখি’ তারা ‘দ্রাবিড় দিগন্ত থেকে আত্মার সোনাদানা খুঁটে খায়’, ‘মধ্যরাতে জেগে থাকা জনপদের নক্ষত্রের কাছে রাখে তারা হার্দিক অভিবাদন’, ‘বৃক্ষগুলো কক্ষপথে নক্ষত্রের সহগামী’, ‘অজানা রহস্যে ঢাকা পড়ে যায় সবুজ পত্রপল্লব’। এদিকে ‘নিসর্গের শিরাতন্ত্রীগুলো অপার্থিব ঢেউ তুলেছে’ আর ‘পৃথিবীর চাঁদ-তারাগুলো উদয়াস্তে জ্বালিয়েছে মুগ্ধমনলেলিহান।’
দেখলেন তো! একটি দৃশ্যও বাস্তব নয়। কিন্তু সবগুলোর মর্ম ও তাৎপর্য বাস্তব এবং এর ভেতরে নিহিত দর্শন ও ভাবনারাজি বাস্তব। দৃশ্যগুলোর ভেতরের সেই মর্ম, দর্শন ও ভাবনারাজি উন্মোচন সহজ কাজ নয়। গভীর অনুধাবন ও শিল্পদৃষ্টি দিয়েই সেটা করতে হয়। সে কাজেই এগিয়ে এসেছেন মো. রিজাউল ইসলাম। তার নিষ্ঠাবান পরিশ্রমের স্বর্ণফসল ‘মুসা আল হাফিজের মননবিশ্ব’। বইটির স্বাদু ভাষা মোহময় ভঙ্গিতে বার বার প্রলুব্ধ করে মুসা আল হাফিজের জগত পর্যটনে। বইটি সেই জগতে প্রবেশদ্বারের চাবি তুলে দেয় পাঠকের হাতে। পাঠক যতই সেখানে ঘুরবেন, ছুটবেন, বুদ হবেন, নিজেকে হারাবেন, ততই রিজাউলের প্রজ্ঞা ও বিশ্লেষণকে অনুধাবন করবেন। আমরা তাই আরেকবার কবির কবিতায় প্রবেশ করি। একটি কবিতাকে ধরে অগ্রসর হই। কবিতার নাম ‘মহাবিশ্বের করতালি’। দেখি ও দেখাই কিছু দৃশ্য:
১. দৃষ্টির প্রভা বিমুগ্ধ বৃষ্টি ঝরায় ¯েœহের সৌরলোকে …
চোখের মৃত্তিকা নড়লেই
উল্লাসে মেতে উঠে নিসর্গের বিশাল তৃণাঞ্চল।

২. কিছু পুস্প লুট ও রিক্ততার দীঘল বসতিকে
ছুঁড়ে মারছে উর্ধ্বপানে,
ঠিকরে পড়া অশ্রান্ত প্রশ্নের স্পর্ধায়
মত্ত বৈশাখে ধুলো গুড়া ঘূর্ণির চুল্লিতে পুড়ানো স্বপ্নের
করতালে বলছে-হাহাশ্বাসে তড়পানো মানুষের পাজরে
পা রেখে হায়ান কারুন কেন শিখরের নিকট চড়বে প্রভু?
৩. বৃষ্টিধারা আদিম উপত্যকায় ধৃষ্টের সাথে হাড্ডাহাড্ডিতে
জিতে পূণরোত্থানের পতাকা হাতে আসছেন
শস্যের প্রতিবেশে। প্রান্তর মাথা তুলো
মেরুদ- প্রদর্শনের বাজছে নাকাড়া।

৪. মিসকলে জাগে ঘুমন্ত শহর লাস্যে
তার তুষারশতাব্দী। দিক-দিগন্তে ভেঙে পড়ে।
… … …
তুষারের গলগল রক্তে বিদগ্ধ সন্ধ্যার প্রণয় ভেঙ্গে যাচ্ছে দ্রাক্ষাবনে।

৫. পশমের হিজলবনে মগ্নগীত জ্যোৎ¯œা, আকাশ বিহঙ্গের
খুড়িয়ে চলা রক্তাক্ত ডানায় গোখরোর দাঁতের দাগে
অকম্মাৎ আঁতকে উঠে…
আকাশে মেঘের চিতা নড়ে আর জেরুজালেমের বুকে
দৌঁড়ায় বিভৎস কুড়াল।

৬. যখন বীজের জিভে সুর্যের দুগ্ধ ঢেলে ছন্দসিক্ত আলের
দু’কাঠ দিয়ে বয়ে গেল চাষী, তুখুড় কবুতরগুলো তখনই
জানা ঝাড়ে ডাকাতের চালে, তখনই কিচকিরি দিয়ে
চুলের বিলাপ ঠেলে মগজের মাখন উঠে ভাতের থালায়।

৭. হে তুমি উজ্জ্বল উজ্জ্বল উজ্জ্বল ঔজ্জ্বল্য। নৃত্যরত পর্বতে দেখো
সুন্দরের মৌজ-সে আমার আত্মার উৎসব।
পর্বতের একেক কণা মুক্তফুলের পাঁপড়ি
রৌদ্রঝড়বৃষ্টিসন্ধ প্রকৃতির চোখ, সহ¯্র উষার দীপ্তি
লুকিয়ে আছে তার অতলে
অনেক কিছুই দেখা গেলো। এক বৃষ্টির কথাই ধরুন। কত বিচিত্র বৃষ্টি। ‘দৃষ্টির প্রভা থেকে ‘বিমুগ্ধ বৃষ্টি’ ঝরছে। ‘¯েœহের সৌরলোকে’। বৃষ্টির একেক ফোটা একেকটি চোখ। তার অভিমুখ মৃত্তিকার দিকে। তার চোখের ইশারায় মৃত্তিকা নড়ে। সাথে সাথে বিসর্গের বিশাল তৃণাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে উল্লাস। ‘উল্লাস’ মানে কি শুদ্ধির আবেগ পরিবর্তন কিংবা প্রাণের জাগরণ? ‘তৃণাঞ্চল’ কী গণস্তর, আমজনতা, বিশ্বমানব? ‘বৃষ্টির বর্ষণ’ কি প্রাণশক্তি, প্রেরণা আদর্শিকতা, কিংবা ঐশীসত্য? ‘¯েœহের সৌরলোক’ কি প্রেমময় নতুন পৃথিবীর ইঙ্গিত? ‘দৃষ্টির প্রভা’ কি মানবিক ঐশ্বর্য, অর্ন্তদৃষ্টি, বিবেকের আলো বা মানবীয় দর্শন?-এতো সব জিজ্ঞাস্য বিষয় আপনাকে দৃশ্যের উপরতলা থেকে ভাবনার নিচতলায় নিয়ে যাবে।
আবার দেখুন: ‘বৃষ্টিধারা আদিম উপত্যকায় ধৃষ্টের সাথে ‘হাড্ডাহাড্ডিতে’ লিপ্ত। ‘বৃষ্টি’ এক শক্তির প্রতীক, ‘ধৃষ্ঠ’ আরেক শক্তির প্রতীক। উভয়কে শরীরী ভাবতে পারেন আবার অশরীরীও ভাবতে পারেন। ‘হাড্ডাহাড্ডিতে’ বৃষ্টির জয় হলো। তারপর সে ‘পূণরোত্থানের পতাকা হাতে আসছেন শস্যের প্রতিবেশে। প্রান্তরকে আহবান করা হচ্ছে মাথা তুলতে। কারণ বৃষ্টির বিজয়ে মেরুদ- প্রদর্শনের নাকাড়া বাজতে শুরু করেছে। কবি বলছেন:
এবার বৃষ্টি নামবে, গর্ভউদ্ভিদেরা হাতমুখ ধুয়ে রাখো
বিক্ষোভের কাল সমুপস্থিত। (মহাবিশ্বের করতালি)
প্রকৃতি ও মানবমনে কবি দেখেন বৃষ্টিবরণের পিপাসা:
এখানে ক্ষুধার সাপ নড়ে উঠে রক্তে-চোরাটানে
তার পাশে ঘাসে ঘাসে সুতুমুল বৃষ্টির আশ্বাস
সৌরজল মাতিয়ে তোলা আদিপৃথিবীর মাছ
অগাধ হৃদয়ে খুজে মুক্তির শ্বাস
(মহাবিশ্বের করতালি)
আবার নিজেকে ও মানবসত্তাকেও তিনি দেখেছেন ‘বৃষ্টির কণা’ হিসেবে। ‘অস্তিত্ব ঘোষণা’ করে যা আকাশের দিকে উড়ে যায় আবার নেমে আসে ‘উদগমের জলধারা’ হয়ে। তার ভাষায়:
তুমি আমি মোতি-সুতা, ছায়াপথ – নক্ষত্রের মতো
মানবসমুদ্রে লীন বৃষ্টির কণা। অস্তিত্ব ঘোষণা করে
প্রাণোচ্ছল উড়ে যাবো আবারো আকাশে
মিকাইল হেকে হেকে কিষাণের স্বপ্ন জুড়ে
বর্ষাবেন উদগমের জলধারা
হায়েনাও ভিজে যাবে ঘোর বরিষণে
আমাদের ধর্ম ঠিক ফসলের মতো, মানবতা তার শষ্যমাঠ (মহাবিশ্বের করতালি)
তাহলে এখানে ‘বৃষ্টি’ বিবিধ অর্থসম্ভাব্যতায় অন্তঃসত্তা। দৃষ্টান্তগুলো আনা হয়েছে কেবল ‘মহাবিশ্বের করতালি’ কবিতা থেকে। তার অন্যান্য কবিতায় ‘বৃষ্টি’ যেসব রঙ, রূপ ও প্রকৃতি ধারণ করে, তা দীর্ঘ এক আলোচনার বিষয়।
রিজাউল ইসলাম মুসা আল হাফিজের ‘আমি’ ‘তুমি’ ‘মদ’ ‘নদী’ ‘আকাশ’ ‘সবুজ’ ‘ জ্যোৎ¯œা’ ‘চাঁদ’ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এতে ধরা পড়েছে মুসা আল হাফিজের মানসপ্রকৃতি এবং চিন্তার বহুতল। প্রাকৃতিক এসব উপাদান অন্য যে কোন কবিতে উপস্থিত। কিন্তু মুসা তার উপাদানগুলিতে বহু তাৎপর্য যোজনা করেন। বহু রহস্য ও অর্থবিস্তার নিশ্চিত করেন। রিজাউল ইসলাম ঠিকই লিখেছেন:
মুসা আল হাফিজের অধিকাংশ কবিতার অর্থ দ্ব্যর্থবোধক, নির্দিষ্ট কোনো অর্থে কাব্যচিন্তার ব্যস সীমায়িত করা যায় না। তবু অর্থব্যঞ্জনাকে ছাপিয়ে কেন্দ্রিকতা যে নেই সেটা বলা যাবে না। পরাবাস্তবতার বিলাসী পোশাক সে কেন্দ্রমুখকে দ্বিধান্বিত করে। (রিজাউল, ২০১৮)
তাঁর এই প্রবণতা যখন প্রকৃতিচিত্রে প্রকাশিত হয়, তখন তাঁর ‘বৃষ্টি’ ‘নদী’ ‘চাঁদ’ ‘পাহাড়’ ‘সাগর’ ‘পাখি’ ইত্যাদি আমাদের চেনা জগতের সীমানায় থেকেও চেনাজগত পেরিয়ে যায়। এ সব উপাদান হয়ে উঠে একেক বক্তব্যের প্রতীক। তার প্রকৃতি হয়ে উঠে একান্তই তার মতো। রিজাউল ইসলামের ভাষায়:
প্রকৃতি মুসা আল হাফিজের কবিতার একটি প্রধান অনুষঙ্গ। প্রকৃতির ভেতর দিয়ে তিনি জীবনকে দেখেন। প্রকৃতি তার কবিতার শরীরে যুক্ত। নিসর্গলিপ্ততা, প্রকৃতি সচেতনতা এবং পরিবেশ চিত্রণে তার কবিতা আলদামাত্রা পেয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি বাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতর সমন্বয় ঘটিয়েছেন। (রিজাউল, ২০১৮)
কখনো ‘বাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতার সমন্বয়’কখনো ‘পরাবাস্তবতার বিলাসী পোশাক’ থাকে তার উপাদানে। ফলত তার ছবিগুলো সালভাদর ডালির ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। ডালির চিত্রে দেখা যায় একটি জিরাফ আগুনের মধ্যে। একটি পানির পাত্র একখ- পনিরে পরিণত হয়েছে। একটি পাথর মানুষে পরিণত হয়েছে। ডালির একটি চিত্রের নাম মেটামরফোসিস-অব-নার্সিসাস। মেটামরফোসিস মানে আকারের পরিবর্তন। চিত্রটিতে দেখা যায় সব কিছুই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। যে হাতটি ডিম ধরে রেখেছে, তা পাথরে পরিণত, পিঁপড়া তার উপর দিয়ে চলাফেরা করছে, ডানদিকের দাবার ছকটি শহরের স্কোরারে পরিণত। এমনকি নদীর পানি কাচে পরিণত হয়েছে। আর মুসা আল হাফিজের মননবিশ্বে হিমালয় তাজমহলে পরিণত হয়, তাজমহল শস্যক্ষেত হয়ে হাঁটে, আবার সূর্যের সুরমা হয়ে সমুদ্রের চোখে লেগে রয়—
আমি তো প্রার্থনায় গলছি
একবার হিমালয় ভেঙে হচ্ছি তাজমহল, হাঁটছি বুকভর্তি ধানের দাপটে
উড়ছে শিল্পের বোধগম্য ধুলো, আমি তো
সূর্যের সুরমা, সমুদ্রের চোখে এলাম অস্তিত্বের
দু’ফোটা রেখে—
বাহবা সমুদ্র! এতো মউজ কখনো দেখিনি তার
(মহাবিশ্বের করতালি: ঈভের হৃদের মাছ)
মুসা আল হাফিজের এই বিচিত্র বিশ্বের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার কৃতিত্ব মো. রিজাউল ইসলামের।
পাঁচ
‘মননের কবি : বৈদগ্ধের দৃষ্টিতে’ বইটি মূলত ‘মুসা আল হাফিজের মননবিশ্ব’ গ্রন্থের উপর বোদ্ধাব্যক্তিবর্গের আলোচনার সমাহার। আলোচনাও একটি সেমিনারভিত্তিক। ‘মুসা আল হাফিজের মননবিশ্ব’ বইটিতে মুসা আল হাফিজের তিনটি কাব্যগ্রন্থ ও দু‘টি গবেষণাগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করা হয়। এগুলো তার সমগ্ররচনার সামান্য মাত্র। তার প্রকাশিত সাতাশটি গ্রন্থের মধ্যে পাঁচটি গ্রন্থ আলোচিত হয় মননবিশ্বে। গবেষক, ড. রিজাউল ইসলামের মতে এসব আলোচনা ‘কবির মননবিশ^কে স্পর্শ করার প্রচেষ্টা মাত্র, পরিপূর্ণ উন্মোচন নয়।’ মুসা আল হাফিজকে উন্মোচন প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য হলো, ‘তাকে উন্মোচনের কাজ হয়তো হবে আরো বহু হাতের দ্বারা।’
এ বইকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত সেমিনারের আলোচনাসমূহের একই ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছে। এসব আলোচনায় যারা অংশ নিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকেই জ্ঞান ও মনীষায় বরেণ্য ও শ্রদ্ধেয়। নিজ নিজ বিষয়ে তারা বিশেষজ্ঞ। চিন্তা ও শাস্ত্রীয় গবেষণায় তারা প্রতিষ্ঠিত। ফলে তাদের পর্যালোচনায় নিবিড় পাঠ ও বিচারশক্তির প্রতিফলন ঘটেছে। ভবিষ্যতে মুসা আল হাফিজ চর্চায় এসব বিচার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যদিও তার সৃষ্টির একটি অংশ এসব আলোচনার বিষয়, তবুও এখানে যে সব মূল্যমান ও বিবেচনা রয়েছে, তা আমাদেরকে পথপ্রদর্শন করবে।
মুসা আল হাফিজচর্চায় ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে আমি তার ‘আমেরিকা মুসলিমদের আবিষ্কার’ বইয়ের উপর একটি আলোচনাগ্রন্থ রচনা করি। ২০১৮ সালে ‘আমেরিকা আবিষ্কারের সত্যউন্মোচন’ নামে বইটি প্রকাশিত হয়। এ বই এ ধারায় আমার দ্বিতীয় প্রয়াস। আশা করি বইটি আমাদের মনের খোরাক হবে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

স্বামীর বিরুদ্ধে ফের নির্যতনের অভিযোগ বালুচরের মনোয়ারার

9        9Sharesস্বামী সাবেক পিপি এডভোকেট এ...

দা‌রিদ্রতা

         সজীব মোহাম্মদ আ‌রিফ : দা‌রিদ্রতা;ক‌বিতায়...

‘ডেঞ্জারজোন’ টিলাগড়ে লাল নিশান উড়িয়ে সন্ত্রাসী ও গডফাদার মুক্ত করার দাবি

10        10Sharesসিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক ঐতিহ্যবাহী এমসি...

ফেসবুকে আমার কোনো অ্যাকাউন্ট নেই: শাবনূর

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক বাংলা চলচ্চিত্রের...