মুসলিম সমাজ : পয়লা বৈশাখ সংস্কৃতি

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল:
প্রতি বছর বাঙালির ঘরে ঘরে আসে পয়লা বৈশাখ। পয়লা বৈশাখ (বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ) বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। নববর্ষ,বর্ষবরণ, পয়লা বৈশাখÑএ শব্দগুলো বাংলা নতুন বছরের আগমন এবং উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব-অনুষ্ঠানাদিকে ইঙ্গিত করে। পয়লা বৈশাখ শব্দগতভাকে পয়লা ও বৈশাখ দুটি আলাদা শব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে। পয়লা উৎপত্তিগত ভাবে ফারসি শব্দ পহেলা থেকে পয়লা, অর্থ হচ্ছে প্রথম (ভারতবর্ষে একসময় ফারসি ভাষার প্রচলন ছিল। ভারতে এখনো পয়লা শব্দটি ব্যবহৃত হয় কিন্তু বাংলাদেশে বাংলা ভাষার অপভ্রংশ হয়ে পয়লা বৈশাখ কথাটি পয়লা হিসাবে চালু রয়েছে তবে এখনো পয়লা ও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়) আর বৈশাখ শব্দ এসেছে যা কিনা বিশাখা নক্ষত্রে সূর্যের একটি অবস্থানকে বুঝান হয়।
বাংলা নববর্ষের সূচনা হয় ভারতবর্ষে, মুঘল সম্রাট আকবরের নির্দেশে। তখন উন্নত প্রযুক্তি না থাকায় ঋতুর উপরই কৃষিকাজ নির্ভর করতো। আর হিজরি ক্যালেন্ডার অনুসারে খাজনা আদায় করা হত। তবে, চাঁদের সাথে কৃষি ফলনের নিয়ম না মিলায় অসময়ে অতিরিক্ত খাজনার কবল থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে সম্রাটের আদশে তৎকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞানী চিন্তাবিদ ফাতেহ উল্লাহ সিরাজী সৌর সন বা নতুন বাংলা সনের প্রচলন করেন। পরে এটি বঙ্গাব্দ হিসাবে পরিচিতি পায়। কৃষিকাজের সেই রেশ ধরেই ভূমি-মালিকরা খাজনা পেয়ে খুশি হয়ে তাদের প্রজাদের মিষ্টি মুখ করান। আর এভাবেই বিভিন্ন পাইকারী, খুচরা ব্যবসায়ী, বিশেষ করে জুয়েলার্সের দোকানগুলো নতুন খাতা (হালখাতা) খুলেন আর ক্রেতাদের মিষ্টি খাওয়ান। যার প্রচলন আমাদের দেশে বড় বড় পাইকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে আজও লক্ষ্য করা যায়।
বাংলা তথা ফসলি সন শুরু হয়েছিল কবে থেকে সেটা তো অনেকেই জানেন ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল থেকে। তবে শুরুর দিন কিন্তু ১ সাল ছিল না, ছিল ৯৬৩ সাল। তখন এ দেশে হিজরী সাল প্রচলিত ছিল। কিন্তু ফসল তোলার সাথে খাজনা পাবার বিষয়টি জড়িত আর এই কারণে একটি বাৎসরিক সময় নির্ধারণের জন্য ফসলি সনের প্রচলন করেন সম্রাট আকবর। হিজরী বছরটিকে ঠিক রেখেই নতুন একটি বর্ষপঞ্জি চালু করা হয়। দুনিয়ায় দুই ধরনের ক্যালেণ্ডারের প্রচলন আছে, চন্দ্রবৎসর ও সৌরবর্ষ। সূর্যকে মানদণ্ড করে সৌরবর্ষের দিনের হিসাব হয় আর চন্দ্রবর্ষের দিনের হিসাব মানদণ্ড ধরা হয় চাঁদকে। খ্রিস্টাব্দ, বাংলা তথা ফসলি সন হচ্ছে সৌরবর্ষ। আর হিজরী হচ্ছে চন্দ্রবর্ষ। সৌরবর্ষের চেয়ে ১১ দিন ছোট চন্দ্রবর্ষ। হিজরী ৯৬৩ থেকে বঙ্গাব্দ শুরু বছর থেকে এ পর্যন্ত পেরিয়েছে (১৪৩১-৯৬৩)=৪৬৮ বছর। প্রতিবছর ১১ দিন হিসাবে ৪৬৮ বছরে দিনের পার্থক্য (৪৬৮ গুন ১১)=৫১৪৮ দিন। মানে (৫১৩৭/৩৬৫)=১৪.০৭৩৯ বছরের পার্থক্য। বাংলা তথা ফসলি ১২ মাসের নামকরণ করা হয়েছে নক্ষত্রমণ্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। বছরের প্রথম পাঁচ মাস বৈশাখ হতে ভাদ্র হবে ৩১ দিনের বাকী মাসগুলো অর্থাৎ আশ্বিন হতে চৈত্র হবে প্রতিটি ৩০ দিনের মাস। প্রতি চতুর্থ বছরের ফাল্গুন মাসে একটি দিন যোগ করে তা হবে ৩১ দিনের। বাংলা একাডেমী সরকারীভাবে এই সংশোধিত বাংলা মাসের হিসাব গ্রহণ করে। যদিও ভারতের পশ্চিম বাংলায় পুরোনো বাংলা সনের প্রচলনই থেকে গেছে এর মূল কারণ এর সাথে হিন্দুদের বৈশাখী বরণ, গণেশ পূজা ও হালখাতার রেওয়াজ প্রচলিত। ধর্মীয় ক্ষেত্রে বাংলায় (বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গ) পূজা এখনো বাংলা বর্ষপঞ্জি নির্ভর। বাংলায় গণেশ হিন্দু ধর্মালম্বীদের এক দেবতা। এই অঞ্চলে গণেশের সবচেয়ে বড় উৎসব পয়লা বৈশাখ তারিখে বাংলা নববর্ষের দিন পালিত হয়। প্রত্যেক বাঙালী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে এইদিন গণেশ পূজিত হন। কলকাতার কালীঘাট ও দক্ষিণশ্বের মন্দিরে গণেশ ও লক্ষ্মীর প্রতিমা এর হালখাতা নিয়ে অনেকে এই দিন সকালে পূজা প্রদান করতে যান। পূজা হয় গঙ্গাতীরে ও পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য মন্দিরেও। দুর্গামূর্তির ডানদিকে অথবা কোনও কোনও ক্ষেত্রে বাদিকে গণেশের মূর্তি নির্মান করে পূজা করা হয়। সকালের সূর্যকে স্বাগত জানানো তথা সূর্য পূজা করা হয়। বাংলা নববর্ষ হিন্দুদের খাছ ধর্মীয় উৎসবের দিন। এর আগের দিন তাদের চৈত্র সংক্রান্ত। আর পয়লা বৈশাখ হলো ঘট পূজার দিন।
পয়লা বৈশাখ আসলেই, বাঙালির সার্বজনীন অনুষ্ঠানের নামে রমনার বটমূলে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো…’ বলে গান গাওয়া, প্রদ্বীপ জ্বালানো, মঙ্গল যাত্রার আয়োজন করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো-এসবের সাথে বাংলা নববর্ষের সম্পর্ক কোথায়? এই উৎসবকে প্রচার মাধ্যমসমূহে বাঙালির ঐতিহ্য হিসেবে রঞ্জিত করা হয়ে থাকে। তাই জাতিগত একটি ঐতিহ্য হিসেবে এই উৎসবকে এবং এর সাথে সম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডকে সমর্থন যোগানোর একটা বাধ্যবাধকতা অনুভূত হয় সবার মনেই-এ যে বাঙালি জাতির উৎসব! তবে বাংলাদেশে বসবাসরত বাঙালি জাতির শতকরা ৯০ ভাগ লোক আবার মুসলিমও বটে, তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে; নববর্ষ উদযাপন এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানাদি যেমন : রবীন্দ্র সংগীতের মাধ্যমে বর্ষবরণ, বৈশাখী মেলা, রমনার বটমূলে পান্তা-ইলিশের ভোজ, জীবজন্তু ও রাক্ষস-খোক্কসের প্রতিকৃতি নিয়ে গণমিছিল এবং এতদুপলক্ষে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, হাসি-ঠাট্টা ও আনন্দ উপভোগ, সাজগোজ করে নারীদের অবাধ বিচরণ ও সৌন্দর্যের প্রদর্শনী, সহপাঠী সহপাঠিনীদের একে অপরের দেহে চিত্রাংকন-এসবকিছু কতটা ইসলাম সম্মত? এসব অনুষ্ঠানের আমদানী কোথা থেকে? কিছু অবুঝ মুসলমান এসব পালন করলেও, যে প্রথা দেশের অধিকাংশ মুসলমানদের মনে কষ্ট দেয়, যার কারণে অনেকেই সেখানে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন, এমন সাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠানে জিইয়ে রাখার উদ্দেশ্য কি? শুরুতেই বলবো, আজকে বাঙালি বলে, যে সব রীতিকে সার্বজনীনভাবে দেখানো হচ্ছে, যেসব বুদ্ধিজীবীরা পশ্চিবঙ্গ (কলকাতা) ও পূর্ববঙ্গের (বাংলাদেশ) রীতিকে এক করতে চাচ্ছেন ও দেখতে চাচ্ছেন, তাদের জানা উচিত, পশ্চিমবঙ্গের কারা এই উৎসব করে এবং কি উদ্দেশ্যে করে। তারা যদিও বাঙালি তবে, তারাও কি নিজেদের ধর্মকে অগ্রাহ্য করে এটাকে সার্বজনীনভাবে দেখছে, নাকি এসব অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে-নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়ে? আমাদের দেশের মত সেখানেও অনেক বাঙালি মুসলমান আছেন-তারা কি সার্বজনীন অনুষ্ঠান মনে করে এতে অংশ নিচ্ছেন? ৯০ ভাগ মুসলিম যে আল্লাহতে বিশ্বাসী, সেই আল্লাহ কি মুসলিমদের এই সকল আচরণে আনন্দ-আপ্লুত হন, না ক্রোধান্বিত হন? আজকের বাংলা নববর্ষ উদযাপনে গান গেয়ে বৈশাখী সূর্যকে স্বাগত জানানো, আর কুরআনে বর্ণিত প্রাচীন জাতির সূর্যকে সিজদা করা, আর উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের সৌর-নৃত্য-এগুলোর মধ্যে চেতনাগত কোন পার্থক্য নেই বরং এ সবই স্রষ্টার দিক থেকে মানুষকে অমনোযোগী করে সৃষ্টির আরাধনার প্রতি তার আকর্ষণ জাগিয়ে তোলার শয়তানী উদ্যোগ।
আমাদের সমাজে নববর্ষ যারা পালন করে, তারা কি ধরনের অনুষ্ঠান সেখানে পালন করে, আর সেগুলো সম্পর্কে ইসলামে বক্তব্য কি? নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে রয়েছে; বৈশাখী মেলা, যাত্রা, পালাগান, জারিগান, গম্ভীরা গান প্রভৃতি বিভিন্ন লোকসঙ্গীতের ব্যবস্থা, প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানান, নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষকরণ, নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীদের সংগীত, পান্তা-ইলিশ ভোজ, চারুশিল্পীদের শোভাযাত্রা, রমনার বটমূলে ছায়ানটের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান ‘এসো হে বৈশাখ…’, এছাড়া রেডিও টিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠান ও পত্রপত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্র। পরিতাপের বিষয় হলো-ধর্মীয়, সামাজিক, প্রশাসনিক, দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি কারণে পঞ্জিকা প্রণীত হয়। আধুনিককালে আন্তর্জাতিক প্রয়োজনেও বাংলা ক্যালেন্ডার তৈরি হয়েছে। বাংলা সন বলতে আমরা যে পঞ্জিকা পাই, তার কোনো প্রয়োগ শিক্ষিত বাঙালিদের জীবনে আছে? নেই। আইন করা সত্ত্বেও তা কি আমাদের প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে? এবারে এ সকল অনুষ্ঠানাদিতে অনুষ্ঠিত মূল কর্মকাণ্ড এবং ইসলামে এগুলোর অবস্থান সম্পর্কে পর্যালোচনা করা যাক :
ইসলাম ধর্মে উৎসবের রূপরেখা
আমরা অনেকে উপলব্ধি না করলেও, উৎসব সাধারণত একটি জাতির ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত হয়। উৎসবের উপলক্ষগুলো খোঁজ করলে পাওয়া যাবে উৎসব পালনকারী জাতির ধর্মনীতে প্রবাহিত ধর্মীয় অনুভূতি, সংস্কার ও ধ্যান ধারণার ছোঁয়া। উদাহরণস্বরূপ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বড়দিন তাদের বিশ্বাসমতে স্রষ্টার পুত্রের জন্মদিন। মধ্যযুগে ইউরোপীয় দেশগুলোতে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ পালিত হতো ২৫ মার্চ এবং তা পালনের উপলক্ষ ছিল এই যে, ওই দিন খ্রিস্টীয় মতবাদ অনুযায়ী মাতা মেরীর নিকট ঐশী বাণী প্রেরিত হয় এই মর্মে যে, মেরী ঈশ্বরের পুত্রের জন্ম দিতে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের সূচনার পর রোমক ক্যাথলিক দেশগুলো পয়লা জানুয়ারি নববর্ষ উদযাপন করা আরম্ভ করে। ঐতিহ্যগতভাবে এই দিনটি একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই পালিত হত। ইহুদীদের নববর্ষ ‘রোশ হাশানাহ’ ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত ইহুদীদের ধর্মীয় পবিত্র দিন ‘সাবাত’ হিসেবে পালিত হয়। এমনইভাবে প্রায় সকল জাতির উৎসব-উপলক্ষের মাঝেই ধর্মীয় চিন্তাধারা খুঁজে পাওয়া যাবে। আর এজন্যই ইসলামে নবী মুহাম্মাদ (সা.) পরিষ্কারভাবে মুসলিমদের উৎসবকে নির্ধারণ করেছেন, ফলে অন্যদের উৎসব মুসলিমদের সংস্কৃতিতে প্রবেশের কোন সুযোগ নেই। মুসলিমদের উৎসব হচ্ছে ইবাদতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। আল্লাহ বলেন : ‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুসম্পন্ন পথ নির্ধারণ করেছি। (সুরা-আল মায়িদাহ, ৫:৪৮)
মুসলিম ও অমুসলিমদের উৎসবের মধ্যে ইসলামের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা মূলনীতিগত অনেক পার্থক্য রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন : ‘প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর তা এটা আমাদের ঈদ।’ (বুখারী : ৯৫২, মুসলিম : ৮৯২)
‘প্রতিটি জাতির জন্য আমি অনুষ্ঠান (সময় ও স্থান) নির্দিষ্ট করে দিয়েছি যা তাদেরকে পালন করতে হয়।’ (সুরা-আল-হাজ্জ্ব, ২২:৬৭)
তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজের অনেকেরই ধর্মের নাম শোনামাত্র গাত্রদাহ সৃষ্টি হলেও প্রকৃতি-পূজারী আদিম ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নকল করতে তাদের অন্তরে অসাধারণ পুলক অনুভূত হয়। সূর্য ও প্রকৃতির পূজা বহু প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন জাতির লোকেরা করে এসেছে। যেমন খ্রিস্টপূর্ব ১৪ শতকে মিশরীয় ‘অ্যাটোনিসম’ মতবাদে সূর্যের উপসানা চলত। এমনইভাবে ইন্দো ইউরোপীয় এবং মেসো আমেরিকান সংস্কৃতিকে সূর্য পূজারীদেরকে পাওয়া যাবে। খ্রিস্টান সম্প্রদায় কর্তৃক পালিত যীশু খ্রিস্টের তথাকথিত জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বরও মূলত এসেছে রোমক সৌর-পূজারীদের পৌত্তলিক ধর্ম থেকে, যীশু খ্রিস্টের প্রকৃত জন্মতারিখ থেকে নয়। ১৯ শতাব্দির উত্তর আমেরিকায় কিছু সম্প্রদায় গ্রীষ্মের প্রাক্কালে পালন করত সৌর-নৃত্য এবং এই উৎসব উপলক্ষে পৌত্তলিক প্রকৃতি পূজারীরা তাদের ধর্মীয়-বিশ্বাসের পুনর্ঘোষণা দিত। মানুষের ভক্তি ও ভালবাসাকে প্রকৃতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির প্রতি আবদ্ধ করে তাদেরকে শিরক বা অংশীদারিত্বে লিপ্ত করানো শয়তানের সুপ্রাচীন ‘ক্লাসিকাল টিদ্রক’ বলা চলে। শয়তানের এই কূটচালের বর্ণনা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে তুলে ধরছেন : ‘আমি তাকে ও তার জাতিকে দেখেছি, তারা আল্লাহকে ছেড়ে সূর্যকে সিজদা করছে এবং শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য শোভনীয় করেছে…’ (সুরা-আল-আমল, ২৭:২৪)
ইসলামের এই যে উৎসব-ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এগুলো থেকে মুসলিম ও অমুসলিমদের উৎসবের মূলনীতিগত একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট হয় এবং এ বিষয়টি আমাদের খুব গুরুত্বসহকারে লক্ষ্য করা উচিত, তা হচ্ছে : অমুসলিম, কাফির কিংবা মুশরিকদের উৎসবের দিনগুলো হচ্ছে তাদের জন্য উচ্ছৃঙ্খল আচরণের দিন, এদিনে তারা নৈতিকতার সকল বাঁধ ভেঙে দিয়ে অশ্লীল কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, আর এই কর্মকাণ্ডের অবধাবিত রূপ হচ্ছে মদ্যপান ও ব্যভিচার। এমনকি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বহুলোক তাদের পবিত্র বড়দিনেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে মদ্যপ হয়ে ওঠে এবং পশ্চিমা বিশ্বে এই রাত্রিতে বেশ কিছু লোক নিহত হয় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে।
অপরদিকে মুসলিমদের উৎসব হচ্ছে ইবাদতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। এই বিষয়টি বুঝতে হলে ইসলামের সার্বিকভাবে বুঝতে হবে। ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং তা মানুষের গোটা জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী বিন্যস্ত ও সজ্জিত করতে উদ্যোগ হয়। তাই একজন মুসলিমের জন্য জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইবাদত শব্দ। যেমনটি কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিচ্ছেন : ‘আমি জীন ও মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন কারণে সৃষ্টি করিনি।’ (সুরা-আয যারিয়াত ৫১:৫৬)
সেজন্য মুসলিম জীবনের আনন্দ-উৎসব আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ ও অশ্লীলতায় নিহিত নয়, বরং তা নিহিত হচ্ছে আল্লাহর দেওয়া আদেশ পালন করতে পারার মাঝে, কেননা মুসলিমের ভোগবিলাসের স্থান ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী নয়, বরং চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে তাদের ধর্মীয় মূলবোধ, তাদের ঈমান, আখিরাতের প্রতি তাদের অবিচল বিশ্বাস, আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালবাসা।
আজ আমরা আমাদের ধর্ম, মূল্যবোধ, নিজস্ব পরিচয়ের জাত মেরে অনেক কর্মসূচি পালন করছি। অবুঝমনে শুধু বাঙালিত্ত্বের নাখড়া লাগাচ্ছি। এদেশের ৯০% মুসলমানরা এতটাই মহান (?) যে নিজের ধর্মের মূল ভিত্তিতে আঘাত লাগলেও অনুভূতিহীন হয়ে থাকছেন। আফসোস! আমরা ভূয়া অসাম্প্রদায়িকতার মোড়কে, ধর্মকে বেঁধে নিজের এক আলাদা পরিচয় খুঁজে বেড়াচ্ছি। আর আমাদের বোদ্ধাগোষ্ঠীরা (যারা আমাদের শিক্ষক) জোরালো কণ্ঠে বলেন : ‘বৈশাখ এক অসাম্প্রদায়িক বাঙালি রীতি।’ অথচ পরিষ্কারভাবে বলতে বৈশাখ অসাম্প্রদায়িকতা বহন করলেও এই দিনকে ঘিরে যেসব রীতির প্রচলন করে রাখা হয়েছে-তা সাম্প্রদায়িক, বাঙালি হিন্দু রীতি। তাই বলতেই হয় : ‘সবাই সবার জায়গায় ঠিক আছে, আমরা, মুসলমানরাই অজ্ঞতা দেখিয়ে মহান (?) সাজতে গিয়ে নিজেরাই নিজেদের ধর্মের গলা টিপিয়ে ধরেছি।’ ঋতুকে নিজের জন্য কল্যাণকর মনে করে স্বাগত জানাচ্ছি মঙ্গল যাত্রা দিয়ে! এদিন অনেকে মুসলমান হয়েও (হিন্দু হলেও বুঝতাম) প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করছি। এতে মুসলমানদের নিজের ধর্মের ব্যাপারে অজ্ঞতাই বুঝায়। দুঃখের বিষয়, আজ এক অজানা স্বার্থে আমাদের তরুণ সমাজকে বাঙালি হিন্দুদের বৈশাখ উদযাপনের পাঠ দিয়ে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। নবর্ষের কিছু অনুষ্ঠানে প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মীয় মতবাদের ছোঁয়া লেগেছে, যা যথারীতি ইসলাম বিদ্বেষীদের নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়, এগুলো তাদের আধ্যাত্মিক আবেগ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর জন্য সত্য ধর্মের বিকল্প এক বিকৃত পথ মাত্র। ইসলামের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সকল প্রকার মিথ্যা দেবতার অবসান ঘটিয়ে একমাত্র প্রকৃত আল্লাহ, মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর ইবাদতকে প্রতিষ্ঠিত করা, যেন মানুষের সকল ভক্তি, ভালবাসা, ভয় ও আবেগের কেন্দ্রস্থলে তিনি অসীম থাকেন। অপরদিকে শয়তানের ষড়যন্ত্র হচ্ছে বিবিধ প্রতিকৃতির দ্বারা মানুষকে মূল পালনকর্তার ইবাদত থেকে বিচ্যুত করা। আর তাই তো ইসলামে প্রতিকৃতি কিংবা জীবন্ত বস্তুর ছবি তৈরী করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত যে রাসুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে (জীবন্ত বস্তুর) ছবি তৈরীকারীরা।’ (বুখারী : ৫৯৫০, মুসলিম : ২১০৯)
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘যে কেউই ছবি তৈরী করল, আল্লাহ তাকে (কিয়ামতের দিন) ততক্ষণ শাস্তি দিতে থাকবেন যতক্ষণ না সে এতে প্রাণ সঞ্চার করে, আর সে কখনোই তা করতে সমর্থ হবে না।’ (বুখারী : ২২২৫, মুসলিম : ২১১০)
নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন অশ্লীলতা : শিকরকপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানের পরেই নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে সমাজ বিধ্বংসী যে বিষয়গুলো পাওয়া যাবে, তা হচ্ছে নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীলতা। বৈশাখী মেলা, রমনার বটমূল, চারুকলার মিছিল, এরই সর্বত্রই সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী নারীকে পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশায় লিপ্ত দেখা যাবে। পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষকে যে সকল আকর্ষণীয় বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করে থাকেন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন : ‘আমি পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে বড় কোন ফিতনা রেখে যাচ্ছি না।’ (বুখারী : ৫০৯৬, মুসলিম : ২৭৪০)
নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও কথাবার্তা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেননা এই অবাধ মেলামেশা ও অবাধ কথাবার্তাই ব্যভিচারের প্রথম ধাপ। যিনা-ব্যভিচার ইসলামী শরিয়াতের আলোকে কবীরা গুনাহ, এর পরিণতিতে হাদীসে আখিরাতের কঠিন শাস্তির বর্ণনা এসেছে। এর প্রসারে সমাজ জীবনের কাঠামো ভেঙে পড়ে, ছড়িয়ে পড়ে অশান্তি ও সন্ত্রাস এবং কঠিন রোগব্যাধি। এ সকল কিছু রোধ করার জন্য ইসলামে নারীদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নারী ও পুরুষের বিচরণ ক্ষেত্র পৃথক করা এবং দৃষ্টি অবনত রাখার বিধান রাখা হয়েছে। আর এজন্যই ইসলামে সুনির্দিষ্ট বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে যে কোন প্রকার সৌন্দর্য বা ভালবাসার প্রদর্শনী ও চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই বিধি নিষেধের আলোকে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নারীর যে অবাধ উপস্থিতি, সৌন্দর্য প্রদর্শন এবং পুরুষের সাথে মেলামেশা-তা পরিপূর্ণভাবে ইসলামবিরোধী, তা কতিপয় মানুষের কাছে যতই লোভনীয় বা আকর্ষণীয় হোক না কেন। এই অনুষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের ধ্বংসের পূর্বাভাস দিচ্ছে। বছরের বালিকা ধর্ষণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বিদ্যাপীঠে ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপন, পিতার সম্মুখে কন্যা এবং স্বামীর সম্মুখে স্ত্রীর শ্লীতাহানি বাংলাদেশের সমাজে এ ধরনের ঘটনা সংঘটনের প্রকৃত কারণ ও উৎস কি? প্রকৃতপক্ষে এর জন্য সেইসব মা-বোনেরা দায়ী, যারা একে প্রগতির প্রতীক হিসেবে বাহবা দিয়ে সমর্থন যুগিয়েছে।
ব্যভিচারের প্রতি আহবান জানানো শয়তানের ক্লাসিকাল ট্রিকগুলোর অপর একটি, যেটাকে কুরআন ‘ফাহিশাহ’ শব্দের আওতায় আলোচনায় করা হয়েছে, পশ্চিমা বিশ্বের অশালীনতার চিত্রও কিন্তু একদিনে রচিত হয়নি। সেখানকার সমাজে নারীর একদিনেই নগ্ন হয়ে রাস্তায় নামেনি, বরং ধাপে ধাপে তাদের পোশাকে সংক্ষিপ্ততা ও যৌনতা এসেছে, আজকে যেমনইভাবে দেহের অংশবিশেষ প্রদর্শনকারী ও সাজসজ্জা গ্রহণকারী বাঙালি নারী নিজেকে শালীন বলে দাবী করে, ঠিক একইভাবেই বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে দেহ উন্মুক্তকরণ শুরু হয়েছিল তথাকথিত ‘নির্দোষ’ পথে।
বিভিন্ন সাজে সজ্জিত পর্দাবিহীন নারীকে আকর্ষণীয়, প্রগতিশীল, আধুনিক ও অভিজাত বলে মনে হতে পারে। কেননা, শয়তান পটাপকাজকে মানুষের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে তোলে। যেসব মুসলিম ব্যক্তির কাছে নারীর এই অবাধ সৌন্দর্য প্রদর্শনকে সুখকর বলে মনে হয়, তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তব্য :
ক. ছোট শিশুরা অনেক সময় আগুন স্পর্শ করতে চায়, কারণ আগুনের রং তাদের কাছে আকর্ষণীয়। কিন্তু আগুনের মূল প্রকৃতি জানার পর কেউই আগুন ধরতে চাইবে না। তেমনই ব্যভিচারকে আকর্ষণীয় মনে হলেও পৃথিবীতে এর ধ্বংসাত্মক পরিণতি এবং আখিরাতে এর জন্য যে কঠিন শাস্তি পেতে হবে, সেটা স্মরণ করলে বিষয়টিকে আকর্ষণীয় মনে হবে না।
খ. প্রত্যেকে নিজেকে প্রশ্ন করে দেখি, একজন নারী যখন নিজের দেহকে উন্মুক্ত করে সজ্জিত করে বহু পুরুষের সামনে উপস্থিত হয়ে তাদের মনে যৌন-লালসার উদ্রেক করে, তখন সেই দৃশ্য দেখে এবং সেই নারীকে দেখে বহু-পুরুষের মনে যে কামভাবের উদ্রেক হয়, সেকথা চিন্তা করে এই নারীর বাবার কাছে তার কন্যার নগ্নতার দৃশ্যটি কি খুব উপভোগ্য হবে? এই নারীর সন্তানের কাছে তার মায়ের জনসম্মুখে উন্মুক্ততা কি উপভোগ্য? এই নারীর ভাইয়ের কাছে তার বোনের এই অবস্থা কি আনন্দদায়ক? এই নারীর স্বামীর নিকট তার স্ত্রীর এই অবস্থা কি সুখকর? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে কিভাবে একজন ব্যক্তি পরনারীর সৌন্দর্য প্রদর্শনকে পছন্দ করতে পারে? এই পরনারী তো কারও কন্যা কিংবা কারও বোন অথবা কারও স্ত্রী? এই লোকগুলোর কি পিতৃসুলভ অনুভূতি নেই, তারা কি সন্তানসুলভ আবেগশুন্য, তাদের বোনের প্রতি ভ্রাতৃসুলভ øেহশূন্য কিংবা স্ত্রীর প্রতি স্বামীসুলভ অনুভূতিহীন? নিশ্চয়ই নয়। বরং আপনি-আমি একজন পিতা, সন্তান, ভাই কিংবা স্বামী হিসেবে যে অনুভূতির অধিকারী, রাস্তার উন্মুক্ত নারীটির পরিবারও সেই একই অনুভূতির অধিকারী। তাহলে আমরা আমাদের কন্যা, মাতা, ভগ্নী কিংবা স্ত্রীদের জন্য যা চাই না, তা কিভাবে অন্যের কন্যা, মাতা, ভগ্নী কিংবা স্ত্রীদের জন্য কামনা করতে পারি? তবে কোন ব্যক্তি যদি দাবী করে সে যে নিজের কন্যা, মাতা, ভগ্নী বা স্ত্রীকেও পরপুরুষের যথেচ্ছ লালসার বস্তু হতে দেখে বিচলিত হয় না, তা সে তো পশুতুল্য, নরাধম। বরং অধিকাংশেরই এধরনের সংবেদনশীলতা রয়েছে। তাই আমাদের উচিত অন্তর থেকে এই ব্যভিচারের চর্চাকে ঘৃণা করা। এই ব্যভিচার বিভিন্ন অঙ্গের দ্বারা হতে পারে, যেমনটি রাসুলুল্লাহ ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন : ‘…চোখের যিনা হচ্ছে তাকানো, জিহ্বার যিনা হচ্ছে কথা বলা, অন্তর তা কামনা করে এবং পরিশেষে যৌনাঙ্গ একে বাস্তবায়ন করে অথবা প্রত্যাখ্যা করে।’ (বুখারী : ৬২৪৩, মুসলিম : ২৬৫৭)
দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার দ্বারা সংঘটিত যিনাই মূল ব্যভিচার সংঘটিত হওয়াকে বাস্তব রূপদান করে, তাই জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য সে সকল স্থান থেকে শতহস্ত দূরে থাকা, যে সকল স্থানে দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার ব্যভিচারের সুযোগকে উন্মুক্ত করা হয়।
সঙ্গীত ও বাদ্য : নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকে সংগীত ও বাদ্য। ইসলামে নারীকণ্ঠে সংগীত নিঃসন্দেহে নিষিদ্ধ-একথা পূর্বের আলোচনা থেকেই স্পষ্ট। সাধারণভাবে যেকোন বাদ্যযন্ত্রকেও ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন বিশেষ কিছু উপলক্ষে দফ নামক বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অনুমতি হাদীসে এসেছে। তাই যে সকল স্থানে এসব হারাম সংগীত উপস্থাপিত হয়, যেমন রমনার বটমূল, বৈশাখী মেলা এবং নববর্ষের অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি, সে সকল স্থানে যাওয়া, এগুলোতে অংশ নেওয়া, এগুলোতে কোন ধরনের সহায়তা করা কিংবা তা দেখা বা শোনা সকল মুসলিমের জন্য হারাম। কিন্তু কোন মুসলিম যদি এতে উপস্থিত থাকার ফলে সেখানে সংঘটিত এই সকল পাপাচারকে বন্ধ করতে সমর্থ হয়, তবে তার জন্য সেটা অনুমোদনযোগ্য। তাছাড়া অনবরত কথা ও গল্প-কাহিনি যা মানুষকে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, তা নিঃসন্দেহে মুসলিমের জন্য বর্জনীয়। অনর্থক কথা, বানোয়াট গল্প কাহিনি এবং গান বাজনা মানুষকে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য শয়তানের পুরোনো কূটচালের একটি, আল্লাহ এ কথা কুরআনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন : ‘তাদের মধ্যে তুমি যাকে পার উস্কে দাও তোমার কথা দিয়ে’ (সুরা-আল ইসরা, ১৭:৬৪)
যে কোন আওয়াজ, যা আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে আহবান জানায়, তার সবই এই আয়াতে বর্ণিত আওয়াজের অন্তর্ভুক্ত। (তাফসীর ইবনে কাসীর)
আল্লাহ আরও বলেন : ‘এবং মানুষের মাঝে এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর পথ থেকে (মানুষকে) বিচ্যুত করার জন্য কোন জ্ঞান ছাড়াই অনর্থক কথাকে ক্রয় করে, এবং একে ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে, এদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা-লুকমান, ৩১:৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘আমার উম্মাতের মধ্যে কিছু লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশমী বস্ত্র, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল বলে জ্ঞান করবে।’ (বুখারী : ৫৫৯০)
এছাড়াও এ ধরনের অনর্থক পাপপূর্ণ অনুষ্ঠান সম্পর্কে বহু সতর্কবাণী এসেছে কুরআনের অন্যান্য আয়াতে এবং আল্লাহর রাসুলের হাদীসে। নববর্ষ উপলক্ষে যে গানগুলো গাওয়া হয়, সেগুলোর কোন কোনটির কথাও শিরকপূর্ণ, যেমনটি আগেই বর্ণনা করা হয়েছে। যে সকল মুসলিমের মধ্যে ঈমান এখনও অবশিষ্ট রয়েছে, তাদের উচিত এসবকিছুকে সর্বাত্মকভাবে পরিত্যাগ করা।
নতুন বছরের সাথে মানুষের কল্যাণের সম্পর্ক : নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি-এ ধরনের তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়, বরং নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি-পুজারী মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ। ইসলামে এ ধরনের কুসংস্কারের কোন স্থান নেই। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই পরম মূল্যবান হীরকখণ্ড, হয় সে এই মুহূর্তকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয় করবে, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে শাস্তির যোগ্য হয়ে উঠবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বছরের প্রথমদিনের কোন বিশেষ তাৎপর্য নেই। আর তাই তো ইসলামে হিজরী নববর্ষ পালনের কোন প্রকার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। না কুরআনে এর কোন নির্দেশ এসেছে, না হাদীসে এর প্রতি কোন উৎসাহা দেওয়া হয়েছে, না সাহাবাগণ এরূপ কোন উপলক্ষ পালন করেছেন। এমনকি পয়লা মহররমকে নববর্ষের সূচনা হিসেবে গণনা করা শুরুই হয় নবীর (সা.) মৃত্যুর বহু পরে উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা.) শাসন আমলে। এ থেকে বোঝা যায় যে, নববর্ষ ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা তাৎপর্যহীন, এর সাথে জীবনে কল্যাণ অকল্যাণের গতিপ্রবাহের কোন দূরতম সম্পর্কও নেই, আর সেক্ষেত্রে বাংলা নববর্ষের কিই বা তাৎপর্য থাকতে পারে ইসলামে?
কেউ যদি এই ধারণা পোষণ করে যে, নববর্ষের প্রারম্ভের সাথে কল্যাণের কোন সম্পর্ক রয়েছে, তবে সে শিরকে লিপ্ত হল, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করল। যদি সে মনে করে যে, আল্লাহ এই উপলক্ষ দ্বারা মানবজীবনে কল্যাণ বর্ষণ করেন, তবে সে ছোট শিরকে লিপ্ত হল। আর কেউ যদি মনে করে যে নববর্ষের আগমনের এই ক্ষণটি নিজে থেকেই কোন কল্যাণের অধিকারী, তবে সে বড় শিরকে লিপ্ত হল, যা তাকে ইসলামের গন্ডীর বাইরে নিয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আর এই শিরক এমন অপরাধ যে, শিরকের ওপর কোন ব্যক্তি মৃত্যু করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে চিরতরে হারাম করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন : ‘নিশ্চয়ই যে কেউই আল্লাহর অংশীদার স্থির করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন, আর তার বাসস্থান হবে অগ্নি। এবং যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।’ (আল-মায়িদাহ, ৫:৭২)
বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সাথে মঙ্গলময়তার এই ধারণার সম্পর্ক রয়েছে বলে কোন কোন সূত্রে দাবী করা হয়, যা কিনা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। মুসলিমদেরকে এ ধরনের কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে ইসলামের যে মূলতত্ত্ব সেই তাওহীদ বা একত্ববাদের ওপর পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা নববর্ষ সংক্রান্ত যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এজন্য যে এতে নিুেলিখিত চারটি শ্রেণীর ইসলাম বিরোধী বিষয় রয়েছে : ১. শিরকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদি, চিন্তাধারা ও সংগীত, ২. নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান, ৩. গান ও বাদ্যপূর্ণ অনুষ্ঠান, ৪. সময় অপচয়কারী অনর্থক, আজেবাজে কথা ও কাজ।
এ অবস্থায় প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব নিজে এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে থাকা এবং বাঙালি মুসলিম সমাজ থেকে এই প্রথা উচ্ছেদের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো নিজ নিজ সাধ্য ও অবস্থান অনুযায়ী। যেসব ব্যক্তি নিজ নিজ ক্ষেত্রে কিছুটা ক্ষমতার অধিকারী, তাদের কর্তব্য হবে অধীনস্থদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখা। যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এই নির্দেশ জারি করতে পারেন যে, তার প্রতিষ্ঠানে নববর্ষকে উপলক্ষ করে কোন ধরনের অনুষ্ঠান পালিত হবে না, নববর্ষ উপলক্ষে কেউ বিশেষ পোশাক পরিধান করতে পারবে না কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারবে না। মসজিদের ইমামগণ এ বিষয়ে মুসল্লীদেরকে সচেতন করবেন ও বিরত থাকার উপদেশ দেবেন। পরিবারের প্রধান এ বিষয়টি নিশ্চিত করবেন যে তার পুত্র, কন্যা, স্ত্রী কিংবা অধীনস্থ অন্য কেউ যেন নববর্ষের কোন অনুষ্ঠানে যোগ না দেয়। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকে তার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, সহকর্মী ও পরিবারের মানুষকে উপদেশ দেবেন এবং নববর্ষ পালনের সাথে কোনভাবে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক দান করুন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক

আরও পড়ুন



শাল্লায় আব্রার খাল খনন কাজের শুভ উদ্বোধন

হাবিবুর রহমান-হাবিব, শাল্লা সুনামগঞ্জ থেকেঃ...

সাংবাদিক সজল ঘোষ’র পিতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ

দৈনিক উত্তরপূর্ব, সিলেটভিউ২৪ডটকমের সিনিয়র রিপোর্টার...

সিলেট জেলা ও মহানগর যুবদলের কর্মী সভা

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল সিলেট জেলা...