মুসলিম জীবনে হজ্বের তাৎপর্য

প্রকাশিত : ১৩ আগস্ট, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল: হজ্ব ইসলামের পাঁচটি বুনিয়াদের অন্যতম। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হজ্ব একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদাত। এর মধ্যে মুসলিম উম্মাহর জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় নিহিত রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাদা, কালো, আরবী, আযমী সকলেই ছুটে যান একই কেবলা পানে। আর সকলেরই মুখে একই তালবিয়া। সকলের পরনে একই ধরনের ইহরামের পোশাক। একই দিন আরাফাত ও মুযদালিফায় অবস্থান করেন। একই নিয়মে মিনায় প্রতীকী শয়তানের প্রতি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। এর মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে একতা, সম্প্রীতি, ভালবাসার বন্ধন সুদৃঢ় হয়। হজ্বের সময় পোশাক-পরিচ্ছদ, তাকবীর, তাহলীল, হলক, কসর সব কিছুর মধ্য দিয়ে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মানুষদের মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়; যা একটি শক্তিশালী মুসলিম উম্মাহ গঠনে বিরাট ভূমিকা পালন করে।
হজ্বের হুকুম : সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর তার জীবনে একবার হজ্ব¡ ফরজ হওয়া এবং তা পাঁচটি স্তম্ভ যার উপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত তার অন্যতম একটি স্তম্ভ হওয়ার ব্যাপারে উম্মাত ঐক্যমত পোষণ করেছেন। আল্লাহ্ তায়া’লা বলেন : ‘মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই গৃহের হজ্ব¡ করা তার অবশ্য কর্তব্য। এবং কেহ প্রত্যাখ্যান করলে সে জেনে রাখুক আল্লাহ বিশ্ব-জগতের মুখাপেক্ষী নহেন।’ (সুরা-আলে ইমরান : ৯৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য মাবুদ নেই, মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল এ সাক্ষ্য দান করা। নামাজ প্রতিষ্ঠা করা। জাকাত প্রদান করা। রমজানের সিয়াম পালন করা। বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্ব¡ করা’ (বুখারী মুসলিম)। তিনি বিদায় হজ্বের ভাষণে আরো বলেন : ‘হে মানবজাতি! আল্লাহ তোমাদের উপর বায়তুল্লাহর হজ্ব¡ ফরজ করেছেন। সুতরাং তোমরা হজ্ব¡ কর’ (মুসলিম)।
হজ্বের হাকীকত বা মর্মকথা এই যে, ব্যক্তি তার নিজেকে পরিপূর্ণ রূপে তার প্রভুর হাতে সোপর্দ করে দেবে এবং একনিষ্ঠ মুসলমান হয়ে যাবে। আসলে আল্লাহ তায়া’লার পাক সত্তা থেকে এ শক্তি আশা করা যায় যে, সংস্কার সংশোধনের সকল প্রকার নির্ভরযোগ্য প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বান্দাহর জীবনে যেসব ত্র“টি-বিচ্যুতি থেকে যায় তা হজ্বের করণীয় কাজগুলো এবং হজ্বের স্থানগুলোর বরকতে দূর হয়ে যাবে এবং সে হজ্বের মাধ্যমে এমন পাক সাফ হয়ে ফিরে আসবে যেন সে আজই জন্মগ্রহণ করেছে। সেই সাথে হজ্ব প্রকৃত অবস্থার একটা কষ্টিপাথরও বটে। অর্থাৎ কার হজ্ব প্রকৃত হজ্ব এবং কে হজ্বের সকল আরকান পালন এবং বায়তুল্লাহর যিয়ারত করা সত্ত্বেও বঞ্চিত রয়ে গেছে। আর এটাও সত্য যে হজ্বের তওফীক লাভ করা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি নিজেকে সংশোধন করা থেকে বঞ্চিত থাকে, তার সম্পর্কে খুব কম আশাই করা যেতে পারে যে, অন্য কোনো উপায়ে তার সংশোধন হতে পারবে। এজন্যে হজ্ব পালনকারীর জন্যে এটা অত্যন্ত জরুরী যে, সে যেন তার আবেগ অনুভূতি ও কামনা বাসনার পর্যালোচনা করে এবং হজ্বের এক একটি রুকন ও আমল পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও অনুভূতির সাথে আদায় করে হজ্বের সেসব ফায়দা হাসিল করে যার জন্যে হজ্ব ফরয করা হয়েছে।
হজ্জের প্রকারভেদ : হজ্ব তিন প্রকার : এক. ফরজ, দুই. ওয়াজিব, তিন. নফল।
১. সুস্থ বালেগ, সজ্ঞান, দৃষ্টিশক্তি বিশিষ্ট এবং মক্কা শরীফ যেয়ে ফিরে আসার এবং উক্ত সময়ে পরিবারের জন্য ব্যয়ভার বহনের ব্যবস্থা করতে পারলে জীবনে একবার হজ্ব করা ফরজ। ২. কোন বিপদ আপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য হজ্ব মানত করলে এটা আদায় করা ওয়াজিব। ৩. দ্বিতীয়বার হজ্ব করা কিংবা হজ্ব ফরজ বা ওয়াজিব না হওয়া সত্বে ও সওয়াবের আশায় হজ্ব করা নফল।
হজ্বের আহকাম : ১. হজ্ব ফরয হওয়ার সকল শর্ত বিদ্যমান থাকলে জীবনে একবার হজ্ব করা ফরয। হজ্ব ফরযে আইন এবং তার ফরয হওয়া কুরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণিত। যে ব্যক্তি হজ্ব ফরয হওয়া অস্বীকার করবে সে কাফের এবং যে ব্যক্তি হজ্বের শর্ত বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও হজ্ব করবে না সে গুনাহগার এবং ফাসেক। ২. হজ্ব ফরয হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে বছরই তা আদায় করা উচিত। ফরয হওয়ার পর বিনা কারণে বিলম্ব করা এবং এক বছর থেকে আর এক বছর পর্যন্ত টালবাহানা করা গুনাহ। রাসুল (সা.) বলেন, যে হজ্বের ইচ্ছা পোষণ করে তার তাড়াতাড়ি করা উচিত। হতে পারে যে, সে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়বে, অথবা সওয়ারীর উটনী হারিয়ে যেতে পারে। আর এটাও হতে পারে যে, অন্য কোনো প্রয়োজন তার হতে পারে। (ইবনে মাজাহ) ৩. হজ্বের ফরয আদায় করার জন্যে যাদের অনুমতি নেওয়া শরীয়াতের দিক দিয়ে জরুরী যেমন কারো মা-বাপ দুর্বল অথবা রোগাক্রান্ত এবং তার সাহায্যপ্রার্থী অথবা কোনো ব্যক্তি কারো কাছে ঋণী অথবা কারো জামিনÑএমন অবস্থায় অনুমতি ছাড়া হজ্ব করা মাকরূহ তাহরীমি। ৪. হারাম কামাইয়ের দ্বারা হজ্ব হারাম। ৫. ইহরাম না বেঁধে মীকাতে প্রবেশ করলে হজ্ব ফরয হয়ে যায়। ৬. হজ্ব ফরয হওয়ার পর কেউ বিলম্ব করলো, তারপর সে অসমর্থ হয়ে পড়লো এবং অন্ধ, পঙ্গু অথবা কঠিন অসুখে পড়লো এবং সফরের যোগ্য রইলো না, তাহলে সে তার নিচের খরচে অন্যকে পাঠিয়ে বদলা হজ্ব করে নেবে।
হজ্ব আত্মিক উন্নতির মাধ্যম : হজ্ব এমন এক ইবাদাত যার মাধ্যমে দৈহিক ও আর্থিক উভয় ধরনের ইবাদাত পালিত হয়। তামাম পৃথিবী থেকে ঈমানদার নর-নারী ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ অর্থাৎ ‘হে প্রভু! আমি তোমার দরবারে উপস্থিত’ তাকবীর দিতে দিতে বায়তুল্লাহর দিকে ছুটে যায়। ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের পার্থক্য সত্ত্বেও সকলেই একই ঘরের চারিদিকে তাওয়াফ করে। সকলের পরিধানে সেলাইবিহীন ইহরামের কাপড়। এ কি মধুর পরিবেশ! এ কি মধুর আমেজ! এ কি মধুর স্লোগান! একেক দেশের লোকজনের একেক ধরনের ভাষা হলেও সবাই একই আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য ছুটে এসেছে। সবাই এক আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কাবার চারদিকে একই পদ্ধতিতে প্রদক্ষিণ করছে, আর মনে মনে আল্লাহর কাছে হাজারো আকুতি জানাচ্ছে। আল্লাহর নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে সবাই একই রাসুলকে অনুসরণ করছে। ভাষা, অঞ্চল ও বর্ণের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আদর্শের কোন পার্থক্য নেই। সবাই ইসলামী আদর্শের অনুসারী। তারা একই সময়ে একই পদ্ধতিতে হজ্বের আহকাম পালনের মধ্য দিয়ে ইসলামী আদর্শ দুনিয়াতে কায়েমের প্রেরণা লাভ করছে। তাদের মধ্যে ঐক্য, সংহতি, ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা মজবুত করছে।
হজ্বের মাসগুলো মহিমান্বিত : শুধু হজ্বের আহকাম পালনের মধ্যে সওয়াব নিহিত নেই; বরং যে মাসগুলোতে হজ্ব করা হয় সেই মাসগুলোও তাৎপর্যপূর্ণ। হজ্বের মাসসমূহে লড়াই নিষিদ্ধ। অপরদিকে যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ দিন বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত। আল্লাহ তায়া’লা সুরা ফজরের শুরুতে উক্ত দশ রাতের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন : ‘ফজরের কসম! দশটি রাতের, জোড় ও বেজোড় এবং সে রাতের কসম! যখন তা বিদায় নিতে থাকে। ভেবে দেখ, এসবের মধ্যে বুদ্ধিমানের জন্য কোন কসম আছে কি? অর্থাৎ নিশ্চয়ই আছে। (সুরা-ফাজ্র : ১Ñ৫)
হজ্বের সাথে সম্পৃক্ত আমলে অনেক নেকী : হজ্বের সাথে আরো অনেক আমল সম্পৃক্ত আছে। আল্লাহ তায়া’লা এসব আমলের মাধ্যমে অনেক সওয়াব হাসিলের সুযোগ করে দিয়েছেন। যেমন :
অর্থ ব্যয় : হজ্ব করতে হলে অনেক অর্থ খরচ করতে হয়। হযরত বুরাইদা (রা.) বর্ণনা করেন, হজ্ব করার জন্য যেসব অর্থ ব্যয় হয় আল্লাহ ‘জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর মতো এ অর্থ ব্যয়ের প্রতিদান সাতশত গুণ বাড়িয়ে দেবেন।’ (বায়হাকী)
রাসুলে কারীম (সা.) আরো বলেন, যারা হজ্ব করতে যায় তারা আল্লাহর মেহমান। তারা যা চায় আল্লাহ তা দেন। তারা যা দোয়া করে আল্লাহ তা কবুল করেন। আর তারা হজ্বের সময় যা খরচ করে আল্লাহ তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে প্রতিদান দেন।
প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ! এবার একটু চিন্তা করুন, আল্লাহ আমাদের আখিরাতে নাজাতের জন্য কত সুযোগ দিচ্ছেন। যাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য আছে তারা হজ্ব করতে গিয়ে নিজেরা যা খাবে, চলাফেরা করতে যা খরচ করবে, সব কিছুর জন্য আল্লাহ সওয়াব দেবেন। আর এ সওয়াব তিনি অনেকগুণ বাড়িয়ে দেবেন। সামর্থ্য থাকার পরেও যারা হজ্ব করতে না গিয়ে ব্যাংকে টাকা জমা করে রাখেন তাদের চিন্তা করা দরকার, ব্যাংকের জমা টাকা কোন কাজে আসবে কিনা।
ইহরাম ও তালবিয়া : হাজীগণ তালবিয়া পাঠ করেই ইহরাম শুরু করেন। হযরত যায়েদ ইবনে খালেদ আল জুহানী বর্ণনা করেন, রাসুলে কারীম (সা.) বলেছেন, আমার কাছে জিবরাঈল (আ.) এসে বলেছেন, আপনার সঙ্গী-সাথীদের উচ্চঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করতে বলুন, কেননা এটা হজ্বের নিদর্শন। (ইবনে মাজাহ)
হযরত সাহল বিন সা’দ থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলে কারীম (সা.) বলেছেন, যখন তালবিয়া পাঠ করা হয় তখন তালবিয়া পাঠকারী হাজীর ডান-বাম দিকের পাথর, গাছ ও মাটি তার সাথে তালবিয়া পড়তে থাকে। একজন হাজী যখন তালবিয়া পাঠ করে, আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্বের প্রকাশ করে, তখন আল্লাহ খুব খুশি হন।
ইহরামের আগে সালাত : একজন হাজীর জন্য দু’রাকআত সালাত আদায় ইহরাম বাঁধা সুন্নাত। এ দু’রাকআত সালাতের অনেক ফজিলত আছে। এ সালাতে প্রথম রাকআতে সুরা কাফিরূন আর দ্বিতীয় রাকআতে সুরা ইখলাস পড়া মুস্তাহাব।
তাওয়াফ : যিনি হজ্ব করতে যান তিনি ফরয তাওয়াফসহ আরো অনেক তাওয়াফ করেন। আল্লাহ তায়া’লা নিজেই তাঁর ঘর প্রদক্ষিণ করার কথা বলেছেন। তিনি কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘প্রাচীন সম্মানিত ঘরের তাওয়াফ করতে হবে।’’ (সুরা-হজ্ব : ২৬)
তাওয়াফের মধ্যে অনেক সওয়াব আছে। রাসুলে কারীম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তাওয়াফ করার জন্য পা উপরে উঠায় তার পা নিচে নামানোর আগেই আল্লাহ তায়া’লা তার আমলনামায় দশ নেকী লিখে দেন এবং প্রত্যেক কদমের পরিবর্তে দশটি গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেন, আর দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।’ (আহমদ)
রাসুলে কারীম (সা.) আরো বলেন, যে ব্যক্তি পঞ্চাশ বার তাওয়াফ করবে সে সদ্যপ্রসূত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়। (তিরমিযী)
হাদীসে আরো আছে, যে ব্যক্তি প্রতি সপ্তাহে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করে তাকে একটি গোলাম মুক্ত করার সওয়াব দান করা হয়।
হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীকে চুমু দেওয়া বা স্পর্শ করা : হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর ফজিলত সম্পর্কে রাসুলে কারীম (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়া’লা কিয়ামতের দিন হাজারে আসওয়াদকে জীবন দান করে উঠাবেন। তার দুটি চোখ হবে যা দিয়ে সে দেখবে। তার মুখ হবে যা দিয়ে সে কথা বলবে। যেসব বান্দা তার ইস্তেলাম তথা চুম্বন করবে, তার সপক্ষে সে সাক্ষ্য দেবে। (ইবনে মাজাহ)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, হাজারে আসওয়াদ জান্নাত থেকে যখন জমিনে অবতীর্ণ হয় তখন তা সাদা ছিল। বনী আদমের পাপই তাকে কালো বানিয়ে ফেলেছে। (তিরমিযী)
মাকামে ইবরাহীমে দু’রাকআত সালাত : আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, আমি নবী করীম (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করবে এবং মাকামে ইবরাহীমে দু’রাকআত সালাত আদায় করবে, আল্লাহ তাকে একটি গোলাম মুক্ত করার সওয়াব দান করবেন।
সাফা ও মারওয়ায় সাঈ বা দৌড়ানো : হাজী সাহেবগণ সাফা মারওয়ার মাঝখানে সাঈ করেন। হজ্ব বা ওমরা করার জন্য যারা যান তাদের সাঈ করতে হয়। এখানে সাঈ করার সময় ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহর কাছে মনের আকুতি জানাতে পারেন। এখানে নিজের জন্য ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য দোয়া করা যায়। রাসুলে কারীম (সা.) এ স্থানেও দোয়া কবুল হয় বলে উল্লেখ করেছেন।
আরাফার ময়দানে বিশেষ ক্ষমা : রাসুলে কারীম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়া’লার নিকট আরাফাতের দিনটি সকল দিন থেকে উত্তম। এ দিন আল্লাহ ফেরেশতাদের সামনে নিজের হাজী বান্দাদের জন্য গৌরব প্রকাশ করে বলেন, তোমরা দেখ! আমার বান্দারা প্রচণ্ড রৌদ্রে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তারা বহু দূর থেকে এখানে উপস্থিত হয়েছে। তারা আমার রহমতের আশায় এখানে উপস্থিত হয়েছে। বস্তুত তারা আমার আযাব দেখেনি। এ দরনের গৌরব প্রকাশের পর আল্লাহ তার বান্দাদের জাহান্নামের আযাব থেকে রেহাই দেওয়ার হুকুম দেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলে কারীম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ আরাফাতের দিন যত লোককে মাফ করেন, তত লোককে আর কোনদিন মাফ করেন না। এরপর তিনি ফেরেশতাদের লক্ষ্য করে বলেন, হে ফেরেশতারা! তোমরা সাক্ষী থাকো, আমি তাদের ক্ষমা করেছি। (ইবনে হাব্বান)
রমী বা পাথর নিক্ষেপ : মিনায় হাজী সাহেবদের তিনটি স্তম্ভ লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করতে হয়। এটা ওয়াজিব। হযরত ইবরাহীম (আ.) যখন শিশু পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানী করার জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন শয়তান পথিমধ্যে সন্তানের মাতার দোহাই দিয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালন থেকে তাঁকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছিল। তখন তিনি পাথর নিক্ষেপ করে শয়তানকে দূর করে দেন। এ ইতিহাস স্মরণ করিয়ে হাজী সাহেবগণকে সব সময় যাতে শয়তানের বিরুদ্ধে সজাদ সচেতন থাকেন সে অনুভূতি সৃষ্টির জন্যই পাথর নিক্ষেপ করার বিধান দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, আবরাহা বায়তুল্লাহ ধ্বংস করার জন্য সেনাবাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় এ স্থানে পৌঁছলে আল্লাহ ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি প্রেরণ করেন। ক্ষুদ্র আবাবিল পাখির পাথর নিক্ষেপেই আবরাহার বিশাল বাহিনীর অধিকাংশ পথে পথে মারা যায়। এভাবে আল্লাহ তায়া’লা আবরাহার দুরভিসন্ধি নির্মূল করে দেন। এ ঘটনা স্মরণ করেই মিনাতে পাথর নিক্ষেপ করার মাধ্যমে হাজী সাহেবগণ ইসলামবিরোধীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন। আর তাঁদের মধ্যে এ বিশ্বাস আরো বদ্ধমূল হয় যে, যেই আল্লাহ আবরাহার বিশাল বাহিনীকে ক্ষুদ্র আবাবিল পাখি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছেন; আজকেও তিনি ইসলামবিরোধীদের সেরূপ নির্মূল করতে সক্ষম।
পাথর নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে উল্লিখিত অনুভূতিকে শাণিত করার পাশাপাশি অনেক সওয়াবও অর্জিত হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়, প্রতিটি ছোট ছোট পাথরকণা বড় বড় গুনাহ মুছে দেয়। হযরত আবু সাইদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলে কারীম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ যার পাথর নিক্ষেপকে কবুল করেন তা ফেরেশতারা উঠিয়ে নেন। যদি ফেরেশতারা না উঠাত তাহলে পাথরের বড় একটি পাহাড় হয়ে যেত। (তিবরানী)
মুযদালিফায় রাত্রি যাপন : আরাফাতের ময়দান থেকে হাজী সাহেবদের মুযদালিফায় যেতে হয়। মুযদালিফায় রাত যাপন ওয়াজিব। এখানে রাত যাপনের মধ্যে অনেক সওয়াব রয়েছে। মুযদালিফায় এসে হাজী সাহেবগণ রাতে খোলা আকাশের নিচে ঘুমানোর সময় নিশ্চয়ই আল্লাহর সৃষ্টি নৈপুণ্য তাদের মনে দোলা দেয়। হাজী সাহেবগণের মুযদালিফায় সমবেত হয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে হামদ ও সানা জ্ঞাপন করাকে আল্লাহ খুবই পছন্দ করেন। এখান থেকে যাওয়ার সময় মিনায় নিক্ষেপ করার জন্য পাথর নেওয়াও সওয়াবের কাজ।
মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা : হাজী সাহেবগণ ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মাথা মুণ্ডন করেন বা চুল ছোট করেন। রাসুলে কারীম (সা.)-এর হাদীস অনুযায়ী মাথা মুণ্ডন করাতেই সওয়াব বেশি। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়, আল্লাহর রাসুল মাথা মুণ্ডনকারীর জন্য তিন বার মাগফিরাতের দোয়া করেছেন। আর যে চুল ছোট করে তার জন্য একবার মাগফিরাতের দোয়া করেছেন।
মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীতে সালাত আদায় : মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীতে সালাত আদায় করলে অনেক সওয়াব পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, আমার এ মসজিদে এক রাকআত সালাত আদায় মসজিদে হারাম ছাড়া দুনিয়ার যে কোন মসজিদে এক হাজার রাকআত সালাত আদায়ের চেয়ে উত্তম। আর মসজিদে হারাম অর্থাৎ বায়তুল্লাহতে সালাত আদায় করলে আমার মসজিদে সালাত আদায়ের চেয়ে একশ’ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে। (ইবনে খোযায়মা)
মসজিদে কুবায় সালাত আদায় : হযরত সাহল ইবনে হোসায়ফ বলেন, রাসুলে কারীম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার বাড়িতে পবিত্রতা হাসিল করে মসজিদে কুবায় আসবে এবং এখানে সালাত আদায় করবে, সে এর বিনিময়ে এক ওমরার সওয়াব পাবে। মসজিদে কুবায় কত রাকআত সালাত পড়া সুন্নাত এ সম্পর্কে দু’ধরনের হাদীস আছে। কোন কোন হাদীসে চার রাকআতের কথা, আবার কোন কোন হাদীসে দু’রাকআতের কথা আছে।
কুরবানী : কুরবানী শব্দের অর্থ হচ্ছে নৈকট্য লাভ। আর এ নৈকট্য লাভের জন্য লোভ-লালসা ও কামনা-বাসনা পরিত্যাগ ও প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করা প্রয়োজন। আল্লাহর যে বান্দাহ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে ইচ্ছুক তাকে তার সব কিছু উৎসর্গ করে হলেও আল্লাহকে খুশি করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ইবরাহীম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানী করার জন্য প্রস্তুতি নেওযার কারণেই আল্লাহ তাঁকে খলিলুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর একান্ত বন্ধুরূপে ঘোষণা করেছেন। আমাদেরও আল্লাহকে খুশি করার জন্য প্রয়োজন হলে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কুরবানী করতে হবে। এমনকি আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য যদি আমাদের জীবন কুরবান করতে হয় তবে তাও করতে হবে। এ ধরনের মানসিক শক্তি যদি আমাদের থাকে তাহলেই আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারব।
গোটা বিশ্বের সামর্থ্যবান মুসলমানরা জিলহজ্ব মাসের দশ তারিখ বা তার পরবর্তী দু’দিন কুরবানী করে। সাধারণত দশ তারিখেই সকলে কুরবানী করে থাকে। হাজী সাহেবদের কুরবানী মিনার অদূরে দেওয়া হয়। জিলহজ্ব মাসের দশ তারিখ পশু কুরবানীর মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত করা হয় বলে এ দিনকে ‘ইয়াওমুন নাহর’ বা কুরবানীর দিনও বলা হয়। রাসুলে কারীম (সা.) বলেন, কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলে কারীম (সা.) ফাতেমা (রা.)-কে বললেন, ‘ফাতেমা! তোমার কুরবানীর পশুর কাছে দাঁড়িয়ে থাকো। কারণ কুরবানীর পশুর যে রক্ত মাটিতে পড়বে তার বদলায় আল্লাহ তোমার পূর্বের গুনাহগুলো মাফ করে দেবেন। এ কথঅ শোনার পর হযরত ফাতেমা (রা.) প্রশ্ন করলেন, এ সুসংবাদ কি শুধু আহলে বায়তের জন্য, না সকল উম্মতের জন্য? আল্লাহর রাসুল (সা.) জবাব দিলেন, আহলে বায়ত ও সকল উম্মতের জন্য।’ (জামি‘উল ফাওয়ায়েদ)
হজ্বের সামাজিক তাৎপর্য : একটি সুন্দর সমাজের পূর্বশর্ত হচ্ছে সমাজের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও মায়া মমতার মধুর বন্ধন। কোন সমাজের মানুষের মধ্যে মায়া-মমতার বন্ধন যত গভীর হয়, সে সমাজ তত সুখের হয়। সে সমাজে বসবাসকারীদের মধ্যে একের উপর অপরের আক্রমণ, কিংবা একের অধিকার অপরে হরণ করার ভয় থাকে না। হজ্ব এই ধরনের একটি সুন্দর সমাজ গঠনের দীক্ষা দেয়। একজন হাজী হজ্বের ইহরাম বাঁধার পর থেকেই তার মনে এক জান্নাতী ভাবধারা উজ্জীবিত হয়। তার মনে সর্বদা এ চিন্তার উদ্রেক হয়, তার যবান কিংবা হাত দ্বারা কোন মানুষ যেন কষ্ট না পায়। এমনকি অন্যান্য প্রাণী নিধন থেকেও সে বিরত থাকে। নিজের যবান, হাত, পা, চোখকে নিয়ন্ত্রণ করার এ প্রশিক্ষণ তার পুরো জীবনধারা পাল্টে দেয়। হজ্ব থেকে ফিরে আসার পরও তার মনে সব সময় এ কথা জাগরূক থাকে, তিনি আল্লাহর ঘর জিয়ারত করে এসেছেন, তার পক্ষে কোন খারাপ কাজ করা, কাউকে খারাপ কিছু বলা উচিত নয়। মুসলমানরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বা গোত্রে বসবাস করতে পারে, কিন্তু তারা তো এক আল্লাহর বান্দা; একই নবীর উম্মত; একই কুরআন থেকে হেদায়াত লাভের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করে; একই কাবার চারদিকে প্রদক্ষিণ করে আল্লাহকে খুশি করার চেষ্টা করে। হজ্বের সময় পৃথিবীর নানা দেশের, নানা বর্ণের, নানা ভাষার মানুষের সাথে মিশতে হয়। এ ধরনের মেলামেশার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সামাজিক সাংস্কৃতিক অবস্থা ও রীতিনীতির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়। এতে অনেকে অন্য দেশের সামাজিক সুন্দর শিষ্টাচার, রীতিনীতি দেখে তা নিজ দেশে চালু করার চেষ্টা করেন। এভাবে সারা পৃথিবীর মুসলমানরা একে অপরের শিষ্টাচার দেখে একটি সুন্দর সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা লাভ করেন।
হাজীগণ হজ্বের মধ্যে একতা, শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা ও অপরকে অগ্রাধিকার দানের শিক্ষা পান। নির্দিষ্ট সময়ে আরাফাতে যেতে হয়। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবস্থান শেষে আবার তাঁরা মুযদালিফায় ছুটে যান। মুযদালিফায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়ে আবার মিনার দিকে ছুটে চলেন। মিনায় কাঁকর নিক্ষেপ শেষ করে কুরবানী করেন। কুরবানী শেষে আবার মক্কায় ছুটে যান তাওয়াফ করার জন্য তাওয়াফ শেষে সাঈ করেন। সাঈ শেষ করে হালক বা কসর করেন। এরপর আবার মিনায় ছুটে যান। এভাবে দেখা যায়, সুশৃঙ্খলভাবে একের পর এক হজ্বের কার্যক্রম পালন করতে হচ্ছে। এতে কোন ক্লান্তি নেই, বিশ্রামের মানসিকতা নেই। একটি কাজ করার পর আরেকটি কাজ থেকে বিরত থাকার কোন বাহানা নেই। এভাবে একজন হাজীর মধ্যে শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা ও পরিশ্রমের যে মানসিকতা তৈরি হয়, তা হজ্ব পরিবর্তী সময়েও কাজে আসে। আর এই গুণগুলো একটি সুন্দর সমাজ গঠন করার জন্য অপরিহার্য। হজ্বের সময় বর্ণ, ভাষা বা দেশের পার্থক্যের কারণে কেউ কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেন না। কেউ কারো দ্বারা যেন সামান্যতম আঘাত না পান, এজন্য সকলেই সচেষ্ট থাকেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে একে অপরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ কারণেই হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ ও চুমু দেওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা থাকার পরও কাউকে কষ্ট দিয়ে হাজারে আসওয়াদ চুমু দিতে যান না। অপর মুসলমানকে কষ্ট না দেওয়ার মানসিকতার কারণেই ভিড়ের মধ্যে ঠেলা-ধাক্কা না দিয়ে হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ না করে দূর থেকে ইশারা করেন। একজন হাজী নিজের আবেগ এভাবে নিয়ন্ত্রণ করার প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে যাওযার পর তা সমাজ গঠনে কাজে লাগান। কেননা সমাজের অনেক মারামারি, বিভেদ ও বিরোধের কারণ হচ্ছে নিজে অধিক ভোগ করার মানসিকতা। আর হজ্বের মধ্যে অপরকে অগ্রাধিকার দানের প্রশিক্ষণ পাওয়া যায়। কেউ যদি নিজের চেয়ে অপরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা রাখে, তার পক্ষে কারো ক্ষতি করার সম্ভাবনা থাকে না। সে সব সময় অপরের সুখের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক

আরও পড়ুন



গৌসুল আলম গেদু’র উদ্যোগে ঈদ খাদ্য-সামগ্রী বিতরণ

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি...

সৌদি সরকারের নিষেধাজ্ঞা, শাহজালাল বিমানবন্দরে ৫ ফ্লাইটের যাত্রী আটকা

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রভাবে ওমরাহ যাত্রী...

রাত ১২টার মধ্যে নগর ছাড়ার নির্দেশ বহিরাগতদের

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র...

নিউইয়র্ক সিটিতে নতুন উদ্বেগ করোনা সংশ্লিস্ট শিশু আক্রান্ত

এমদাদ চৌধুরী দীপু,২০মে ২০২০ইং,নিউইয়র্ক) নিউইয়র্কে...