মুক্তিযোদ্ধা বনাম রাজাকার এবং কোটা প্রসঙ্গ

,
প্রকাশিত : ২৫ এপ্রিল, ২০১৮     আপডেট : ৪ বছর আগে

এম আশরাফ আলী: ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ হতে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং এ দেশীয় দোসর বা রাজাকারদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে সূচিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশের। আমরা পাই একটি পতাকা। লাল সবুজের পতাকাটি বিশ^ মানচিত্রে জায়গা করে নেয়। বাঙালি জাতির স্বকীয় অস্তিত্ব জানান দেয় বিশে^। বিশে^র প্রতিটি মানুষ জেনে যায় বাংলাদেশ নামক একটি নতুন দেশের জন্ম হয়েছে। আস্তে আস্তে বরণ করে নেয় ওরা আমাদের। জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ সহ বিশে^র প্রতিটি সমাজ সেবা-উন্নয়নমূলক, মানবতাবাদী কর্মকা-ে বাঙালি জড়িয়ে গেল। আজ ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নি¤œ মধ্য আয়ের দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি বিশ^বাসী থেকে আদায় করে নিয়েছে বাংলাদেশ। পদ্মা সেতুর মত বিশাল সেতু নির্মান প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। এ সব কিছুই মুক্তিযুদ্ধের ফসল। এটি দেরিতে হলেও বিশে^ বাঙালির আলাদা স্থান ও মর্যাদা, ভাষা-সংস্কৃতি সহ স্বতন্ত্র-জাতি গোষ্ঠীর মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এক বিরাট অর্জন। আর এই অর্জনের মূলে যে মানুষটি জড়িয়ে তিনি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমার এই ছোট্ট কলমে তার বিশালত্ব তুলে ধরা, বিশেষণে বিশেষায়িত করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ে যার অবস্থান তাঁর মূল্য কত সেটা নির্ধারণ করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। শুুধু অনুভবে সেই মহাকীর্তি সৃষ্টিকারী বাংলার অবিসংবাদিত নেতাকে অনুধাবন করা যায়। তার ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণই বাঙালিকে যোগায় দুরন্ত সাহস। অস্ত্র নেই, গুলি নেই, সৈন্য সামন্ত নেই তাতে কী হয়েছে। ঝাঁকে ঝাঁকে বাঙালি তরুণ বাঁশের লাঠি সম্বল করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সে যুদ্ধ মুক্তির, সে যুদ্ধ অধিকারের, সে যুদ্ধ স্বাধীনতার এবং সে যুদ্ধ স্বকীয়তার। হ্যাঁ সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা উপেক্ষা করে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে, শুধু বাংলা মাতার ইজ্জত আব্রুর স্বার্থে ৩০ লক্ষ বাঙালি শহীদ হয়ে গেল। দুই লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারালো। রক্তগঙ্গা বইয়ে দিল পাকিস্তানিরা । তথাপি সাহসী বাঙালিরা শপথ রক্ষা করল। একটি বাঙালি বেঁচে থাকতে কোন ছাড় দিব না। জয় ছিনিয়ে আনবোই। হলো ও তাই। নয় মাসের মাথায়ই দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। এক অবিশ^াস্য কাহিনী সত্যে পরিণত হলো। বাঙালি রচনা করল এক রক্তাক্ত ইতিহাস। সে ইতিহাস রক্ত দিয়েই লেখা হল।

সেই মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তারা সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি। যারা বেঁচে আছেন তাঁরাও সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে জাতি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধটি শুধু যুদ্ধ ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্নভাবে এদেশের মানুষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। কেউ যুদ্ধের গান গেয়ে, কেউ যুদ্ধের পক্ষে কলম ধরে, কেউ গান রচনা করে, কেউ বিদেশে জনমত তৈরি করে, কেউ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করে, কেউবা মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য পানীয় দিয়ে, বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে, পাকিস্তানিদের অবস্থানের খবর দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন। সকল বিভাগে সকল মানুষের সহযোগিতার হাত ছিল বলেই মুক্তিযুদ্ধ অতিদ্রুত ত্বরান্বিত হয়েছিল। হিসাব করে দেখলে প্রায় ৯৫% মানুষই মুক্তিযুদ্ধে শরিক ছিল। কারণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমস্ত বাঙালি জেগে উঠেছিল, সাড়া দিয়েছিল এবং সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু সবাই সার্টিফিকেটের আওতাভূক্ত হয়নি বা সার্টিফিকেট চায় ও নি। অনেক বাঙালি যারা মুক্তি যুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করেছেন দেশ মাতৃকার স্বার্থে, কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সার্টিফিকেট আনার জন্য বা পাবার জন্য চেষ্টা ও করেনি। মনে মনে প্রাপ্তি এটাই সার্টিফিকেট দিয়ে কি হবে, বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি এটাই সার্টিফিকেট। তবে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ না করেও অনেকেই ভূয়া সার্টিফিকেট অর্জন করে সরকার থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আদায় করতে দেখা যায়। এমন কি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় এখনও তাদের সন্তান, তাদের নাতি-পুতিরা ও সুযোগ সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছেন। দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ প্রায় ৪৭ বছর। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইসলামী দলগুলো বিশেষ করে জমিয়তে উলামা, মুসলিমলীগ, জামায়াতে ইসলামি, খেলাফত আন্দোলন এরা অবিভক্ত পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করলেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কেবলমাত্র জামায়াতে ইসলামীই রাজাকার উপাধিত ভূষিত হয়। অন্যান্য ইসলামী দলগুলো রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান গড়তে না পারায় তারা নাম সর্বস্ব দলে পরিণত হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে বি.এন.পি ও জাতীয় পার্টি। ১৯৭১ সালে তাদের অস্তিত্ব ছিল না। রাজনৈতিক কারণে আজকে দেখা যায় অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার বনে আবার অনেক রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধা বনে যান। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জেল খাটেন তৎকালীন জাসদ নেতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধো এম.এ জলীল। একটা সভ্যজাতি কখনও ইতিহাস বদলাতে পারে না। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে একটা মাত্র দলেরই প্রাধান্য ছিল। এই দলেরই অনেক সদস্য দলের মতের সাথে অনৈক্য সৃষ্টি হয়ে পরবর্তীতে অনেক রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। যেমন-জাসদ, বাসদ ইত্যাদি। এখন দল মত বিভিন্ন হতে পারে, কিন্তু যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তারাতো বদলাতে পারেন না। যেমন অমুক দল করলে মুক্তিযোদ্ধা আর তমুক দল করলে মুক্তিযোদ্ধা নয়। স্বাধীনতার এত বছর পর দেখা যায় অনেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়েছে শিবির জামায়াত, আবার, অনেক রাজাকারের সন্তান হয়েছে ছাত্রলীগ আওয়ামীলীগ, বি.এন.পি জাতীয় পার্টি ইত্যাদি। এ কয়দিন ধরে কোটা নিয়ে দেশে বেশ আন্দোলন দানা বেঁধে উঠলে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বলিষ্ট কন্ঠে কোটা বিষয়ের একটা সমাপনী বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন ‘কোটার কোনো দরকার নাই। যাদের জন্য কোটা তারাই যদি মানতে চায় না। তাহলে কোটার দরকার কি?’ কোটা বাতিল বা কোটা সংস্কার বিষয়টি এখন মন্ত্রনালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। এরই মধ্যে দাবি উঠেছে রাজাকারের সন্তানরা সরকারি চাকরি পেতে পারবে না। কথাটি বলছে মুক্তিযোদ্ধা পক্ষ। আবার সাধারণ পক্ষ বলছে কোটা পদ্ধতি কেন? এ দেশের প্রতিটি নাগরিকেরই যোগ্যতা থাকলে সরকারি চাকরি পেতে পারে। এখন কোন যুক্তিটি সঠিক? অনেক রাজাকারের সন্তান এখন মুক্তিযোদ্ধা পক্ষের শক্তির মন্ত্রী এমপি আছেন। তারা কোন যুক্তিতে মন্ত্রীত্ব এমপিত্ব পান। কাজেই একটি বিষয়ে একমত হওয়া জরুরি যে একটা দেশে বিবধমান দুটি দল থাকা ঠিক নয়। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজাকার কেউ থাকলে তার ছেলেও রাজাকার আবার মুক্তিযোদ্ধা কেউ থাকলে তার ছেলেও মুক্তিযোদ্ধা বানানো ঠিক নয়। যে পাপ করে তার শাস্তি যেমন তার ছেলে পেতে পারে না, যে পূণ্য করে তার ভাগও তার ছেলে পাবে না। কাজেই বংশ পরম্পরায় একটা বিষবাস্প জিইয়ে না রেখে চূড়ান্ত একটা ফায়সালা হওয়া দরকার। দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলা দরকার। মেধাবীদের প্রশাসনে স্থান করে দিলে সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গঠন সহজ হবে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, গণতন্ত্রের সুফল জনগণের কাছে পৌছে দেয়া দায়িত্বশীল নাগরিকের কর্তব্য। হিংসা বিদ্বেষ পরিহার করে একটা ন্যায় ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের কর্তব্য। তাই পরস্পর কাদা ছড়াছড়ি না করে একটা নিরপেক্ষ মুল্যায়নের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি যোগ্য নাগরিক সরকারি চাকরি পাক, ইহাই জনগণের প্রত্যাশা।

—————————————————————————————————-
এম.আশরাফ আলী
১২/১ পূরবী আ/এ
ইসলামপুর (মেজরটিলা) সিলেট।
০১৭৮৭৭৫৩৬৯২


আরও পড়ুন

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ স্মরণে শোকসভা সফলের লক্ষে প্রস্তুতি সভা

 সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেটের প্রগতিশীল...

রায়হানের বাড়িতে পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্ত দল

 সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)-এর বন্দরবাজার...