মুকতাবিস-উন-নূর : সময়ের এক বিপ্লবী কণ্ঠস্বর

প্রকাশিত : ০৩ মে, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে
  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    27
    Shares

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল:
মুকতাবিস-উন-নূর অত্যন্ত পরিশ্রমী লেখক, সাংবাদিক সংগঠক ও সমাজসেবক সজ্জন লোক। সকল পরিচয়ের মধ্যে সাংবাদিক হিসেবেই তিনি অতি পরিচিত। এর পাশাপাশি সমাজের বহুকিছুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা আছে। সাংবাদ মাধ্যমে তিনি তাঁর জীবনের দীর্ঘ একটা সময় ব্যয় করেছেন। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে যোগ দেন সাপ্তাহিক জালালাবাদ পত্রিকায়। মাত্র দুবছরে তিনি জালালাবাদকে দৈনিক পত্রিকায় আত্মপ্রকাশের মতো বিরাট কাজ করে বসেন। এটা তার বড় অর্জনগুলোর একটি। সংবাদ তৈরি করে করে লিখে ফেলছেন, তথ্যবহুল অনেক প্রবন্ধ, সমাজ রাষ্ট্রের বিশ্লেষণধর্মী গদ্য। বিশেষ করে সিলেটের সাংবাদিকতায় তাঁর যোগদান ও কর্মব্যাপ্তি অস্বীকার করার উপায় নেই। সমস্ত পরিচয়কে ছাপিয়ে তিনি হলেন একজন দিলখোলা মানুষ।
মুকতাবিস-উন-নূর জন্মগ্রহণ করেছেন সিলেটের ভার্থখলায় ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন-এ। তিনি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মরহুম মাওলানা ইব্রাহিম আলীর ছোট ছেলে। মা মরহুম জহুরুন নেছা। তিনি গৌরবমাখা বংশের সন্তান। তাঁর দাদা মুনশি এলাহি বখশ ব্রিটিশ শাসনামলের নামকরা ইসলামি চিন্তাবিদ ছিলেন। তাঁদের পূর্বপুরুষের বংশপরম্পরায়ও রয়েছে আরেক ধরনের গৌরব। হজরত শাহজালালের সঙ্গে যে তিনশ ষাট জন সফরসঙ্গী ছিলেন; তাঁদের অন্যতম হজরত কুতবুল আলম হলেন তাঁর পূর্বপুরুষ। দাদা মুনশি এলাহি বখশ দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারে স্থায়ী বসবাস করতেন। কুতুবপুরের মাজারবাড়ি ছিল মুনশি সাহেবের বসতভিটা। কোনো কারণে তিনি এখান থেকে স্থানান্তর হন। চলে যান বিশ্বনাথে, আতাপুর গ্রামে গড়ে তোলেন স্থায়ী নিবাস।
মুকতাবিস-উন-নূর পুঁথিগত বিদ্যার ইতি টেনে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে সে সময়ের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগ দান করেন। তখন থেকেই শুরু তাঁর সাংবাদিকতা। এখানেই থেমে থাকেননি। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্য পদ লাভ করেন। এবং পরের তিন বছর কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন, যথাযথভাবে দায়িত্বও পালন করেন। সমাজ ও মানুষের কল্যাণের কাজে আরও অগ্রসর হতে থাকলেন। ১৯৮৫-১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে দুই মেয়াদে সহ-সভাপতিও নির্বাচিত হন। এছাড়াও সংলাপ সাহিত্য সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট-এর সেক্রেটারি জেনারেল, কবি দিলওয়ার পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৩-৯৪ থেকে ২০১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ছয় দফায় সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে নিষ্ঠা ও আন্তরিকাতার সঙ্গে দীর্ঘ চৌদ্দ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এক এক করে তিনি যেন আকাশের দিকে অগ্রসর হতে থাকলেন। ছুঁতে চাইলেন মেঘ, নীল, মহাশূন্য! কর্মজীবনে এসে তিনি সম্মুখককেই যেন ভালোবাসলেন। এদিকে দশ বছর যাবত সাপ্তহিক সিলেট কণ্ঠ সম্পাদনা করে আসছেন। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে যোগ দেন সাপ্তাহিক জালালাবাদ পত্রিকায়। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে জালালাবাদ দৈনিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়। একমাত্র তাঁর অবিরল সাধনা ও আন্তরিক পরিশ্রমের ফলেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে। দীর্ঘ সতেরো বছর তিনি পত্রিকাটির সম্পদনার মতো গুরুদায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় দৈনিক পুণ্যভূমি। ইন্টারনেট মুগ্ধতার যুগে তাঁর এ পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণ বর্তমানে চালু আছে।
মুকতাবিস-উন-নূর সাংবাদিক ও সংগঠক হিসেবে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি থাকলেও লেখালেখিতে তিনি প্রতিশ্র“তিশীল লেখকের প্রতিকৃতি। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর দুটি গ্রন্থ বেরিয়েছে। এগুলি দেশ-বিদেশের বোদ্ধা পাঠক সমাজের কাছে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। তাঁর প্রত্যেকটি রচনায় মাটি মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা এবং সমকালীন সমস্যা-সম্ভাবনা ও মুক্তি-কল্যাণের কথা ফোটে উঠেছে। নিুে তাঁর সদ্য প্রকাশিত দুটি গ্রন্থের সামান্য আলোকপাত করা যাক।
সময় অসময় : জীবনের পাঠ ও অসামান্য পায়ের দাগ
আমরা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে জীবনকে অতিবাহিত করছি। মানুষ জীবনের সকল কিছুকে মনে রাখতে পারছে না। ক্রমশ কতকিছু ঘটছে আবার এসব রাশি রাশি ঘটনার স্মৃতি একসময় মুছে যাচ্ছে। কবি জীবনানন্দ দাশ-এর একটি বিখ্যাত পঙ্ক্তি আছে-একদিন মুছে যাবে জীবনের সব লেনদেন। এটি মূলত মৃত্যুচিন্তার কবিতা। মৃত্যুচিন্তার কবিতা হলেও জীবনের স্মৃতি ধারণের প্রবল আকাক্সক্ষা সৃষ্টি করে। এই চিন্তা থেকেই হয়ত সাংবাদিক মুকতাবিস-উন-নূর সময়ের ডায়রি হিসেবে ‘সময় অসময়’ গ্রন্থ রচনা করেছেন। অথবা তাঁর বেদনাহত দিনের লেখা, এ লেখার যূথবদ্ধ আকার একটি গ্রন্থ হয়ে উঠেছে। মানুষ আসলে তার মুহূর্তের জানাকে সাহিত্য করে সমগ্রকে ধারণ করে। আর এমন করে লেখার পর মনে হয় অতি পরিচিত জিনিসগুলোই যেন আমরা চিনতে পারছি না। খুব সাধারণ কথাগুলো কেমন যেন আলো ছড়াচ্ছে, দ্যোতি ছড়াচ্ছে। খুব সাধারণ বস্তু যেন অতি মূল্যবান হিরকখণ্ড হয়ে উঠেছে। অতি সাধারণ খড়কুটোও ফুলের সৌরভে ম-ম করতে শুরু করে। প্রত্যেক বিখ্যাত লেখক তাঁর নিজের চোখ দিয়ে, আপন হৃদয় দিয়ে বিশ্বকে দেখেছেন। নিজের জীবনের পাঠকে অন্যের জীবনে অমৃতের মতো ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এককথায় সকল লেখকের ব্যক্তিজীবনের সময় ও অসময়ই হচ্ছে তাঁর সাহিত্য। তবে এর মধ্যে আছে কল্পনার মোহনীয় বিস্তার। অবলোকন আর কল্পনার শক্তিই তাঁদের লেখতে সাহায্য করে।
কবি আল মাহমুদ তাঁর জীবনের সময় অসময় নিয়ে লিখেছেন-কবির কররেখা, বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ এ দুটি আত্ম-আলোচনার বই। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হূমায়ূন আহমেদ তাঁর সময়ের নানা কথা, জীবনযাপনের দিনলিপি এভাবে লিখেছেন এবং সহজেই তা সাহিত্য হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে তাঁর আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই, আমার আপন আঁধার, কিছু শৈশব, আরো বহু ব্যক্তিগত দেখাশোনার গ্রন্থ। তাঁর এ লেখাগুলো এখন সকল পাঠকের খাদ্য। লেখকদের একটা সুবিধা হচ্ছে তাঁদের ব্যক্তিজীবনের সরল আখ্যানসমূহ পাঠক অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আহার করেন। এবং তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। আবার অনেক লেখকের অসময় বা দুঃসময়ের লেখা পাঠ করে আমরা ব্যথিত হই। চোখে জল আসে। আবার কোনো লেখা ভীষণ রেগে উঠি। মনে হয় এখনই ঘর থেকে বেরিয়ে যাই, অন্যায়ে প্রতিবাদ করি।
এ সমস্ত কথামালা তাঁদের কাছ থেকে আমাদের কাছে না-এলে আমরা পৃথিবীর অনেক কিছুই জানতাম না, দেখা হতো না রহস্যে আচ্ছাদিত পৃথিবীকে। মুকতাবিস-উন-নূর একজন সৎ সাহসী সাংবাদিক। সাংবাদিকতা এটি মহৎ পেশা। আজকাল সৎ সাংবাদিতার অভাব। একজন সাংবাদিক তো প্রতিদিনের সাক্ষী। এই বিচারে তাঁর অসময় অসময় বইটি দুর্বিসহ সময়ের সাক্ষী। এখানে মুদ্রিত আছে তাঁর অনেক সুখের কথা, অনেক বেদনার কথা। বহু প্রাপ্তির কথা ও অপ্রাপ্তির কথা। মানুষ তার জীবনের কথাগুলো দুভাবে লিখতে পারে। স্বাধীনভাবে বা শৃঙ্খলের ভেতরে থেকে। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান তাঁর জেলজীবনের দুঃসহ বেদনার স্মৃতিকথা জেলে বসে লিখেছেন : জেল থেকে জেলে কবি নজরুলও লিখেছেন রাজবন্দীর জবানবন্দি। এসব রচনাগুলোকে আমরা বিদ্রোহ বা মুক্তির নির্দেশক রচনা হিসেবে দেখি। এদিক থেকে নূর সাহেব-এর বইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কে ধারণ করছে। ওয়ান-ইলেভেনের ঘটনাবহুল দিনগুলো এখানে বিবৃত হয়েছে। এই সময়ে তাঁর অবস্থা কেমন ছিল, তিনি তখন কীভাবে দিনযাপন করেছিলেন। এখান থেকে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সাংবাদিতা খুব সাধারণ ব্যাপার নয়। নানা রকম যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে সাংবাদিকদের যেতে হয়। তিনি যে সৎ সাংবাদিক ছিলেন এর পরিচয় মেলে আহমেদ নূরের মুক্তির জন্য তার দৌড়-ঝাঁপ দেখে। দৈনিক সিলেট প্রতিদিনের সাংবাদিক আহমেদ নূর-এর গ্রেফতারের পর সংবাদমহলে একধরনের ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সম্পাদক আহমেদ নূর-এর মুক্তির তদবির করা কতটা কঠিন ছিল পরিস্থিতিই এর একমাত্র সাক্ষী। এক্ষেত্রে মুকতাবিস-উন-নূর এর সাহসিকতা সততার প্রশংসায় মাথা নত হয়ে আসে। অজস্র সত্য ঘটনার প্রবাহে তাঁর বইটি একটি সত্য ভাষণ, একটি সত্য ইতিহাস। তার বইটিতে ওয়ান ইলেভেনের বিশাল অংশ জুড়ে আছে সাংবাদিক আহমেদ নূরের গ্রেফতার থেকে নিয়ে কারাবরণ ও নানা যন্ত্রণার কথা। সহকর্মীর প্রতি তাঁর অগাধ দরদ ছিল সামান্য একটা বর্ণনা আমরা পড়তে পারি :
আরও একদিন কেটে গেল। আহমেদ নূরকে থানা হাজতে নিয়ে আসার খবর পেয়ে থানায় চললাম। গাড়ি থেকে নামার সময় দেখলাম তাঁর পা ফুলে আছে। চোখে পানি। মুখে প্রচণ্ড যন্ত্রণার ছাপ। আমাদের চোখে পানি এল। ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র শুনলাম। শারীরিক মানসিক কষ্টে জর্জরিত আহমেদ নূর। তাঁকে ঘিরে রয়েছেন তাঁর অসহায় সহকর্মীরা।
সহ-সাংবাদিক বন্ধুর প্রতি এমন মনোভাব না-থাকলে মুকতাবিস সাহেব সংবাদ জগতে বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারতেন না। তার বইটি একই সঙ্গে হয়ে উঠেছে ভালোমন্দ সময়ের দলিল। তার এই সাহসিকতার কারণে সংবাদিকদের প্রতি সুবিচার করা হয়েছে। সকল কষ্ট-যন্ত্রণার পর আহমেদ নূর বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন। তার দুঃসময়ে যারা পাশে ছিলেন তাদের তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন আর যারা পাশে থাকেননি তাদের কথাটাও লিখতে ভুলেননি। ওদের মুখোশধারী চরিত্র তিনি তোলে ধরেছেন। মুকতাবিস-উন-নূর যখন পড়ে গিয়েছিলেন বিপদের আঁটা ফাঁদে তখন সাগরদিঘির পারের ও স্টেডিয়ামের অফিসে যেসব সেনা অফিসারেরা তাঁকে জিজ্ঞাসার তীরে জর্জরিত করেছিলেন এরমধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে পরবর্তীতে তাঁর সুসম্পর্কও তৈরি হয়েছিল। তিনি নিজেই লিখেছেন : কর্নেল মোশাররফের ভূমিকার কথা (এখন অবসর গিয়ে একজন ব্যবসায়ী)। ওয়ান ইলেভেনের সময় সিলেটের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তাকে ধর-পাকড় শুরু হয়েছিল (পরে প্রকাশ পায় সেটা ছিল কেবল হয়রানি আর চাঁদাবাজি। এ নিয়ে মহিউদ্দিন খান আলমগীর ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের লেখা বেরিয়েছে তখনই)। দেশব্যাপী অবৈধ স্থাপনা ভাঙার একটা ধুম পড়েছিল। সিলেটও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ওই সময়ে দুর্নীতিবাজদের হাজতে ঢুকানো হয়েছিল, অবৈধ দখল নির্মাণকে ভাঙা সাধারণ মানুষ ধারণা করেছিল, মঈন ও ফখরুদ্দিনের সময়ে ভালো কাজ হচ্ছে। সেনা সমর্থিত সরকারের কাজকর্মের ব্যাপারে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশিত হলে দেশবাসী জানত ঐ সময়ে তাদের আবির্ভাব ও ধ্বংসের কথা। সমগ্রের স্বার্থে ওয়ান ইলেভেনের কথা জ্ঞাত করতে হবে সরকারকে। সময় অসময়-এ মুকতাবিস-উন-নূর খুবই সতর্কভাবে সহচরদের বা সহ-সাংবাদিকদের আক্রোশ মেটানোর অসৎ পথ বেছে নেওয়ার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর সৎসাহসের প্রশংসা না-করলে অবিচার হবে। তিনি যেভাবে পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছেন। লেখক ও আহমেদ নূর বেঁচে গেলেও সাংবাদিক মহিউদ্দিন শীরু ছিলেন হৃদরোগে জরাক্রান্ত ব্যক্তি। তিনি তর্কবির্তক জেরা-বিশ্লেষণের ধকল সামলাতে পারেননি তাঁর মৃত্যুতে এর প্রভাব পড়েছিল বলে অনেকের ধারণা।
অবশেষে লেখক মুকতাবিস-উন-নূরকে আমি বিনত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। তাঁর গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ অমোঘ দলিল হয়ে থাকবে বছরের পর বছরে, যুগে যুগে, শতাব্দীতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর লাইব্রেরি প্রবন্ধে এ ভাবটি উঠে এসেছে যে, বইয়ের ভেতরের কালো অক্ষরগুলো যদি কথা বলতো তাহলে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো মহা গর্জনের আওয়াজ পাওয়া যেত। এবং এই মুুদ্রিত অক্ষরগুলো একসঙ্গে বিপ্লব করতে জানলে পৃথিবীর কেউ তাদের রুখতে পারতো না। কালো বর্ণগুলোর চোখমুখ ফোটে ওঠলে কেউ ওদের সামনে দাঁড়াতে পারত না। কথা বলতে পারত না। রুদ্ধ হয়ে থাকত। মূক হয়ে থাকত। বিমূর্ত হয়ে থাকত। এভাবে আমাদের প্রতিদিনের লেখার মধ্যেই রচিত হয় মহাকালের ইতিহাস। শতাব্দীর মহা গুঞ্জরণ। মুকতাবিস-উন-নূর সাহেবের বইটিতে ধরা পড়েছে ওয়ান ইলেভেনের যন্ত্রণাকাতর দিনগুলো। সময়ে অসময়ে তার গ্রন্থে হাত রেখে আমরা ইতিহাসের সম্মুখে দাঁড়াব।
দুই তারকার জোছনা কাহিনি : সামাদ আজাদ ও সাইফুর রহমান
দুজন মহান রাজনীতিককে কাছে থেকে দেখার অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ এক স্মৃতিসম্ভার আমার দেখা সামাদ আজাদ ও সাইফুর রহমান। লেখক মুকতাবিস-উন-নূর নিজের মতো করে তার দুই প্রিয় নেতাকে নিয়ে এ চমৎকার গ্রন্থটি রচনা করেছেন। তিনি যেভাবে তাঁদের ভালোবাসেন ঠিক এভাবে আরো বহু মানুষ এ দুই মহান নেতাকে হৃদয়ে পোষে রেখেছেন যতœ করে। তারা এই বইটি ভালোবেসে ক্রয় করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। সকল বইয়ের ক্রেতা কিন্তু সমান নয়। কেউ বই নেয় নিজের আনন্দের জন্য আর কেউ নেয় বইয়ে বিস্তৃত তার ভালোবাসার মানুষ দেখে। বিশিষ্ট লেখক মুকতাবিস উন-নূর সরল গদ্যে থরথর করে বলে গেছেন তাঁর জানা কথাগুলো, তাঁর দেখা কথাগুলো। তিনি অকপটেই বলে ফেলছেন তাঁর অভিজ্ঞতার সমূহ কথা। তাঁদের কাছে গিয়ে রাজনীতি ও জীবনযাপনের নানা জিনিস জানতে পেরেছেন। মহান নেতাদের জীবন কেমন ছিল, কেমন ছিল মানুষের সাথে তাঁদের স¤পর্ক। রহস্যময় এক অধ্যায়ের কথা তিনি লিখেছেন। দুই মেরুর দুই মহানায়ককে নিয়ে অসাধারণ সমীকরণ তৈরি করেছেন মুকতাবিস-উন-নূর। গ্রন্থটি পাঠকের যে কেউ আনন্দ পাবেন। মুগ্ধ হবেন, আশ্চর্য হবেন। আমার দেখা সামাদ আজাদ অংশে তিনি এই মহান রাজনীতিকের মহত্বের অপূর্ব স্মৃতিচারণ করেছেন : আমরা পড়ে দেখতে পারি :
দুপুরে ফোন করলেন সামাদ আজাদ। কখন ফিরলাম, তা জিজ্ঞাস করলেন। বললেন, বাসার জন্য ফলফ্রুট নিতে পারোনি মনে হয়। বললাম বেশি রাত হয়ে গেছে আজ নেব। তবে এ টাকা দিয়ে নয়। বললেন, কেন? বললাম, আপনার দেয়া টাকা আমি স্মৃতি হিসেবে রেখে দিতে চাই। হাসলেন। পরে কথা হবে বলে ফোন রেখে দিলেন।
ঠিকমতো ফিরছি কি না, ফলফ্রুট নিয়েছি কি না, কিছুই তাঁর নজর থেকে বাদ পড়েনি। সামাদ আজাদ এমন মানুষ কাছে না-ভিড়লে বুঝা হতো না। আসলে একজন মহান নেতার এর চেয়ে বড় গুণ কি হতে পারে! যিনি সাধারণের সাথে খুব সাধারণভাবে মিশতে পারেন, মনের ভেতরে ঢুকতে পারেন তিনিই তো বিশাল হৃদয়ের অধিকারী। কবি রবীন্দ্রনাথের একটি কথা আছে : তিনিই উত্তম যিনি অধমের সাথে চলতে পারেন বিনা তফাতে, প্রকৃতপক্ষে সমীক্ষা করলে দেখা যায় বড়রা মূলত বড় হতে চাননি, একদম নিরহংকার বিনয়ী স্বভাবের জীবন ছিল তাঁদের, তাঁরা মাথাকে নত করে দিয়েছেন আর এতই তাদের মাথা উঠেছে সকলের উপরে।
এছাড়াও লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের পাশাপাশি উঠে এসেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ; ভালোমন্দের সামান্য ইঙ্গিত। তবু তাঁর বইটি আমূল স্মৃতিগ্রন্থ হয়ে উঠেছে। সামাদ আজাদ যে একজন সাংবাদিককে কত ভালোবাসতেন তা এই বইটি না-পড়লে বুঝা যেত না। তিনি মুকতাবিস-উন-নূর সাহেবকে মন থেকে ভালোবাসতেন, তাঁর এই স্মৃতিচারণ আরও বেশি রহস্যের জন্ম দিল মহান ব্যক্তিদের জীবন সম্পর্কে। আসলে সামাদ আজাদ এভাবে কত মানুষকে গোপনে গোপনে ভালোবাসতেন তা আমাদের কারও জানা নেই, যারা তাঁর সংস্পর্শ পেয়েছেন একমাত্র তারাই তা অনুভব করেছেন, এবং বলতে পারবেন। সকলের জ্ঞান লাভে জাতির উপকার হয় না, মানুষের কত জানা তথ্য-অভিজ্ঞতা, কত øেহের কথা বুকেই জমে আছে। তা আর মানুষের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়নি।
আমাদের সিলেটে বর্ষীয়ান বুদ্ধিদীপ্ত; প্রবল ধীমান দুই নেতাকে দেখার সুযোগ হয়েছিল মুকতাবিস উন-নূর এর। তিনি কাছে থেকে দেখেছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা মাননীয় মন্ত্রী সামাদ আজাদ সাহেবকে। অন্যদিকে বিএনপি নেতা সাইফুর রহমান সাহেবকে। আমার সাংবাদিক বন্ধুর হাতে ছিল সোনার সরঞ্জাম তাই সাথে সাথে লিখে ফেলেছেন মূল্যবান স্মৃতি, সাজিয়ে তোলেছেন তার অভিজ্ঞতার প্রাসাদকে। সেখানে এখন নতুন আলো ঝলমল করছে। এই আলো ছড়িয়ে পড়বে কাল থেকে কালে। শতাব্দী থেকে শতাব্দীতে। আমার ধারণায় তাঁর বইটি বাংলাদেশের এক মহাকালের সাক্ষী হয়ে থাকবে। সামাদ আজাদ ও সাইফুর রহমানকে কাছে থেকে দেখা তার অভিজ্ঞতার ফসল। সামাদ আজাদ এমন এক মানুষ ছিলেন যিনি মানুষের কোনো পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়ে কোনো কথা বলতেন না। তিনি বুঝতেন যে তার মতের অমিলের কারণে কারো সম্পর্কে কোনো কথা বললে তার প্রিয় মানুষের কাছে খারাপ লাগতে পারে। তাই তিনি এমন কথা থেকে বিরত থাকতেন। মুকতাবিস-উন-নূর তৎকালীন স্পিকার হুমায়ুন রশীদ সাহেবকে পছন্দ করতেন। তাঁর কাছে স্পিকারকে নিয়ে কোনো কথা বলতেন না। এছাড়াও এই দুজন মহান নেতা সাংবাদিক মুকতাবিস-উন-নূর এর সব খবর রাখতেন। ১৯৯৯-২০০০ খ্রিস্টাব্দের জন্য তিনি সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হন। সামাদ আজাদ কিন্তু তাঁকে অভিনন্দন জানাতে ভুলেননি।
লেখকের বইটি একক বিচারে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটি সাংবাদিক মুকতাবিস সাহেবের নানা পর্যবেক্ষণের উজ্জ্বল দিগন্ত। এখানে আছে সংগ্রামী চিন্তাবিদদের সমাজ দর্শন, রাষ্ট্রের কল্যাণ পরিকল্পনাসহ বহুমাত্রিকতা। তথ্য-স্মৃতি ও সময়প্রবাহের বিশ্লেষণ তার বইটিকে ইতিহাসের সাক্ষী করে তুলছে।
মুকতাবিস-উন-নূর তাঁর কর্মের দ্বারা মূল্যায়িত হবেন। সিলেটের সাহিত্য-সাং¯ৃ‹তিক আন্দোলন, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতায় কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর বহুবিদ কর্মপরিধি সুশীল সমাজকে সংগ্রামে সঙ্কটে উপকৃত করেছে। দেশ মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর অপরিসীম ভালোবাসা সবাইকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত এবং আন্দোলিত করেছে। তিনি সিলেটবাসীর আত্মার আত্মীয় হিসেবে হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান লাভ করেছেন। তাঁর নিয়মিত সমাজসেবা, সাহিত্য, সাংবাদিতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং বহুবিদ কর্মযাত্রা অব্যাহত থাকুক। আমরা তাঁর সর্বাঙ্গীন কল্যাণ কামনা করি।

লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক


  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    27
    Shares

আরও পড়ুন

দক্ষিণ সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে স্কুল ছাত্র নিহত

         সালেহ আহমদ হৃদয় : দক্ষিণ...

সিলেট সিটির সাবেক মেয়রের মৃত্যুতে র্লিডিং ইউনিভার্সিটির শোক

         বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির...

ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে আইনশৃংখলা বাহিনী

         নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ-সিলেট নগরীর চৌহাট্টা...