মাধবকুণ্ডে স্মৃতির অজস্র পালক

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

ডা. হাবিবুল্লাহ মিসবাহ:

৪ঠা জানুয়ারি, ২০১৯, শুক্রবার!

আমার মেজাজটা বিগড়ে চরম পর্যায়ে! বলতে পারেন মাথার মধ্যে ১৪৯ চলছে! কুয়াশার নিচে ঢাকা পড়ে আছে ঘুমন্ত প্রকৃতি।
আমরা তিনজন আহমদ আজাদ এবং রায় কৌশিক রাস্তার পাশে একটি কালবার্টে দাঁড়িয়ে গল্প করছি, আর আঁড়চোখে পথের পানে চেয়ে চেয়ে শিশির ভেজা কাকের মতো অপেক্ষা করছি আমাদের পিকনিকের বাসের জন্য।
আমাদের কথা বলার ইস্টাইল দেখলে যে কেউ ভাবতে পারে আমরা আয়েশ করে বাচ্চু বিড়ি ফুঁকছি!
অতিরিক্ত ঠা-ায় যেমনটা হয় আর কি!
আজাদ সাহেব ভাবলেশ হীন হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কায়দা করে প্রতিটা প্রশ্বাস বিড়ির ধোঁয়ার মতো ছাড়ার চেষ্টা করছেন, আমার কাছে বরাবর বাংলা পাঁচের মতো লাগছে আজাদ সাহেবের মায়াবী মুখখানা। সংগত কারণে আমার হাসি আসছে না!
নির্ধারিত সময় পার হওয়ার প্রায় ঘণ্টা খানেক পরও বাসের কোন হদিস নাই।
এই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে খোলা আসমানের নিচে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করা যে কতটুকু নরক যন্ত্রণার তা হাড়ে হাড়ে আমরা হজম করছি। হাত পা হিম হয়ে আসছে।

কৌশিকের ফর্সা মুখের ভাষা অকথ্য হয়ে গেছে অনেক আগেই, কারণ সে পিকনিকে যাওয়ার আনন্দ আর টেনশনে সারারাত ঘুমাতে পারে নি।
শেষরাতে যা একটু ঘুম ধরেছিল তাও আজাদ সাহেবের ফোনের ধাক্কায় কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে গেছে, সে খ্যাপা ষাঁড়ের মতো হয়ে গেছে এখন।
বাবু চোখ ভর্তি ঘুম আর অনিদ্রার ধকল মাথায় নিয়ে দেড় কিলোমিটার কুয়াশা ভেঙ্গে এসেছে এখানে।

কাঁচা ঘুম ভাঙ্গলে যে মানুষ কি রকম অমানুষ হয়ে উঠতে পারে তা আজ মালুম হল কৌশিকের চেহারা দেখে!
কৌশিক একটু পর পর হাই তুলছে আর বিরস মুখে কর্তৃপক্ষের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে চলছে।
সে যে কত বড় মাপের ইতর ( গাইলে পিএইচডি করা) তার সহজ সরল মুখ দেখলে কেউ ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করবে না। একটু পর পর আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলছে বস “দেখেন শালার অমানুষদের কা–কারখানা,এতো লেইট করবে জানলে অনায়াসে আরো এক ঘণ্টা ঘুমাতে পারতাম!”

ঠিক এই মুহুর্তে একটি ফোন আসলো, ওপাশ থেকে কর্কশ কণ্ঠে শাহাবুদ্দিন হুংকার দিচ্ছে “এটা কি পিকনিকের গাড়ি? মাইক নাই, ব্যানার নাই, কোন মানুষও নাই এখনো, এই লক্কর-ঝক্কর বাস দিয়ে কি আমরা যাব, সম্ভব না!
আমি বললাম, বলিস কী?
সে বলল- জ্বী বস, ইখওয়ানের সামনে আমি একা বসা। বুড়া ড্রাইভার বেটাও বিড়বিড় করে বকছে “আমাকে ফজরের সময় আসতে বলে এখনো কারো দিদার নাই”।
শাহাবুদ্দিনের মাথা গরম হলে তাকে সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সমস্ত দিন কারণে অকারণে মানুষের সাথে ঝগড়া করবে, প্রয়োজনে কারো উপর হাত তুলতেও সে পরওয়া করে না। তার হাতে গলায় স্পষ্ট মারপিটের দাগ্ এখনো আছে।
শাফি টান পাড়ায় গাড়ির কাছে আসল, শাহাবুদ্দিনের চিল্লাচিল্লি শুনে মনে করেছিল হয়ত কারো সাথে ঝগড়া বেঁধে ফেলছে! পিছনে এসে দেখে ওমা, সে ফোনে কথা বলছে, কার সাথে যেন।
শাফি মিয়া গাড়ী আর শাহাবুদ্দিনের রৌদ্রমূর্তি দেখে মুখে কুলুপ দিয়ে দড়াম করে বসে পড়লেন বাসের এক কোণায়।

প্রায় দুই ঘণ্টা পরে কর্তৃপক্ষের ম্যাডাম হাসনা হেনাকে দেখা গেল এক পাল ইয়াং লেডিস নিয়ে আসতেছেন গাড়ি অভিমুখে।

অমনি শাহাবুদ্দিনের মুড পাল্টে গেল, রাগ পানি হয়ে গেল নিমিষেই!
শাফির মুখেও হাসির রেখা ফুটতে শুরু করেছে।
এটা ম্যাডামের হাসির ম্যাজিক নাকি সাথের সুন্দরী মাইয়াগো দেখে তা এখনো টাহর করা যাচ্ছে না।
এদের একটি মজ্জাগত সমস্যা হচ্ছে তারা সুন্দরী মাইয়া দেখলে হিরো আলম হতে তৎপর হয়ে উঠে!
অবশেষে মুন্না ভাইও এসে গেছেন।
আমাদের ফোনের ঠেলায় গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হল আরেক কর্তৃপক্ষ মেহদী হেলাল ভাইকে ছাড়াই।
তিনি অবশ্যই দেড় কি.মি পথ দৌঁড়ে এসে গাড়ি ধরলেন!
শাস্তিটা খারাপ হয় নি।
তবে ভদ্রলোকের কোন দোষ নাই, তিনি সাত সকালে যাওয়ার জন্য রাত্রে এসে হোটেলে থেকেছেন। সব দোষ উনার ঘুমের।

এক সময় আমাদের দীর্ঘ প্রত্যাশিত বাস চলে আসলে আমরা চেপে বসলাম। গাড়িতে উঠেই মনে হল ইচ্ছামত অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করি। কিন্তু কার উপর রাগ করব!
নাহ্! মুন্না ভাই এবং এতো প্রিয়জনদের মুখ দেখে ইচ্ছেটা গিলে ফেললাম।

বালাই হাওরের বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের গাড়ি, ভিতরে সুনসান নিরবতা। অনেকেই ঘুমের কাজা আদায় করছেন হা করে!!!
এর মধ্যে ‘হাসনা হেনা’ ম্যাডাম বত্রিশ দান্দান বের করে বার দুয়েক ভেটকি মেরেছেন আমাদের ইজি করার জন্য।

রতনগঞ্জ বাজারে এসে আমাদের অনেক বড় মাপের ধাক্কা দিলেন মেহদী হেলাল ভাই!
দেখলাম বড় বড় স্পিকার রাখা রাস্তার পাশে, মেহদী হেলাল ভাই স্বদর্পে গাড়ি থেকে নেমে ওগুলো সেট করলেন, ব্যানারও লাগানো হল। জলমল করে উঠলো সবকটি ভোঁতা মুখ।
চমৎকার রৌদ্রোজ্জল আবহাওয়া, রুপের রাণী জেগে উঠেছে তার রুপের পসরা মেলে। শীতের সকালের মিষ্টি রোদ আর শিশির সিক্ত উত্তরের পাহাড় দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ি।

ওমা! মাইক্রোফোন হাতে পেয়ে শুরু হয়ে গেল প্রতিভা বিকাশের কম্পিউটিশন, কেউ সুরেলা আবার কেউ বেসুরা কণ্ঠে বাংলা গানকে তুলোধুনা করতে লাগলেন।
অনেকেই মাইক্রোফোন ছাড়তে রাজি না, মনে হচ্ছে আইসক্রিমের মতো কামড়ে কামড়ে খাবেন!
তার মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল ফকির জাফরের গানগুলো, এক সময় মনে হয়েছিল আমাদের গাড়িতে ফকির লালের স্বয়ং উপস্থিতিতে।
গাড়ি আবারো থামলো সড়কের বাজারে!
সেখান থেকে উঠলেন আমাদের ভ্রমণের প্রধান সমন্বয়ক শিপুল আমীন চৌধুরী।
সেই সাথে আমাদের দুপুরের খাবার দাবার এবং কানাইঘাটের প্রিয় মানুষগুলো। তাদের পেয়ে আমাদের গাড়ি কানায় কানায় ভরে উঠলো পূর্ণতায়।

আবারো যাত্রা শুরু!
আনন্দ আর বিনোদনের অন্যরকম আমেজ বিরাজ করছে গাড়ীতে, সবাই উৎফুল্ল
আমরা ভুলে গিয়েছি সকালের দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি, ভুলে গিয়েছি লক্কর-ঝক্কর গাড়ির আক্ষেপ, গাড়িতে এখন ‘লন্ডন এক্সপ্রেস’ এর সুখ!
জানি না কেন এ রকম লাগছে! কানাইঘাটের মানুষদের মাঝে কোন লুকায়িত রহস্য, নাকি লাঞ্চ প্যাকেটগুলো দেখে বুঝা যাচ্ছে না।

এবার থামতে হল চারখাই বাজারে!
যোগ দিলেন সাংবাদিক আব্দুল বাসিত ভাই ও আরো কিছু ভাইয়েরা।
আমরা শেষ ধৈর্য্যের পরিক্ষা দিলাম জকিগঞ্জ টিভির জামাল সাহেবের জন্য। তিনি আধাঘণ্টা তপ্ত রৌদ্রে গাড়ি ভর্তি মানুষ দাঁড় করিয়ে যোগ দিলেন বীর বেশে। উনার হাসিমাখা মুখ দেখলে রাগ পোষা যায় না, আমরা সাদরে গ্রহণ করলাম উনাকে।
ঘাটে ঘাটে দাড়িয়ে মানুষ তোলা সাঙ্গ হল!
আমার মনে মনে একটি গান বার বার উঁকি দিচ্ছে, ইচ্ছা করছে মাইক্রোফোন হাতে পেলে গাড়ি ভরা আউল বাউল আর শিল্পীদের নিয়ে সমস্বরে গাইতে “তুই লোকাল বাসরে বন্ধু, তুই লোকাল বাস!!!!!!!!!!

এক সময় আমরা পৌঁছে গেলাম মাধবকু-ে।
গাড়ি থেকে নামার পর সবাই খাই খাই শুরু করলো, এক যুগে সবার পেট দাবী করে উঠলো এখনই খাওন দিতে হবে!
পেটের ভিতর হিং¯্র বাঘ নিয়া ঘুরাঘুরি করা সম্ভব না। বাধ্য হয়ে আমাদের খাবার পরিবেশন করা হল।

‘স্বাদ’ এর চকচকা প্যাকেট আর পানির বোতল দেখে শাফি গংদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

আমরা খাওয়া দাওয়া করলাম খুব আয়েশ করে। জুম্মার নামাজ আদায় করে বিসমিল্লাহ বলে মুখে পান ভরে ঢুকে পড়লাম অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি ‘মাধব কু-ের’ একদম ভিতরে।
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক ঝর্ণা, শীতের সময় অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। আমরা প্রাণভরে উপভোগ করলাম তার অপার সৌন্দর্য।

শেষ বিকেলে সবুজ চা বাগানের ভিতরে একটি সমতল জায়গায় আমাদের কাফেলা আশ্রয় নিল।
সেখানে অনেক খেলা হল-মেলা হল, এমন কি দৌড় প্রতিযোগিতার মতো ভয়ানক কর্মকা- ঘটে গেল!

দৌড়বাজদের আচ্ছামতো শায়েস্তা করার একটি সুযোগ খুব নীরবে কাজে লাগিয়েছি।

প্রায় সমস্তদিন একটি বিষয় দারুণ বিনোদন দিয়েছে আমাদের, মনে হলে এখনো হাসি চাপা রাখতে পারি না।
হ্যালো, হ্যালো বলতে বলতে আমাদের প্রাণ তামা তামা!
মাইক্রোফোনটির বেরসিক আচরণ এই আসা এই যাওয়া বড্ড ভুগিয়েছে আমাদের আর সেই সাথে তাচ্ছিল্যর হাসি অনেক দিন মনে থাকবে।
অবশেষে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে স্মরণ রাখার মতো একটি দিনের সমাপ্তি হয়। জীবনে বারবার এ রকম দিন ফিরে আসলে মন্দ হবে না। স্মৃতি হয়ে থাকবে মোহনা পাঠক ফোরামের স্বর্ণালী আয়োজন। স্মৃতির অজ¯্র পালক রেখে যাওয়া সময় আসবে আবারো আমাদের জীবনে এই প্রত্যাশায়!

লেখক: ডা. হাবিবুল্লাহ মিসবাহ
চিকিৎসক, কবি, ছড়াকার

আরও পড়ুন