মাদক আগ্রাসন: অস্তিত্ব সংকটে জাতিসত্ত্বা

প্রকাশিত : ০৬ জুন, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে

শেখ ছালেহ আহমদ : আজকের মত সুন্দর একটি দিনে যখনই কোন মানবিক বিষয় অমানবিক হয়ে আমাদের সামনে প্রকাশ ঘটে, যেমন আচমকা যে কাউকে বাড়ী ফিরতে হলো একটি নির্ভুল রক্তাক্ত লাশ হয়ে তখনই আমাদের চিন্তা আর গবেষণার রাজ্যে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার সঞ্চালন ঘটে অনবরত। অপ্রতিরোধ্য মাদক আগ্রাসনের ফলে প্রবলভাবে অস্তিত্ব সংকটে জাতিসত্ত্বা। অতএব এই বিষয়ে এখন আমাদের করণীয় কি হওয়া উচিত তার জন্য সম্মিলিতভাবে একটি সুন্দর ক্ষেত্র নির্মাণের জোরালো প্রচেষ্টা জোরদার করা অতীব জরুরী। কেননা ইতিমধ্যে বেসরকারি এক জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মাদকের কারণে তিন শতাধিক মা-বাবা এ পর্যন্ত খুন হয়েছেন। এছাড়া অন্য আরেকটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বলা হয়েছে চলতি বছরের ১৫ই মে থেকে ১লা জুন পর্যন্ত ৪৫টি জেলায় কমপক্ষে ১৪১ জন মাদক ব্যবসায়ী বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন।
ক্রস ফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, প্রতিহত, গোলাগুলি ইত্যাদির মত রহস্যজনক শব্দের অনুপ্রবেশ আমাদেরকে সহ্য করতে হয় নিরবে। আমাদের দায়বদ্ধতা সিমাহীন প্রশ্নাতীত হয়ে উঠলে স্ব-ভাবতই প্রচন্ডভাবে আমার জানতে ইচ্ছে করে যে, লুকায়িত অদৃশ্য সেইসব মূল্যবান সূত্রের শক্তিমালী প্রয়োগ দৃশ্যমান হলে কেমন দেখায়? নিকৃষ্ট, নোংরা, পাপীষ্ঠ মাদক ব্যবসায়ীরা কোন ক্রমেই আইনের উর্ধ্বে নয়। তাদের বিচাটা আমাদের চাহিদার অবশ্যই প্রয়োজনীয় অংশ বটে। যে কোন অপরাধীকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা, দ- নিরূপন ও প্রদান করা একটি সংবিধান স্বীকৃত বিষয়। এক্ষেত্রে মাত্রা নিরূপন ও তার সঠিক প্রয়োগ একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয় বটে। অপরাধ ও অপরাধীকে প্রশ্রয় দেওয়ার সংস্কৃতি কোন ভাবেই যেন আমাদের জাতীয় দায়বদ্ধতায় অনুপ্রবেশ না ঘটে সে জন্য সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে কঠোর অনুশাসনের শক্ত ভিত্তি রচনা করা জরুরী।
ইয়াবার মরণ ছোবলে দেশের যুব সমাজ এখন সম্পূর্ণ বিধ্বংস ও অরক্ষিত। মাদক দ্রব্যের বহুল প্রচলন ও ব্যবহারের অবাধ ক্ষেত্র হিসাবে পরিচিতির পিছনে একটি বড় কারণ হল বাংলাদেশ ভৌগলিক অবস্থানের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার। মাদক দ্রব্য খুব সহজে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আমাদের দেশে ঢুকে পড়ে। অপর্যাপ্ত তদারকি আর সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার কাছাকাছি পৌছতে দৃশ্যমান বিলম্বই আমাদের যুব সমাজকে অন্ধকার জগতের পিচ্ছিল পথে নিয়ে যায়। ইয়াবা সেবনের ফলে এক সময় মানসিক বৈকল্য সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় কিডনী ও লিভারের জটিলতার অন্যতম কারণ হিসাবে ভেজাল ইয়াবা সেবনকে দায়ী করা হয়। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে মাদকাসক্তদের অধিকাংশ বয়সে তরুণ। এরা সাধারণত চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজী সহ বিভিন্ন অপকর্মের সাথে সরাসরি জড়িত।
মাদক একটি লাভজনক ব্যবসা। মাদক ব্যবসায়ীরা রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগছ বনে যায়। দু’হাতে সহজ উপায়ে টাকা কামাই করার এমন সহজ সুযোগই এক সময় মাদক ব্যবসার মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে এবং খুন-খারাবির মত ঘটনা ঘটে। এই অবৈধ ব্যবসার কারণে এক সময় সমাজ অশান্ত হয়ে উঠে। রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। তাই এমতাবস্থায় এমন ভয়াবহ দুর্গতি থেকে রক্ষা পেতে এখনই একটি সঠিক নীতিমালার দারস্থ হওয়া আমাদের জন্য একটি জরুরী বিষয় বটে।
আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় অনৈতিক কার্যক্রম ও মাদক দ্রব্যের বাধাহীন প্রসারের বিরুদ্ধে কতখানি সক্রিয় ভূমিকা নিতে পেরেছে- তার উত্তর পেতে আমাদেরকে কি খুব বেশি বেগ পেতে হবে? না, মোটোই না। সমাজ বিরোধী কাজের ব্যাপক প্রসার আর মাদক দ্রব্যের জমজমাট ব্যবসাই বলে দেয় আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি কতটুকু শক্তিশালী? প্রযুক্তির মহাসড়কে দাঁড়িয়ে হতভাগা এক পথহারা পথিকের আহাজারির মত এ করুণ কান্না আমাদের কাম্য নয়। শক্তিশালী একটি প্রযুক্তি পারদর্শী জাতি গঠনের পথ ধরেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। প্রচলিত কু-অভ্যাসগুলো যেমন- জুয়া, মদ, লটারী ও মাদক দ্রব্যের বিরুদ্ধে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি সমূহ চিহ্নিত করে এবং অচিরেই তা পাঠ্য পুস্তকে সংযোজিত করে নৈতিক শিক্ষাকে শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা। যাতে করে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন রচনার স্বপ্নিল সিড়িগুলি মজবুত করে গড়ে উঠে। নৈতিক নিরাপত্তার দেওয়াল যতটুকু সম্ভব মজবুত করে যথেষ্ট উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। এই দেওয়ালই হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের নৈতিক শিক্ষার প্রথম পাঠশালা। একটি দেশ, একটি জাতি, তাতেই একটি অখন্ড সুন্দর অবয়বে ফুটে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক অভিলাষ চরিতার্থ করার অভিপ্রায় নিয়ে যে শিক্ষা ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়- তার সুদূর প্রসারী ফলাফল কি হতে পারে? আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা তৎকালীন আরব উপত্যকায় অন্ধকার যুগে মেয়ে শিশুদেয় জীবন্ত পূতে ফেলার মতোই একটা অপকৌশল বলে মনে হয়। তাই এমন নৈরাজ্য জনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষা বিষয়ক দ্রুত গবেষণা জরুরী। গবেষণালব্ধ ফলাফলই আমাদের নিয়ে যাবে প্রযুক্তির মহাসড়কে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা বিশেষতঃ মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা বার বার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। যে আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল পুলিশের চলমান আচরণ নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের আইন ও নিরাপত্তা কৌশলের পরিপন্থি বটে। সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী যারা রাষ্ট্রের আনুগত্যের শপথ নিয়ে নিজের দেশের জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবন চলার গ্যারান্টি বাধাগ্রস্থ করল, আনুগত্যের শপথ খেলাপ করল, তাদের প্রতি কি পরিমাণ ক্ষোভ জানালে যথাযথ প্রতিবাদ বলে গণ্য করা হবে।
যে কোন দেশের বিশেষ কোন অঞ্চলে নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ঐ অঞ্চলের জনসাধারণকে সংঘটিত করে সামাজিক প্রতিরোধ ও প্রতিকার সর্বাগ্রে জরুরী। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজপতিদের সমন্বয়ে একটি বহুমুখী কৌশলপত্র প্রণয়নে জোরালো তাগিদ গ্রহণ ও প্রতিকারের জোরালো প্রচেষ্টার মধ্যে নিহিত আছে সফলতার আসল চাবিকাঠি। কিন্তু দুভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, জনপ্রতিনিধি ও সমাজপতিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিরোধ আর প্রতিকারের বদলে অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয় স্থল হিসাবে বিবেচিত হয়। যা আমাদের কাঙ্খিত চাহিদার বিপরীত মেরুর লজ্জাজনক আত্মপ্রকাশ ঘটে। অপরাধী কর্তৃক নজরানা প্রদান সামাজিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। যা অপরাধের বিস্তৃতি ঘটাতে কৌশলগত সহায়ক বটে। অপরাধ আর অপরাধীর সাথে সখ্যতা- এই অবাঞ্চিত অবস্থা সমাজ নামক দেহটার মেরুদন্ডে পচন শুরু হয়। নজরানা প্রদানের হীন অপসংস্কৃতি থেকে আমাদের পরিত্রাণের উপায় কি? রাজনৈতিক আর সামাজিক কৌশল পরিবর্তনের মাধ্যমে এই সমস্ত দুষ্কর্ম থেকে হয়তো আমাদের পরিত্রাণ মিলতে পারে।
লেখক- মানবাধিকার কর্মী, তেলিরাই, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট। ০১৭১২ ০৬১২৯০।
মাদক বিষয়ক কলাম : শেখ ছালেহ আহমদ। সেন্ড- আল ফাত্তাহ কম্পিউটার।

আরও পড়ুন

কর্ণেল তাহেরের ৪৪তম হত্যা দিবসে জাসদের শ্রদ্ধাঞ্জলি

মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার...

মানুষের অনেক ভাষা কিন্তু, চিত্রশিল্পের ভাষা সর্বজনীন

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেটের চারুকলা...

বার্ষিক ম্যাগাজিন “সুরমা” র মোড়ক উন্মোচন

  বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক...