মাতৃভাষার মহাত্ম্য

প্রকাশিত : ০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে

মো:শামসুল ইসলাম সাদিক:
মাতৃভাষার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মানুষের জন্মগত অধিকার। শিক্ষার মাধ্যম যে মাতৃভাষাই হওয়া উচিত এ ব্যাপারে আজ কোনো দ্বিমত নেই। সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাস থেকে জানা যায়, মাতৃভাষার গুরুত্ব যাদের কাছে যত বেশি, তারা উন্নয়নের ধারায় তত বেশি এগিয়ে। নিজেদের ভাষাকে উন্নত ও কার্যকরী করেই বিশ্বের জাতিসমূহ উন্নত ও অগ্রসর হতে পেরেছে আজ। কারণ মনের ভাব মাতৃভাষার মাধ্যমে যে রূপ স্বাচ্ছন্দ্য ও অবলীলায় প্রকাশ করা যায় অন্য ভাষায় তা সম্ভব নয়। শিক্ষা ও উন্নয়নে মাতৃভাষা বাংলাকে যেভাবে মূল্যায়ন করা দরকার, সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশ অনেক পিছিয়ে। ফলে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক উন্নয়ন সেভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। এর পাশাপাশি বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে অন্যদের সাথে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ও অন্যান্য বিদেশি ভাষার ব্যবহার অব্যশই মাথায় রাখতে হবে।
প্রত্যেক মানুষের কাছে তার মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান রয়েছে। সুতরাং অন্যান্য সব ভাষা অপেক্ষা নিজ দেশীয় মাতৃভাষা সকলের নিকট অতীপ্রিয়। শৈশবে মায়ের কোল থেকে যে ভাষায় সর্বপ্রথম শিশু কথা বলতে শিখে, সে ভাষার বর্ণের সাথে সবার আগে পরিচিত হওয়া উচিত। অতঃপর সে ভাষার মাধ্যমেই উচ্চতর শিক্ষায় অগ্রসর হতে হবে। যেহেতু সারাবিশ্বে ইংরেজি ভাষার প্রচলনই সব থেকে বেশি এবং তাদের অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে তারা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে সেহেতু একটি ভালো চাকরি, কর্মসংস্থান যা-ই বলি না কেন, তা অনেকাংশে নির্ভর করে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার ওপর। কিন্তু মাতৃভাষার দুর্বল থেকে বিদেশি ভাষায় সবলতার আশা করা দুরাশার নামান্তর। মাতৃভাষা সম্পূর্ণ আয়ত্ত না করতে পারলে তার সম্যক জ্ঞানার্জন সম্ভব হবেনা। মায়ের ভাষায় কথা বলে কিংবা মনের ভাব প্রকাশ করে যে আনন্দ পাওয়া যায় অন্য কোন ভাষায় সেই আনন্দ পাওয়া যায় না। আমরা বীর বাঙালি জাতি। আমাদের মাতৃভাষা তথা মায়ের ভাষা বাংলা। বাংলাভাষার মাধ্যমেই আমরা প্রথমে ‘মা’ নামক মধুর ছোট্ট শব্দটি শিখেছি। এ ভাষাতেই আমরা কথা বলি ও লিখি। এ ভাষাতেই অতি আপনজনের কাছে চিঠি লিখে মনের ভাব প্রকাশ করি। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে আমরা যে কল্পনার ছবি আঁকি তা এই বাংলা ভাষাতেই। তাই এই ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের স্বাদই আলাদা। যার মাধ্যমে বিশ্বের নানা দেশের জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইতিহাস, ঐতিহ্য গ্রহণ করা এবং সেসবকে নিজের দেশ ও সমাজে প্রয়োগ করাও সহজতর হবে। এইক্ষেত্রে অবশ্যই মাতৃভাষাকে সামনে রাখতে হবে। কারণ, সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে যখন কোনও জাতি তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি বিসর্জন দেয় তখন তারা তাদের নিজস্ব জাতিসত্তা হারিয়ে ফেলে। নতুন কিছু শিখতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলার চেয়ে বিপদ আর কিছুতেই হতে পারে না।
রবি ঠাকুরের ভাষায় ইউরোপীয় বিদ্যা ইংরেজি ভাষার জাহাজে করে এদেশের শহরে বন্দরে আসতে পারে, কিন্তু পল্লীর আনাচে-কানাচে তাকে পৌঁছে দিতে হলে দেশি ভাষার ডিঙ্গি নৌকার প্রয়োজন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘মাতৃভাষা মাতৃস্তন্যের ন্যায়।’ তিনি এও বলেছেন যে, প্রত্যেক মানুষের তিনটি করে মা থাকে। একটি হচ্ছে জন্মধাত্রী মা, একটি মাতৃভাষা, আরেকটি হচ্ছে মাতৃভূমি। তাঁর কথার গুরুত্ব সর্বকালব্যাপী। আমরা মায়ের কোলেই থাকতে পছন্দ করি এবং মায়ের মুখ থেকে শিখে কথা বলি মায়ের ভাষায়। যে মাটির খেয়ে বড় হই, আলো বাতাসে বেড়ে উঠি সেই মাটি যে, মায়ের মতোই পরম আশ্রয় আমাদের। এ জন্যই বলা হয়-মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষালাভ ও চিন্তার উৎকর্ষতা আদান-প্রদানে কতগুলো সাধারণ সুবিধা রয়েছে। স্বাধীন দেশে মাতৃভাষা চালু থাকবে এবং শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষা গুরুত্ব পাবে এটাই স্বাভাবিক। বলার চেয়ে লেখ্য ভাষার গুরুত্ব বেশি। তাই যদি মাতৃভাষায় সব কিছু লেখা যায় তাহলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যার্জনে আর কোন বাধা থাকবেনা। তাহলে বিদ্যা অর্জন করা দুর্বোধ্য বলে কেউ বই পুস্তক ট্যাংকে রেখে পালিয়ে বেড়াবেনা। আমাদের দেশে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল কেন? মাতৃভাষার জন্য কেন বুকের তাজা প্রাণ ঝরে পড়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর একটাই মাতৃভাষাকে অস্বীকার করা বা অবমাননা করা মানে নিজেকে অবমাননা করা, নিজের মাকে অবমাননা করা নামান্তর। এসকল দাবি প্রতিষ্ঠা ও ভাষার জন্যেই বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা আন্দোলন করতে হয়েছিল। আমাদের দেশের মানুষ যখন বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য যায় তখন সেখানে তাদের প্রথমে সেসব দেশের ভাষা শিখতে হয়। তাহলে সে দেশের ভাষায় কি তারা সমৃদ্ধ নয়? তারা কি বিজ্ঞানে পিছিয়ে রয়েছে কভুওনা। তাই মাতৃভাষার প্রতি অবশ্যই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হলে তা সহজেই মানুষের হৃদয় জুড়ে থাকতে পারে। শিক্ষার্থীরা ও শিক্ষণীয় বিষয়ে আনন্দ খুঁজে পায়। মাতৃভাষার মাধ্যমে গাঁথুনিটা খুব মজবুত করে দিতে পারলে যে কোন ভাষায় শিক্ষার্থীরা অতি সহজে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। দেশের শিক্ষাহীনতার ঘোর অন্ধকার বিদূরিত করার একমাত্র প্রন্থা শিক্ষাকে সহজতর করা। সাধারণের মধ্যে শিক্ষার আলো প্রসার ঘটাতে হলে শিক্ষাঙ্গনে অবশ্যই মাতৃভাষা হতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতিতে বাংলাকে উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারে বাধ্যতামূলক করা; বাংলা শব্দভা-ার উন্নত করা; উচ্চ শিক্ষায় প্রয়োজনীয় গ্রন্থগুলোর বাংলায় অনুবাদের ব্যবস্থা গ্রহণ; বাংলাভাষার জন্য গবেষণাকেন্দ্রের সক্রিয় ভূমিকা ও কার্যক্রম; বাংলাভাষার শৈল্পিক, ব্যাকরণগত ও লিখিত রূপে সহজবোধ্যতা আনা; বাংলাভাষার ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রবাসী বাংলাভাষী ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপন; সর্বস্তরে বাংলাভাষার নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য প্রচলন; বাংলাভাষার গুরুত্ব বোঝাতে সবার মাঝে সচেতনতা বাড়ানো; বাংলা সংস্করণে বেশি বেশি কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরি করা এবং বাংলাভাষাকে দ্রুত প্রযুক্তি নির্ভর করতে উদ্যোগী হওয়া। দেশের মনীষীবৃন্দ তাদের চিন্তার ফসল যদি মাতৃভাষার মাধ্যমে গ্রন্থাগারে সঞ্চয় করেন তবে তা সহজেও স্বাভাবিকভাবে দেশের বিদ্যার্থীদের অন্তর স্পর্শ করতে পারে।
মাতৃভাষা হচ্ছে মায়ের ভাষা। এ ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করে যে আনন্দবুদ তা অন্য ভাষায় নেই। তাছাড়া বিদেশী ভাষা শেখা ও আয়ত্ব করা অনেক কষ্টসাধ্যও বটে। তাইতো মাতৃভাষায় জ্ঞানানুশীলন ব্যতীত বিশ্বে কোন জাতিই উন্নতি লাভ করতে পারেনি বা কখনও পারবেও না। ইউরোপে যতদিন ল্যাটিন ভাষা প্রচলিত ছিল, ততদিন সেখানে জাতীয় সংস্কৃতির স্বোতছিল প্রায় রুদ্ধ। ইউরোপের অধিবাসীরা যখন ল্যাটিন ভাষা ছেড়ে তাদের মাতৃভাষা গ্রহণ করে তখন থেকেই সেখানে সর্বাঙ্গীন জাতীয় উন্নতি দেখা দেয়।
২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে ঢাকার রাজপথে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার এছাড়াও অনেক নাম না জানা ছাত্রজনতা মাতৃভাষা বাংলার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। তারই পথধরে ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম প্রিয় বাংলাদেশ। আমরা জানিতো যেকোনো অর্জন রক্ষা করা আরও বেশি কঠিন। তাই আমাদের উদাসীনতায় যেন আমাদের মায়ের মতো ভাষা কলুষিত না হয় সেদিকে দৃষ্ট দিতে হবে। বর্তমানে মাতৃভাষার মাধ্যমে যে শিক্ষাদান পদ্ধতি আমাদের দেশে চালু হয়েছে এর পেছনে রয়েছে ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা লাভ করে। এরপর থেকে সর্বস্তরে শিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলাভাষা পর্যায়ক্রমেই বিস্তার লাভ করে চলছে।
আজ পৃথিবীর সকল সভ্য দেশে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা-দীক্ষা, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। শিল্প, বাণিজ্য, জ্ঞান, বিজ্ঞানের উন্নতির মূলেও রয়েছে মাতৃভাষা। মাতৃভাষার মাধ্যমে বহুদেশের বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে এবং সে সব দেশ সর্বক্ষেত্রে উন্নতি প্রদর্শন করে শ্রদ্ধা অর্জন করেছে। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ সম্পর্কে আজ পৃথিবীর মনীষীবৃন্দ একমত। যাদের মনে দেশপ্রেম রয়েছে তারা সকলেই মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৮ বছর পেরিয়ে এসেও সর্বক্ষেত্রে-সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলার সম্মানজনক প্রতিষ্ঠা করতে না পারাটা সত্যিই বেদনার।

আরও পড়ুন