মশার তামাশায় করনীয়

,
প্রকাশিত : ০৩ আগস্ট, ২০২১     আপডেট : ২ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আনোয়ার হোসেন মিছবাহ্ :

মশার তামাশা আজদিনের নয়।পুরনো দিনের।ক্ষুদ্রকায় এই কীট প্রাণীটির জন্মযন্রণায় অতিষ্ঠ মানুষ।বোবা প্রাণী।অতিষ্ঠ নাগরিক জীবন।তটস্থ গ্রামীন মানুষ।কিবা দিন কিবা রজনী মশার অত্যাচারে সীমাহীন সময় অতিপাত করছে নগর মহানগর,বন্দর,এমন কী গ্রাম গঞ্জের মানুষ।মশার জীবন প্রণালী কে উষ্কে দিয়ে কেমন জানি অসহায়ত্বের দ্বারপ্রান্তে আমরা কার্যকরী উদ্যোগের অভাবে আজ মানুষের কর্মঘন্টা, স্কুল কলেজের সিলেবাস,অফিস আদালত, হাসপাতাল,ক্লিনিক কিংবা উপাসনালয়ের পরিবেশ আজ পড়ো পড়ো।মশা নিধনের কাজ দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকলেও নিধন পরিক্রমার খতিয়ান নিতে নিতেই অতিষ্ঠ নগর কিংবা গ্রামবাসী। সারাদিন তাল-বেতালের চটাস-চটাস শব্দকে কর্ণকুহরে জমি দান করা ই যেন ভুক্তভোগীর জীবন্তিকায় অন্তর্ভুক্তি বৈ কিছু নয়।অথচ এ থেকে বাঁচতে চায়,উৎরে উঠতে চায় মানুষ। মানুষের পরিবেশ।প্রাণীর প্রাণ।
আমরা জানি,শীত এসে যাই বললে ই হুড়মুড় করে শুরু হয়ে যায় মশার তামাশা।বর্ষা এলে ক্ষমতার বাড়বাড়ন্তের প্রমাণ দিতে থাকে মশা।শীতকালে প্রকৃতির যে যে স্থানে মশার ডিম থাকে সেগুলোই ফেব্রুয়ারী বা মার্চের দিকে গরমের পর খানিক সংস্পর্শে এসেই একসাথে ফুটতে শুরু করে।অন্যদিকে বর্ষার লাগাম ধরেও এগিয়ে আসে মশকের বংশধর।পৃথিবীর নানা প্রান্তে মশার উপস্থিতি টের পাওয়া গেলেও আমাদের দেশে টের পাওয়ার মাত্রাটা একটু বেশি।কারণ জাতি হিসেবে মশা বিস্তারে আমরাই সেরা!
পৃথিবীতে আজ অবধি সাড়ে তিন হাজার মশা শনাক্তের তালিকা দখল করে আছে।মশা মুলত নেমাটোসেরা মাছি বর্ণের ক্রেণ মাছি পরিবারভুক্ত ভয়ঙ্কর কীট বিশেষ। প্রাণীজগতের মধ্যে বড়ো পর্ব-আথ্রোপডার মাছি বর্গের অন্তর্ভুক্ত প্রাণীটির নাম মশা। যাকে ইংলিশে Mosquito বলা হয়ে থাকে।স্প্যানিশ শব্দ Mosca এবং diminutive নামক দুটি থেকেও এসেছে Mosquito যার অর্থ যথাক্রমে ক্ষুদ্র ও অন্যটি মাছি।অর্থাৎ, Mosquito শব্দের পূর্ণাঙ্গ রূপ বলতে পারি-
ছোট মাছি, যা উড়তে সক্ষম ক্ষুদ্র পতঙ্গ বিশেষ।চারটি জীবন চক্রের ধাপ অতিক্রম করে ই এরা প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।প্রথমটি-
ডিম।দ্বিতীয় টি-শূক।তৃতীয়টি-মুককীট থেকে মশা নাম কে ধারন করে পৃথিবীতে রাজত্ব করে।
অধিকহারে নারী মশা আবদ্ধিত জলাশয়ে ডিম পাড়ে।কিছু পাড়ে পানির ধারে কাছে।কিছু জলজ উদ্ভিদের ওপর।কিছু সংখ্যক হ্রদে। কিছু কিছু সাময়িক ডোবায়।আবার লবনাক্ত পানিতেও ডিম দিতে মানানসই প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায়।তবে সমান সংখ্যক মশাকে বাসাবাড়ির পানিকেও বেছে নিতে দেখা মিলে।প্রজাতি অনুযায়ী মশার ডিম পাড়ার পার্থক্যও পরিলক্ষিত হয়। এ কাজটি করতে পরিপক্কভাবে নারী মশাকেই দেখা যায় পানির উপরাংশে উড়াউড়িতে ব্যস্থ।কারণ ডিমগুলো পানির উপরই পাড়তে হয়।অ্যানোফিলিস মশা এ কাজটি ই বেশি করে থাকে।চুরট আকৃতির ডিমে দুপাশে ভেসে থাকার উপাদান বহন করে বলেই অ্যানোফিলিস কে সহজেই চিন্হিত করা যায়।কিছু প্রজাতির নারীমশাকে ও তার পূর্ণাঙ্গ জীবন্তিকায় ১০০ থেকে ২০০ টি ডিম দিতে দেখা যায়।খাবার উপযোগি মুখ। সুগঠিত মাথা।পা ছাড়া বক্ষস্থল ও বিভক্তি চিন্হিত পেটে জানান দিতে থাকে ডিমটি লার্ভা ৪টি স্তর পর্যন্ত বেড়ে গিয়ে শূককীট,মুককীটে রূপান্তর ঘটিয়ে থাকে।মুককীট অনেকটা কমা আকৃতির হয়।মাথা ও বক্ষস্থল তার পেটের সাথে বেঁকে একত্রিত হয়।মুককীট তার পেটের সাহায্যে পানিতে অনায়াসে সাঁতার কেটে বেড়াতে বেড়াতে হাঁপিয়ে গেলে মাঝেমধ্যে পানির উপর শ্বাস নিতেও চলে আসে।পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা বিবেচনায় কিছু মশাকে পূর্ণাঙ্গ সময়ে ফিরতে ৫ থেকে ৭ দিনের সময় নিতে হয়।কিন্তু বেশিরভাগ কে পূর্ণাঙ্গ বয়েসী হয়ে ওঠতে সময় নিতে হয় ৪০ দিন বা তার একটু বেশি সময়।ব্যাপারটি অবশ্য নির্ভর করে শারীরিক আকৃতি, শূক এর ঘনত্ব ও পানিতে খাবার সরবরাহ কে ঘিরে।অ্যানোফিলিস,এডিস ও কিউল্যাক্স মশা ই আমাদের দেশে বেশি থাকে।এদের চেনার সহজ উপায় হলো- তাদের বসা অবস্থাকে পর্যবেক্ষণ করা।
অ্যানোফিলিস মশা যখন কোথাও বসে তখন লেজের দিকটা উঁচু করে বসে।আমাদের দেশে প্রায় ৬ প্রকার অ্যানোফিলিস মশার অস্তিত্ব পাওয়া যায়।যেমন-(১) অ্যানোফিলিস ফিলিপিনেপসিস-এরা সমতল ভূমি ও গ্রামাঞ্চলে বেশি থাকে।(২)অ্যানোফিলিস মিনিমাম-পাহাড়ি এলাকা ওদের স্থান।(৩)অ্যানোফিলিস সানডেইকাস -এরা থাকে উপকূলীয় এলাকায়।(৪)অ্যানোফিলিস বেলবাসিনসিস-পার্বত্যাঞ্চল এবং জঙ্গলপূর্ণ এলাকার বাসিন্দা এরা।(৫)অ্যানোফিলিস কিউলিসিকেসিস -এরা থাকে সিলেট ও দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় ও (৬)অ্যানোফিলিস স্টিফেনসি-এরা শহরাঞ্চলের বাসিন্দা। এরা যে কোন শহরকেই নিজের শহর বলে জানে।
আর এডিস ও কিউল্যাক্স মশা বসার সময় শরীর রেখে ও লেজের দিকটাকে সমান্তরাল করে বসে।অ্যানোফিলিস মশার পায়ে ডোরাকাটা দাগ না থাকলেও এডিস মশার পায়ে বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা দাগ থাকে।এবং এরা দিনে কামড়ায়।
অ্যানোফিলিস মশা পুকুর বা খেতখামারের পরিষ্কার বা আবদ্ধিত পানিতে ডিম পাড়ে।বাংলাদেশে কিউল্যাক্স মশার বসবাস আবার ৭৯ প্রজাতির। এডিস মশা গাড়ির পরিত্যাক্ত টায়ার,বারান্দার টব,নারিকেলের মালা,
ডাবের খোসা,মিনারেল ওয়াটারের বোতল,
ছাদ বাগানের টব।রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে জমে থাকা পানি,গ্লাস বা প্লেট রাখার ট্রে।প্রসাধনীর কৌটা ইত্যাদির মধ্যে জমে থাকা অল্প পানিতে ডিম পাড়ে।অপর দিকে
কিউল্যাক্স মশা নর্দমার নোংরা পানি,
ডাস্টবিনের আবর্জনা,ময়লা ডোবা ইত্যাদিতে ডিম পাড়ে।মশার ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে সময় লাগে এক সপ্তাহ থেকে এক মাস।এরা বাঁচেও- পুরুষ ৫ থেকে ৭দিন আর স্ত্রী মশা ১ মাস পর্যন্ত সময়কে নিয়ে।মশা শুষ্কস্থানে ডিম দিলেও ডিম ফুটতে পানি লাগে অনেকটা উদ্ভিদের অঙ্কুরোদগমের মতো।পানির স্পর্শ না পেলেও মশার ডিম কয়েক মাস পর্যন্ত সতেজ থাকতে পারে।এ জন্যই বর্ষার মৌসুমে মশার উপদ্রব অন্যতম বেশি ই পাওয়া যায়।
বিশ্বে সাড়ে তিন হাজার প্রজাতি মশার মধ্যে কিউল্যাক্স,অ্যানোফিলিস ও এডিস এই ৩ প্রকার মশা ই মারাত্মক। কিউল্যাক্স বাস করে মানববসতি ঘিরে।এবং উড়তে পারে মাত্র ৫০ থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে।এরা মানুষের রক্ত খেয়েই ডিমের জন্য উপযুক্ত হয়।সুযোগ পেলে সরীসৃপ ও উভচর প্রাণী কেও ছাড়ে না।এমনকি মাছের রক্ত দিয়েও জিহবার স্বাদ মেঠায়।স্ত্রী মশা ডিমের উপযুক্ত হলে শরীরে প্রোটিনের অভাব দেখা দেয় বলে ই মানুষের রক্তে প্রোটিনের ঘাটতি মেটায়।বাকি রা রক্ত পান না করে উদ্ভিদ, ফুলের রস ইত্যাদি শোষনের মাধ্যমে জীবনধারন করে থাকে।
অনেকগুলো উপাঙ্গ বিশিষ্ট মশা প্রজাতির মাথায় থাকে একটি লম্বা শুঁড় যাকে কাজে লাগায় প্রাণীর রক্ত শোষনে। মাথায় থাকে দুটো শক্তিশালী এ্যান্টেনা যা সংবেদী তথ্যের রিসেপ্টর হিসেবে কাজ করতে সাহায্য করে।পুরুষ মশার মাথা স্ত্রী মশার চাইতে রোমশ হয়ে থাকে।মশা তার এ্যান্টেনা দিয়ে প্রায় ১০০ফুট দূর থেকেও মানুষের রক্তের ঘ্রাণ নিতে পারে। মশারা A.B.AB.এবং O গ্রুপ রক্তধারী মানুষের মধ্যে 0 গ্রুপধারীদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে বেশি। অপছন্দের তালিকায় রাখে A গ্রুপধারীদের। এছাড়াও মানুষের নাক দিয়ে নির্ঘত কার্বনডাইঅক্সাইড ও মশাকে আকৃষ্ট করে বেশি। দেখা গেছে,যে যতো বেশি কার্বনডাইঅক্সাইড গ্যাস ত্যাগ করে,সে ততো আক্রান্ত হয় বেশি। এ জন্য স্থির হওয়া মানুষ বসে থাকা বা শুয়ে থাকা অবস্থায় মশার উৎপাত টের পান বেশি।তার থেকে অনেকটা নিরাপদ থাকে শিশুরা।কারণ শিশুদের ফুসফুস ছোটো থাকায় কার্বন নিঃস্মরণ কম বিধায় মশাকেও আকৃষ্ট করে কম।আরও কারণ গুলোর মধ্যে রয়েছে ঘামের গন্ধযুক্ত শরীর।ল্যাকটোজেন সমৃদ্ধ বেশি মাত্রার ত্বক।রক্তের ঘ্রাণ।ফুসফুস থেকে নির্গত কার্বনডাইঅক্সাইড এর ঘ্রাণ।
এদের শিকারের লক্ষ্য প্রাণী।যা সনাক্তকরণে কাজ করে নিজেদের মাথার এ্যান্টেনা।সাধারণ মশা,যেমন কিউল্যাক্স ও অ্যানোফিলিস একবার কামড়িয়ে ই রক্ত শোষন করে নিলেও এডিস মশা একবার কামড়ায় না,সারাদিন কামড়ায়।বেশি কামড়ায় সকাল ও সন্ধেবেলায়।রাতের উজ্জ্বল আলোতে ও এডিস কে কামড়াতে দেখা যায়।মানুষেরা সঙ্গ পেলে বহুতল ভবনেও উঠে বাসা বাঁধতে পারে এডিস।একজনের রক্তে তার তৃষ্ণা মেঠে না।৪ থেকে ৫ জন মানুষের দেহ থেকে একটু করে রক্ত শিকার করা তার বৈশিষ্ট্য। তার সংগ্রহ করা রক্ত শরীরের স্যালিভারি গ্ল্যান্ড বা লালাগ্রন্থির ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে জীবাণুবাহিত মশায় পরিণত হয়ে যখন অন্য মানুষের কাছে রক্ত নিতে যায় তখন সে একটা ফ্লুইড ছাড়ে,যা তে সংরক্ষনকালীণ রক্ত জমাট বেঁধে যায়।এমন কি রক্তে বহন করা জীবাণু নিয়ে মানুষ কামড়িয়ে সুস্থ মানুষ কে আক্রান্ত করে ফেলে।এডিস মশা হাঁটুর ওপর পর্যন্ত উঠতে পারে না কথাটিও ভুল প্রমাণ করে ছাড়ে তারা।
মশা মানুষ কে কামড় দেবার সময় তার শরীর থেকে এক ধরনের লালা মানুষের শরীরে ছড়িয়ে দেয়।এবং এ ছড়িয়ে দেওয়া থেকে মানুষ সহজে ই আক্রান্ত হয়ে পড়ে। সাধারণত মশার কামড়ের অংশটুকু শরীরের মধ্যে লাল দাগের সৃষ্টি করে।এর কারণ তার শুঁড়ের মাঝে লেগে থাকা লালা ত্বকে ঢুকে গিয়ে চুলকানির সৃষ্টি করে।যেসব মশা কামড়ায় তারা প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষের শরীরে রোগজীবাণু সংক্রমণের চলক হিসেবে কাজ করে।অ্যানোফিলিস,কিউলেক্স ও এডিস,।হেমাগোগাস মশা রোগ সংক্রমণের চলক হিসেবে কাজ করলে ও এর উল্লেখযোগ্যতা বেশি পরিচিত। যারা কামড়ের মাধ্যমে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ ধরনের রোগ ছড়িয়ে দিতে পারে।এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-ম্যালেরিয়া,ফাইলেরিয়া,কালাজ্বর,ডেঙ্গু,চিকনগুনিয়া,জাপানি এনফালাইটিস,
ওয়েস্টার্ন ইকুইন,এনসেফালাইটিস,ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস,লিম্ফেটিক,ফাইলেরিয়াসিস
,ভ্যানুজুয়েলা ইকুইন এনসেফালাইটিস ও ইয়েলো ফিভার উল্লেখযোগ্য।
ম্যালেরিয়াঃ ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু বহনকারী মশক প্রজাতিটির নাম,স্ত্রী অ্যানোফিলিস।পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়-১৯৮৮ সালে ৩৩ হাজার ৮শ ২৪টি ম্যালেরিয়ার সংক্রমণের ঘটনা ঘটলেও ১৯৯৮ সালে এ সংক্রমণের হার ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত দাঁড়ায়-৬০ হাজার ২৩ টিতে।আর সংক্রমণের ৯০ শতাংশই ঘটে বৃহত্তম চট্রগ্রাম ও পার্বত্যাঞ্চলে।অতীতে পৃথিবী জুড়ে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ এতো বেশি ছিলো যে,
শুধুমাত্র ম্যালেরিয়া নিয়ে গবেষনার জন্য ৫ বার নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।ম্যালেরিয়ার লক্ষণ হচ্ছে-শরীর জুড়ে কাঁপুনি, জ্বর ও মাথা ব্যথা।
ফাইলেরিয়াঃউত্তরাঞ্চলের ঠাকুরগাঁও,
দিনাজপুর,রংপুর ও নীলফামারিতে ফাইলেরিয়া বা অঞ্চলগত ভাষায় গোদ রোগের দেখা পাওয়া যায়।এ রোগ মানুষের অঙ্গকে বিকৃত করে হাত ও পা কে হস্তিপদের মতো বড়ো ও যন্ত্রনাদায়ক করে তুলে।এর জন্য দায়ী কিউল্যাক্স মশা।মশাবাহিত হয়ে এই রোগ মানুষের শরীরে ঢুকে লিম্ফফ্যাবিকতন্ত্র এবং ত্বকের নিচের টিস্যুকে ক্ষতি করে দেয়।অনিয়মিত জ্বর,কাঁপুনি, শরীর ব্যথা,যৌণাঙ্গ,মুত্রাশয়,বীর্যথলী এবং অন্ডকোষে প্রদাহ বা অন্ডকোষে ব্যথা,ত্বকের ছাল ওঠে যাওয়া ইত্যাদি ফাইলেরিয়া রোগের ই উপসর্গ।
কালাজ্বরঃবাংলাদেশে ১৯৪০ সাল থেকে জনস্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবে চিন্হিত কালাজ্বর। এ রোগের জীবাণু বহনকারী মশার নাম বালিমাছি।বৃহত্তর ময়মনসিংহ, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি।এর লক্ষ্মণ হলো-যকৃত ও প্লীহার জলীয় -অন্তর্ঝিল্লিতন্ত্রের ক্ষয় সাধন।

শিশুদের জন্য বেশি ক্ষতিকারক এ রোগে মানুষকে মৃত্যুর কাছেও নিয়ে যেতে দেখা যায়।
ডেঙ্গুঃ এডিস অ্যাজিপ্টাই মশার কামড়ে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালেই এ রোগ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।বিশ্বের প্রায় ১১০ টিরও বেশি দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়।প্রতিবছর ৫ থেকে ১০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে সংক্রমিত হয়।
শুধু বাংলাদেশ কে যদি এ চিত্রের সাথে যুক্ত করি তবে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক মানবকন্ঠ ২৬ জুলাই ২০২১ সংখ্যা পত্রিকার বরাত দিয়ে জানাতে পারি-সারাদেশ ডেঙ্গু ২০২০ সালে যেখানে আক্রান্ত হয়েছিলো ১ হাজার ৪০৫ জন সেখানে ২০২১ সালের অর্ধেক সময়ের মধ্যে ২০২০ সালের সমপরিমান আক্রান্ত হয়ে পড়েছে।২০২১ সালের জানুয়ারী থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৩৯ জন।যার মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৬৭ জনে।১৯৭৯ সালে আফ্রিকা থেকে জন্ম নেওয়া ডেঙ্গু কে পৃথিবীবাসী চিনতে পারে বিংশ শতকের প্রথমদিকে।এডিস অ্যাজিপ্টাই
মশার কামড়ে এ ভাইরাসের লক্ষণ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে ৩ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে। মাথাব্যথা,জ্বর,বমি,মাংসপেশি ও হাড়ের সংযোগস্হলে ব্যথা,সাথে আছে কোমরে ব্যথা।তবে তীব্র পর্যায়ের ডেঙ্গু র ধরনে দুটি ভাগ লক্ষ্য করা যায়-প্রথমত,ক্লিনিক্যাল ডেঙ্গু। দ্বিতীয়ত,হেমোরেজিক ডেঙ্গু। তারমধ্যে হেমোরেজিকটা ই বেশি ভয়াবহ।প্রাথমিক পর্যায়ে শরীরে থাকে তীব্র জ্বর সাথে মাথাব্যথা।যার স্থায়িত্বকাল ২ থেকে ৭ দিন।পরবর্তীতে চোখে ব্যথা,চোখ নাড়ালে ব্যথা,দাঁতের মাড়ি ফেটে রক্ত ঝরা,পায়খানার সাথে রক্ত ক্ষরা,পায়খানার রঙ পরিবর্তন হয়ে লাল কালো বর্ণ ধারন।শরীরে রেশ বের হওয়া। কারো কারো ক্ষেত্রে মুখ ও নাকের মিউকাস মেমব্রেন থেকে অল্প অল্প রক্তপাত হতে থাকা।কারো ক্ষেত্রে ডেঙ্গু চরম পর্যায়ে চলে গেলে,প্রবল জ্বরের সাথে প্রচুর পরিমানে তরল বুক এবং অ্যাবডোমিনাল ক্যাভিটিতে বর্ধিত ক্যাপিলারিশোষন ও লিকেজের কারণে জমিয়ে রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকলাঙ্গতা প্রকাশ পায়।রোগীর হাড়ের ব্যথা বৃদ্ধি পায়।চোখ ও ত্বক লাল হয়ে যায়।চরম অবসন্নতা ও
বিষাদগ্রস্ততা দেখা দেয়।ডেঙ্গু ভাইরাস টি
হেমোরেজিক পর্যায়ে পৌঁছে গেলে ত্বকের নিচে রক্ত জমাট বাঁধে এবং পাকস্থলী ও অন্ত্রে রক্তক্ষরণের জন্ম দেয়।ফলে রোগীকে টেকানো দায় হয়ে পড়ে।ফলে রোগী কে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।এ সময় বাসায় রাখা বোকামির পর্যায় বিবেচনা করা হয়।
ডেঙ্গুর ইতিহাস থেকে জানা যায়-মশার কামড়ে ভাইরাসজনিত এই রোগটি ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮১ সালে মহামারীর আকারে প্রথম দেখা দেয়-ক্যারিবীয় অঞ্চলে।১৯৮০ সালের গোড়ার দিকে দক্ষিণ আমেরিকা, ১৯৭৯ সালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও আফ্রিকায়।তবে রক্তক্ষরা ডেঙ্গুর প্রথম সাক্ষাৎ মিলে ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে ম্যানিলায়।এবং ১৯৭৫ সাল নাগাদ দক্ষিণ -পূর্ব এশিয়ায় নিয়মিত হয়ে চলমান থেকে যায়।ঢাকায় আকষ্মিকভাবে ২০০০ সালে এ ডেঙ্গু বিস্তার লাভ করে।হঠাৎ করে এক সাথে অনেক মানুষ আক্রান্ত হওয়াতে পরীক্ষা -নীরিক্ষার মাধ্যমে এ রোগটিকে নামে জানা যায়।ধারনা করা হয়-আফ্রিকার সোহাহিলি ভাষার প্রবাদ-‘কা-ডিঙ্গা পেপো’,থেকে ডেঙ্গু শব্দটি এসেছে।যার অর্থ ‘শয়তানের শক্তির কাছে আটকে যাওয়ার মতো ব্যথা।’তবে চীনের ২৬৫ থেকে ৪২০ খ্রিস্টপূর্ব সময়ের নথিপত্রে ডেঙ্গুর উপস্থিতি পাওয়া যায়।যদিও এ নিয়ে বিতর্ক পিছু ছেড়ে যায় নি।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে-মহামারী আকারে ডেঙ্গু কে শণাক্ত করা হয় ১৯৫০ সালের দিকে থাইল্যান্ড ও ফিলিপিন্স এ।
১৯৭০ সালের আগে মাত্র ৯টি দেশে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা গেলেও বর্তমানে শতাধিক দেশে ডেঙ্গু ভাইরাস কে খুঁজে পাওয়া যায়।বিশ শতকের শেষ দিকে রোগটি ব্যাপক বিস্তার লাভ করে,যা আজ অবধি চলমান।
চিকনগুনিয়াঃএডিস অ্যাজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার কামড়ে ২ থেকে ১৪ দিনের মাথায় চিকনগুনিয়া র লক্ষণ ফুটে ওঠে।জ্বর,মাথাব্যথা,ত্বকের রেশ,বমিভাব,
শরীর ব্যথা এমন কি হাড়ের জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা এ রোগের বিশেষ লক্ষ্মণ হিসেবে চিন্হিত।তানজানিয়ার মাকুন্দি জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত কিমাকুন্দি ভাষা থেকে চিকনগুনিয়া শব্দটি এলেও ১৯৫২ সালে এ রোগটি ধরা,পড়ে তানজানিয়াতে।চিকনগুনিয়া বহনকারী মশা মানুষকে সাধারণত দিনেই কামড়ায় বেশি।চিকনগুনিয়া কে নিয়ে পেছন দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই-এর প্রাদুর্ভাব এশিয়া ও আফ্রিকায় বেশি হলেও ২০০০ এর দশকে ইউরোপ,আমেরিকায়ও ছড়িয়ে পড়ে।২০১৪ সালে প্রায় ১০ লক্ষ মামুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়।স্থান হিসেবে দেখা গেছে আমেরিকার ফ্লোরিডা।
২০০৮ সালে বাংলাদেশের রাজশাহী, ২০১১সালে রাজধানীর দোহারে।এবং ভয়ংকর কথা হলো-২০১৭ সালের পর বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস চিকনগুনিয়া।
জাপানি এ্যানসেফালাইটিসঃ কিউল্যাক্স মশা থেকে ছড়ায় জাপানি এ্যানসেফালাইটিস।এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি জাপানেই দেখা যায়।১৯৭৭ সালের আগে এ রোগ টি চিন্হিত করা না গেলেও মধুপুর জঙ্গলে গারো সম্প্রদায়ের মধ্যে এর প্রাদুর্ভাব ছিলো বলে জানা যায়।প্রধান লক্ষ্মণ -মাথাব্যথা,পেশির জড়তা,
স্বরভঙ্গ ও উর্ধ্বশ্বাসতন্ত্রের গোলমাল ইত্যাদি

ওয়েস্টার্ন ইকুইন এ্যানসেফালাইটিসঃ
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা,জর্জিয়া ও নিউজার্সিতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি।কিউল্যাক্স মশার কামড় থেকে রোগটি ছড়িয়ে-জ্বর,মাথাব্যথা,
বমিভাব পর্যন্ত উপসর্গে মানুষ কে জানান দেয়,রোগটি ওয়েস্টার্ন ইকুইন এ্যানসেফালাইটিস।
১৯৬৪ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ৭০০ জনে দাঁড়িয়েছে।দেখা গেছে এ রোগে আক্রান্তের এক তৃতীয়াংশ রোগীকে বাঁচানো যায় না, মারা যায়।যারা বেঁচে থাকে,তাদের মস্তিষ্কের সমস্যা দেখা দেয়।রোগের কোন প্রতিষেধকও নেই।
জিকাঃএ্যাইডেস অ্যালবোপিকটাস জীবাণুবাহক মশা জিকা ভাইরাসের জন্য দায়ী। এটি প্রথম ১৯৪৭ সালে উগান্ডায় রেসাস ম্যাকাক বানরের মধ্যে পাওয়া গেলেও ১৯৫২ সালে উগান্ডা ও তানজানিয়াতে মানবদেহের মধ্যে সনাক্ত করা হয়।জ্বর, মাথাব্যথা,অবসাদগ্রস্থতা,অস্থিসন্ধিতে ব্যথা,
পেশিতে ব্যথা,শরীরে লালচে দাগ ও ফুসফুড়ি জিকা ভাইরাসের লক্ষণ।আশার কথা হলো,রোগটি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে জেঁকে বসে নি।
সেন্ট লুইস এ্যানসেফালাইটিসঃযুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। কিউল্যাক্স মশা ই এ রোগের বাহক।জ্বর,মাথাব্যথা,বমিভাব ইত্যাদি এ রোগের উপসর্গ। এই রোগের কোন প্রতিষেধক নেই।
লা ক্রস এ্যানসেফালাইটিসঃ আটলান্টিক মহাসাগরের দক্ষিণ পাড়ের দেশগুলোতে রোগের লক্ষ্মণ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।গাছের কোটরে বংশ বিস্তারকারী মশাকে এ রোগের জন্য দায়ী করা হয়।জ্বর,বমিভাব প্রধান লক্ষ্মণ। বয়স্কদের মধ্যে ছড়ানোর আশংকা বেশি।দীর্ঘ মেয়াদি রোগী এ রোগে শারীরিক বিকলাঙ্গতাকে বরণ করতে পারেন বলে সতর্ক থাকা উচিত।
ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসঃকিউল্যাক্স মশা ই এ রোগের ভাইরাস বহনকারী। এ রোগে শুধু মানুষ ই নয়,পাখি ও আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি না জেনেই স্নায়বিক দূর্বল হয়ে পঙ্গুত্বকে বরন করতে পারেন।এর প্রাদুর্ভাব যুক্তরাষ্ট্রে ই বেশি বলে জানা যায়।
লিম্ফেটিক ফাইলেরিয়াসিসঃকিউল্যাক্স জাতীয় স্ত্রী মশার কামড়ে এ রোগ হয়ে থাকে।
আফ্রিকা,দক্ষিণ আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম তীরবর্তী অঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাব বেশি।এ রোগ মানুষের শরীরে ভয়ংকর ইনফেকশন তৈরি করে শরীরের প্রধানতম চলমান অঙ্গ পা কে অস্বাভাবিক ফুলিয়ে মানুষ কে অচল করে তুলে।
ভেনিজুয়েলা ইকুইন এ্যানসেফালাইটিসঃ দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় এর প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়।জ্বর,মাথাব্যথা,বমিভাব ইত্যাদি উপসর্গে কাবু করে এই ভাইরাস। কিউল্যাক্স মশার কামড়ের ফলে এ রোগে বয়স্করা ই আক্রান্ত হয়ে পড়েন বেশি।
ইয়েলো ফিভারঃ ইয়েলো ফিভার পীতজ্বর নামেও পরিচিত।বাহক এডিস অ্যাজিপ্টাই।
জ্বর,মাথাব্যথা,জন্ডিস,পেশির ব্যথা এর লক্ষ্মণ। আফ্রিকান দেশগুলোতে প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়।
কাজেই মশাকে প্রসঙ্গিক আলাপে আনলেই আমরা জানি,জীবাণু বহনকারী অনেক মশা ই লুকিয়ে থাকে বনজঙ্গল,
ডােবা,নালায়,যাদের শরীর এমনিতেই
ভাইরাস সহনীয়।শুনতে অবাক লাগলেও বলা জরুরী;আন্তর্জাতিক এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়-সারা পৃথিবী জুড়ে প্রতিবছর ৭০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়ে পড়ে মশাবাহিত রোগে।আর মারা যায় প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ। এ জন্যেই হয়তো বিশ্ব জাগানিয়া মশাকে স্মরণে আনতে প্রতিবছর ২০ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় মশা দিবস।যা ১৯৩০ সাল থেকেই পালিত হয়ে আসছে। এই ক্ষুদ্র প্রানীটির দাপট এতো বেশি যে,তাকে ঘিরে ই একই বিষয় নিয়ে পাচ পাচবার নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়েছে।যা নোবেল ইতিহাসে বিরল।তাই হয়তো মশার কার্যকারিতা প্রমাণে ‘মশা মারতে কামান দাগা’ শব্দটি ইতিহাসের পুস্তকে ঐতিহাসিক স্মৃতিকে ধারণ করে আছে।
জানা যায়,সে ই ১৮ শতকে ইয়েলো ফিভার নামে একটি মশাবাহিত রোগ মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রে।গবেষকরা দেখেন
‘একটা হোটেল কে ঘিরেই ইয়েলো ফিভার ছড়িয়ে পড়েছিলো,যেটি ছিলো যুদ্ধ ফেরত সৈনিকদের আবাসন।আর উক্ত আবাসন থেকে ছড়িয়ে পড়ার আশংকা কে সন্দেহের তালিকায় প্রথম সারিতে রেখে কামানের গোলায় হোটেলটি ই গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো বলে’মশা মারতে কামান দাগা কথাটির সাথে আমাদের পরিচয় গড়ে ওঠেছে।

বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন-আজ থেকে প্রায় ২২৬ মিলিয়ন বছর পূর্বে মশার পূর্ব পুরুষের উদ্ভব ঘটে এ ভূমন্ডলে।
প্রাণী র প্রাণকে ওষ্ঠাগত করে তুলতে মশার বিকল্প খোঁজা ভার। এই কীটের জীবন থেকে যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ মানুষ কে স্বস্তি নিতে বৃদ্ধ, বৃদ্ধা,ছাত্র ছাত্রী ও গর্ভবতী কিংবা রোগী দের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এ জন্য ই প্রথম দিকে ই বলে নেওয়া ভালো;আমরা সচেতন নই।আমরা আমাদের সর্ব সচেতনতা আয়ের বা ভোগদখলের সামান্য টেক্সের বিনিময়ে তুলে দিয়েছি-ইউনিয়ন,পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের কাঁধে। আমরা সচেতন নই বলে বুঝতে পারি না স্থানীয় প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা আছে।ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও আমাদের আশপাশ প্রতিপাশের পরিবেশ পরিষ্কার করার দায়দায়িত্ব তাদের ঘাড়ে বর্তায় না।প্রশাসনের কাঁধে দায়দায়িত্ব অর্পণ করার পূর্বে আমাদের জানা উচিত ছিলো -এ দায়িত্ব আমার -আপনার,নাগরিকের ও।আমরা যদি চতুর্পাশ পরিষ্কারের জন্য সচেতন হতাম,তাহলে মশার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতাম।পূর্বে পাড়া মহল্লায় স্বেচ্ছাসেবী অনেক সংগঠন-সংস্থা ছিলো,তাদের মাধ্যমে পরিষ্কার করে রাখা বিলাসী অভ্যাস ছিলো।আজকাল তা দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় সে রকম কর্মসূচিগুলো চোখে পড়ে না।এখন আর নির্দলীয় ক্লাব সংগঠন নেই।পাড়া মহল্লা এমন কি নিজের রান্নাঘরের আবর্জনা পরিষ্কারের দায়িত্ব ও যেনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিতে সীমাবদ্ধ!এ ছাড়া জনতার ট্যাক্স এ পরিচালিত স্থানীয় প্রশাসনেরও মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।সেগুলোও কেমন জানি রাজনৈতিক কর্মসূচির আওতায় ঘোরপাক খায়।কাজের কাজ শুধু কর্মসূচির মধ্যে ই সীমাবদ্ধ থাকে।অপরিষ্কার নালা-নর্দমা,ডোবা,পুকুরের কচুরিপানা,খোলা পায়খানা,খোলা ডাস্টবিন, ছড়া,ঝোপঝাড়,সুষ্ঠু পয়ঃনিষ্কাশনে কার্যকরি উদ্যোগ গ্রহণ চোখে পড়ছে না।সিলেট সহ দেশের সবকটি সিটি কর্পোরেশনের কথা ই ধরা যাক,পূর্বে পরিকল্পনা না রেখে নালা-
ডোবা,নির্মাণের জন্য হঠাৎ জমি নিতে বিরোধে জড়িয়ে,ঠিকাদার বা কর্মকর্তা-
কর্মচারীর সততা বহির্ভূত কার্যকলাপ অথবা ঘুষ ব্যাধীতে বাঁধা পড়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থানে স্থানে আটকে গিয়ে,অনেক অনেক নালা-নর্দমার পানি অনিষ্কাশিত অবস্থায় জমে গিয়ে মশার প্রজননক্ষেত্র হয়ে রয়েছে।খোলা ডাস্টবিন,পরিত্যক্ত ক্যারিব্যাগ,যত্রতত্র নিষিদ্ধ পলিথিন,প্লাস্টিকের বোতল,মিনারেল ওয়াটারের বোতল,কোমলপানীয়ের বোতল,
ডাবের খোসা,নারিকেলের খোল,পরিত্যক্ত টায়ার,প্রসাধনী র ডিব্বা,ভাঙ্গাচুরা জগ,মগ,
বদনা,লুটা,বালতি,বোল,ঘটিবাটি ইত্যাদি হচ্ছে মশকের ভাগাড়।এগুলোতে নজর নেওয়া নাগরিক চাহিদার প্রাণান্ত জরুরি থাকলেও কেমন জানি উন্নয়ন পরিকল্পনা আর মশক নিধনের জল্পনা করতে করতে এগুলো তালিকার নিম্নাংশে চলে গেছে বলেই মনে হয়।সুরমা নদী,মালনি ছড়া,কানিছড়া,
গোয়ালীছড়া থেকে শুরু করে শহরের নালা,ডোবা,মুক্ত জলাশয়ের আবর্জনায় আটকে আছে।সামান্য বৃষ্টিতে থৈথৈ ময়লা পানিভর্তি ডোবা রাস্তা দেখলে আর সেগুলো আঙুল তুলে দেখাতে হয় না।মাঝে মাঝে ভেজাল মিশেলে জলে মাখা অকার্যকরী মশক নিধন কার্যক্রম কে ময়লা রেখে কাপড় পরিষ্কারের কথাই মনে করিয়ে দেয়।অথচ কার্যকরী পদক্ষেপের চিত্রের জন্যে মুখিয়ে আছে নাগরিক।এ জন্য চাই সুষ্ঠু পরিকল্পনা।
প্রথমত,মশা মারার ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিধন করতে হবে।দ্বিতীয়ত,ডিম পাড়ার স্থানগুলোতে মশা যা তে ডিম দিতে না পারে,সে দিকে লক্ষ্য রেখে বদ্ধপানিতে প্রবাহ আনতে হবে,যেনো অ্যানোফিলিস ও কিউল্যাক্স মশা ডিম না পাড়তে পারে।ড্রেন,নালা,পুকুর বা অন্য জলাশয়ের নোংরা পানি পরিষ্কার করতে হবে।বাসাবাড়ির ছাদে ও আশপাশে থাকা ছাদবাগানের টব,ডাবের খোসা,কোমল পানীয়ের ক্যান,মিনারেল ওয়াটারের বোতল,প্রসাধনীর কৌটা ইত্যাদিতে চার পাঁচদিনের বেশি সময় পানিকে জমতে না দেওয়া,ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখা,রাস্তার আশপাশের খানাখন্দের পরিষ্কার নিশ্চিত করা।গর্ত ভরাট করে দেওয়া।রেফ্রিজারেটর বা এসি র মধ্যে পানি জমতে না দেওয়া।রান্নাঘরে প্লেট বা গ্লাসের ট্রে তে পানি জমে গেলে পরিষ্কার করা।বাতরুমের বালতি,বদনা,টব,শৌচাগারে পানি জমিয়ে না রেখে ব্যবহারের পানির প্রয়োজনীয় প্রাপ্তির অনিশ্চয়তায় ড্রাম,বালতি,চৌবাচ্চা মশা বিস্তারে ভূমিকা পালনকারীদের মনিব মহোদয়গনকে সচেতন হতে হবে।সারা দেশে নির্মাণ কাজ বেড়ে যাওয়ায় নির্মাণ সাইডগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে।শীতের পর বা বর্ষার শুরুতে হঠাৎ গরম কিংবা বৃষ্টির সময়ে মশার প্রজননের ভরা মৌসুম থাকায় এ সময়টি অধিক সংখ্যক সচেতন হয়ে বদ্ধ জলাশয়,কাভার্ড ড্রেন,বক্স কালভার্ড পরিষ্কার রাখতে হবে। বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশের জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ জনাব,কবিরুল বাশার দীর্ঘদিন কীট ও মশক নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। তিনি তাঁর গবেষণার আলোকে বলেন-মশা কে নিয়ন্ত্রণে নিতে সারাবছর জুড়ে সমম্বিত মশক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে।প্রথমত;পরিবেশের ব্যবস্থাপনা করতে হবে।অর্থাৎ আশপাশের পরিবেশ,জলাশয় পরিষ্কার ও দূষণমুক্ত রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত; জৈবিক নিয়ন্ত্রণ-এ ক্ষেত্রে যেসব প্রাণী প্রকৃতিগতভাবে ই মশা ভক্ষণ করে থাকে সেগুলো যেমনঃগাপ্পি মাছ,ব্যাঙ,ড্রাগন ফ্লাই,এগুলোর ব্যবহার করতে হবে।তৃতীয়ত; দু ধরনের কীটনাশকের মাধ্যমে। এবং একটি কীটনাশক লার্ভা ধ্বংস করে। অন্যটি পূর্ণ বয়ষ্ক মশা মেরে ফেলে।চতুর্থত; মশক নিধনে জনগণকে সম্পৃক্ত করে।
তিনি বলেন-সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ডের প্রতিটি স্থানে যেখানে পানি জমে আছে,
সেখানে একযোগে লার্ভা নিধনের ওষুধ ছিটিয়ে দিতে হবে।জনগণকে সম্পৃক্ত করে বিল-ঝিল,ডোবা নালা পরিষ্কার করতে হবে।
প্রাপ্ত বয়স্ক মশা দমনে ফগিং করতে হবে।এ অভিযান শুরু করার তিনদিনের মধ্যেই শেষ করতে হবে। যাতে মশা আবারও ডিম পাড়ার সুযোগ না পায়।
কয়েল,স্প্রে ইত্যাদি ব্যবহার করেও মশা মারা কিংবা তাড়ানো যাচ্ছে না,বিষয়টি তাঁর নজরে আনলে তিনি বলেন-কোন একটি কীটনাশক একটানা ৫ বছরের বেশি সময় ব্যবহার করা হলে মশা সে ই কীটনাশকের বিপক্ষে সহনশীলতা তৈরী করে। “এটি একটি জেনেটিক মেকানিজম,এ জন্য মশা নিয়ন্ত্রণে প্রতি ৫ বছর পর পর কীটনাশক পরিবর্তন দরকার।” এডিস মশার ডিম ৬ মাস পর্যন্ত শুকনো স্থানে থাকলেও বেঁচে থাকতে পারে।কাজেই বৃষ্টির পানির ছোঁয়া পেলে এরা তাড়াতাড়ি বাড়তে

থাকে বিধায় এ সকল ডিম নিধন বা ধ্বংসে জরুরী পদক্ষেপ নিতে হবে।এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকেও কাজে লাগানো যায়।তাঁরা বলেন-”
(১)প্রচার,সামাজিক সক্রিয়তা এবং জনস্বাস্থ্য সংগঠন ও সম্প্রদায় সমূহকে শক্তিশালী করতে আইন প্রণয়ন। (২)সরকারী ও বেসরকারি স্বাস্থ্য ও অন্যান্য বিভাগ সমূহের মধ্যে সহযোগিতা। (৩) সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহার করে রোগ নিয়ন্ত্রণে সুসংবদ্ধ প্রয়াস। (৪) যে কোন হস্তক্ষেপ যাতে সঠিক লক্ষ্যবস্তুতে হয় তা সুনিশ্চিত করতে প্রমাণ ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং(৫)স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সাড়া পেতে সক্ষমতা বৃদ্ধি।
সর্বোপরি,যে পদ্ধতিটি বিশেষ কার্যকরী তা হলো-প্রচার মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।শুরু থেকে আজ অবধি যে ফর্মূলা বা কাঁচামাল ব্যবহার করে কয়েল,স্প্রে ইত্যাদি তৈরি করা হচ্ছে তা ৫ বছর পর পর বদলাতে হবে।এবং সে ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা প্রতিষ্ঠান কে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে পাড়া মহল্লায় ক্লাব,সংগঠনকে জাগিয়ে তুলতে হবে।প্রতিবছর মশার প্রজনন সময় আসার আগে আগেই নাগরিক,প্রশাসন,সবাইকে জেগে ওঠে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।তবে ই হয়তো দৈনন্দিন জীবনে মশা নিয়ে তামাশার ইতি হবে।আসবে শান্তি। আসবে স্বস্তি।
লেখক:কবি লেখক কলামিস্ট  আনোয়ার হোসেন মিছবাহ্ :
ঋণাবদ্ধঃ বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল
দৈনিক মানবকন্ঠ-২৮ জুলাই ২০২১
অন্যদিগন্ত-সেপ্টেম্বর২০২১ এবং
সিলেটের আঞ্চলিক পত্র-পত্রিকা।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

করোনায় এক দিনে সর্বোচ্চ ৬৪ জনের মৃত্যু

        করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এক...

উপশহরে প্রবাসীর বাসায় ডাকাতি ৩ জন গ্রেফতার মালামাল উদ্ধার

5       নগরীর উপশহরে লন্ডন প্রবাসীর বাসায়...

আ.লীগ কর্মী খুন

        সুনামগঞ্জ-১ আসনের ধর্মপাশায় পূর্ব শত্রুতার...