মতিউর রহমান চৌধুরী সাংবাদিকতায় অনন্য ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করেছেন

প্রকাশিত : ০২ আগস্ট, ২০২০     আপডেট : ৬ দিন আগে

সাঈদ চৌধুরী :
মতিউর রহমান চৌধুরী একাধারে সাংবাদিক, সম্পাদক ও কলামিস্ট। সাংবাদিকতায় তিনি জাপান ও হংকং থেকে ফেলোশিপ লাভ করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির ওপর দীর্ঘ প্রশিক্ষণ গ্রহন করেছেন। আধুনিক বাংলা সাংবাদিকতায় নতুনত্ব ও নান্দনিকতা সৃষ্টি করে চলেছেন তিনি। যার সংবাদ সংগ্রহ ও সৃষ্টিতে উদ্ভাবনী শক্তি, সংবাদের শিরোনামে অভিনবত্ব এবং সংবাদপত্রের গেটআপ-মেকআপের সৌন্দর্য ও কারুকাজ উন্নত বিশ্বের মূলধারার সাংবাদিকতার সাথেই কেবল তুলনা করা যায়। আমাদের সাংবাদিকতায় তিনি অনন্য ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করেছেন।
মতিউর রহমান চৌধুরী সব রকম লোভ-মোহ আর ভয়-ভীতির উর্ধ্বে থেকে সরকার ও বিরোধী রাজনীতির নিমোর্হ সমালোচনায় নির্ভীক ও সোচ্চার। সাংবাদিকতায় সততা ও দৃঢ়তার ফলে বিজ্ঞ মহলে তিনি বিদগ্ধ পথিকৃৎ হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেছেন। টেলিভিশন টক-শোতে মানবিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কথা বলে বহুজনের ঈর্ষার কারণ হয়েছেন। একইভাবে গণমানুষের আকাশচুম্বি ভালোবাসাও অর্জন করেছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেয়া কলম সৈনিক, সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ মতিউর রহমান চৌধুরী একজন অনুকরণীয় সম্পাদক। দেশের প্রথম ও বৃহত্তম প্রচারিত বাংলা ট্যাবলয়েড দৈনিক মানব জমিন’র প্রধান সম্পাদক হিসেবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির প্রাণের মানুষ তিনি। ইতিপূর্বে দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও সাংবাদিকতায় মূল্যবোধ সৃষ্টির জন্য তার প্রানান্ত প্রয়াস সর্বজন স্বীকৃত।
আশি ও নব্বই দশকে দৈনিক ইত্তেফাক ও অধুনালুপ্ত দৈনিক আজকের কাগজ এবং ভয়েস অব আমেরিকা’য় মতিউর রহমান চৌধুরীর ক্ষুরধার লেখনী ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। লন্ডনের ডেইলি মেইল, সুরমা, কলকাতার যুগান্তর, সংবাদ প্রতিদিন ইত্যাদি কাগজে সংবাদদাতা হিসেবে দেখিয়েছেন সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়, শুধু খবর প্রকাশ নয়, নান্দনিকতার সাথে পাঠকের কাছে তুলে ধরার অন্যতম একটি বিষয়। অবিরাম নতুনত্ব আর সাহসী প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছেন তিনি।
ক্ষমতাসীন দল কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠী কর্তৃক নৈতিক ও সাহসী সাংবাদিকতাকে দমনের চেষ্টা নতুন কিছু নয়। কেবল সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দমনের নতুন নতুন কৌশল। বাংলাদেশে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল স্বাধীনচেতা মানুষজন। তখন সাহসী সাংবাদিকতার নজির সৃষ্টি করেন মতিউর রহমান চৌধুরী। তার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রশাসনে বার বার ঝাকুনি দিয়েছে। সামাজিক অবিচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সাহসী ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে তার জীবনও ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে বার বার।
ফ্যাসিবাদী স্বৈরতান্ত্রিক অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের ভয়ঙ্কর ছোবল থেকে উদারতা ও সহনশীলতার মতো মানবিক বোধে উজ্জীবিত ও জাগ্রত করতে সচেষ্ট রয়েছেন মতিউর রহমান চৌধুরী। বঞ্চনামুক্ত, সাম্য ও সমতাভিত্তিক মানবিক সমাজ গড়তে এই নীতিমালাকেই আঁকড়ে ধরতে হবে। এ সত্য সমাজ নেতৃত্ব যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন, জাতির জন্য ততই মঙ্গল ও কল্যাণকর।
আধুনিক বিশ্বে ক্রীড়া সাংবাদিকতার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আজকাল কাউকে বুঝিয়ে বলতে হয়না। কিন্তু বাংলাদেশ ছিল অনেক পিছনে। মতিউর রহমান চৌধুরী বিশ্বকাপ ফুটবল আসরে অংশ নিয়ে বর্ণময় এই জগতের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। তখন তাকে ক্রীড়াঙ্গনের কণ্ঠস্বর বলেই মনে হয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবল আসরে অন্তত পাঁচবার অংশ নিয়েছেন তিনি। একসময় ঢাকা মোহামেডান ক্লাবের সাথে সক্রিয় ভাবে জড়িত ছিলেন। ২ জুলাই বিশ্ব ক্রীড়া সাংবাদিক দিবসে বাংলাদেশে মতিউর রহমান চৌধুরী সহ এক্ষেত্রে জাগরণ সৃষ্টিকারি সংবাদিকদের সম্মানীত করা উচিত ছিল।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে গিয়ে পাক বাহিনীর হাতে গ্রেফতার এবং নিপীড়নের স্বীকার হন মতিউর রহমান চৌধুরী। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে তিন দিন পর বাঙ্গালি এক ক্যাপ্টেনের সহযোগিতায় মুক্ত হন তিনি।
ছাত্র জীবনে মতিউর রহমান চৌধুরী মৌলবী বাজার কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) ছিলেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদেও একাধিকবার সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মতিউর রহমান চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়ন ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের অবস্থান সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
পারিবারিক ভাবে প্রবাসী হবার সুযোগ ছিল। ছিল সুখ ও সমৃদ্ধির হাতছানি। রাজনীতিতে হতে পারতেন অনেক কিছু। মানব কল্যাণের ব্রত নিয়ে চলে আসেন সাংবাদিকতায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য সুন্দরের পক্ষে লড়ে চলেছেন অবিরাম। সাহসী সাংবাদিকতার জন্য চাকরি হারিয়েছেন ১৯৭৪ সালে। জিয়াউর রহমানের জমানায় দু’বার অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হয়েছে। একনাগাড়ে বিনা কারণে আট মাস দেশের বাইরে রয়েছেন। খালেদা জিয়ার জমানায়ও জেলে গিয়েছেন। শেখ হাসিনার সময়েও মামলা আর হুমকি মোকাবেলা করে চলেছেন অহর্নিশ।
২০১৭ সালের ১ মার্চ বুধবার লন্ডনে ‘কমনওয়েলথ ও দক্ষিণ এশিয়ার মুক্ত সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে যখন মতিউর রহমান চৌধুরীর প্রসঙ্গ আলোচনা হয়, তখন সিলেটের কৃতি সাংবাদিক হিসেবে মনটা ভরে যায়। সেদিন তাকে নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন করেছিলাম। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ‘ইনস্টিটিউট অব কমনওয়েলথ স্টাডিজে (আইসিএস) এই সেমিনার হয়েছিল।
অনুষ্ঠানে এশিয়ানদের মধ্যে আলোচনায় অংশ গ্রহন করেন ভারতীয় সাংবাদিক ও কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভের (সিএইচআরআই) নির্বাহী পরিচালক সঞ্জয় হাজারিকা, পাকিস্তানের এক্সপ্রেস ট্রিবিউন পত্রিকার কলাম লেখক আফতাব সিদ্দিকী, আইসিএসের গবেষক ডেভিড পেইজ, বাংলাদেশের ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম প্রমুখ। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (সিজেএ) ইমেরিটাস প্রেসিডেন্ট রিতা পেইন।
বাংলাদেশে সাংবাদিকতার গর্ব মাহ্ফুজ আনাম বলেছিলেন, সত্য ও সাহসী সাংবাদিকতার শত্রু সব সময়ই ছিল এবং থাকবে। গণমাধ্যম গুলোর আত্ম-সমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, গণমাধ্যম যখন বিপদে পড়ে, পাঠকেরা তখন এসে পক্ষে দাঁড়ায়। যদি না দাড়ায়, তবে তা নিয়ে ভাবতে হবে।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিকতায় রাজনৈতিক চাপ ও হস্তক্ষেপের পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য সংবাদ মাধ্যমের অপরিনামদর্শী প্রয়াসকে স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে সেমিনারের সুকন্ঠ উচ্চারণ এখনো মনে আছে। নির্ভিক সাংবাদিকেরা থেমে নেই, সাহসী সাংবাদিকতার জয় হবেই।
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে সাইমন ড্রিং দেশত্যাগ না করে লুকিয়ে ছিলেন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে। পাকিস্তানি বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন শহরে। ঢাকার বুকে তখন হত্যা, ধ্বংস আর লুটপাটের চিহ্ন। অপকর্ম লুকাতে সামরিক সরকার চাইছিল ঢাকাকে বিশ্ব মিডিয়ায় স্বাভাবিক হিসেবে দেখাতে। সাইমন সুকৌশলে প্রকাশ করেন ‘ট্যাংকস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’। বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন নির্মম বাস্তবতাকে। আর তখনই নড়েচড়ে বসে পুরো বিশ্ব। ২৫ মার্চ কালরাতের পর ঢাকার ভয়াবহ নির্মম পরিস্থিতি প্রকাশ করে তিনি ইতিহাস হয়ে আছেন।
একইভাবে বিলেতের রবার্ট ফিস্ক বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধাভিযানের সংবাদ সংগ্রহ এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে তা পরিবেশনের জন্য। তার অসীম সাহসিকতা সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। সাইমন ড্রিং কিংবা রবার্ট ফিস্ক সাংবাদিকতাকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। মেধা, নিষ্ঠা, সততা ও সাহসিকতার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন বিশ্বময়। তাদের সার্থক উত্তরসূরী নির্ভীক সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীও সকল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে লিখে চলেছেন সাহসের সাথে।
এইতো সেদিন লিখেছেন, বন্ধ হয়ে গেছে দুটি টিভি নেটওয়ার্ক। একটি সংবাদপত্র বন্ধ হয়েছে আগেই। চাপের মধ্যে রয়েছে একটি টিভি আর দুটি সংবাদপত্র। বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। টিভির টকশোগুলো ভীষণ চাপের মধ্যে রয়েছে। যেকোনো সময় খড়গ নেমে আসতে পারে। নব্বই দশকের পর আর কিছুর উন্নতি না হলেও মিডিয়া এগিয়ে যাচ্ছিলো। প্রশংসিত হচ্ছিলো দেশ-বিদেশে। এটা অনেকেরই পছন্দ নয়। তাই চাপ বাড়ছে মিডিয়ার ওপর।
টিভি মাধ্যমগুলো বড্ড চাপের মধ্যে। এই চাপ মোকাবিলা করার মতো শক্তি অনুপস্থিত। সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন জিইয়ে রাখা হয়েছে এজন্যই। এই বিভাজন গোটা সংবাদ মাধ্যমকে বড় এক চ্যালেঞ্জের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। কোনো টিভি বা সংবাদপত্র বন্ধ হলে বা সংকটে পড়লে এক পক্ষ দূর থেকে বাহবা দিচ্ছে। আরেকপক্ষ প্রেস ক্লাবের সামনে রাজপথে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। বিদেশী মানবাধিকার সংস্থাগুলো দুয়েকটা বিবৃতি দিয়েই ক্ষান্ত। তাদেরইবা কি করার আছে।
১৯৯০ সালের ৩০ আগস্ট সাপ্তাহিক খবরের কাগজে ‘দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাস নৃত্য’ শীরোনামে মতিউর রহমান চৌধুরীর আগুন ঝরা কলাম আজো মনে পড়ে। ওই লেখার পরিনতি হয়ত তিনি জানতেন। অকুতোভয় ও নীতির সাথে আপোষহীন সাহসী সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী কারো রক্তচক্ষু পরোয়া করেননি। হুলিয়া জারি হয়েছিল তার বিরুদ্ধে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল সাপ্তাহিক খবরের কাগজ। সাহস করে আদালতে গিয়েছিলেন কাজী শাহেদ আহমেদ। এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন আদালত। সে রায় না হলে হয়তো বন্দি থাকতো গণমাধ্যম।
কি ঘটেছিল সেদিন? মতিউর রহমান চৌধুরীর নিজের ভাষায়, আমি তখন দৈনিক ইত্তেফাকের কূটনৈতিক রিপোর্টার। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ কভার করতে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। খবরের কাগজে নিয়মিত কলাম লিখি। নির্বাহী সম্পাদক জিল্লুর রহমান নাছোড়বান্দা। তৃতীয় মাত্রা খ্যাত জিল্লুর সকালে ফোন করে বললেন মতিভাই লেখা না দিয়ে ঢাকা ছাড়বেন না।
বিশ্বাস করুন লেখা অসম্পূর্ণ রেখে বিমান ধরতে গেলাম এয়ারপোর্টে। জিল্লুরকে কি ফাঁকি দিতে পারবো? বিমান পাঁচঘণ্টা বিলম্বে ছাড়বে। ফিরে এলাম বাসায়। স্ত্রী বললেন সে কি? আবার কলম নিয়ে বসলে কেন? বললাম অসম্পূর্ণ লেখাটা শেষ করে দেই। ঠিকই একঘণ্টার মধ্যে লেখা শেষ করে জিল্লুরকে ফোন দিলাম- কাউকে পাঠালে ভালো হয়। একজন এসে লেখাটা নিয়ে গেল। আমি আবার বিমানবন্দরের দিকে ছুটলাম। বিষয়টি এখানেই তো শেষ হওয়ার কথা। সে কি আর হয়?
হাফরুল বাতেন সীমান্ত থেকে ফিরে এলাম মদিনায়। সঙ্গে রয়েছেন আরো তিন সাংবাদিক। রিয়াজউদ্দিন আহমেদ, আমানুল্লাহ কবির, সালাহউদ্দিন বাবর। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হচ্ছি এমন সময় একজন সৌদি প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার বললেন, আপনি এখানে। এইমাত্র বিবিসিতে শুনে এলাম ঢাকায় আপনাকে নিয়ে কত কিছু হচ্ছে। হুলিয়া জারি হয়েছে। আপনার লেখার কারণে সাপ্তাহিক খবরের কাগজের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সম্পাদক ও প্রকাশক কাজী শাহেদ আহমেদের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।
তাই নাকি? এতো সব। এখন তাহলে কি করবো? ঢাকায় ফোন করে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম নতুন কি আর আছে? আতঙ্কিত মাহবুবার কণ্ঠে ভীতির ছাপ। বিপদের কথাই জানালেন। বাড়ির সামনে গোয়েন্দারা গিজ গিজ করছে। খবরের কাগজে ফোন করেও কাউকে পেলাম না। সহকর্মীরা অপেক্ষা করতে বললেন। দেখা যাক না কি দাঁড়ায়। কি আর দাঁড়াবে? এরশাদ সাহেব তো সামান্য সমালোচনাই সহ্য করেন না। কথায় কথায় পত্রিকা বন্ধ করে দেন। কে তাকে রুখবে। একমাত্র ভরসা আদালত।
ঠিকই আদালতে গড়ালো বিষয়টি। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ ও বিচারপতি মোস্তাফা কামাল তখন উচ্চ আদালতে সাহসী ভূমিকা রেখে চলেছেন। পত্রিকার প্রকাশনা পুনর্বহাল চেয়ে রিট হলো। যুগান্তকারী রায় দিলেন তারা। এখন থেকে কথায় কথায় পত্রিকা বন্ধ করা যাবে না। সাংবাদিকরা লিখতে পারবেন হাত খুলে। অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে নিজের চিন্তায় এবং বিবেকে। হেরে গেলেন এরশাদ। স্বৈরশাসনের কব্জামুক্ত হলো সাংবাদিকতা।
আজ আমরা যেটুকু লিখছি বা বলছি তার জন্য সামান্যতম ক্রেডিট দিতে হলে সাপ্তাহিক খবরের কাগজ তথা কাজী শাহেদ আহমেদকে দিতে হবে। নিজের কথা এখানে নাই বা বললাম। ইতিহাস হয়তো একদিন বিচার করবে। সেনাবাহিনীর লোক হয়েও সেদিন শাহেদ ভাই যে সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন তা এদেশের মুক্ত সাংবাদিকতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকা উচিত।
এরশাদ প্রশাসন পত্রিকা বন্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি। দেশে ফেরার পর ১৭ ঘণ্টা আমাকে আটকে রাখা হলো। আমার গাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নিয়ে গিয়ে ব্রিজের ওপর থেকে ফেলে দেয়া হলো পানিতে। গাড়িটি যখন আনতে গেলাম তখন দেখলাম গাড়ির ওপরে নির্যাতনের চিহ্ন। আদালতে হেরে গিয়ে গাড়ির ওপর উল্লাসের নৃত্য করা হয়েছে। একটা রূপকাশ্রয়ী লেখাতে এত ঝাল হবে তা ভাবিনি কখনো। যে লেখায় এরশাদের নাম পর্যন্ত ছিল না। পাঠকদের জানার জন্য লেখাটি তুলে ধরছি এখানে।
এমন একদিন আসবে যেদিন মূর্খরা উদ্ভট আদেশ জারি করে দেশ শাসন করবে। নির্বোধরা তাদের নির্বুদ্ধিতার জন্য গর্ব অনুভব করবে। পণ্ডিতরা তাদের পাণ্ডিত্যের জন্য অনুশোচনা বোধ করবেন। দুর্নীতিপরায়ণরা তাদের দুর্নীতির জন্য উল্লাসে নৃত্য করবে।
সাধক শেখ সাদী এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি অবশ্য সময় বলে যাননি কখন এমন ঘটনা ঘটবে। আমরা প্রতিদিনই এমন ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি। অনেক মিলও খুঁজে পাচ্ছি। তাহলে কি শেখ সাদীর বর্ণিত সেদিন এসে গেছে।
রাষ্ট্র পরিচালনা করছে কারা? দেশে দেশে কিছু উদ্ভট আদেশ জারির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার খবর আমরা পাচ্ছি। তাদের মূর্খ বলা ঠিক হবে কিনা জানি না। তবে জনগণকে নিয়ে তারা তামাশা করে চলেছে। এমন আদেশ জারি করছে যা না মেনে কোনো উপায় নেই জনতার। এরা জনগণকে ভয় পায় না। জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায় না। মাঝে মধ্যে জনগণের সঙ্গে অভিনয় করে। বলে-জনগণই আমার শক্তি।
আসলে জনগণের পক্ষে তারা কথা বলে না। এরা নিজেদের সবজান্তা মনে করে। জনগণকে বলে দেয়, আমি যা বলবো তাই মেনে চলতে হবে। জনগণের সেবক নয়, তারা চায় জনগণ তাদের সেবা করুক। এরা আইন মানে না। সংবিধান মানে না। তাদের ইচ্ছার ওপর দেশ চলে। দেশে দেশে এমন অবস্থা চলছে। যার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা থাকার কথা নয় বা রাষ্ট্র পরিচালনা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না অথচ তারা বলপূর্বক ক্ষমতা দখল করে বলে-এভাবে দেশ চলতে পারে না।
আজ থেকে আমি যেভাবে বলবো সেভাবে দেশ চলবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মাঝেমধ্যে তাদের উন্মাদ বলে আখ্যায়িত করেন। তাতে কি যায় আসে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা কিছুই জানেন না বলে তারা প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন। রাজনীতিবিদরা দেশ চালানোর কোনো যোগ্যতা রাখে না বলে ফরমান জারি করে দেয়। বলে- রাজনীতিবিদরা দেশের সব অনিষ্টের মূল। এদের সমাজ থেকে নির্মূল করে দিতে হবে। ক’দিন পর যখন দেখে রাজনীতিবিদ ছাড়া চলে না তখন আবার রাজনীতিবিদদের ডেকে নিয়ে উজির বানায়।
অর্থনীতিবিদদের ভর্ৎসনা করে স্পষ্ট বলে দেয়-এরা অর্থনীতির কি বুঝে? আমি সবই বুঝি। আমি লেফট রাইট করেও সব জেনেছি। বড় বড় বই পড়ার কোনো দরকার নেই। আমি কূটনীতিও বুঝি। সমালোচকরা বলে, আমি নাকি জেনারেল ডিপ্লোম্যাসিতে বিশ্বাস করি। এটা সর্বৈব মিথ্যা। আমি সব কূটনীতিতেই ওস্তাদ। সিদ্ধান্ত নিয়ে পাল্টানোর মধ্যে মজা আছে। পৃথিবীতে ক’জন পারে সিদ্ধান্ত পাল্টাতে। আমি কারো সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেই না। আমি মনে করি, আমার চাইতে অন্যরা বেশি জানতেই পারে না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য সিদ্ধান্ত নেই। সেভাবে কাজ করি। অন্যরা কে কি ভাবলো বা মনে করলো তা নিয়ে মোটেও চিন্তা করি না। আমার কাছে রাষ্ট্র বা জনগণ হচ্ছে পণ্য। সময় বুঝে নিলামে তুলি। অন্য রাষ্ট্রপ্রধান টেলিফোন করলে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানাতে থাকি। হার্ভার্ডে পড়ালেখা করা লোককে বলি সে ইংরেজি জানে না। আমার ইংরেজি শুনে বৃটিশরাও বলে কি করে এত সুন্দর ইংলিশ শিখলাম।
আমি মনে করি, আমি ছাড়া সবাই নির্বোধ। তাই আমি বছরের পর বছর তাদের নির্বোধ হিসেবেই বিবেচনা করি। তারা আমার কথা হেরফের করে না। বরং গর্ব অনুভব করে। বলে-আমরা গর্বিত এমন এক সন্তানকে পেয়ে; যিনি না হলে রাষ্ট্র চলতোই না। পল্লীর বন্ধু হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়ে বসে। আমি শহরে থাকি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসা। মাঝেমধ্যে হেলিকপ্টারে উড়ে পল্লীতে যাই। কান্নাকাটি করি তাদের সুখ-দুঃখে।
ফিরে এসে বলি এই ব্যাটাদের জন্য শান্তিতে থাকা গেল না। একটা না একটা সমস্যার মধ্যে ওরা থাকেই। কখনও পানিতে, কখনও রোগে-শোকে আবার কখনও অনাহারে। বলেন তো আর কাহাতক পারা যায়। আমি আর পারি না। আমারও তো আরাম-আয়েশের কথা চিন্তা করতে হয়। লোকে আমার সম্পর্কে অযথাই সমালোচনা করে। আমি শত ব্যস্ততার মধ্যেও কিছু সময় আমোদ-ফুর্তিতে ডুবে থাকি তাও অনেকের সহ্য হয় না। তারা কানাঘুষা করে। অবশ্য জনসমক্ষে কিছু বলে না। তাদের আমি নির্বোধ বলি।
জানেন তো আমার রাজ্যে পণ্ডিত বলে তো কেউ নেই। কারণ আমার জ্ঞানের চেয়ে তাদের জ্ঞান বেশি নয়। আমি তাদের বলেই দিয়েছি পাণ্ডিত্য যেন না দেখায়। আমি বৈঠক ডাকি। আলোচনা করতে বলি তাদের মধ্যে। ঘুরে এসে বলি আপনারা এবার বাড়ি যান। সিদ্ধান্ত আমি নিয়ে ফেলেছি। তারা কোনো প্রশ্ন করে না। জানে, আমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কতিপয় লোক ছিল শুধু শুধু আমার সমালোচনা করতো। বলতো আমার নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো অধিকার নেই। এখন তারা ক্লান্ত। নিজেরাই বলছে, কেন রাজনীতি করলাম, দেশ স্বাধীন করলাম। এত লেখাপড়া করলাম কেন? তারা নিজেদের পাণ্ডিত্যের জন্য অনুশোচনা করে বলছে-আমি যোগ্য ব্যক্তি। আমার মতো পণ্ডিত লোক হয় না।
দুর্নীতির কথা বলবেন। আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছি। তবে আমাকে লোকে দুর্নীতিবাজ বলে। আমি নাকি টাকা পাচার করি। জনগণের রক্ত শুষে নিচ্ছি। আমার রাজ্যে দুর্নীতিবাজরা উল্লাস করে বলে আমরা দুর্নীতিবাজ-আসুন আমরা দুর্নীতিকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেই। কেউ কেউ সমালোচনার চেষ্টা করে। সুযোগ মতো তাদের নামও খাতায় লিখিয়ে দেই। অথবা মুখ বন্ধ করে দেই চেনাপথে। আমার কাছে জাদু আছে। গভীর রাতে আমার সঙ্গে সবাই দেখা করতে আসে। যারা পল্টনে গরম গরম বক্তৃতা করে তাদের দেখাও পাবেন আমার বাড়িতে। আমি মাঝেমধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তালিকা প্রকাশ করে বলি ওদের এবার রেহাই নেই।
জনগণের সামনে বলি, রাঘববোয়ালদের পাকড়াও করতে হবে। রাতে তাদের ডেকে বলি মনে কিছু করো না। আমাকে বলতে হয়। আমি যে রাষ্ট্র চালাই। তোমাদের কিছু হবে না। তোমরা ধরা পড়লে আমার কি হবে। তোমরাই তো আমার আসল শক্তি, বন্ধু। এ কথা শুনে দুর্নীতিবাজরা উল্লাস করে। এই উল্লাসে আমরা সবাই যোগ দেই।

আরও পড়ুন

সিলেট-সুনামগঞ্জ রুটে চালু হলো বিআরটিসি বাস সার্ভিস

পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের আপত্তি আর ধর্মঘটের...

শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ স্মরণে শোক র‌্যালি

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: ১৯৭১ সালে...

চেতনা যুব পরিষদের সংবর্ধনা

আব্দুস সোবহান ইমন : সিলেট...