ভাষা আন্দোলনে সিলেটের নারী সমাজ

প্রকাশিত : 03 December, 2019     আপডেট : ২ দিন আগে  
  


সেলিম আউয়াল

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে গড়ে ওঠা আন্দোলনে সিলেট ছিলো সবার আগে এবং সিলেটের নারী সমাজ পালন করেছেন অগ্রণী ভ‚মিকা। বাংলা ভাষার পক্ষে সিলেটের নারী সমাজের ছিলো দৃঢ় অবস্থান। আটচল্লিশে সারা দেশে ভাষা আন্দোলন গড়ে ওঠার অনেক আগেই সিলেটের মহিলারা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় নেমে এসেছেন রাজপথে । সাহসিকতার সাথে অংশ নিয়েছেন মিছিল সমাবেশে।
ভাষা আন্দোলনে জোবেদা রহীম চৌধুরীর নেতৃত্বে সিলেটের মহিলারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম লীগের নেত্রী হয়েও জোবেদা রহিম চৌধুরী নীতি প্রশ্নে আপোস করেননি। তিনি সরকারের ভাষানীতির তীব্র বিরোধীতা ও সমালোচনা করে সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। জোবেদা খাতুন ছিলেন ইডেন বালিকা বিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী (১৯০৬)। জোবেদা খাতুন (বিয়ের পর জোবেদা রহিম) ছিলেন সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ শিলঘাট নিবাসী খান বাহাদুর শরাফত আলী চৌধুরীর কন্যা এবং সেই সময়ের মন্ত্রীসভার প্রভাবশালী মন্ত্রী তফজ্জুল আলীর শাশুড়ী। তিনি ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। হবিগঞ্জের পানি উমদার খান বাহাদুর আবদুর রহিমের সাথে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তার বিয়ে হয়। কর্মময় জীবনের অধিকারিনী জোবেদা রহিম ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের ২০জানুয়ারী ঢাকায় ইন্তেকাল করেন
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে সিলেটে ভাষা আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দেন তাদের মধ্যে ছিলেন ছাত্রসমাজ, মহিলা সমিতি এবং মুসলিম লীগের প্রগতিশীল গোষ্ঠী। বছরটির শুরু থেকেই সিলেটের মহিলারা বিভিন্ন তৎপরতার মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখেন। ১৯৪৮খ্রিস্টাব্দের ১১ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী আব্দুর রব নিশতার সিলেটে সফরে এলে স্থানীয় মহিলাদের একটি প্রতিনিধি দল তার সঙ্গে দেখা করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন।
ফেব্রæয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে সিলেট জেলা মহিলা মুসলিম লীগের সভানেত্রী জোবেদা রহিম চৌধুরী, সহ-সভানেত্রী সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী (অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের জননী), সম্পাদিকা সৈয়দা লুৎফুন্নেছা খাতুন, সিলেট সরকারী অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মিসেস রাবেয়া খাতুন বিএবিটি, মিসেস জাহানারা মতিন, মিসেস রোকেয়া বেগম, মিসেস শাম্মী কাইসার রশীদ এমএ,বিটি, নূরজাহান বেগম, মিসেস সুফিয়া খাতুন, মিসেস মাহমুদা খাতুন, মিসেস শামসুন্নেছা খাতুন, সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুন( সৈয়দ মুজতবা আলীর বোন) সহ সিলেটের বিশিষ্ট মহিলারা মূখ্যমন্ত্রী খাজা নজিমুদ্দীনের কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। এ স্মারকলিপিতে তারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান।
এ স্মারকলিপি পাঠানোর জের ধরে সেই সময়ে সিলেটে উর্দু সমর্থক পত্রিকা ইস্টার্ণ হেরাল্ড (আসাম হেরাল্ডের পরিবর্তিত নাম) একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধে মহিলানেত্রী জোবেদা রহিম ও স্মারকলিপি সম্পর্কে অশোভন মন্তব্য প্রকাশ করে। পত্রিকাটির এই অশোভন বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন স্মারকলিপিতে স্বাক্ষরদানকারী সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুন। সাপ্তাহিক নওবেলালের ১২ মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত এক প্রতিবাদ লিপিতে তিনি বলেন, ‘যাহারা পুর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী হইয়া মাতৃভাষার বিরুদ্ধাচরণ করে তাহারা মাতৃভাষার বিশ্বাসঘাতক কু-পুত্রতুল্য।…উর্দু ভাষাভিজ্ঞ অপেক্ষা সিলেটের উর্দু অনভিজ্ঞ মুসলমানেরা ইসলাম ধর্মের অনুশাসন পালনে কোন অংশে হীন ? বরং এ বিষয়ে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে সিলেটের মুসলমানদের তাহজীব ও তমদ্দুন এক বিশিষ্ট স্থান লাভের অধিকারী বলিয়া অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা মত প্রকাশ করিয়াছেন।’
তমদ্দুন মজলিসের সম্পাদক প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম চিঠি লিখে সাহসী ভূমিকার জন্যে জোবেদা রহিম চৌধুরীসহ নারী নেত্রীদেরকে অভিনন্দন জানান। তিনি লেখেন, আজ সত্যিই আমরা অভ‚তপূর্ব আনন্দ এবং অশেষ গৌরব অনুভব করছি। সিলেটের পুরুষরা যা পারেনি তা আপনারা করেছেন। উর্দুর সমর্থনে সিলেটের কোন কোন পত্রিকা যে জঘন্য প্রচার করছে আর সিলেটের কোন কোন পুরুষরা স্মারকলিপি দিয়ে যে কলঙ্কজনক অভিনয় করেছেন তা সত্যিই বেদনাদায়ক। কিন্তু আপনাদের প্রচেষ্টা দেখে মনে হচ্ছে আমাদের ভয়ের কোন কারণ নেই।…তমদ্দুন মজলিশ আজ আপনাদের অকৃত্রিম ধন্যবাদ জানাচ্ছে।’
১৯৪৮ খিস্টাব্দের ৮ মার্চ সিলেট নগরীর কেন্দ্রস্থলে সেই সময়ের গোবিন্দচরণ পার্কের (বর্তমানে হাসন মার্কেট) সমাবেশে হামলার প্রতিবাদে সিলেটের মহিলারা সেই বছরের ১০ মার্চ গোবিন্দ পার্কে একটি প্রতিবাদ সভা ডেকেছিলেন। কিন্তু সভা আয়োজনের আগেই সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এম. ইসলাম চৌধুরী পুরো সিলেটে সভা সমাবেশ আয়োজনে ১৪৪ ধারা জারি করেন। তখন সিলেটের জেলা প্রশাসক ছিলেন এম. খুর্শেদ।
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান গণ পরিষদের প্রথম অধিবেশনে কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ইংরেজী ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষায়ও বক্তব্য রাখার প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এবং দল হিসেবেও মুসলিম লীগ এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। তখন এক যুব সম্মেলনে যোগ দেবার জন্যে সিলেটের বামনেত্রী হাজেরা মাহমুদ কলকাতায় ছিলেন। তিনি আর আখলাকুর রহমান (পরবর্তীতে অর্থনীতিবিদ ড. আখলাকুর রহমান) সেই কলকাতা থেকে এক বিবৃতিতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান।
পাকিস্তানের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান সফর আসেন। তিনি ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাকে দেয়া সংবর্ধনা সভায় ও ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে তার অভিমতকে পুনর্ব্যক্ত করেন।
১৯৫২ সালে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে ছাত্র, জনতা হত্যার প্রতিবাদে সিলেটের নারী সমাজ আবারো প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ২৩ ফেব্রæয়ারি সিলেট শহরে অনেকগুলো মিছিল বের করা হয়। এইসব মিছিলে পুরুষের সাথে সিলেটের অনেক মহিলাও স্বতস্ফুর্তভাবে অংশ নেন। বেলা ১১টায় মিছিল শুরু হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো ঘুরে গোবিন্দ চরণ পার্কে এসে শেষ হয়। এখানে একটি জনসভাও অনুষ্ঠিত হয়। এতে পুরুষের সাথে বেগম হাজেরা মাহমুদও ঢাকার নৃশংস হত্যাকান্ডের নিন্দা ও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবী জানিয়ে এক জ¦ালাময়ী ভাষণ দিয়েছিলেন। সেদিন বিকেলে সিলেট নগরীর দরগাগেইটের জিন্নাহ হলেও (বর্তমানে শহীদ সুলেমান হল) এক মহিলা সমাবেশ হয়েছিলো। সিলেটের মতো রক্ষণশীল এলাকায় কোন মন্ত্রীকে মহিলাদের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি দেয়া, পুরুষের সাথে মিছিলে মহিলাদের অংশগ্রহণ, জনসভায় পুরুষের পাশাপাশি মহিলাদের জ্বালাময়ী ভাষায় বক্তৃতা দেয়া, বিকেলে একটি হলে মহিলাদের পৃথক সমাবেশের আয়োজন করার বিষয়গুলো বিবেচনা করলে বুঝা যায় ভাষা আন্দোলনে সিলেটের মহিলারা কতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
ভাষা আন্দোলনে মহিলাদের মধ্যে সিলেটে আরো ভূমিকা পালনকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেনন রাবেয়া আলী, ছালেহা বেগম, লুৎফুন্নেছা বেগম প্রমুখ। নওবেলাল পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদ আলীর স্ত্রী হাজেরা মাহমুদ একজন বামপন্থী নেত্রী ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনে বিভিন্নভাবে তিনি অবদান রাখেন। রাবেয়া আলী ছিলেন সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর স্ত্রী। সরকারি চাকুরে হয়েও স্বামীর মতো ভাষা আন্দোলনের পক্ষে ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালে তিনিও অবদান রাখেন। লুৎফুন্নেছা বেগমের স্বামী সেনা বিভাগের কর্মকর্তা হওয়া স্বত্তে¡ও তিনি ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখেন। মহিলা মুসলিম লীগের সিলেট জেলার সহ সভানেত্রী সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী (অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের জননী) এবং একই দলের অপর নেত্রী সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুন (সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর বোন) দলীয় অবস্থানের বিরোধীতা করে ভাষা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন।
স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলনের জন্য সিলেটের মেয়ে ছালেহা বেগমকে ডেপুটি কমিশনার (উ.ক. চড়বিৎ)এর আদেশক্রমে তার স্কুল থেকে ৩ বছরের জন্য বহিস্কার করা হয়। কুলাউড়ার মেয়ে ছালেহা বেগম ভাষা আন্দোলনের সময় ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন। ভাষা শহীদদের স্মরণে তিনি স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলন করেন। স্কুল থেকে বের করে দেবার পর ছালেহার আর পড়াশোনা হয়নি।
কুলাউড়ার আরেক কন্যা রওশন আরা বাচ্চু ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। তখন তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তিনি সলিমুল্ল¬াহ মুসলিম হল, ওমেন্স স্টুডেন্টস রেসিডেন্সের হল ইউনিয়ন সদস্যও ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারী ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্র-ছাত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে যে মিছিল বের করে সেই মিছিলে অংশ নিয়ে পুলিশের লাঠিচার্জে তিনি আহত হন। সে দিনের ঘটনা সম্পর্কে একটি স্মৃতিচারণে রওশন আরা বাচ্চু বলেন, সকাল দশটার দিকে দেখি একটি জিপ ও ৩/৪টি ট্রাক এসে দাঁড়ালো এবং পুলিশ বাহিনী পজিশন নিল, ইউনিভার্সিটির গেটটা ঘেরাও করলো। পুলিশ আমাদের মিছিলে লাঠিচার্জ করে। অনেক মেয়ে আঘাত পেলো, আমিও আঘাত পেয়েছি। আমরা দৌড়ে তখন এ্যাসেম্বলীর দিকে যাচ্ছিলাম, আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো স্মারকলিপি পৌছে দেয়া। কিন্তু মেডিকেলের মোড়েই দেখি শেল পড়ছে, চারদিকে কাঁদুনে গ্যাস। বেলা তিনটার দিক তখন আবার গুলির শব্দ পেলাম। এরপর তার কাটার বেড়া পার হয়ে ওসমান গনি সাহেবের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে দেখি সারা তৈফুর, সুফিয়া ইব্রাহিম, বোরখা শামসুন। তারা আমার এ রক্তাক্ত অবস্থা দেখে এগিয়ে এল।
এভাবে অন্যান্য জেলার তুলনায় সিলেট ও ঢাকায় সিলেটের নারী সমাজ ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

আরও পড়ুন



রম্যলেখক হারান কান্তি সেন’র সংবর্ধনা প্রদান

তাসলিমা খানম বীথি: প্রবাসী হলেও...

কেমুসাসের ১০৩৪ তম সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর আজ

কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের ১০৩৪...

অবহেলিত দক্ষিণ সুরমার উন্নয়নে সিলেট-৩ আসন থেকে প্রার্থী হতে চাই

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক...