ভাঙাচোরা সংসার!!

প্রকাশিত : ০১ অক্টোবর, ২০১৮     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

মোহাম্মদ আব্দুল হক :  নজর আলী গ্রামের ইস্কুলে পড়াশুনা করেছেন। এরপর শহরের কলেজ থেকে লেখাপড়া করে পাশ করেছেন ভালোভাবে। মেধাবী ছিলেন, তাই একটা চাকরিও সময়মতো জুটিয়ে নিয়েছেন। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে ছয়দিন কাজ করতে হয় সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত। সপ্তাহের একটা দিন শুক্রবার তার ছুটি। বিয়ে করেছেন এবং তখন থেকেই ঢাকা শহরের খিলগাও এলাকায় এই বাসায় আছেন। দুই ইউনিটের ছয়তলা ভবনের দুতলায় একপাশে তারা থাকেন। আজ সকালে ঘুম ভাঙ্গে চিৎকার, গালিগালাজ আর চেঁচামেচি শুনে। আজ পবিত্র শুক্রবার তাই রাত জেগে ইবাদত সেরেছেন। তাসবিহ্ জপেন , তাহাজ্জুদ নামাজ পড়েন। ফজরের নামাজের সময় হলে স্ত্রীকে ডেকে তুলেন এবং দুজনে মিলে নামাজ আদায় করে একসাথে হাল্কা নাস্তা ও চা পান করেন।

# প্রতি শুক্রবারের মতো ধার্মিক মানুষ মিষ্টার নজর আলী রাত জেগেছেন তাই এখন ঘুমুচ্ছেন। তার স্ত্রী নাজমা সিটিং রুমে কিছুসময় কোরআন তেলাওয়াত করে এখন রান্ধন কাজে রান্না ঘরে ব্যস্ত। রান্নাঘরে খুব সাবধানে নাজমা বাসনকোসন নাড়াচাড়া করছেন। শব্দ হলে নজর আলীর ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে। কিন্তু ঘরে যতোই নিরব পরিবেশ বজায় রাখতে চেষ্টা করেন, প্রতিবেশির অত্যাচারে সেটা দীর্ঘক্ষণ স্থায়ীত্ব পায়না। এ হচ্ছে আমাদের ভাঙাচোরা সমাজের এক নির্মম অবস্থা। বাহিরে কোথাও চিৎকার ও গালিগালাজ শুনে নজর আলীর ঘুম ভেঙে যায়। পাশের বস্তিবাসীর মাঝে প্রায় প্রতিদিন সকালবিকাল রুটিন করেই ঝগড়া হয়। কিন্তু আজ একটু অন্যরকম আওয়াজ কানে আসছে। নজর আলী ঘড়িতে সময় দেখে নিলেন। সকাল দশটা বাজে। বিছানার পাশের জানালা একটু ফাঁক করে অলস ভঙ্গীতে শুয়ে আছেন। নজর আলী বুঝতে পারেন ঝগড়া হচ্ছে পাশের ফ্লাটে। এমনটি আগে হলেও গত কয়েক বছর হয়নি।

# ঝগড়াঝাটি করতে করতে পাশের বাসার এক দম্পতির শেষ পর্যন্ত ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। সবাই জানে, জামিল সাহেবের ভাই পড়াশুনা করে ঢাকাতেই তবু মেসে থাকতে হয়। এখানে আসা উনার স্ত্রী পছন্দ করেন না। এমনকি জামিল সাহেবের কোনো বোন আসলেই শুরু হতো ঝগড়া। এক পর্যায়ে স্ত্রী সুমনা নিজে থেকেই স্বামী জামিল সাহেবকে তালাক দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিলেন চার বছর আগে। মহিলা ছেলে মেয়ে ফেলে রেখে বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন কোথায় যেন। কেউ আর ঠিক জানেনি। তবু লোকের মুখে কথার নানান রূপ দাঁড়ায় এরকম , মহিলা পরকীয়ায় জড়িয়ে আছেন হয়তো অন্য কোনোখানে। ঢাকা শহরে এমন খবর প্রতিদিন পত্রিকায় ছাপা হয়। তবে নজর আলী কিছু বলেননা। তিনি একদিন পত্রিকায় ‘ব্রোকেন ফ্যামিলি’ নামক একটি প্রবন্ধে পড়েন, ”ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলে মেয়েরা একটু বেশি মাত্রায় হতাশাগ্রস্থ হয় এবং এদের সাথে দাম্পত্য জীবন বেশি মাত্রায় অশান্তির হয়। ব্যতিক্রমতো আছেই। কাজেই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে মা-বাবাকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। একা থাকা নয়; বরং সবাইকে নিয়ে থাকি। বিবাহ বিচ্ছেদ বা ব্রোকেন ফ্যামিলি নয়; বরং সয়ে সয়ে সাজাই আর থাকি সংসারে।” তারপর স্ত্রী নাজমার সাথে কথা বলেন,
: আচ্ছা ওই ভদ্র মহিলার নিশ্চয় কোনো ফেসবুক একাউন্ট আছে। তুমি জানো কিছু।
: নাজমা বলেন, ফেসবুক থাকলেও আমার সাথে নেই। তবে সুমনা ভাবীর হোয়াটস অ্যাপ আছে।
: তাহলে শুনো। এই লেখাটি তুমি সুমনা ভাবীকে হোয়াটস অ্যাপে পাঠিয়ে দাও। লেখাটি পড়ে যদি মহিলার একটু টনক নড়ে তাহলে হয়তো উনি নিজেই সন্তানদের কথা ভেবে আবার ফিরে আসতে পারেন।
: ঠিক বলেছো। লেখাটি পড়ে আমিও বুঝেছি ব্রোকেন ফ্যামিলি ‘র ছেলেমেয়েরা মারাত্মক হতাশায় ভোগে। দাও আমি আজই পাঠাবো।
নজর আলী ও মিসেস নাজমার উদ্যোগ কাজে লেগেছে। প্রায় চার বছর আলাদা থাকার পর ছেলে মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে গত প্রায় দুই মাস ধরে মিসেস সুমনা ও জামিল সাহেব আবার বিয়ে করে ভালোই চলছেন। কিন্তু প্রতিবেশীদের কেউ কেউ ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে বলাবলি করেন, ছেলে মেয়ে রেখে যে মহিলা লোকটিকে তালাক দিয়ে চার বছর বাইরে কোথায় না কোথায় কাটিয়েছে জামিল সাহেব তাকেই আবার বিয়ে করতে গেলেন কোন দুঃখে। এসব কথাবার্তা নজরআলী ও মিসেস নাজমা এড়িয়ে চলেছেন।

# নজর আলী ও নাজমার কথা হলো ভদ্রমহিলা ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং জামিল সাহেব তার পূর্বের স্ত্রীকেই আবার নিয়ম মেনে আইন অনুযায়ী ঘরে তুলেছেন। এতে দোষের কিছু নেই। এখন আগের মতো ঝগড়া ফ্যাসাদ করে আত্মীয় ও প্রতিবেশিকে অশান্তিতে না ফেললেই হয়। আমাদেরও যেমন সন্তান বড়ো হইছে। তেমনি ওদের ছেলে মেয়েও বড়ো হইছে। ওরা ভালো থাকুক। কিন্তু একি উপদ্রব শুরু হলো আজ সকাল সকাল। প্রায় চার বছর ধরে ছয় তলা ভবনে আজকের মতো এমন ঝগড়ার খবর কেউ শুনেনি। এমনিতে কিছু দূরের বস্তির মানুষের আর্থিক টানাটানি ও অশিক্ষার কারণে প্রতিদিনের গালাগালিতে কান জ্বালাপালা হলেও তা অনেকটা সয়ে যায় ঢাকা শহরবাসীর। কিন্তু লেখাপড়া জানা এবং বাড়ি, গাড়ি, টাকা, পোশাকি জৌলুস থাকার পরও যদি বস্তিবাসীর মতো গালিগালাজ দিয়ে দিনের শুরু হয়, তবে আর লেখাপড়া ও অর্থ বিত্তের মূল্য কোথায়? তাছাড়া শুনেছি ওই মহিলা জনসেবা মূলক ক্লাবেও জড়িত। এসবই হচ্ছে ভন্ডামি। নজর আলী বালিশ ছেড়ে উঠে বসেন বিছানায়। মনেমনে বিরক্ত হয়ে ভাবেন, নাহ্ এভাবে চলতে পারেনা। অশান্তির কোলে বসবাস করে বাঁচা কঠিন। আজই এই ভবনের সবাইকে নিয়ে বসতে হবে। সবাই মিলে ওদেরকে জানাতে হবে এক বিল্ডিংয়ে থাকতে হলে অন্যের শান্তির কথাও ভাবতে হয়। তাতেও কাজ না হলে সিটি কর্পোরেশন পর্যন্ত যাবো।

# নাজমা রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে জানালা বন্ধ করলেন। তারপরও জামিল সাহেবের আওয়াজ আসছে, তোমাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করাটাই আমার ভুল হইছে। একই সাথে মিসেস সুমনার কর্কশ কন্ঠের চিৎকার – আমিও ভুল করেছি। আজই তোমাকে আমি…। কাঁচের কিছু একটা ভাঙ্গার শব্দের সাথে বাকি কথাগুলো মিলিয়ে গেলো। কাঁচ ভাঙলো নাকি সংসার ভাঙলো? প্রশ্ন নিয়ে নজর আলী আর নাজমা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ।।

আরও পড়ুন



শাল্লায় বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ কার্যক্রম শুরু

হাবিবুর রহমান হাবিব, শাল্লা (সুনামগঞ্জ)...

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগে পিঠা উৎসব অনুষ্ঠিত

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: বাংলাদেশ ব্যাংকের...

সিলেট বিভাগ গণদাবী ফোরামের আলোচনা সভা

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট বিভাগ...