ভয়ানক এ দৃশ্য

প্রকাশিত : ২৫ জুন, ২০২০     আপডেট : ১ মাস আগে

শামীমুল হক সত্যিই ভয়ানক এ দৃশ্য। ভয়ঙ্করও। মর্মান্তিক তো বটেই। হায়রে মানবিকতা। এটি তো আজ পিষ্ট। মধ্যযুগীয় বর্বরতাও হার মানছে অত্যাধুনিক এ ডিজিটাল যুগে। করোনার ভয়ঙ্কর থাবায় পৃথিবী কাবু। অদৃশ্য ভাইরাসের কাছে গোটা বিশ্ব নাস্তানাবুদ।
এই কঠিন সময়ে সাধারণ মানুষ মাস্ক আর হ্যান্ড স্যানিটাইজার এ দুটি অস্ত্র নিয়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়তে নেমেছে। বারবার হাত ধুয়ে বা হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার মেখে এবং মাস্ক ব্যবহার করে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে অনেকেই বিপদ ডেকে আনছে। বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে এসব
নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মানুষ জীবাণুনাশক পণ্যেকে পুঁজি করে মেতে উঠেছে মরন খেলায়। কঠিন বাস্তবতাও ওদের হৃদয়কে গলাতে পারেনি। বুধবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সনি আক্তার সূচীর ফেসবুক ওয়ালে নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারে বিকৃত হাতের ছবি ভাবিয়ে তুলে। দুটি হাতই ফুসকায় বিবর্ণ। তিনি ক্যাপশনে লিখেছেন- অসাধু ব্যাবসায়ীদের নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যাবহার করে হাতের কি অবস্থা..। সূচীর এ পোস্টে আবুল হাসান সরকার নামে একজন মন্তব্য করেছেন- এ তো করোনার চাইতেও ভয়ংকর…। সাংবাদিক কাওসার ইমরান কিখেছেন- যারা এমন মেডিসিন তৈরিতে জড়িত এরা জানুয়ারের বাচ্চা। এদের অাইনের অাওতায় এনে বিচারের দাবি জানাই। জয়নাল আবেদীন নামে একজন লিখেছেন- আমরা বাঙালি মানুষ হবো কবে? আলাল সরকার লিখেছেন- কঠিন বিচার হওয়া দরকার। জেসমিন আক্তার নামে একজন লিখেছেন-এই হলো বাংলাদেশ। মোহাম্মদ আলামিন লিখেছেন- আল্লাহ্ সঠিক বিচার যেন করেন নকল মানুষ গুলোকে। এমন অনেক মন্তব্য সূচীর এই পোস্টে। মন্তব্যগুলোতেই ফুটে উঠেছে ক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিক্রিয়া। এ ব্যাপারে সূচীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গতকাল আমার বাসার কাজের মেয়ে এসে বলছেন, ফুটপাত থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনে ব্যবহারের পর হাতে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। আমি তাকে মানা করেছি আর যেন ফুটপাতে কেনা স্যানিটাইজার ব্যবহার না করে। আসলেই তো করোনা শুরুর কয়েকদিনে সর্বত্র হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ এ সংক্রান্ত পণ্যের ব্যাপক সংকট দেখা দেয়। কদিন যেতে না যেতেই দেখা যায় মহল্লায় মহল্লায় ফুটপাতে টেবিল বসিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, পিপিই বিক্রি হচ্ছে। মানুষও তা কিনছে। আসলে করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে চাহিদা বেড়ে যায় জীবাণুনাশক পণ্যের। আর এ চাহিদাকে পুঁজি করেই অসাধু মানুষগুলো বাজারে ছাড়ে নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার। নিজেরা কারখানা খুলে বসে। খবর নিয়ে জানা যায়, প্রসাধনী কিংবা সুগন্ধির দোকান থেকে শুরু করে ফার্মেসির দোকানেও তৈরি হচ্ছে নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের নজরেও আসে বিষয়টি। অভিযান শুরু হয় বিভিন্ন জায়গায়। নকল কারখানাও আবিষ্কার হয়। গত সোমবার ২২শে জুন বরিশালে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার জব্দ করে। এ সময় নয়জনকে জেল-জরিমানা দেয়া হয়। নগরীর গির্জা মহল্লা ও চকবাজার এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের এ অভিযান পরিচালনা করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিয়াউর রহমান। জেলা প্রশাসনের মিডিয়া সেল সাংবাদিকদের জানায়, বরিশালের বাজারে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির নাম বিকৃত করে এজিআই; ওরিওনা, হেক্সিসলি, হেক্সিওল কিংবা হেক্সাসল, স্যাভলনকে স্যাভরন কিংবা স্যাবলন ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের নকল স্যানিটাইজার ও ডিজইনফেকট্যান্ট সামগ্রী অবাধে বিক্রি হচ্ছে। এসব প্রতিরোধে বরিশাল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গির্জা মহল্লা ও চকবাজার এলাকায় অভিযান চালানে হয়। এ সময় নকল এসব ওষুধ সামগ্রী বিক্রির অপরাধে সাতজনকে ২৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানে সজল জমাদ্দার রাজিব ও মোস্তফা কামাল নামে দুই জনকে ১ বছর করে বিনাশ্রমে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। জানানে হয়, দণ্ডপ্রাপ্ত রাজিব ও কামাল মূলত বরিশালে এসব নকল হেক্সিসল ও স্যানিটাইজার সামগ্রীর যোগানদাতা। তারা ঢাকা থেকে এসব সামগ্রী কুরিয়ারে কিংবা লঞ্চে পরিবহন করে নিয়ে আসেন। ঢাকার মিটফোর্ড এলাকা থেকে রাকিব নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশে তারা এ কাজটি করে থাকেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিয়াউর রহমান জানান, অভিযানে প্রায় এক লাখ টাকার নকল ওষুধ জব্দ করে তা ধ্বংস করা হয়।
শুধু বরিশাল নয়, গোপালগঞ্জের ডিসি রোডের হক মঞ্জিলে নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক তৈরি কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালিয়ে নকল এ কারখানার মালিক জুয়েল রায়কে একলাখ টাকা জরিমানা ও ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ সালাউদ্দীন দিপু এ দন্ডাদেশ দেন।
চট্টগ্রামেও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত তিন দিনে অভিযান চালিয়ে অন্তত সাত জনকে ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। এসময় জব্দ করা হয়েছে প্রায় এক হাজার লিটার নকল ও মানহীন হ্যান্ড স্যানিটাইজার। নগরীর হাজারী গলি, সদরঘাট, কালুরঘাট ও কতোয়ালীসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরির কারখানার সন্ধান পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিরীন আক্তার সাংবাদকদের জানিয়েছেন, প্রসাধনী কিংবা সুগন্ধির দোকান থেকে শুরু করে ফার্মেসির দোকানের মালিকরাই বাজার থেকে কেমিক্যাল কিনে এসব নকল হ্যান্ড সেনিটাইজার তৈরি করছেন। তিনি গত সোমবার বিকালে খাতুনগঞ্জ এলাকায় শাহ আমানত ও যমুনা স্টোর নামে দুটি সুগন্ধির দোকানে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১০০ লিটার নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার জব্ধ করেন। পরে ধ্বংস করা হয়। একই সঙ্গে দুই দোকানদারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তিন ধরে পরিচালিত অভিযানে অন্তত এক হাজার লিটার নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার জব্দ করা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, কিছু মৌসুমী ব্যবসায়ী এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেরাই হ্যান্ড স্যানিটাইজার প্রস্ততকারক বনে গেছেন। এসব নকল স্যানিটাইজার ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখেছি এতে ক্ষতিকারক অনেক উপাদান রয়েছে। যা শরীরের জন্য ক্ষতিকারক।
বাজারে সংকট থাকার সুযোগ নিয়ে নিজেরাই বিভিন্ন কেমিক্যাল কিনে তা তৈরি করে বাজারে ছাড়ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এছাড়া যশোর, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এমন নকল কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। এত কিছুর পরও রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র ফুটপাতে, রাস্তায়, মহল্লার মোড়ে মোড়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রি হচ্ছে। মানুষও দাম কম পেয়ে এসব নকল পণ্য কিনে নিচ্ছে। সঙ্গে অজান্তে নিয়ে যাচ্ছে বিপদ। এখনই অবাধে এসব বিক্রি বন্ধ ঘোষনা করা প্রয়োজন। সুত্র মানবজমিন

আরও পড়ুন