বোনের চোখের জল

প্রকাশিত : ০৩ জুলাই, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

 মোহাম্মদ আব্দুল হক: কতো শত গল্প নিজের সারা জীবন জুড়ে রয়েছে। একটি বলছি খুবই সংক্ষেপে। চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে যাবার দিনের গাড়ি সৌদিয়ায় উঠে বসেছি মাঝামাঝি এক সিটের করিডোর পাশে। পাশে জানালার ধারে ছেলে বসেছে। সেও যাবে আমার সাথে তার ফুফুকে দেখতে। সীতাকুণ্ড আসার পর করিডোরের ঠিক বরাবর অপর পাশেই উঠে বসেছেন এক মহিলা। তার সাথে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগ কোলের কাছেই রাখলেন, আরেকটি সহজে বহনযোগ্য মাঝারি সাইজের ব্যাগ পাশের সিটের উপর রাখলেন। বুঝা গেলো গন্তব্য যেখানেই হোক না কেনো ভদ্রমহিলা একাই যাচ্ছেন এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে গাড়িতে নিজের জন্যে পাশাপাশি দুই সিট ভাড়া করেছেন। গাড়ি ছুটে চলেছে মিরেরসরাই অভিমুখে।

মোবাইল ফোনের রিং বাজতে থাকলে পাশের ভদ্রমহিলা ফোন ধরলেন, আস্তে করে বললেন হ্যালো। মনে হচ্ছিলো তিনির কন্ঠে ক্লান্তি এবং বিরক্তি। অপর প্রান্ত থেকে একটি মহিলা কন্ঠের আওয়াজ আসছে, তবে আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। ওই প্রান্তের কথা শেষ হলে পরে গাড়ির ভদ্রমহিলা বলতে শুরু করলেন, শুনেন আপা, আমি সিলেট থেকে পরশু রাতে গাড়িতে উঠে বসি চট্টগ্রাম যাবার উদ্দেশ্যে। অনেকখানি পথ যাবার পর একটা ফোন আসে। আমার গাড়ি তখন হবিগঞ্জের মাধবকুন্ড ছাড়িয়েছে। আমাকে ঢাকা থেকে এক ভাই ফোন করে বলতেছে, শুনো তুমি চট্টগ্রাম না গিয়ে সীতাকুণ্ড নেমে পড়বা। ওখানে তুমি আমাদের এক বোনের বাসায় উঠবা। মবুভাই আমার এক পরম আত্মীয় ভাই।দুই দিকেই তার যোগাযোগ আছে। বড়ো ভালো মানুষ। আমার স্বামীর বন্ধুও বটে। আমি তখন তাকে বললাম, সীতাকুণ্ড আমার গাড়ি পৌঁছাবে ভোর চারটার সময়। আমি একেতো মহিলা তার উপর খুব চেনাজানা নাই। দেশের যা অবস্থা নারী ও শিশুদের দিনের বেলায় যেখানে নিরাপত্তা নাই, সেখানে রাতের আঁধারে কেনো পথে নামবো। ভাইয়া কি হইছে আমাকে খুলে বলেনতো। ভাইয়া তখন আমতা আমতা করে বললেন, দেখো তোমার বড়োভাবী আমাকে এপর্যন্ত কয়েকবার ফোন করে বলেছে, মবু তুমি ওকে ফোন করে নিষেধ করো যেনো সে আমার বাসায় না আসে। আমি বললাম কেনো কি হইছে। আর বড়োভাই কি কিছু বলছে? তখন মবুভাই বললেন, তোমার বড়োভাই যদি মানুষ হইতো তবে কি তার বউ এমন কথা বলতে পারে। জানোইতো ও বউয়ের কথা ছাড়া পানি পান করে না। আমি আবার মবুভাইর কাছে জানতে চাই, মা – বাবা নাই বলে এমনিতেই খুব একটা যাওয়া হয়না। ভাই যে কয়টি আছে তারাও বছরে দুই চারবার শালা-শালীর বাড়ি ঠিক ঘুরে বেড়ায়। আমার বেলায় বলে সময় নাই। যেনো রাষ্ট্রের সব দায়িত্ব ওদের কাছে। আজ দুই বছর পর নিজেই দেখতে যাচ্ছি অথচ চলন্ত গাড়ি থেকে নামিয়ে দিচ্ছে। কি অজুহাতে বলুনতো ভাইয়া। মবুভাই বলেন, ওদের দুই ছেলের মাস্টার্স পরীক্ষা তাই তোমাকে যেতে নিষেধ করছে। আমি বললাম কি বলছেন এসব। ওদের পরীক্ষার দোহাই দিয়ে ওই মহিলা আমাকে রাতের আঁধারে বিপদে ফেলে দিতে পারে।আপা আমি তখন মবুভাইকে বলি, আচ্ছা ভাইয়া আপনি বলেন ওইসব পোলাপান কি দিবে জাতিকে। বাদদেন জাতির কথা, বাইশ-তেইশ বছরের যে ছেলেরা নিজের ফুফুর নিরাপত্তার কথা ভাবতে পারলো না। ওরা কি ওদের মা বাবার প্রতি সময়ে সঠিক আচরণ করবে মনে করেন। মবুভাই বলেন, আমিওতো সেকথাই ভাবছি এবং তোমার ভাবী যখন আমার সাথে ফোনে কথা বলে তোমাকে নিষেধ করার জন্য বলছিলেন তখনও ওই দুই ছেলে ও তোমার বড়োভাইয়ের আওয়াজ আমি শুনেছি, ওরা পাশেই ছিলো। যাক্ আমি অভিশাপ দিচ্ছি না। তবু ভাই ভাতিজা ভালো থাকুক। আসলে হইছে কি আপা ; টেলিভিশনে প্রায় দিনই মাগরিব কিংবা এষার আজানের আগে একটি বাণী লেখা দেখানো হয়, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী কখনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ আমি চাই আমি নিজেও জান্নাতে যাবো এবং আমার ভাই-বোনেরাও জান্নাতে যাক্। তাই নিজে থেকেই যোগাযোগ করি। ভদ্রমহিলা এবার থামলেন, চোখ জলে ভরা। সামনে বাজার, তাই গাড়ি ধীরগতিতে এগুচ্ছে। আমার সামনের সিটে বসা এক বৃদ্ধাও সম্ভবত আমার মতো ওই ভদ্রমহিলার কথা শুনছিলেন। তিনি যোগ করলেন, মন খারাপ করোনা মা। ছোটোবেলা আমার মা মারা গেছিলেন, আমার একটা ছোট বোন ছিলো, কিন্তু বড়োভাইর বউ রোজ সকালবেলা তার ছেলেরে ডিম খেতে দিতো আর আমার বোনটা মরিচ পোড়া দিয়ে ভাত খেয়ে ইস্কুলে যেতো। বড্ড খবিশ ছিলো ভাইর বউটা।

পাশের ভদ্রমহিলা এদিকে কান না দিয়ে চোখ মুছে ফোনে বলতে লাগলেন , আপা দুটো দিন আপনার কাছে ছিলাম। মা-বাবা নাই। ভাইগুলো থেকেও…। কান্নার এক নদী যেনো মহিলাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোনো এক অজানা হাহাকারের সমুদ্রে। নিজেকে সামলে নিয়ে, একটু থেমে বললেন, জানেন আপা আমার ছোটো মেয়েটি ঢাকার হাসপাতালে ভর্তি ছিলো। কিন্তু আমার আরেক ভাই চৌদ্দদিন পরে দেখতে গেছে। অথচ সে ঢাকার অভিজাত এলাকায় নিজের বাসায় থাকে এবং মতিঝিলে প্রতিদিন অফিসে যায়। হাসপাতাল মতিঝিল থেকে বেশি দূরে নয়। আমার মেয়েটি বাঁচেনি শেষপর্যন্ত। জানেন, মেয়ে আমার মৃত্যুর আগে হাসপাতাল থেকে কয়দিনের জন্যে রিলিজ পেয়েছিলো। তখন ওই টাকাওয়ালা ভাই ও ভাবী বলেছিলো, আমাদের বাসায় মেয়েকে নিয়ে আসতে পারবে তবে থাকতে হবে ফ্লোরে। আপা এ হচ্ছে আমার মায়ের পেটের ভাইদের চেহারা। অবশ্য এমন আচরণ ওরা করতে শুরু করে আমার স্বামী ব্যবসায় মার খেয়ে বেশ খানিকটা আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ার পর থেকেই। অসুস্থ মৃত্যুপথ যাত্রী নিষ্পাপ মেয়েটিকে নিয়ে যে ভাইয়ের বাসায় হাসপাতাল থেকে যেতে চেয়েছিলাম তাকে মেয়েটি চাঁদমামা বলে ডাকতো। আরো অনেক কষ্ট আছে আপা। দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বললেন, অনেক কষ্টের পাহাড় বুকে চেপে যাচ্ছি। কেউ জানছে না। আবার কেউ ভুলটুকু জানছে। আসলে বদের বদ একেকটা ছোটোলোক মহিলা বিয়ে করেছে আমার ভাই দুটো। আপনাকে আর বিরক্ত করবোনা আপা। বুঝলেন আপা অভিশপ্ত ভাবী ও অভিশপ্ত ভাইয়ের জন্যে আমাদের সমাজের সরল বোনগুলোর কষ্টের সীমা থাকেনা। আমি দেখেছি আপা, অনেক ক্ষেত্রে ওইসব দুষ্ট লোভী মহিলারা বাংলার শ্বশুরকুলে ইতিহাসের জঘন্য ঘসেটি বেগম সেজে এমনসব কুকান্ড করে। আবার এমনও দেখেছি আমাদের সমাজের চরম স্বার্থপর ওইসব মা-বাবারা নিজেদের সন্তানদেরকেও নৈতিক শিক্ষা না দিয়ে অন্যের জন্যে বিছানো ষড়যন্ত্রের জালে নিজেরাই আটকা পড়ে। কেউ আগে কেউ পরে।

ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ থেমে চোখ মুছলেন। অনেক্ষণ পর অপর প্রান্ত থেকে মহিলার কান্নাজড়ানো কন্ঠ অস্পষ্ট শুনতে পেলাম। গাড়িতে বসা ভদ্রমহিলার গাল বেয়ে অশ্রু পরছে। কাঁদতে কাঁদতে বলছেন , আপা আল্লাহ বিচারের মালিক। আমাদের বাবার বাড়িতে ধর্মীয়ভাবে যেমন তেমনি দেশের আইনে আমার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তবু বাড়ির ভিটা, গাছ, ধানক্ষেত, পুকুর সবই আমরা ভাইদের জন্যে ছেড়ে আসি। এসব অধিকার ছাড়া উচিত নয় কোনোভাবেই। ভিটের অংশ যেমন আইন অনুযায়ী নিয়ে নেয়া উচিত, তেমনি পুকুর, পুকুরপাড় সবকিছু আলাদা আলাদা করে বন্টন করে দখল নেয়া উচিত। ক্ষেতের ধান, গাছের আম, নারিকেল, পুকুরের মাছ সবই ওরা বছরের পর বছর অন্যায়ভাবে ভোগ করে। আমাদের সরলতার সুযোগে এখন পার পেলেও পরকালে জবাব দিতে হবে। আইন আমাদের পক্ষে থাকলেও আমরা বাঙালি মেয়েরা হিসেব চাই না। মনেকরি খাক ভাই ভাতিজা খেয়ে সুখি হোক। আসলে যতো সমস্যার মূলে দুষ্টক্ষত মানসিকতার বউ আর মেরুদন্ডহীন ভাই। আবার ভদ্রমহিলার দীর্ঘশ্বাস, চলন্ত গাড়ির ভিতরের পরিবেশ ভাড়ী হয়ে আছে। তিনি বললেন আপা রাখি, আমাদের জন্যে দোয়া করবেন। আমার শাশুড়ি বলতেন, ‘কার জন্যে কে কুয়া খুঁড়ে, কুয়াতে পড়ে সে মরে।’ আল্লাহ ভরসা। আপা খোদা হাফেজ।

গাড়ি ততক্ষণে ফেনি পার হয়েছে। আমার চোখ জলে ভরে গেছে। মুছতে ইচ্ছে করে না। আমি যাচ্ছি ছয়মাস পরে বোনকে দেখবো বলে। পাশে ছেলেটি বাহিরে দিগন্তে চেয়ে না জানি কতো স্বপ্ন বুনে যাচ্ছে। আমি ভাবছি, এই ছয়মাসে না জানি বোনটি আমার প্রতিদিন কতোবার পথ চেয়ে চেয়ে চোখের জলে ভেসেছে। আমার স্ত্রী খুব করে বলে দিয়েছেন যেনো বোনকে সাথে করে নিয়ে আসি কয়েকটি দিন থাকবে। আর সন্তানেরা ফুফু আর ফুফুতো ভাই বোনদের জন্যে রীতিমতো অপেক্ষায় থাকে। গাড়ি পথে কোনো এক বাজারে জ্যামে আটকেছে। রাস্তার ধারে এক বস্তির সামনে জটলা। এক মহিলা ময়লা শাড়ি গায়ে জড়ানো আর গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলছে, ‘ তুই হইলে ছিনাল বেডি। আমরার ভাই এইরুম আছিল না। তুই নডি বেডি যতো নষ্টের…।’ চিৎকার চেঁচামেচি দূরে ঠেলে গাড়ি ছুটে চলেছে। আবার মোবাইল ফোনে রিং বাজছে। কার ফোন? আমি অন্যমনষ্ক ছিলাম। পাশের ভদ্রমহিলা বলছেন, ভাইজান সম্ভবত আপনার ফোন বাজতেছে। হুঁশে ফিরি! জ্বি? … ও হ্যাঁ…।।

 

আরও পড়ুন



সিলেট কাষ্টঘরে র‌্যাবের অভিযান, মাদকসহ ২৯ জন আটক

সিলেট নগরীর কাষ্টঘর এলাকায় মাদকের...

সিলেটে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: ঢাকায় বাসচাপায়...

ঢাবি ছাত্রীকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণের আলামত...